জুলাই অভ্যুত্থান: রাষ্ট্র বদলের আকাঙ্ক্ষা ও শ্রেণি-ক্ষমতার প্রত্যাবর্তন
যা দেখেছি, যা বুঝেছি
মেহেদী হাসান রাতুল
একটি গণঅভ্যুত্থানের সবচেয়ে কঠিন মুহূর্ত কখন?
যখন মানুষ রাস্তায় নামে—তখন?
যখন শাসকের পতন ঘটে—তখন?
নাকি তার পর?
উত্তর শাসকের পতন।
শাসকের পতন দৃশ্যমান। কিন্তু রাষ্ট্রের ভেতরে যে ক্ষমতার সম্পর্ক, শ্রেণিগত স্বার্থ, প্রতিষ্ঠানগত কাঠামো এবং আধিপত্যের ব্যবস্থা বছরের পর বছর ধরে তৈরি হয়, তা কোনো একটি দিনে ভেঙে পড়ে না। এই কারণেই ৫ আগস্ট ২০২৪-কে আমি জুলাই অভ্যুত্থানের সমাপ্তি হিসেবে দেখি না। বরং সেটিকে দেখি একটি ঐতিহাসিক দ্বন্দ্বের গুরুত্বপূর্ণ বাঁক হিসেবে।
শেখ হাসিনার পতনের মধ্য দিয়ে একটি সরকারের পতন ঘটেছিল। কিন্তু প্রশ্ন থেকে গিয়েছিল—
রাষ্ট্র কি বদলেছে?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে আমাদের আবেগের বাইরে গিয়ে রাষ্ট্র ও সমাজকে শ্রেণির দৃষ্টিতে দেখতে হবে।
কারণ মার্কস আমাদের শিখিয়েছেন—রাষ্ট্রকে কেবল নিরপেক্ষ প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখলে সমাজের প্রকৃত ক্ষমতার সম্পর্ক বোঝা যায় না। রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলো যে সমাজে কাজ করে, সেই সমাজের শ্রেণি-সম্পর্ক, অর্থনৈতিক কাঠামো এবং ক্ষমতার ভারসাম্যের সঙ্গে রাষ্ট্রের চরিত্র গভীরভাবে যুক্ত।
তাই জুলাইয়ের পর আমাদের প্রথম প্রশ্ন ছিল—
শাসক বদলেছে, কিন্তু শাসনের সামাজিক ভিত্তি কি বদলেছে?
৫ আগস্ট: রাষ্ট্রের পতন নয়, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় রাজনৈতিক সংকট
৫ আগস্ট আমরা দেখলাম শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে পালিয়ে গেলেন।
জুলাই গণঅভ্যুত্থান নিঃসন্দেহে একটি ঐতিহাসিক রাজনৈতিক বিজয় কিন্তু কোনো শাসকের পতনকে পুরো রাষ্ট্রব্যবস্থার পতন হিসেবে দেখা রাজনৈতিকভাবে বিপজ্জনক সরলীকরণ।
কারণ রাষ্ট্র কোনো এক ব্যক্তির নাম নয়।
রাষ্ট্র হলো প্রতিষ্ঠান, প্রশাসন, আইন, আমলাতন্ত্র, নিরাপত্তা কাঠামো, অর্থনৈতিক ক্ষমতা, রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান এবং শ্রেণিগত স্বার্থের একটি জটিল সমন্বয়। একজন শাসক চলে যেতে পারেন।কিন্তু রাষ্ট্রের ভেতরে থাকা শ্রেণি-ক্ষমতার সম্পর্ক তখনও থেকে যেতে পারে।
সুতরাং ৫ আগস্টের পর মূল প্রশ্ন হওয়া উচিত ছিল -
কে রাষ্ট্র ক্ষমতায় আসবে? বরং প্রশ্ন হওয়া উচিত ছিল—
কোন শ্রেণির স্বার্থে রাষ্ট্র পরিচালিত হবে?’এটাই জুলাইয়ের সবচেয়ে গভীর রাজনৈতিক প্রশ্ন?
