বর্তমান ভারতীয় উপমহাদেশে ধর্মভিত্তিক সাম্প্রদায়িক রাজনীতির যে বাড়বাড়ন্ত, তার মূল উৎসটা কোথায় সেটা বোঝা দরকার। নাহলে ধর্মের বিপরীতে ধর্মীয় রাজনীতির ফাঁকির জায়গাটা উপলব্ধি করা যাবে না। এটা মুসলিম লীগ বা হিন্দু মহাসভা শুরু করেনি। সংগঠিত সাম্প্রদায়িক রাজনীতির বীজবপন হয়েছিল আরও বহু আগে।
ব্রিটিশ ইতিহাসকার জেমস মিল, যিনি এই উপমহাদেশের ঔপনিবেশিক ইতিহাসচর্চার ধারার জনকও বটে, তিনি ১৮১৭ সালে একটি বই লেখেন - 'The History of British India'. সেই বইতে প্রথম এই উপমহাদেশের ইতিহাসকে হিন্দু যুগ, মুসলিম যুগ, ব্রিটিশ যুগ - এইভাবে সাজানো হয়। যুগ কেবল নয়, হিন্দুদের ইতিহাস, মুসলিমদের ইতিহাস - এইভাবে ইতিহাসের ভাষ্যকে নির্মাণ করা হয়। প্রশ্ন ওঠে, হিন্দু যুগ, মুসলিম যুগের পরে তো হিসাবমতো খ্রিস্টান যুগ আসার কথা। তাহলে ব্রিটিশ যুগ কেন? এর কারণস্বরূপ দু'ধরণের মত প্রচলিত আছে। প্রথম, বাদবাকি ইউরোপিয়ান খ্রিস্টান, অর্থাৎ ফরাসি, পর্তুগিজ, ওলন্দাজ - এরা তখন ছিল ব্রিটিশদের প্রতিযোগী। কাজেই খ্রিস্টান যুগ বললে ব্রিটিশের একাধিপত্যে অসুবিধা হতো। কারণ ব্রিটিশের প্রধান লক্ষ্য ছিল আধিপত্য, ধর্মপ্রচার নয়। যদিও মূল কারণ সেটা ছিল না।
ব্রিটিশদের আসল উদ্দেশ্য ছিল ঔপনিবেশিক শাসনের ধর্মনিরপেক্ষতা এবং ন্যায়পরায়ণতাকে তুলে ধরা। জেমস মিলরা দেখাতে চেয়েছিলেন, ব্রিটিশ যুগের আগে সমস্ত শাসকেরা, সে হিন্দু হোক বা মুসলিম, তারা শাসকের ধর্ম চাপিয়ে দিয়ে জনসাধারণের ওপর লুটতরাজ, বর্বরতা এবং অত্যাচার নামিয়ে এনেছিল। ধর্মের ভিত্তিতে। ব্রিটিশরা সেই অন্যায়ের অবসান ঘটিয়ে আইনের শাসন এনেছে। বলাই বাহুল্য যে এটা মিথ্যা ইতিহাস। কারণ তথাকথিত হিন্দু যুগের অধিকাংশ শাসকই ছিলেন বৌদ্ধ, এবং তথাকথিত মুসলিম যুগে দক্ষিণ ভারত ও উত্তর পূর্ব ভারতে প্রায় কোনো রাজাই মুসলিম ছিলেন না। এমনকি বৃহৎ রাজ্যের মুসলিম রাজা অপর কোনো মুসলিম শাসকের রাজ্য দখল করার জন্য তুলনামূলক ছোট রাজ্যের হিন্দু রাজাদের সঙ্গে জোট বেঁধেছে, এবং শত্রুপক্ষীয় মুসলিম রাজার রাজ্য দখল করে নেওয়ার পর অনুগত কোনো হিন্দু রাজাকে সেই রাজ্যের মসনদে বসিয়েছে - এইরকম অসংখ্য উদাহরণ আছে। কিন্তু সেই মিথ্যা ইতিহাসের ভাষ্য নির্মাণ করার জন্য ব্রিটিশকে পৃথক হিন্দু সংস্কৃতি এবং পৃথক মুসলিম সংস্কৃতি, তথা শাসকের সংস্কৃতি 'create' করতে হয়েছে, যারা কিনা, নাকি, পরস্পর বিবাদমান। সেটাকেই প্রাক ব্রিটিশ অপশাসনের মূল ভিত্তি হিসেবে গোটা ঔপনিবেশিক শাসনকালে পড়ানো হয়েছে।
