সকল লেখা জানতে চাই
Searching…

আগস্ট বিপ্লব ও নৌবিদ্রোহে ত্রৎস্কিপন্থীরা

Sankalpa
Sankalpa মজদুরের নিয়মিত লেখক
পড়তে 19 মিনিট লাগতে পারে
এই লেখাটি 177 বার পড়েছে এ মাসে লেখকের লেখা 2 জন পাঠক পড়েছেন
আগস্ট বিপ্লব ও নৌবিদ্রোহে ত্রৎস্কিপন্থীরা

বাংলা ইতিহাসচর্চায় ১৯৪২ সালের আগস্ট বিপ্লবের কথা উঠলে সাধারণত কংগ্রেস, মহাত্মা গান্ধী, কংগ্রেস সোশ্যালিস্ট পার্টি কিংবা কমিউনিস্ট পার্টির অবস্থান নিয়ে বিস্তর আলোচনা হয়। কিন্তু একই সময়ে এক ক্ষুদ্র কিন্তু সক্রিয় বিপ্লবী মার্কসবাদী ধারার অস্তিত্ব ছিল, যাদের ভূমিকা মূলধারার ইতিহাসে প্রায় বিস্মৃত। সেই ধারাটি ছিল ভারতীয় ত্রৎস্কিপন্থী আন্দোলন, যার কেন্দ্রীয় সংগঠন ছিল বলশেভিক-লেনিনিস্ট পার্টি অব ইন্ডিয়া, সিলন অ্যান্ড বার্মা (বিএলপিআই)। সংগঠনটি সংখ্যার দিক থেকে ছোট হলেও ১৯৪২ সালের আগস্ট আন্দোলনে সক্রিয় হস্তক্ষেপ করে এবং পরবর্তী সময়ে ১৯৪৬ সালের নৌবিদ্রোহেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এই ইতিহাসের প্রধান উৎস চার্লস ওয়েসলি আরভিনের Tomorrow is Ours, তাঁর পূর্ববর্তী Revolutionary History প্রবন্ধ, রবার্ট জে. আলেকজান্ডারের International Trotskyism-এ প্রকাশিত ভারত বিষয়ক অধ্যায় এবং মৃন্ময় সেনগুপ্তের গবেষণামূলক নিবন্ধ।

প্রাককথন

ভারতে ত্রৎস্কিপন্থার উত্থান মূলত ১৯৩০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে ভারতীয় কমিউনিস্ট আন্দোলনের অভ্যন্তর থেকেই ঘটে। রবার্ট জে. আলেকজান্ডারের মতে, কমিন্টার্নের ১৯৩৪-৩৫ সালের পপুলার ফ্রন্ট নীতি গ্রহণের বিরোধিতা করেছিলেন সিপিআইয়ের একাংশ। তাঁদের "ত্রৎস্কিপন্থী" বলে আক্রমণ করা হলেও, সেই আক্রমণের ফলেই তাঁরা লিয়ঁ ত্রৎস্কির রচনা, বিশেষত History of the Russian Revolution এবং The Revolution Betrayed, অধ্যয়ন করেন এবং ধীরে ধীরে ত্রৎস্কিপন্থাকে নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থান হিসেবে গ্রহণ করেন।

এই সময়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে একাধিক ছোট ত্রৎস্কিপন্থী গোষ্ঠী গড়ে ওঠে। বাংলায় কমলেশ ব্যানার্জির নেতৃত্বে রেভলিউশনারি সোশ্যালিস্ট লিগ (আরএসএল), উত্তর প্রদেশে ওঙ্কারনাথ শাস্ত্রীর নেতৃত্বে বলশেভিক-লেনিনিস্ট সংগঠন, গুজরাতে চন্দ্রবাদন শুক্লার বলশেভিক মজদুর পার্টি এবং বোম্বেতে মারে গাও পার্ডির প্রতিষ্ঠিত Friends of Trotsky Society— এই বিচ্ছিন্ন সংগঠনগুলিই মূলত পরবর্তীকালে একত্রিত হয়ে সর্বভারতীয় ত্রৎস্কিপন্থী দল গঠনের ভিত্তি রচনা করে।

আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিও এই পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সূচনায় ভারতীয় ত্রৎস্কিপন্থীরা যুদ্ধকে সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলির পারস্পরিক সংঘর্ষ হিসেবে চিহ্নিত করেন। একই সঙ্গে তারা সোভিয়েত ইউনিয়নের নিঃশর্ত প্রতিরক্ষার পক্ষে অবস্থান নেন। বিএলপিআই-এর যুক্তি ছিল, সোভিয়েত ইউনিয়নকে রক্ষা করার প্রকৃত পথ ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ বা অন্য কোনো পুঁজিবাদী শক্তির সঙ্গে আপস নয়; বরং বিশ্বজুড়ে শ্রমিকশ্রেণির স্বাধীন বিপ্লবী সংগ্রামের মধ্য দিয়েই সোভিয়েত রাষ্ট্রকে রক্ষা করা সম্ভব। ভারতীয় উপমহাদেশে শ্রমিক রাষ্ট্র স্থাপন হলে তা সোভিয়েত রাশিয়ার জন্যেই লাভজনক হবে। ১৯৪২ সালে দলের মুখপত্রের প্রথম সংখ্যাতেই বিএলপিআই ঘোষণা করে যে স্বাধীন শ্রমিকশ্রেণিই সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রকৃত রক্ষাকর্তা হতে পারে। তাদের মতে, পুঁজিপতি শ্রেণির সঙ্গে ঐক্য নয়, বরং পুঁজিবাদী শোষণের বিরুদ্ধে সংগ্রাম তীব্র করাই ছিল যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে বিপ্লবীদের কর্তব্য। এই কারণেই তারা যুদ্ধের সংকটকে ব্যবহার করে শ্রমিক ধর্মঘট, কৃষক সংগ্রাম এবং ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে গণঅভ্যুত্থান গড়ে তোলার আহ্বান জানায়। অন্যদিকে, জার্মানির সোভিয়েত আক্রমণের পর ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টি "পিপলস ওয়ার" নীতি গ্রহণ করে ব্রিটিশ যুদ্ধপ্রচেষ্টার সমর্থনে অবস্থান নেয় এবং আসন্ন ভারত ছাড়ো আন্দোলনের বিরোধিতা করে। আরএসপি ও আরসিপিআই আনুষ্ঠানিকভাবে চতুর্থ আন্তর্জাতিকের অংশ না হলেও সমসাময়িক সময়ে এবং বহু ইতিহাসবিদের আলোচনায় তারা ত্রৎস্কিপন্থা-ঘনিষ্ঠ বা "সেমি-ত্রৎস্কিপন্থী" সংগঠন হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। উভয় সংগঠনই শুরু থেকেই যুদ্ধকে সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধ হিসেবে দেখেছিল এবং আগস্ট আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেছিল।

১৯৪১-৪২ সালে এই বিচ্ছিন্ন ত্রৎস্কিপন্থী গোষ্ঠীগুলিকে একত্রিত করার প্রক্রিয়া দ্রুত এগোয়। ১৯৪১ সালের নভেম্বর মাসে কলকাতায় একটি সাংগঠনিক বৈঠকে বলশেভিক-লেনিনিস্ট পার্টি অব ইন্ডিয়া, সিলন অ্যান্ড বার্মা গঠনের প্রস্তুতি নেওয়া হয় এবং একটি অস্থায়ী কমিটি নির্বাচিত হয়। পরের বছর এপ্রিল মাসে সিলনের কারাগার থেকে এন. এম. পেরেরা, ফিলিপ গুণবর্ধনে, কলভিন ডি সিলভা প্রমুখ নাটকীয়ভাবে পালিয়ে ভারতে আসেন। এরপর ১৯৪২ সালের মে মাসে বোম্বেয় একটি গোপন বৈঠকে আনুষ্ঠানিকভাবে বিএলপিআই প্রতিষ্ঠিত হয়। বোম্বে, কলকাতা, মাদ্রাজ ও উত্তর প্রদেশে সংগঠনের ইউনিট গড়ে ওঠে; পাশাপাশি গুজরাতের সংগঠনকেও এর সঙ্গে যুক্ত করা হয়। দলের মুখপত্র Bolshevik Leninist প্রকাশিত হতে শুরু করে এবং দলের কর্মসূচিতে শ্রমিকশ্রেণির নেতৃত্বে বিপ্লব, সোভিয়েত প্রতিষ্ঠা, শ্রমিকদের দ্বারা কারখানা দখল এবং কৃষকদের দ্বারা জমি অধিগ্রহণের মতো স্লোগান স্থান পায়। পরবর্তীকালে চতুর্থ আন্তর্জাতিকের আন্তর্জাতিক সচিবালয় বিএলপিআই-কে ভারতের আনুষ্ঠানিক শাখা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।

১৯৪২ সালের মাঝামাঝি সময়ে ভারতের রাজনৈতিক পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যাচ্ছিল। সমসাময়িক কিছু দলিল অনুযায়ী জওহরলাল নেহরু মার্কিন প্রশাসনকে ব্যক্তিগতভাবে আশ্বস্ত করেছিলেন যে ব্রিটিশ সরকার বাধ্য না করলে গান্ধী কোনো বৃহৎ আন্দোলন শুরু করবেন না। গান্ধী নিজেও মার্কিন সাংবাদিকদের বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র চাইলে ব্রিটেনের ওপর চাপ সৃষ্টি করে ভারতের দাবি বাস্তবায়ন করাতে পারে। অন্যদিকে, একই সময়ে ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক পি. সি. যোশী প্রকাশ্যে কংগ্রেসকে দেশপ্রেমিক সংগঠন বলে উল্লেখ করলেও গোপনে ব্রিটিশ প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে যুদ্ধপ্রচেষ্টায় সহযোগিতার আশ্বাস দেন। আরভিনের উদ্ধৃত নথি অনুযায়ী, পরে ই. এম. এস. নম্বূদিরিপাদও স্বীকার করেন যে সিপিআই বাস্তবেই সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করেছিল।