জুলাইয়ের রাজপথে যে ঐক্য তৈরি হয়েছিল। জুলাইয়ের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল এর সামাজিক বিস্তার।
ছাত্ররা শুরু করেছিল।কিন্তু আন্দোলন ছাত্রদের মধ্যে আটকে থাকেনি।
শ্রমিক এসেছে।
দিনমজুর এসেছে।
ব্যবসায়ী এসেছে।
নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত এসেছে।
শহর ও গ্রামের মানুষ যুক্ত হয়েছে।
আদিবাসী, বাঙালি সহ বিভিন্ন শ্রেণীর বিভিন্ন রাজনৈতিক মত ও পরিচয়ের মানুষ একই রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছে।
এই জায়গাটিই গুরুত্বপূর্ণ।
কারণ একটি গণঅভ্যুত্থান তখনই শক্তিশালী হয়, যখন বিচ্ছিন্ন অসন্তোষ একটি বৃহত্তর সামাজিক শক্তিতে পরিণত হয়।
জুলাইয়ের ক্ষেত্রে সেটিই ঘটেছিল।ছাত্রের ক্ষোভ শ্রমিকের ক্ষোভের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল।তরুণের ক্ষোভ সাধারণ মানুষের ক্ষোভের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল।
রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে বিচ্ছিন্ন ক্ষোভ একটি সম্মিলিত রাজনৈতিক শক্তিতে রূপ নিয়েছিল। এ কারণেই জুলাই সফল হয়েছিল।
কিন্তু এখানেই একটি মৌলিক দ্বন্দ্ব তৈরি হয়।
যে ঐক্য রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার পতন ঘটাতে পারে, সেই ঐক্য যদি রাষ্ট্রের চরিত্র বদলানোর জন্য সংগঠিত না হয়, তাহলে পুরোনো ক্ষমতাসম্পর্ক নতুন রূপে ফিরে আসতে পারে।
গণঅভ্যুত্থান কেন সবসময় বিপ্লব হয় না,? এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য করা দরকার।
গণঅভ্যুত্থান এবং বিপ্লব এক জিনিস নয়।একটি গণঅভ্যুত্থান বিদ্যমান শাসনকে উৎখাত করতে পারে।কিন্তু বিপ্লবের প্রশ্ন আরও গভীর।
বিপ্লব প্রশ্ন তোলে—
উৎপাদনের মালিক কে?
রাষ্ট্রের ক্ষমতা কার হাতে?
সম্পদ কীভাবে বণ্টিত হয়?
শ্রমের মূল্য কে নির্ধারণ করে?
সমাজের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা কার হাতে থাকে?
অর্থনৈতিক ক্ষমতা কি রাজনৈতিক ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণ করে?
অর্থাৎ বিপ্লব শুধু সরকারের পতন ঘটায় না; সে ক্ষমতার সামাজিক ভিত্তি পরিবর্তনের প্রশ্ন তোলে।
এই জায়গাতেই জুলাইয়ের অসম্পূর্ণতা।
জুলাই রাষ্ট্রের শীর্ষে একটি রাজনৈতিক সংকট সৃষ্টি করেছিল।
কিন্তু সেই সংকটকে যদি উৎপাদন-সম্পর্ক, শ্রেণি-সম্পর্ক এবং রাষ্ট্রের কাঠামোগত রূপান্তরের দিকে নিয়ে যাওয়া না যায়, তাহলে পুরোনো ক্ষমতা অন্য রূপে ফিরে আসবে।
নতুন বন্দোবস্ত’—কাদের জন্য?
জুলাইয়ের পর ‘নতুন বন্দোবস্ত’ কথাটি সামনে এসেছে। কিন্তু যেকোনো রাজনৈতিক বন্দোবস্তকে একটি প্রশ্ন দিয়ে বিচার করতে হয়—
এই বন্দোবস্তে কার লাভ হচ্ছে?
মার্কসবাদী বিশ্লেষণের মৌলিক শক্তি এখানেই।রাষ্ট্রীয় ভাষ্য কী বলছে, সেটিই শেষ কথা নয়।দেখতে হবে—
কোন শ্রেণি সুবিধা পাচ্ছে?