ব্রিটিশদের এই কাজটা করতে হয়েছিল, কারণ ব্রিটিশ শাসনের মূল নীতি ছিল 'ডিভাইড অ্যান্ড রুল'। ভাগ করো, ভাগ করে শাসন করো। ভাগ করে দিতে পারলে সবদিক থেকেই সুবিধা। কেবল প্রশাসনিক সুবিধা বা ব্রিটিশ বিরোধী ক্ষোভ বিভক্ত হওয়াই নয়, আরও অনেক রকম সুবিধা ছিল তাতে।
এই ডিভাইড অ্যান্ড রুল-এর সলতে পাকানোর কাজ শুরু হয়েছিল ওয়ারেন হেস্টিংসের আমল থেকেই। ধর্মভিত্তিক ইতিহাস রচনা করতে গেলে আগে এদেশের ধর্ম, সংস্কৃতি, নিজস্ব ইতিহাস সম্বন্ধে বিস্তৃতভাবে জানা প্রয়োজন। তার জন্য এদেশের ভাষা শিখতে হবে, তার জন্য ছাপা বই লাগবে। তা নাহলে ডিভাইডও করা যাবে না, এবং তার ভিত্তিতে রুলও করা যাবে না। সেইজন্যেই আমরা দেখি, অষ্টাদশ শতকের শেষভাগ থেকেই হেস্টিংসের পৃষ্ঠপোষকতায় ব্র্যাসি হ্যালহেড হিন্দু আইনের ইংরেজি অনুবাদ করছেন, বাংলা ব্যাকরণ রচনা করছেন। সেসব অ্যান্ড্রুজের ছাপাখানা থেকে প্রকাশিত হচ্ছে। উইলিয়াম জোনস ১৭৮৪ সালে কলকাতায় 'এশিয়াটিক সোসাইটি' প্রতিষ্ঠা করছেন। এই প্রতিষ্ঠানের মূল কাজই ছিল প্রাচীন সংস্কৃত পুঁথিগুলি সংগ্রহ করা এবং তা ইংরেজিতে অনুবাদ করা। চার্লস উইলকিন্স নিজে পঞ্চানন কর্মকারকে নিয়ে এলেন, ছাপার মেশিনের বাংলা ছেনিকাটা হরফ বানানোর জন্য। ১৮০০ সালে বহু অর্থ ব্যয় করে কলকাতায় তৈরি হলো ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ। সেটা হঠাৎ প্রয়োজন হয়ে পড়ল কেন? শুধুই কি ব্রিটিশ সিভিলিয়ানদের ট্রেনিং দেওয়ার জন্য? প্রশাসন পরিচালনার জন্যে তো এতটা প্রয়োজন হয় না! আসল উদ্দেশ্য ছিল সিভিলিয়ানদের দেশীয় ইতিহাস এবং ঐতিহ্য বিষয়ে শিক্ষা দেওয়া, যাতে তারা যথাযথভাবে 'ডিভাইড অ্যান্ড রুল'-এর ভাষ্য ছড়িয়ে দিতে পারে।
১৮০১ সালে শ্রীরামপুর মিশনে ছাপাখানা বসানো হল। সেখান থেকে উইলিয়াম কেরী বাংলায় গদ্য লিখছেন, জোশুয়া মার্শম্যান বাংলায় বই ছাপছেন। ইতিহাসের সাধারণ পাঠ্যবইতে লেখা হয় যে এঁরা খ্রিস্টান পাদ্রী ছিলেন, খ্রিস্টধর্মের প্রচারের জন্যেই এসব করেছিলেন। সত্যিই কি তাই? তৎকালীন খ্রিস্টান মিশনারিদের অত টাকা ছিল না। জায়গাটা ইউরোপ হলে তাও সম্ভবপর ছিল, কারণ চার্চের প্রচুর সম্পত্তি ছিল। কিন্তু বঙ্গদেশে তো তা নয়। অধিকাংশ খ্রিস্টান পাদ্রীরাই নিজেদের দেশে কিছু করতে না পেরে, অথবা বিতাড়িত হয়ে এদেশে এসেছিলেন ভাগ্য অন্বেষণের জন্য। তাঁরা কোথায় পাবেন এত টাকা? আসলে তাঁদের অর্থ দিয়েছিল ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি। কিন্তু কোম্পানি তো এসেছে ব্যবসা করতে। তাহলে তারা মিশনারিদের পেছনে এত টাকা ঢালছে কেন? ধর্ম নিয়ে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কিসের