ভারত ছাড়ো

এই পটভূমিতেই ১৯৪২ সালের ৭ আগস্ট বোম্বেয়ের গোয়ালিয়া ট্যাঙ্ক ময়দানে কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটি "ভারত ছাড়ো" প্রস্তাব গ্রহণ করে। প্রস্তাবে ব্রিটিশ শাসনের অবসানের দাবিতে "সর্ববৃহৎ পরিসরে অহিংস গণসংগ্রাম"-এর আহ্বান জানানো হয়। কংগ্রেসের সভাস্থলের বাইরে উপস্থিত বিএলপিআই কর্মীরা একই দিন "Revolution: The Only Way to Smash Imperialism" শিরোনামের একটি লিফলেট বিতরণ করেন। সেই লিফলেটে কংগ্রেস-নেতৃত্বাধীন যে কোনো সাম্রাজ্যবাদবিরোধী সংগ্রামকে সমর্থনের ঘোষণা দেওয়া হলেও একই সঙ্গে সতর্ক করা হয় যে গান্ধী আপসের পথে যেতে পারেন। তাই কেবল কংগ্রেসের আহ্বানের ওপর নির্ভর না করে সর্বভারতীয় রাজনৈতিক সাধারণ ধর্মঘট ও স্ট্রাইক কমিটি গঠন, গ্রামে কর ও খাজনা দান বন্ধ করার আন্দোলন এবং কৃষক কমিটির মাধ্যমে জমি দখলের আহ্বান জানানো হয়।

এই লিফলেট সমসাময়িক রাজনৈতিক মহলেও দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল। কংগ্রেস-ঘনিষ্ঠ সংবাদপত্র Harijan এবং The Hindu-এ ত্রৎস্কিপন্থীদের "অবিলম্বে স্বাধীনতার দাবিতে সম্পূর্ণভাবে অঙ্গীকারবদ্ধ" বলে উল্লেখ করা হয়। এমনকি কলকাতার কংগ্রেস নেতা হরিপদ সরকার গ্রেপ্তার হওয়ার সময় তাঁর কাছে বিএলপিআই-এর এই লিফলেট পাওয়া যায়, যার উল্লেখ বাংলার প্রাদেশিক সরকারের রিপোর্টে পর্যন্ত ছিল। পরদিন, ৯ আগস্ট, বিএলপিআই আরেকটি লিফলেট প্রকাশ করে, যেখানে কংগ্রেসের যে কোনো সাম্রাজ্যবাদবিরোধী গণআন্দোলনকে সমর্থনের পুনরুচ্চারণ করা হলেও বলা হয়, সংকটের মুহূর্তে কংগ্রেস শেষ পর্যন্ত ভারতীয় বুর্জোয়াদের রাজনৈতিক সীমার মধ্যেই আবদ্ধ থাকবে।

৮ আগস্ট সন্ধ্যায় গান্ধী তাঁর বিখ্যাত "করেঙ্গে ইয়া মরেঙ্গে" ভাষণ দেন। কিন্তু আরভিনের বিশ্লেষণে দেখা যায়, ভাষণে কোনো সুস্পষ্ট সাংগঠনিক নির্দেশনা ছিল না; বরং কয়েক দিন আগেও গান্ধী বলেছিলেন, প্রস্তাব গৃহীত হলেই আন্দোলন শুরু হবে না, তিনি প্রথমে ভাইসরয়কে চিঠি লিখবেন। কিন্তু ৯ আগস্ট ভোরেই গান্ধীসহ কংগ্রেসের শীর্ষ নেতৃত্ব গ্রেপ্তার হন। নেতৃত্বহীন অবস্থায় আন্দোলন স্বতঃস্ফূর্তভাবে বিস্ফোরিত হয়; বোম্বেয় ট্রাম ও বাস থামিয়ে দেওয়া হয়, সরকারি ভবনে অগ্নিসংযোগ হয় এবং সেনাবাহিনী নামানো হয়। আরভিন মন্তব্য করেন, ব্রিটিশ সরকার সেই নেতাদেরই গ্রেপ্তার করেছিল, যারা জনতার ওপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে পারতেন।