কোন শ্রেণি সিদ্ধান্ত গ্রহণ করছে?
কার সম্পদ নিরাপদ থাকছে?
কার শ্রম সস্তা থাকছে?
কার রাজনৈতিক ক্ষমতা বৃদ্ধি পাচ্ছে?
কার সামাজিক ক্ষমতা কমছে?
যদি রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ভিত্তি অপরিবর্তিত থাকে, যদি সম্পদের কেন্দ্রীভবন অক্ষত থাকে, যদি শ্রমজীবী মানুষের অধিকার দুর্বল থাকে, যদি উৎপাদনের ওপর গণতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণ না আসে—তাহলে কেবল রাজনৈতিক নেতৃত্বের পরিবর্তনকে ‘নতুন বন্দোবস্ত’ বলা যায় না।
তখন সেটি হতে পারে—
পুরোনো রাষ্ট্রব্যবস্থার নতুন রাজনৈতিক বিন্যাস।রাষ্ট্র কেন নিজের চরিত্র রক্ষা করতে চায়?
এখানে রাষ্ট্রের শ্রেণিচরিত্রের প্রশ্নটি আসে।রাষ্ট্রকে আমরা প্রায়ই নিরপেক্ষ হিসেবে কল্পনা করি। কিন্তু বাস্তবে রাষ্ট্র যে সমাজে কাজ করে, সেই সমাজের শ্রেণি-সম্পর্ক থেকে রাষ্ট্র বিচ্ছিন্ন নয়।বাংলাদেশের সমাজে সম্পদের বৈষম্য আছে।
জমির বৈষম্য আছে।
শিক্ষায় বৈষম্য আছে।
চিকিৎসায় বৈষম্য আছে।
শ্রমের মূল্য ও সম্পদের মালিকানায় বৈষম্য আছে।
রাজনৈতিক ক্ষমতায়ও বৈষম্য আছে।
অর্থাৎ সমাজের ওপরের স্তরে যারা অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিকভাবে শক্তিশালী, তাদের প্রভাব রাষ্ট্রের ওপরও পড়ে।তাই রাষ্ট্রের চরিত্র বদলাতে হলে শুধু প্রশাসনের কিছু পদে পরিবর্তন যথেষ্ট নয়।প্রয়োজন—
ক্ষমতার সামাজিক ভিত্তির পরিবর্তন।এ কারণেই জুলাইয়ের প্রকৃত প্রশ্ন ছিল রাষ্ট্র সংস্কারের চেয়েও বড় :রাষ্ট্রের শ্রেণিচরিত্র কীভাবে বদলাবে?
জুলাইকে প্রগতিশীলতার বিরুদ্ধে দাঁড় করানোর রাজনীতি
জুলাইয়ের পর আরেকটি প্রবণতা চোখে পড়েছে—জুলাইকে যেন প্রগতিশীল রাজনীতির বিপরীতে দাঁড় করানো হচ্ছে।এখানে আমাদের সতর্ক হওয়া দরকার।জুলাই কোনোভাবে প্রকৃত প্রগতিশীল রাজনীতির বিরুদ্ধে ছিল না, বরং জুলাই আমাদের সামনে প্রগতিশীলতার একটি গভীর সংকট উন্মোচন করেছে।
কারণ দীর্ঘদিন ধরে যারা নিজেদের প্রগতিশীল বলে দাবি করেছে, তারা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার কেন্দ্রে থেকেও শ্রেণি-বৈষম্য, ক্ষমতার কেন্দ্রীভবন ও জনগণের রাজনৈতিক অধিকারহীনতা, উগ্রপন্থীদের রাজনীতিতে পেট্রোন করেছে।জুলাই সেই কাঠামো দৃশ্যমান করেছে।
জুলাই সেই ব্যাবস্থার বিপরীতে প্রকৃত অর্থের প্রগতিশীল রাজনীতি বিনির্মাণের জন্য হয়েছিলো।
প্রতিক্রিয়াশীলতার উত্থান কেন হয়েছে।
একটি সমাজে যখন পুরোনো রাজনৈতিক কাঠামো সংকটে পড়ে, তখন শুধু প্রগতিশীল শক্তিই সক্রিয় হয় না। প্রতিক্রিয়াশীল শক্তিও সক্রিয় হয়। কারণ পুরোনো ক্ষমতার সম্পর্ক ভেঙে পড়লে সমাজে একটি রাজনৈতিক শূন্যতা তৈরি হয়।
