সকল লেখা জানতে চাই
Searching…

আন্ডারগ্রাউন্ডে ভারতীয় ত্রৎস্কিপন্থীদের উত্থান

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের উত্তাল সময়ে ভারত ও সিলনের বিপ্লবীরা ব্রিটিশ দমন-পীড়ন উপেক্ষা করে বলশেভিক-লেনিনিস্ট পার্টি অব ইন্ডিয়া বা বিএলপিআই গঠন করেন। এই গোপন সংগঠনটি কেবল ব্রিটিশ শাসনের অবসান নয়, বরং শ্রমিক-কৃষকের নেতৃত্বে একটি সামাজিক বিপ্লবের স্বপ্ন দেখেছিল।

Sankalpa
Sankalpa মজদুরের নিয়মিত লেখক
পড়তে 11 মিনিট লাগতে পারে
এই লেখাটি 90 বার পড়েছে এ মাসে লেখকের লেখা 2 জন পাঠক পড়েছেন
আন্ডারগ্রাউন্ডে ভারতীয় ত্রৎস্কিপন্থীদের উত্থান

আমার পূর্বের লেখায় ১৯৪২ সালের আগস্ট আন্দোলন এবং ১৯৪৬ সালের নৌবিদ্রোহে ভারতীয় ত্রৎস্কিপন্থীদের রাজনৈতিক ভূমিকা নিয়ে আলোচনা করেছি। কিন্তু সেই হস্তক্ষেপগুলির পিছনে যে দীর্ঘ আন্ডারগ্রাউন্ড প্রস্তুতি, আন্তঃদেশীয় সাংগঠনিক সহযোগিতা এবং গোপন বিপ্লবী কর্মকাণ্ড ছিল, তা ইতিহাসচর্চায় তুলনামূলকভাবে অনেক কম আলোচিত। অথচ বলশেভিক-লেনিনিস্ট পার্টি অব ইন্ডিয়া, সিলন অ্যান্ড বার্মা (বিএলপিআই)-এর গঠন এবং বিকাশের ইতিহাস দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ভারত ও সিলনের বিপ্লবী মার্কসবাদীদের আন্তর্জাতিক সহযোগিতার এক অনন্য অধ্যায়। চার্লস ওয়েসলি আরভিন, রবার্ট জে. আলেকজান্ডার এবং Revolutionary History-এ প্রকাশিত গবেষণা এই বিস্মৃত ইতিহাসের নানা দিক উন্মোচিত করেছে।

ভারতীয় ত্রৎস্কিপন্থী আন্দোলনের সূত্রপাত এবং তার রাজনৈতিক বিবর্তন নিয়ে আগের পর্বে সংক্ষেপে আলোচনা করা হয়েছে। এখানে সেই পরিচিত ইতিহাস পুনরাবৃত্তি না করে আমরা মূলত বিএলপিআই-এর আন্ডারগ্রাউন্ড সংগঠন গড়ে তোলা, ভারত ও সিলনের বিপ্লবীদের যৌথ উদ্যোগ, এবং যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে একটি সর্বভারতীয় বিপ্লবী দল নির্মাণের প্রচেষ্টার দিকে নজর দেব।

ভারত-সিলন ঐক্যের পরিকল্পনা: বিএলপিআই গঠনের পটভূমি

এই উদ্যোগের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি ছিল সিলনের লঙ্কা সম সমাজ পার্টি (এলএসএসপি)। ১৯৩৫ সালে প্রতিষ্ঠিত এই দলের মধ্যে ফিলিপ গুণবর্ধনে, কলভিন আর. ডি সিলভা, লেসলি গুণবর্ধনে, এন. এম. পেরেরা, রবার্ট গুণবর্ধনে ও এডমন্ড সমরক্কোডির নেতৃত্বে একটি ত্রৎস্কিপন্থী ধারা গড়ে ওঠে। ১৯৪১ সালে এলএসএসপি চতুর্থ আন্তর্জাতিকের সঙ্গে যুক্ত হলে ভারত ও সিলনের ত্রৎস্কিপন্থীদের মধ্যে সাংগঠনিক সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ হয়।