এই পরিস্থিতিতে বিএলপিআই নিজেদের অবস্থান আরও স্পষ্ট করে। তাদের "March Separately, Strike Together" শীর্ষক লিফলেটে বলা হয়, কংগ্রেস-নেতৃত্বাধীন স্বাধীনতা সংগ্রামকে তারা নিঃশর্ত সমর্থন করলেও কেবল অনুসারী হয়ে থাকতে চায় না; বরং সংগ্রামের মধ্য দিয়েই বিপ্লবী নেতৃত্ব গড়ে তোলা এবং উপযুক্ত সময়ে সেই নেতৃত্ব কংগ্রেস হাইকম্যান্ডের হাত থেকে শ্রমিকশ্রেণির হাতে তুলে আনার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। একই সঙ্গে তারা দেওয়াল লিখন, প্রচারপত্র এবং সৈনিকদের উদ্দেশে আহ্বানপত্র প্রকাশ করে ভারতীয় জনগণের ওপর গুলি না চালানোর এবং সামরিক শৃঙ্খলের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের আহ্বান জানায়।

আগস্ট আন্দোলনের সূচনার পর বিএলপিআই-এর কার্যকলাপ কেবল প্রচারপত্র প্রকাশেই সীমাবদ্ধ ছিল না। সংগঠনটি বিভিন্ন প্রদেশে শ্রমিক, শিক্ষার্থী ও বিপ্লবী কর্মীদের মধ্যে সক্রিয় রাজনৈতিক কার্যকলাপ গড়ে তোলার চেষ্টা করে। বোম্বেয় দলটি ধর্মঘট ও স্ট্রাইক কমিটি সংগঠিত করার কাজে অংশ নেয়, মাদ্রাজে শিক্ষার্থী ও শ্রমিকদের মধ্যে প্রচার চালায়, উত্তর প্রদেশে ওঙ্কারনাথ শাস্ত্রীর নেতৃত্বে সংগঠন সম্প্রসারণের চেষ্টা হয় এবং বাংলায় তৎকালীন অন্যান্য বিপ্লবী বামপন্থী সংগঠনগুলির সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে আন্দোলনে অংশগ্রহণ করা হয়। সংগঠনের শক্তি সীমিত হলেও তারা আগস্ট আন্দোলনকে সর্বভারতীয় শ্রমিক-কৃষক বিপ্লবে পরিণত করার রাজনৈতিক লক্ষ্য সামনে রেখেই কাজ চালায়।

কলকাতায় বিএলপিআই-এর কার্যকলাপ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এখানে সংগঠনটি রেভলিউশনারি সোশ্যালিস্ট পার্টি (আরএসপি), ফরোয়ার্ড ব্লক এবং কংগ্রেস সোশ্যালিস্ট পার্টির সঙ্গে একটি যৌথ সংগ্রাম কমিটিতে অংশগ্রহণ করে। এই কমিটির উদ্দেশ্য ছিল ব্রিটিশ দমননীতির বিরুদ্ধে আন্দোলনকে সমন্বিত করা এবং শহরের বিভিন্ন অঞ্চলে গণ-প্রতিরোধ গড়ে তোলা। যদিও এই জোট দীর্ঘস্থায়ী হয়নি, তবুও আগস্ট আন্দোলনের প্রথম পর্যায়ে এটি কলকাতার বামপন্থী রাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ ছিল।

বিএলপিআই কেবল শহুরে শ্রমিক আন্দোলনের মধ্যেই নিজেদের সীমাবদ্ধ রাখেনি। তাদের প্রচারপত্রে ধারাবাহিকভাবে কৃষকদের উদ্দেশে খাজনা ও কর দান বন্ধ করার আহ্বান জানানো হয় এবং গ্রামাঞ্চলে কৃষক কমিটি গঠনের ওপর জোর দেওয়া হয়। দলীয় নথিতে বলা হয়, স্বাধীনতার সংগ্রামকে সফল করতে হলে শ্রমিক ধর্মঘট, কৃষক সংগ্রাম এবং সৈনিকদের বিদ্রোহ— এই তিনটি ধারাকে একত্রিত করতে হবে। দলটি এই কারণেই কেবল প্রতিবাদ কর্মসূচি নয়, একটি সর্বভারতীয় বিপ্লবী কৌশলের প্রশ্ন উত্থাপন করেছিল।

আগস্ট আন্দোলনের সময়ে বিএলপিআই ভারতীয় সেনা ও পুলিশ সদস্যদের উদ্দেশেও বিশেষ প্রচার চালায়। তাদের লিফলেটে বলা হয়, ভারতীয় জনগণের ওপর গুলি চালানোর নির্দেশ অমান্য করতে হবে এবং সাম্রাজ্যবাদী সরকারের স্বার্থে নয়, দেশের মানুষের পাশে দাঁড়াতে হবে। সৈনিকদের উদ্দেশে প্রকাশিত এই প্রচারপত্রগুলিকে ব্রিটিশ প্রশাসন বিশেষভাবে গুরুত্ব দিয়ে পর্যবেক্ষণ করত এবং এগুলিকে রাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্য বিপজ্জনক বলে বিবেচনা করা হয়েছিল।