এত মাথাব্যথা? খ্রিস্টান ধর্ম প্রচারের জন্য এতটাই উদগ্রীব হলে তারা 'ব্রিটিশ যুগ' নামকরণ না করে 'খ্রিস্টান যুগ'-ই করতে পারত। তা তো করেনি। এ সমস্ত কিছুই হয়েছিল ডিভাইড অ্যান্ড রুলের ব্লু প্রিন্টকে সামনে রেখে। জেমস মিলের বই প্রকাশিত হওয়ার আগে দীর্ঘকাল ধরে ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়েছিল।
দেশীয় জনমানসে এই সাম্প্রদায়িক ঔপনিবেশিক ভাষ্য খুব গভীরভাবে প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হয়েছিল। ঊনবিংশ শতকের শেষ দশকে দাদাভাই নৌরজি যখন অর্থনৈতিক জাতীয়তাবাদের ধারণার জন্ম দিলেন, তখন থেকেই একদল দেশীয় ইতিহাসবিদ দাবি করতে শুরু করেন যে হিন্দু যুগ নাকি ছিল বৌদ্ধিক অগ্রগতি এবং নীতিপরায়ণতার যুগ, তুর্কী আক্রমণকারীরা এসে নাকি সেই স্বর্ণযুগের অবসান ঘটায়। এরা নিজেদের জাতিয়তাবাদী বলে দাবি করলেও আসলে এরা ছিলেন হিন্দু সংস্কারবাদী এবং আজকের রাজনৈতিক হিন্দুত্ববাদীদের পূর্বসূরী। এরা কিন্তু ব্রিটিশের প্রধান বক্তব্য, অর্থাৎ শাসকের ধর্মের ভিত্তিতে ইতিহাসের যুগবিভাজনকে অস্বীকার করলেন না, বরং ব্রিটিশের ভাষ্য অনুসরণ করেই সুলতানি ও মুঘল আমলে গলায় তলোয়ার রেখে ধর্মান্তকরণ, মন্দির ভেঙে মসজিদ তৈরি করা ইত্যাদি গল্প প্রচার করতে থাকলেন। কারণ ততদিনে ব্রিটিশরা এটা প্রতিষ্ঠা করে দিতে পেরেছে যে হিন্দু ও মুসলমান যুগে যুগে পরস্পরের শত্রু ও বিবাদমান।
স্বাভাবিকভাবেই এর প্রতিক্রিয়ায় বিশ শতকের গোড়া থেকে একদল মুসলিম সাম্প্রদায়িক ইতিহাসবিদ উঠে এলেন। তারা আবার মুসলিম যুগের গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা প্রচার করে হিন্দুদের আক্রমণ করার কাজ শুরু করলেন। কিন্তু তারাও ব্রিটিশের ধর্মভিত্তিক ইতিহাসের ভাষ্যকে প্রশ্ন করলেন না। এই দুই শিবিরের মধ্যে অতঃপর সংঘাত শুরু হয়, সেই সংঘাত রাজনৈতিক চেহারা নেয় ও ক্রমশ দেশভাগের দিকে এগোয়। ডিভাইড অ্যান্ড রুলের অন্যতম সাফল্য হিসেবে ব্রিটিশের পৃষ্ঠপোষকতায় মুসলিম লীগ এবং হিন্দু মহাসভা প্রতিষ্ঠিত হয় এবং রাজনীতির সাম্প্রদায়িকীকরণের সূচনা ঘটে। নেপথ্যে ব্রিটিশরা মুচকি হাসে, কারণ তাদের দীর্ঘদিনের পরিকল্পনা যথাযথভাবে কার্যকরী হয়।