১৯৪০ সালের ডিসেম্বর মাসে ক্যান্ডিতে অনুষ্ঠিত একটি বৈঠকে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় যে ভারত, সিলন ও বর্মাকে নিয়ে একটি একক বিপ্লবী দল গঠন করা হবে। ১৯৪১ সালে এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য এলএসএসপি-র কর্মীদের ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে পাঠানো হয়। লেসলি ও ভিভিয়েন গুণবর্ধনে, হেক্টর অভয়বর্ধনে ও এস. সি. সি. অ্যান্থোনিপিল্লাই মাদ্রাজে; কমলেশ ব্যানার্জি, বার্নার্ড সোইসা ও লেসলি গুণবর্ধনে বোম্বেতে সাংগঠনিক কাজ শুরু করেন।

কিন্তু ব্রিটিশ পুলিশি দমন এই প্রচেষ্টাকে বাধাগ্রস্ত করে। ১৯৪১ সালের গ্রীষ্মে কলকাতায় কমলেশ ব্যানার্জি, ইন্দ্র সেন, বার্নার্ড সোইসা, ডরিক ডি সুজা ও তাঁর স্ত্রী গ্রেপ্তার হন। তবুও নভেম্বর মাসে কলকাতায় একটি গোপন বৈঠকে বিএলপিআই গঠনের জন্য একটি ফরমেশন কমিটি তৈরি হয়। লেসলি গুণবর্ধনে, কমলেশ ব্যানার্জি, ওঙ্কারনাথ শাস্ত্রী ও সোমা রমনাথনকে নিয়ে একটি অস্থায়ী কমিটি গঠিত হয় এবং খসড়া কর্মসূচি কলকাতা, বোম্বে, মাদ্রাজ, গুজরাত ও উত্তর প্রদেশের বিভিন্ন গোষ্ঠীর কাছে পাঠানো হয়।

১৯৪২ সালের এপ্রিল মাসে সিলনের কারাগারে বন্দি এন. এম. পেরেরা, কলভিন ডি সিলভা, ফিলিপ গুণবর্ধনে ও এডমন্ড সমরক্কোডি জেল ভেঙে পালিয়ে ভারতে আসেন। মাছধরা নৌকায় করে তাঁরা সিলন থেকে ভারতে পৌঁছান। ভারতে এসে তাঁরা সম্পূর্ণ আন্ডারগ্রাউন্ড জীবন শুরু করেন এবং বিভিন্ন ছদ্মনাম ব্যবহার করেন। ফিলিপ গুণবর্ধনে কখনও "রূপ সিং", কখনও "আলমেইদা" নামে পরিচিত ছিলেন। রবার্ট গুণবর্ধনে ব্যবহার করতেন "বৈদ্য" ও "প্রকাশ" নাম। এন. এম. পেরেরা প্রথমে "এ. দেশমুখ" এবং পরে এক আকস্মিক পরিস্থিতিতে "বিশ্বনাথ" নাম গ্রহণ করেন। আর কলভিন ডি সিলভা নিজের ছদ্মনাম রাখেন "সি. আর. গোবিন্দন"— ১৯৪০ সালে মুল-ওয়া চা বাগানে পুলিশের গুলিতে নিহত শ্রমিক গোবিন্দনের স্মৃতিতে, যার বিধবার পক্ষে তিনি আইনজীবী হিসেবে আদালতে লড়েছিলেন। ১৯৪৪ সালের বিচার-বিবৃতিতে পেরেরা ও গুনওয়ার্দেনা তাঁদের কারাগার থেকে পলায়নের উদ্দেশ্য ব্যাখ্যা করতে গিয়ে একটি তাৎপর্যপূর্ণ কথা বলেন: “১৯৪২ সালের এপ্রিল মাসে আমি কারাগার থেকে পালাই, ভারতের চতুর্থ আন্তর্জাতিকতাবাদীদের ক্ষুদ্র গোষ্ঠীটিকে শ্রমিক শ্রেণির একটি পার্টি নির্মাণে সাহায্য করার উদ্দেশ্যে।”