এই শূন্যতা কে পূরণ করবে—সেটিই তখন প্রধান প্রশ্ন।যদি সংগঠিত গণতান্ত্রিক ও প্রগতিশীল শক্তি সেই জায়গা দখল করতে না পারে, তাহলে প্রতিক্রিয়াশীল শক্তি সেখানে প্রবেশের সুযোগ পায়।
বাংলাদেশে জুলাই-পরবর্তী সময়ে সাংস্কৃতিক স্বাধীনতা, বাউল, লোকসংস্কৃতি, মাজার এবং বিভিন্ন সাংস্কৃতিক পরিসরকে ঘিরে যে ধরনের চাপ ও হামলার ঘটনা সামনে এসেছে, সেগুলো তাই শুধু বিচ্ছিন্ন সামাজিক ঘটনা হিসেবে দেখলে চলবে না।এগুলোকে দেখতে হবে বৃহত্তর রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে।
কারণ সংস্কৃতির ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা কখনোই কেবল সংস্কৃতির প্রশ্ন নয়। এটি মানুষের চিন্তার ওপর নিয়ন্ত্রণের প্রশ্ন।
আর চিন্তার ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারলে সমাজের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা সহজ হয়।
ঐক্য ভাঙার রাজনীতি আসলে শ্রেণি-রাজনীতির প্রশ্ন
জুলাইয়ের সবচেয়ে বড় অর্জন ছিল শ্রেণিগত ও সামাজিক বিভাজনের ওপর একটি সাময়িক রাজনৈতিক ঐক্য তৈরি হওয়া।
এই ঐক্য ছিল অস্বাভাবিক শক্তিশালী।কিন্তু এই ঐক্য স্থায়ী হয়নি। এখানে মার্কসবাদী বিশ্লেষণের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা কাজে লাগে।
শাসকশ্রেণি যখন কোনো গণআন্দোলনের মুখোমুখি হয়, তখন কেবল দমনই তার একমাত্র অস্ত্র নয়।বিভাজনও একটি রাজনৈতিক অস্ত্র।
ধর্ম বনাম সংস্কৃতি।
শহর বনাম গ্রাম।
ছাত্র বনাম শ্রমিক।
বাম বনাম ডান।
প্রগতিশীল বনাম ধর্মীয় জনগোষ্ঠী।
মধ্যবিত্ত বনাম নিম্নবিত্ত।
এভাবে যদি জনগণ নিজেদের মধ্যেই বিভক্ত হয়ে পড়ে, তাহলে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সম্মিলিত শক্তি দুর্বল হয়।তখন ক্ষমতাকাঠামো পুনর্গঠনের সুযোগ পায় পুরোনো শক্তিগুলো।তাই জুলাইয়ের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব ছিল ঐক্যকে শ্রেণিসচেতন রাজনৈতিক ঐক্যে পরিণত করা।সেটি যতদিন সম্ভব হয়নি, ততদিন জুলাইয়ের সম্ভাবনাও অসম্পূর্ণ থেকে যাবে।
জাতীয় ঐক্য নয়, শ্রেণিগত সংহতি
এখানে ‘জাতীয় ঐক্য’ কথাটিকেও নতুনভাবে ভাবতে হবে।কারণ সমাজে সব মানুষের অর্থনৈতিক স্বার্থ এক নয়।একজন বৃহৎ পুঁজির মালিক এবং একজন পোশাকশ্রমিক একই রাষ্ট্রের নাগরিক হলেও তাদের শ্রেণিগত স্বার্থ এক নয়।একজন ভূমির মালিক এবং ভূমিহীন কৃষকের বাস্তবতা এক নয়।একজন কর্পোরেট মালিক এবং তার শ্রমিকের ক্ষমতার অবস্থান এক নয়।তাই কেবল ‘জাতীয় ঐক্য’ বললেই সামাজিক দ্বন্দ্ব অদৃশ্য হয়ে যায় না।
জুলাইয়ের প্রকৃত ঐক্য ছিল তাদের মধ্যে, যারা রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিল। এই ঐক্যকে আরও গভীর করতে হলে তাকে শ্রেণিগত বাস্তবতার সঙ্গে যুক্ত করতে হবে।