স্বাভাবিকভাবেই ব্রিটিশ সরকার এই কার্যকলাপের বিরুদ্ধে দমননীতি গ্রহণ করে। বিএলপিআই-এর বহু নেতা ও কর্মী গ্রেপ্তার হন এবং সংগঠনের ওপর নজরদারি আরও জোরদার করা হয়। দলটি গোপন পদ্ধতিতে কাজ চালিয়ে যেতে বাধ্য হয় এবং একাধিক অঞ্চলে তাদের সাংগঠনিক যোগাযোগ বিঘ্নিত হয়। তবুও যুদ্ধকালীন পুরো সময় জুড়ে তারা আন্ডারগ্রাউন্ড অবস্থায় রাজনৈতিক প্রচার চালিয়ে যায় এবং Bolshevik Leninist সহ বিভিন্ন প্রকাশনার মাধ্যমে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরতে থাকে।

আগেই উল্লেখ করেছি যে সোভিয়েত ইউনিয়নের ওপর জার্মান আক্রমণের পর সিপিআই "পিপলস ওয়ার" নীতি গ্রহণ করে এবং ব্রিটিশ যুদ্ধপ্রচেষ্টাকে সমর্থন করার সিদ্ধান্ত নেয়। এর ফলে তারা ভারত ছাড়ো আন্দোলন এবং সেই আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন বিপ্লবী প্রবাহের বিরোধিতা করে। চার্লস ওয়েসলি আরভিনের গবেষণায় উদ্ধৃত তথ্য অনুযায়ী, সিপিআই-এর মুখপত্র People's War-এ বিএলপিআই এবং ভারত ছাড়ো আন্দোলনের সমর্থকদের "Fifth Columnists" হিসেবে অভিহিত করা হয়। একই পত্রিকায় ত্রৎস্কিপন্থীদের "criminals and gangsters who help the Fascists" বলে আক্রমণ করা হয় (৭ মার্চ, ৪ জুন এবং ১২ সেপ্টেম্বর ১৯৪৩-এর সংখ্যায়)। এমনকি পি. সি. যোশী সিপিআই সদস্যদের ত্রৎস্কিপন্থীদের "traitors" হিসেবে বিবেচনা করতে এবং তাঁদের "driven out of political life and exterminated" করার আহ্বান জানান।

বিএলপিআই-ও এই আক্রমণের জবাবে সিপিআই নেতৃত্বের বিরুদ্ধে তীব্র পাল্টা প্রচার চালায়। ১৯৪২ সালের আগস্টে প্রকাশিত তাদের Stalinist Traitors Unmasked লিফলেটে সিপিআই নেতাদের "pimps and procurers for British Imperialism", "confusionist disruptors, government hirelings, and police agents" হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। বিএলপিআই-এর যুক্তি ছিল, সিপিআই সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রতিরক্ষার প্রশ্নকে এমনভাবে ব্যাখ্যা করছে যার ফলে ভারতীয় শ্রমিকশ্রেণির স্বাধীন রাজনৈতিক ভূমিকা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম দুর্বল হয়ে পড়ছে। বরং সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রকৃত প্রতিরক্ষা কোনো সাম্রাজ্যবাদী সরকারের সঙ্গে সহযোগিতার মাধ্যমে নয়, বরং আন্তর্জাতিক শ্রমিকশ্রেণির স্বাধীন বিপ্লবী উদ্যোগের মাধ্যমেই সম্ভব। তাদের একটি বিবৃতিতে বলা হয়েছিল:

Unlike the minions of the Kremlin boss, the Joshis and Mukherjees of India, who have degenerated to the position of imperialist agents, we stand for independent working class aid to the Soviet Union...

কল্লোল

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষ পর্যায়ে ভারতের রাজনৈতিক পরিস্থিতি দ্রুত পরিবর্তিত হতে শুরু করে। ১৯৪৫ সালে যুদ্ধ শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দেশে শ্রমিক আন্দোলন, শিক্ষার্থী আন্দোলন এবং ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে নতুন করে গণঅসন্তোষ দেখা দেয়। একই সময়ে ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল আর্মি (আইএনএ)-র সৈনিকদের বিচারকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে প্রতিবাদ শুরু হয়। বিএলপিআই এই গণআন্দোলনগুলিতে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করে এবং এগুলিকে ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে ক্রমবর্ধমান বিপ্লবী পরিস্থিতির লক্ষণ হিসেবে ব্যাখ্যা করে।