দমন, গ্রেপ্তারের পর গোপন দলের জন্ম

অবশেষে ১৯৪২ সালের মে মাসে বোম্বেতে গোপন বৈঠকে আনুষ্ঠানিকভাবে বলশেভিক-লেনিনিস্ট পার্টি অব ইন্ডিয়া, সিলন অ্যান্ড বার্মা প্রতিষ্ঠিত হয়। দলটি গণতান্ত্রিক-কেন্দ্রীয়তাবাদী কাঠামোর ভিত্তিতে সংগঠিত হয়। বোম্বে, কলকাতা, মাদ্রাজ ও উত্তর প্রদেশে ইউনিট গড়ে ওঠে। পরে চতুর্থ আন্তর্জাতিক বিএলপিআই-কে ভারতের আনুষ্ঠানিক শাখা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।

দলের রাজনৈতিক কর্মসূচি ছিল শ্রমিকশ্রেণির স্বাধীন নেতৃত্বে বিপ্লবী সংগ্রামের পক্ষে। বিএলপিআই দাবি করেছিল:

  • শ্রমিকদের নেতৃত্বে রাজনৈতিক ক্ষমতা প্রতিষ্ঠা;

  • সোভিয়েত বা শ্রমিক-কৃষক পরিষদের ভিত্তিতে রাষ্ট্র গঠন;

  • কারখানায় শ্রমিক নিয়ন্ত্রণ;

  • বিনা ক্ষতিপূরণে জমিদারি উচ্ছেদ এবং চাষিদের হাতে জমির মালিকানা;

  • কৃষিঋণ বিলোপ;

  • সাম্রাজ্যবাদের অবসান।

তাদের মতে, স্বাধীনতা শুধু ব্রিটিশ শাসনের অবসান নয়; এটি শ্রমিক-কৃষকের ক্ষমতা প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের অংশ।

তবে সংগঠনটি সংখ্যায় বড় ছিল না। ১৯৪২ সালের মাঝামাঝি সময়ে বোম্বে ইউনিটে প্রায় চল্লিশ জন সদস্য ছিল। এর মধ্যে আহমেদাবাদ ও ভাবনগরের বস্ত্রশ্রমিক, মুদ্রণকর্মী এবং সিলন থেকে আগত নেতারা ছিলেন। উত্তর প্রদেশে প্রায় ত্রিশ জন সদস্যের মধ্যে কানপুরের শ্রমিক ও বেনারসের শিক্ষার্থীরা গুরুত্বপূর্ণ ছিল। বাংলায় প্রায় ত্রিশ সদস্যের সংগঠন মূলত শিক্ষার্থী ও পেশাজীবীদের নিয়ে গঠিত হলেও তারা লিপটনের চা কারখানার একটি ইউনিয়নের নেতৃত্ব দিত।

বোম্বে ছিল বিএলপিআই-এর প্রধান সাংগঠনিক কেন্দ্র। এখানে কেন্দ্রীয় কার্যালয় ও ছাপাখানা স্থাপন করা হয়। চন্দ্রবাদন শুক্লার সহযোগিতায় গুজরাতে ছাপাখানা ব্যবহার করে ইনকিলাব এবং পরে Bolshevik Leninist প্রকাশিত হয়। আন্ডারগ্রাউন্ড পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক সাহিত্য প্রকাশ ছিল সংগঠনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কাজ।