অর্থাৎ—ছাত্র-শ্রমিক-জনতার ঐক্যকে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দাবির ঐক্যে পরিণত করতে হবে।
জুলাইয়ের অসমাপ্ত কাজ
জুলাই যদি আমাদের কিছু দিয়ে থাকে, তাহলে সবচেয়ে বড় জিনিসটি হলো—একটি নতুন রাজনৈতিক কল্পনার দরজা।আমরা বুঝেছি, রাষ্ট্র পরিবর্তন সম্ভব।আপাতদৃষ্টিতে অপরাজেয় ক্ষমতাও পতনশীল।আমরা বুঝেছি, জনগণ যখন সংগঠিত হয়, তখন ইতিহাসের গতিপথ বদলাতে পারে।কিন্তু একই সঙ্গে আমরা এটাও বুঝেছি—শুধু ক্ষমতার শীর্ষে আঘাত করলেই সমাজ বদলায় না।
প্রয়োজন সংগঠন।প্রয়োজন রাজনৈতিক শিক্ষা। প্রয়োজন শ্রেণিচেতনা। প্রয়োজন শ্রমজীবী মানুষের নিজস্ব রাজনৈতিক শক্তি।
প্রয়োজন রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন তোলা।প্রয়োজন এমন গণতন্ত্র, যেখানে ভোটের পাশাপাশি মানুষের অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষমতাও প্রতিষ্ঠিত হয়। তাহলে পরবর্তী লড়াই কোথায়?
আমার কাছে জুলাইয়ের পরবর্তী লড়াই কোনো ব্যক্তি বা একটি দলের বিরুদ্ধে নয়।
লড়াইটি আরও গভীর।
এটি এমন একটি রাষ্ট্রব্যবস্থার বিরুদ্ধে, যেখানে—
অল্প কিছু মানুষের হাতে সম্পদ কেন্দ্রীভূত থাকবে
অসংখ্য মানুষ শ্রম দেবে কিন্তু সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা পাবে না
রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান জনগণের ওপর কর্তৃত্ব করবে,
অর্থনৈতিক বৈষম্য রাজনৈতিক বৈষম্যকে পুনরুৎপাদন করবে;
আর রাষ্ট্র নিজেকে জনগণের ওপরে স্থাপন করবে।এই কাঠামো বদলাতে না পারলে জুলাইয়ের বিজয় অসম্পূর্ণ থাকবে।
‘লাল জুলাই’—একটি রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি
আমার কাছে ‘লাল জুলাই’ ধারণাটি এটাই ।
লাল জুলাই মানে শুধু একটি রঙ নয়।এটি শ্রমের রঙ।শ্রমিকের রঙ।রক্তের রঙ।ত্যাগের রঙ।এবং সাম্যের আকাঙ্ক্ষার রঙ।
লাল জুলাই মানে এমন একটি বাংলাদেশ, যেখানে রাষ্ট্রের উন্নয়নের হিসাব শুধু জিডিপি দিয়ে হবে না; মানুষের জীবন দিয়ে হবে।যেখানে শ্রমিকের মজুরি, কৃষকের ন্যায্য মূল্য, শিক্ষার্থীর শিক্ষা, রোগীর চিকিৎসা এবং নাগরিকের মর্যাদা রাষ্ট্রের মূল প্রশ্ন হবে।
যেখানে গণতন্ত্র শুধু পাঁচ বছর পরপর ভোট দেওয়ার অধিকার নয়; বরং প্রতিদিনের জীবনে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা।
যেখানে রাষ্ট্র জনগণের ওপর নয়—
জনগণের হাতে থাকবে রাষ্ট্রের উপর
জুলাই ৩৬ দিনের নয়
আজ ফিরে তাকালে মনে হয়
জুলাইয়ের সবচেয়ে বড় ভুল হবে যদি আমরা তাকে একটি নির্দিষ্ট তারিখের মধ্যে বন্দী করি। জুলাই ৩৬ দিনের নয়।
জুলাই ৫ আগস্টে শেষ হয়নি।জুলাই কোনো সরকারের পতনের সঙ্গে শেষ হয়নি।কারণ জুলাই যে প্রশ্নগুলো তুলেছিল, সেগুলোর উত্তর এখনো অসম্পূর্ণ।
রাষ্ট্র কি বদলেছে?