১৯৪৫ সালের নভেম্বর মাসে কলকাতায় আইএনএ বন্দিদের মুক্তির দাবিতে যে ছাত্র-জনতার আন্দোলন গড়ে ওঠে, সেখানে বিএলপিআই-এর সদস্যরা সক্রিয়ভাবে অংশ নেন। পরবর্তী সময়ে ১৯৪৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে কলকাতায় আবারও শিক্ষার্থী ও শ্রমিকদের ব্যাপক বিক্ষোভ সংগঠিত হয়। মৃন্ময় সেনগুপ্ত তাঁর গবেষণায় দেখিয়েছেন যে এই সময়ে বিএলপিআই-এর কর্মীরা বিভিন্ন মিছিল, সভা এবং শ্রমিক সংগঠনের কাজে যুক্ত ছিলেন।

এই সময়েই ভারতের সশস্ত্র বাহিনীর অভ্যন্তরেও অসন্তোষ দ্রুত বৃদ্ধি পেতে থাকে। যুদ্ধের সময়ে বৈষম্যমূলক আচরণ, নিম্নমানের খাদ্য, বেতনের সমস্যা এবং ব্রিটিশ অফিসারদের বর্ণবাদী ব্যবহার ভারতীয় নাবিকদের মধ্যে গভীর ক্ষোভ সৃষ্টি করেছিল। এই অসন্তোষই ১৯৪৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে রয়্যাল ইন্ডিয়ান নেভির বিদ্রোহের পটভূমি তৈরি করে। বোম্বের HMIS Talwar-এর নাবিকদের প্রতিবাদ দ্রুত দেশের বিভিন্ন নৌঘাঁটিতে ছড়িয়ে পড়ে এবং কয়েক দিনের মধ্যেই হাজার হাজার নাবিক বিদ্রোহে অংশগ্রহণ করেন। ১৮ ফেব্রুয়ারি (সোমবার), বোম্বের রয়্যাল ইন্ডিয়ান নেভির ‘তলওয়ার’ জাহাজের বেতারকর্মী বলাই চাঁদ দত্তের গ্রেপ্তারীকে কেন্দ্র করে বোম্বেতে ১১০০ ভারতীয় নেভাল রেটিং শুরু করলেন ঐতিহাসিক ‘নৌ-বিদ্রোহ’। দ্রুততার সাথে ‘তলওয়ার’-এর পাশাপাশি আরও বাইশটি জাহাজে ছড়িয়েছিল বিদ্রোহের আঁচ। এই বিদ্রোহের আগুন-হাত চেষ্টা করেছিল ভারতে ক্ষয়িষ্ণু ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদী সরকারকে একটা শেষ ধাক্কা দিতে।

নৌবিদ্রোহ শুরু হওয়ার পর বিএলপিআই একে কেবল সামরিক অসন্তোষ হিসেবে দেখেনি। দলটির মূল্যায়নে এটি ছিল সাম্রাজ্যবাদী শাসনের বিরুদ্ধে উদীয়মান গণআন্দোলনের একটি নতুন স্তর। তাই বিদ্রোহকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে নয়, শ্রমিক আন্দোলন ও শিক্ষার্থী আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত করার ওপর তারা গুরুত্ব দেয়। বিদ্রোহের সূচনার পর বিএলপিআই দ্রুত বোম্বের শ্রমিক সংগঠনগুলির সঙ্গে যোগাযোগ করে এবং নাবিকদের প্রতি সংহতি গড়ে তোলার উদ্যোগ গ্রহণ করে।