বোম্বেতে দলটি বস্ত্রশ্রমিক ও মুদ্রণশ্রমিকদের মধ্যে কাজ গড়ে তোলে। এই শ্রমিকভিত্তিই পরবর্তী সময়ে নৌবিদ্রোহের সময় বিএলপিআই-এর হস্তক্ষেপকে সহজ করে তোলে। উত্তর প্রদেশে কানপুরের শ্রমিক ও বেনারসের শিক্ষার্থীদের মধ্যে সংগঠন তৈরি হয়। এলাহাবাদ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন কংগ্রেসপন্থী শিক্ষার্থী সংগঠনের সক্রিয় কর্মী রাজনারায়ণ আর্যও এই সময় বিএলপিআই-এর সঙ্গে যুক্ত হন। এই তথ্যটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি দেখায় যে ত্রৎস্কিপন্থীরা কেবল বিদ্যমান কমিউনিস্ট কর্মীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিলেন না; জাতীয়তাবাদী শিক্ষার্থী আন্দোলনের মধ্য থেকেও নতুন সদস্য আকৃষ্ট করার চেষ্টা করেছিলেন।

বাংলায় সংগঠনের চরিত্র ছিল কিছুটা ভিন্ন। এখানে সদস্যদের অধিকাংশই শিক্ষার্থী ও পেশাজীবী হলেও, তাদের শ্রমিক সংগঠনের সঙ্গেও সম্পর্ক ছিল। চতুর্থ আন্তর্জাতিককে পাঠানো একটি প্রতিবেদনে তারা জানায় যে রেভলিউশনারি সোশ্যালিস্ট পার্টির (আরএসপি) সঙ্গে তাদের একটি "practical united front" গড়ে উঠেছে। প্রতিবেদনে আরএসপি-কে এমন একটি বিপ্লবী সংগঠন হিসেবে বর্ণনা করা হয়, যারা সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধের বিরোধিতা করছিল, যদিও তাদের আদর্শগত অবস্থানকে বিএলপিআই "পাতি-বুর্জোয়া বিভ্রান্তি" দ্বারা প্রভাবিত বলেও উল্লেখ করেছিল। সেই প্রতিবেদনে আরও দাবি করা হয় যে আরএসপি-র অন্তত একজন সদস্য ইতিমধ্যেই বিএলপিআই-এ যোগ দিয়েছিলেন। এই বিবরণ থেকে বোঝা যায়, মতাদর্শগত সমালোচনা বজায় রেখেও বিএলপিআই বাস্তব রাজনৈতিক সহযোগিতার নীতি অনুসরণ করছিল।

দক্ষিণ ভারতেও মাদ্রাজ ও মাদুরায় সংগঠন গড়ে ওঠে। সিলন থেকে আগত অভিজ্ঞ কর্মীরা এই কাজকে শক্তিশালী করেন। বিএলপিআই-এর নেতৃত্ব তামিল অঞ্চলকে ভারত ও সিলনের মধ্যে রাজনৈতিক সংযোগের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হিসেবে দেখেছিল।

অন্যদিকে সিলনে এলএসএসপি কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে কাজ চালিয়ে যাচ্ছিল। বহু নেতা ভারতে চলে আসেন, দলের সাধারণ সম্পাদক জ্যাক কোটেলওয়ালা কারাগারে বন্দি, শ্রমিক সংগঠনের পত্রিকা Kamkaruwa বন্ধ হয়ে যায় এবং পুলিশি নজরদারি এড়ানোর জন্য একটি বহনযোগ্য ছোট মুদ্রণযন্ত্র ক্রমাগত একটি গোপন আস্তানা থেকে অপর আস্তানায় স্থানান্তর করে রাজনৈতিক সাহিত্য প্রকাশের কাজ চালিয়ে যেতে হতো। ব্রিটিশ প্রশাসন বিএলপিআই-কে গুরুত্বের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করেছিল। সংগঠনের সদস্যসংখ্যা সীমিত হলেও তাদের আন্তর্জাতিক যোগাযোগ, চতুর্থ আন্তর্জাতিকের সঙ্গে সম্পর্ক, যুদ্ধবিরোধী প্রচার এবং আন্ডারগ্রাউন্ড সাংগঠনিক কার্যকলাপ প্রশাসনের নজরে ছিল। চার্লস ওয়েসলি আরভিন তাঁর গবেষণায় ভারত অফিস লাইব্রেরির গোয়েন্দা নথির উল্লেখ করেছেন, যেখানে বিএলপিআই এবং চতুর্থ আন্তর্জাতিক-সংক্রান্ত সাহিত্যকে নিয়মিত নজরদারির আওতায় রাখা হয়েছিল। বিশেষ করে সিলন থেকে নেতাদের পলায়ন, ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে তাঁদের গোপন চলাফেরা, আন্ডারগ্রাউন্ড ছাপাখানা এবং আন্তর্জাতিক যোগাযোগ ব্রিটিশ গোয়েন্দাদের উদ্বেগের বিষয় হয়ে ওঠে।