ক্ষমতার সামাজিক ভিত্তি কি বদলেছে?
বৈষম্য কি কমেছে?
শ্রমজীবী মানুষের ক্ষমতা কি বেড়েছে?
জনগণ কি রাষ্ট্রের প্রকৃত মালিক হয়েছে?
যদি উত্তর অসম্পূর্ণ হয়—
তাহলে জুলাইও অসম্পূর্ণ।
শেষ কথা
যতটুকু দেখেছি, যতটুকু বুঝেছি
জুলাই আমাদের রাষ্ট্রকে নতুন করে দেখার শিক্ষা দিয়েছে।
আমাদের বুঝিয়েছে—
সরকার আর রাষ্ট্র এক নয়।ক্ষমতা আর রাষ্ট্রক্ষমতা এক নয়, স্বাধীনতা আর শুধু শাসকের পরিবর্তন এক নয়।
এবং সবচেয়ে বড় কথা—
গণঅভ্যুত্থান আর সামাজিক বিপ্লবও এক নয়।জুলাই একটি দরজা খুলেছে।কিন্তু দরজা দিয়ে আমরা কোথায় যাব, সেটিই এখন ইতিহাসের প্রশ্ন।যদি আমরা পুরোনো রাষ্ট্রকাঠামোর ভেতরে ফিরে যাই, তাহলে জুলাই কেবল একটি ঐতিহাসিক স্মৃতি হয়ে থাকবে।
কিন্তু যদি জুলাইয়ের ছাত্র-শ্রমিক-জনতার ঐক্যকে সংগঠিত রাজনৈতিক শক্তিতে রূপান্তর করা যায়;
যদি বৈষম্যের বিরুদ্ধে সংগ্রামকে অর্থনৈতিক ও সামাজিক অধিকারের সংগ্রামের সঙ্গে যুক্ত করা যায়;
যদি রাষ্ট্রের শ্রেণিচরিত্র নিয়ে প্রশ্ন তোলা যায়;
যদি জনগণকে রাষ্ট্রের প্রকৃত ক্ষমতার কেন্দ্রে নিয়ে আসা যায়—
তাহলেই জুলাই তার ঐতিহাসিক সম্ভাবনার দিকে এগোবে।
সেই কারণেই
জুলাই এখনো শেষ হয়নি।
জুলাই এখনো চলছে।
এটি কোনো ৩৬ দিনের স্মৃতি নয়।
এটি একটি অসমাপ্ত ঐতিহাসিক প্রক্রিয়া।
আর সেই প্রক্রিয়ার পরবর্তী অধ্যায়ের প্রশ্ন একটাই—
আমরা কি শুধু পুরোনো রাষ্ট্রের নতুন সংস্করণ চাই, নাকি সত্যিই একটি নতুন রাষ্ট্র নির্মাণ করতে চাই?
স্পষ্ট—
বৈষম্যের রাষ্ট্র নয়, সাম্যের রাষ্ট্র।
আধিপত্যের রাষ্ট্র নয়, জনগণের রাষ্ট্র।
শোষণের রাষ্ট্র নয়, শ্রম ও মর্যাদার রাষ্ট্র।
এই লড়াইটিই জুলাইয়ের অসমাপ্ত লড়াই।
এই পথই—
লাল জুলাইয়ের পথ।
আর সেই পথ?
এখনো অনেকটা বাকি।
মতামত
এখনও কোনো মতামত নেই।
প্রথম মতামতটি আপনিই দিন।
আলোচনায় অংশ নিতে লগ ইন করুন অথবা এ্যাকাউন্ট খুলুন