চার্লস ওয়েসলি আরভিন তাঁর গবেষণায় বিএলপিআই কর্মী ইন্দ্র সেনের স্মৃতিচারণ উদ্ধৃত করেছেন। সেখানে বলা হয়েছে, বিদ্রোহ শুরু হওয়ার পর বিএলপিআই-এর কর্মীরা রাতের শিফটে কাজ করা শ্রমিকদের কারখানা থেকে বের করে এনে সাধারণ ধর্মঘটে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানান। পরদিন সকাল হতেই বোম্বেতে সেদিনের নৌ-বিদ্রোহীদের নিঃশর্ত সমর্থনে প্রথম সাধারণ ধর্মঘটের ডাক দেয় ত্রৎস্কিপন্থী বিএলপিআই। বিএলপিআই কর্মী-সদস্য প্রভাকর মোরে এবং লক্ষ্মণ যাদবের নেতৃত্বে কাপড় কলের শ্রমিকেরা ধর্মঘটে নামেন। শহরের বিভিন্ন প্রান্তে রাস্তায় রাস্তায় লিখে দেওয়া হয় ‘হরতাল!’, গড়ে তোলা হয় ব্যারিকেড এবং শ্রমিকদের কাজে না যাওয়ার জন্য সংগঠিত প্রচার চালানো হয়। একই সঙ্গে ব্রিটিশ ত্রৎস্কিপন্থী ডগলাস গারবাট, যিনি ভারতে এসেছিলেন ১৯৪৩ সালে, লিখেছেন যে বোম্বের সাধারণ ধর্মঘট সংগঠনের ক্ষেত্রে বিএলপিআই-এর কর্মীরা অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছিলেন। তিনি তাঁর লন্ডননিবাসী কমরেড ই. আর. ফ্র্যাঙ্ককে ১৯৪৬ সালের ২৯ এপ্রিল লেখা চিঠিতে নৌবিদ্রোহের স্মৃতিচারণা করে বলেন, “I can tell you that our friends played a leading role in Bombay — the general strike can be directly traced to them, as the first workers to come out were ours and were carrying a flag with our device on it!” এই বয়ানে গার্বাট-কথিত ‘ডিভাইস’ হল লিয়ঁ ত্রৎস্কি প্রতিষ্ঠিত ফোর্থ ইন্টারন্যাশনাল-এর এমব্লেম — হাতুড়ি ও কাস্তের সঙ্গে আঁকা সংখ্যা চার। যদিও খুব দ্রুত এই আন্দোলন দলীয় উদ্যোগের সীমা অতিক্রম করে সমগ্র শহরের স্বতঃস্ফূর্ত গণঅভ্যুত্থানে পরিণত হয়।

প্রথমে সমর্থন জানাতে দ্বিধান্বিত হলেও, ধর্মঘটের সকালে ভারতের অবিভক্ত কমিউনিস্ট পার্টিও নৌসেনাদের সমর্থনে ৩০,০০০ ট্রেড-ইউনিয়ন কর্মীর মিছিল বের করেছিল। তবে স্তালিনবাদীরা এর সাথে সাথে বিক্ষোভকারীদের এই উপদেশও দিয়েছিলেন যে তাঁদের এই হরতাল যেন সামরিক নৃশংসতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদকে শান্তিপূর্ণ অভিব্যক্তি দেয়।

বিদ্রোহ চলাকালীন বিএলপিআই নাবিকদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ স্থাপনেরও চেষ্টা করে। কিন্তু ব্রিটিশ সেনাবাহিনী বিদ্রোহী জাহাজ ও নৌঘাঁটিগুলিকে ঘিরে ফেলায় সেই প্রচেষ্টা সফল হয়নি। তা সত্ত্বেও দলটি প্রচারপত্র ও রাজনৈতিক বিবৃতির মাধ্যমে বিদ্রোহী নাবিকদের প্রতি সংহতি জানায় এবং শ্রমিকদের ধর্মঘটের মাধ্যমে আন্দোলনের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানায়।

বিএলপিআই-র এই অবস্থান তাদের আগস্ট আন্দোলন-সংক্রান্ত রাজনৈতিক মূল্যায়নেরই ধারাবাহিকতা বহন করছিল। ১৯৪২ সালে যেমন তারা কংগ্রেস-নেতৃত্বাধীন স্বাধীনতা সংগ্রামকে সমর্থন করলেও স্বাধীন শ্রমিক-কৃষক নেতৃত্ব গড়ে তোলার প্রশ্ন উত্থাপন করেছিল, তেমনি ১৯৪৬ সালেও তারা নৌবিদ্রোহকে কেবল সামরিক বিদ্রোহ হিসেবে নয়, বৃহত্তর গণ-আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত করার চেষ্টা করে। কিন্তু এই সম্ভাবনার দ্রুত অবসান ঘটে। নৌবিদ্রোহের বিস্তার সত্ত্বেও কংগ্রেস ও মুসলিম লীগ, উভয় নেতৃত্বই নাবিকদের আত্মসমর্পণের আহ্বান জানায়। জানা যায়, সেদিনের ঐ ধর্মঘটে সাড়া দিয়ে বোম্বের ৭৪টি কাপড়কলের মধ্যে ৭০টিতে তালা ঝুলিয়ে শ্রমিকেরা বিদ্রোহী নাবিকদের সমর্থন জানান। বিদ্রোহী নৌসেনারা কমিউনিস্ট পার্টির পতাকা ছাড়াও সেদিন উড়িয়েছিলেন ন্যাশনাল কংগ্রেস এবং মুসলিম লীগের পতাকা। যদিও বলা বাহুল্য, কংগ্রেস এবং মুসলিম লীগের মতো বুর্জোয়া দলগুলি মোটেই এই বিদ্রোহকে ও তার সাথে চলা শ্রমিক অসন্তোষকে সুনজরে দেখেনি। ২২ ফেব্রুয়ারি বোম্বে মুসলিম লীগের মুখপাত্র ও বোম্বে প্রভিন্সিয়াল কংগ্রেস কমিটির সম্পাদক তৎকালীন বোম্বে প্রেসিডেন্সির গভর্নর জন কোলভিলকে ডেকে বিদ্রোহ থামানোর বিষয়ে নিজেদের উদ্বেগ প্রকাশ করেন এবং সরকারি পুলিশদের সাহায্য করার জন্য নিজেদের স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী পাঠানোর প্রস্তাব দেন।