বিএলপিআই-এর রাজনৈতিক কর্মসূচি: স্বাধীনতা থেকে সামাজিক বিপ্লবের দিশা

ভগৎ সিং ও লেনিন-ত্রৎস্কিদের উপনিবেশে বিপ্লবের মূল্যায়নের পথ ধরেই [দেখুন: উপনিবেশে বিপ্লব: "সুনির্দিষ্ট পরিস্থিতির সুনির্দিষ্ট বিশ্লেষণ"] ভারতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামকে ভারতীয় ত্রৎস্কিপন্থীরা কেবল একটি জাতীয় মুক্তিসংগ্রাম হিসেবে নয়, আন্তর্জাতিক সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের বৃহত্তর প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে বিবেচনা করত। এই কারণেই দল গঠনের অল্প সময়ের মধ্যেই তারা আন্তর্জাতিক সচিবালয়ের স্বীকৃতি লাভের জন্য উদ্যোগী হয় এবং ১৯৪২ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত "Manifesto to the Workers and Peasants of India"-এর মাধ্যমে বলশেভিক-লেনিনিস্ট পার্টি অব ইন্ডিয়া, সিলন অ্যান্ড বার্মাকে ভারতের আনুষ্ঠানিক শাখা হিসেবে চতুর্থ আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি দেয়। একটি সদ্যগঠিত, ক্ষুদ্র সংগঠনের পক্ষে এই স্বীকৃতি রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ছিল, কারণ এর মাধ্যমে ভারতীয় ত্রৎস্কিপন্থীরা নিজেদের আন্তর্জাতিক বিপ্লবী আন্দোলনের অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হয়।

বিএলপিআই-এর রাজনৈতিক কর্মসূচিও এই আন্তর্জাতিক অবস্থানকে প্রতিফলিত করেছিল। পার্টির কর্মসূচিতে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের নেতৃত্বকে চীনের কুওমিনতাঙের সঙ্গে তুলনা করা হয় এবং বলা হয় যে, বুর্জোয়া নেতৃত্বাধীন জাতীয়তাবাদ স্বাধীনতার সংগ্রামকে শেষ পর্যন্ত আপসের পথেই নিয়ে যাবে। পূর্বেই উল্লেখ করেছি যে এর পরিবর্তে কর্মসূচিতে বিনা ক্ষতিপূরণে জমিদারি উচ্ছেদ, চাষিদের হাতে জমির মালিকানা হস্তান্তরের নীতি, কৃষিঋণ বিলোপ, শ্রমিকশ্রেণির নেতৃত্বে বিপ্লব এবং সোভিয়েত প্রতিষ্ঠার দাবি উত্থাপন করা হয়। অর্থাৎ, বিএলপিআই স্বাধীনতাকে কেবল ব্রিটিশ শাসনের অবসান হিসেবে নয়, সামাজিক বিপ্লবের সূচনা হিসেবেও দেখছিল।

মারক্সিস্ট ইন্টারনেট আর্কাইভে ১৯৪২ সালের “A Transitional Program for India” দলিলের সম্পাদকীয় নোটে বলা হয়েছে যে দল প্রতিষ্ঠার পর থেকেই, মে দিবসের প্রচারপত্র প্রকাশের সময় থেকে শুরু করে, বিএলপিআই “ওয়ারকার্স’ কমিটিজ অব ডিফেন্স”-এর স্লোগানটি উত্থাপন করেছিল। এর উদ্দেশ্য ছিল, যুদ্ধ যখন শ্রমিকদের জীবন ও জীবিকার ওপর সংকট তৈরি করবে, তখন শ্রমিক কমিটিগুলি যেন তাঁদের পক্ষে দাঁড়িয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারে। ওই দলিলে লেখা হয়, “অন্তর্বর্তীকালীন কর্মসূচির মূল কাজ হল প্রলেতারিয়েতের নেতৃত্বে বিপ্লবের লক্ষ্যে জনসাধারণকে পরিকল্পিত ও ধারাবাহিকভাবে সংগঠিত করা।”