১৯৪৭ সালে মূলত বিশ্বযুদ্ধে ব্যাপক অর্থনৈতিক ক্ষয়ক্ষতির কারণে ব্রিটিশরা ভারতীয় উপনিবেশ ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়। কিন্তু যাওয়ার আগে নিজেদের অতৃপ্ত আত্মা হিসেবে ভারত ও পাকিস্তান দুই দেশেই ধর্মীয় রাজনীতির কারবারিদের বসিয়ে দিয়ে যায়। তারা আজও ইংরেজের দেখানো পথেই ধর্মভিত্তিক মৌলবাদী রাজনীতি এবং সাম্প্রদায়িক বিভাজনের রাজনীতি চালিয়ে যাচ্ছে এবং তার জন্য সাম্রাজ্যবাদী শক্তির কাছ থেকে নিয়মিত অর্থসাহায্য পাচ্ছে। একদিকে সাম্প্রদায়িক রাজনীতির বাড়বাড়ন্ত, অন্যদিকে আরাবল্লী পাহাড়, ছোটনাগপুরের জঙ্গল, লাদাখের জমি বেচে দেওয়া হচ্ছে, চট্টগ্রাম বন্দর বেচে দেওয়া হচ্ছে। এতে সবচেয়ে বেশি লাভবান হচ্ছে কারা? সাম্রাজ্যবাদী শক্তি। ইংরেজ আছে ইংরেজেই। আগে ব্রিটিশ ছিল, এখন জাত বদলে মার্কিন হয়েছে।
১৯৪৭ সালে ইংরেজরা পাকাপাকিভাবে চলে যাওয়ার পর আধুনিক ইতিহাসবিদরা, বিশেষ করে মার্কসবাদী ইতিহাসবিদরা দীর্ঘদিনের ঔপনিবেশিক সাম্প্রদায়িক ইতিহাসের ভাষ্যকে ভাঙতে উদ্যোগী হন। ইরফান হাবিব, রোমিলা থাপার, রামশরণ শর্মা, বাঙালিদের মধ্যে সুশোভন সরকার, গৌতম ভদ্র প্রমুখ দেশীয় ইতিহাসকে প্রাচীন যুগ, মধ্যযুগ, আধুনিক যুগ - এইভাবে সাজালেন। আজ আমরা ইতিহাসকে এভাবেই পড়ি। কিন্তু এতে সাম্রাজ্যবাদীদের এজেন্ট, ধর্মীয় রাজনীতির কারবারিদের লেজে পা পড়েছে। ফলে এখন তারা মার্কসবাদীদের বিরুদ্ধে কুৎসা করে, ধারাবাহিক আক্রমণ নামিয়ে এনে আধুনিক বস্তুনিষ্ঠ ইতিহাসকে মুছে ফেলতে উদ্যোগী হয়েছে।
আজকের ভারতীয় উপমহাদেশে সাম্প্রদায়িক রাজনীতির শিকড় অনেক গভীরে প্রোথিত। সেটা একদিনে হয়নি। ব্রিটিশরা দীর্ঘ দেড়শো বছর ধরে আস্তে আস্তে এটাকে নির্মাণ করেছে। আজকের সাম্প্রদায়িক রাজনীতি আসলে আপাদমস্তক ঔপনিবেশিক রাজনীতি, ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদী রাজনীতির 'extension'. এই ধর্মীয় রাজনীতির সঙ্গে ধর্ম ও জাতীয়তাবাদের দূর দূর অবধি কোনোপ্রকার সম্পর্ক নেই। এই রাজনীতি বিদেশি সাম্রাজ্যবাদী শক্তির 'create' করে দেওয়া। তাই আজ মৌলবাদী রাজনীতির বিরুদ্ধে সংগ্রাম কেবল আধুনিকতার সপক্ষে সংগ্রাম নয়, ঔপনিবেশিক রাজনীতি তথা সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রামও বটে। এই সংগ্রাম প্রকৃত দেশপ্রেমিকের মহান ও পবিত্র কর্তব্য।
About the Author
অন্বেষ বন্দ্যোপাধ্যায়
মজদুরের নিয়মিত লেখকJob as a content writer in a media house
গবেষক। প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তনী। আগ্রহের বিষয় : বাংলা সাহিত্য আন্দোলন, মার্কসবাদ, চার্বাক ও লোকায়ত দর্শন। ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী)-র দলীয় সদস্য। ভারতীয় গণনাট্য সংঘ এবং পশ্চিমবঙ্গ ইতিহাস সংসদের আজীবন সদস্য।
প্রোফাইল দেখুন
মতামত
এখনও কোনো মতামত নেই।
প্রথম মতামতটি আপনিই দিন।
আলোচনায় অংশ নিতে লগ ইন করুন অথবা এ্যাকাউন্ট খুলুন