অবশেষে ২৩ ফেব্রুয়ারি নৌবিদ্রোহের সমাপ্তি ঘটে মুখ্যত কংগ্রেসের বল্লভভাই পটেল ও লীগের মহম্মদ আলি জিন্নার অনুরোধে বিদ্রোহী নৌসেনাদের আত্মসমর্পণের মধ্যে দিয়ে।  শেষ পর্যন্ত বিদ্রোহীরা রাজনৈতিকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন এবং ব্রিটিশ সরকার সামরিক শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে বিদ্রোহ দমন করে। সাংগঠনিক দুর্বলতা এবং ইতিপূর্বের অগস্ট আন্দোলনের সময়ে মাজা ভেঙে যাওয়ার কারণে ত্রৎস্কিপন্থী বিএলপিআই বিক্ষুব্ধ পরিস্থিতিকে কাজে লাগাতে ব্যর্থ হল। অন্যদিকে সাংগঠনিক সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও স্তালিনবাদী অবিভক্ত সিপিআই-ও এই একই ব্যর্থতার শরিক হল। আর যে মানুষটির গ্রেপ্তারী এই গোটা বিদ্রোহের অগ্ন্যুৎপাত ঘটিয়েছিল, সেই বলাই চাঁদ তাঁর ‘মিউটিনি অভ দ্য ইনোসেন্টস’ বইতে সেদিনের বিদ্রোহ সম্পর্কে লিখছিলেন, “we had our battleship Potemkin but no Eisenstein.”

এই সমগ্র পর্বে ভারতীয় ত্রৎস্কিপন্থীদের রাজনৈতিক গুরুত্ব তাদের সাংগঠনিক আকারের তুলনায় অনেক বেশি ছিল। রবার্ট জে. আলেকজান্ডার লিখেছেন, বিএলপিআই কখনোই একটি বৃহৎ গণদলে পরিণত হতে পারেনি। সদস্যসংখ্যা সীমিত ছিল, বিভিন্ন অঞ্চলে সাংগঠনিক শক্তিও অসম ছিল। তবুও ভারতীয় ত্রৎস্কিপন্থীদের গুরুত্ব ছিল এই কারণে যে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, ভারত ছাড়ো আন্দোলন এবং যুদ্ধোত্তর গণ-অভ্যুত্থানের সময় তারা ধারাবাহিকভাবে একটি স্বতন্ত্র বিপ্লবী মার্কসবাদী রাজনৈতিক অবস্থান বজায় রেখেছিল।

মৃন্ময় সেনগুপ্তও তাঁর গবেষণায় দেখিয়েছেন যে, স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে বিএলপিআই-এর ভূমিকা দীর্ঘদিন ধরে উপেক্ষিত থেকেছে। এর একটি কারণ সংগঠনটির ক্ষুদ্র আকার; অন্য কারণ স্বাধীনতার পর ভারতীয় বামপন্থী রাজনীতিতে সিপিআই ও সিপিআই(এম)-কেন্দ্রিক ইতিহাসচর্চার প্রাধান্য। ফলে আগস্ট আন্দোলন কিংবা নৌবিদ্রোহে বিএলপিআই-এর হস্তক্ষেপ, তাদের প্রচারপত্র, শ্রমিক সংগঠনের কাজ অথবা বোম্বের সাধারণ ধর্মঘটে তাদের প্রাথমিক ভূমিকা, এসবই মূলধারার আলোচনায় প্রায় অনুপস্থিত থেকে গেছে।


Sankalpa

About the Author

Sankalpa

মজদুরের নিয়মিত লেখক

শিক্ষার্থী

বই পড়ি, প্রশ্ন করি, তর্ক করি। সাহিত্য, ইতিহাস আর রাজনীতি নিয়ে ভাবতে ভালোবাসি। বিশেষ করে সমাজকে তার অন্তর্নিহিত দ্বন্দ্ব, পরিবর্তন ও সম্ভাবনার মধ্য দিয়ে বোঝার চেষ্টা করি। জটিল বিষয়কে সহজ করে বোঝার চেয়ে, তাকে গভীরভাবে বোঝার চেষ্টাটাকেই বেশি মূল্য দিই।

প্রোফাইল দেখুন

মতামত

এখনও কোনো মতামত নেই।

প্রথম মতামতটি আপনিই দিন।

আলোচনায় অংশ নিতে লগ ইন করুন অথবা এ্যাকাউন্ট খুলুন

Reading

Font size

Auto scroll
Slow Fast