পরবর্তী সময়ে বিএলপিআই গঠনের এই উদ্যোগ সম্পর্কে সংগঠনের কয়েকজন প্রবীণ নেতার মূল্যায়নে কিছু পার্থক্য দেখা যায়। চার্লস ওয়েসলি আরভিন উল্লেখ করেছেন যে, ১৯৪৭ সালে ফিলিপ গুণবর্ধনে ফিরে তাকিয়ে তাঁদের উদ্যোগকে এক অর্থে "revolutionary romantics" বলে অভিহিত করেছিলেন। তাঁর বক্তব্য ছিল, সে সময় তাঁরা নিজেদের সাংগঠনিক শক্তির তুলনায় অনেক বেশি আশাবাদী ছিলেন। রেজি সিরিওয়ার্দেনের স্মৃতিকথাতেও অনুরূপ মন্তব্য পাওয়া যায়। অন্যদিকে হেক্টর অভয়বর্ধনা এই উদ্যোগকে "সম্ভবত শ্রীলঙ্কার আধুনিক রাজনৈতিক ইতিহাসের কয়েকটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার একটি" বলে বর্ণনা করেছেন।

বিএলপিআই-এর ইতিহাস দেখায় যে ১৯৪০-এর দশকের ভারতীয় স্বাধীনতা আন্দোলন শুধু কংগ্রেস, মুসলিম লীগ বা কমিউনিস্ট পার্টির রাজনীতিতে সীমাবদ্ধ ছিল না। এই সময়ে একটি ছোট কিন্তু সংগঠিত বিপ্লবী মার্কসবাদী ধারা শ্রমিক-কৃষকের স্বাধীন রাজনৈতিক নেতৃত্ব গড়ে তোলার চেষ্টা করেছিল। তাদের অভিজ্ঞতার প্রধান শিক্ষা হল, কেবল রাজনৈতিক প্রচার নয়, কঠিন পরিস্থিতিতেও সংগঠন নির্মাণ, শ্রমিকদের মধ্যে ভিত্তি তৈরি এবং আন্তর্জাতিক বিপ্লবী সংযোগ বজায় রাখা।




#বলশেভিক_লেনিনিস্ট_পার্টি #বিএলপিআই #ত্রৎস্কিপন্থী_আন্দোলন #চতুর্থ_আন্তর্জাতিক #এলএসএসপি #ভারতের_ইতিহাস #বিপ্লবী_রাজনীতি #স্বাধীনতা_সংগ্রাম
Sankalpa

About the Author

Sankalpa

মজদুরের নিয়মিত লেখক

শিক্ষার্থী

বই পড়ি, প্রশ্ন করি, তর্ক করি। সাহিত্য, ইতিহাস আর রাজনীতি নিয়ে ভাবতে ভালোবাসি। বিশেষ করে সমাজকে তার অন্তর্নিহিত দ্বন্দ্ব, পরিবর্তন ও সম্ভাবনার মধ্য দিয়ে বোঝার চেষ্টা করি। জটিল বিষয়কে সহজ করে বোঝার চেয়ে, তাকে গভীরভাবে বোঝার চেষ্টাটাকেই বেশি মূল্য দিই।

প্রোফাইল দেখুন

মতামত

এখনও কোনো মতামত নেই।

প্রথম মতামতটি আপনিই দিন।

আলোচনায় অংশ নিতে লগ ইন করুন অথবা এ্যাকাউন্ট খুলুন

Reading

Font size

Auto scroll
Slow Fast