# আমার চোখে জুলাই: একটি বেহাত বিপ্লব ও গণমানুষের বঞ্চনার ইতিহাস
## ভূমিকা
ইতিহাস কোনো রৈখিক গতিতে চলে না; বরং তা আকস্মিক বিস্ফোরণ, দ্বন্দ্ব এবং সামাজিক শক্তির সংঘাতে মোড় নেয়। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিসরে ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থান তেমনি এক বিশাল জনরোষ ও গণবিক্ষোভের নাম। শহিদদের রক্তে ভেজা এই অভ্যুত্থানকে বুর্জোয়া শ্রেণি, মূলধারার মিডিয়া এবং বিভিন্ন সুবিধাবাদী রাজনৈতিক শক্তি তথাকথিত ‘বিপ্লব’ বা ‘গণতন্ত্রের পুনর্জন্ম’ হিসেবে চিহ্নিত করার চেষ্টা করেছে। কিন্তু মার্ক্সবাদী-লেনিনবাদী এবং মাওবাদী দর্শনের কঠোর ও বস্তুনিষ্ঠ ঐতিহাসিক আলোকেই কেবল এই জুলাইয়ের সঠিক চরিত্র নির্ণয় করা সম্ভব। আমাদের দৃষ্টিতে, এটি নিছক কোনো সফল বিপ্লব নয়; বরং এটি ছিল শোষিত ও বঞ্চিত গণমানুষের আত্মত্যাগের ওপর ভর করে সংঘটিত এক সম্ভাবনাময় বিপ্লবের বেহাত হয়ে যাওয়ার করুণ ইতিহাস। এই অভ্যুত্থান প্রমাণ করেছে যে, সুনির্দিষ্ট বিপ্লবী নেতৃত্ব ও তাত্ত্বিক দিকনির্দেশনার অভাবে কীভাবে শ্রমজীবী মানুষের রক্তে অর্জিত বিজয় প্রতিক্রিয়াশীল শক্তির হাতে জিম্মি হয়ে পড়তে পারে।
## কেন এটি বিপ্লব না
মার্ক্সীয় রাজনৈতিক অর্থনীতির পাঠ অনুযায়ী, ‘বিপ্লব’ শব্দটির একটি সুনির্দিষ্ট ঐতিহাসিক ও শ্রেণিগত তাৎপর্য রয়েছে। বিপ্লব বলতে কেবল সরকারের পরিবর্তন, কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তির পতন কিংবা ফ্যাসিবাদী শাসকগোষ্ঠীর হাতবদল বোঝায় না; বিপ্লব হলো সমাজ কাঠামোর উৎপাদন সম্পর্কের আমূল পরিবর্তন এবং শোষিত ও মেহনতি মানুষের হাতে রাষ্ট্রক্ষমতার পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা। জুলাইয়ের উত্তাল দিনগুলোতে দেশের শ্রমিক, ছাত্র, দিনমজুর ও সাধারণ মেহনতি মানুষ রাজপথে জীবন বাজি রেখে লড়াই করেছে, বুলেটের সামনে বুক পেতে দিয়েছে। কিন্তু রাষ্ট্র ও সমাজের মূল ভিত্তিমূল—অর্থাৎ পুঁজিবাদী শোষণ ব্যবস্থা, ব্যাংক-বীমা ও বাণিজ্যের ওপর নিয়ন্ত্রণ, এবং আমলাতান্ত্রিক পুঁজির কাঠামো—অপরিবর্তিত রয়ে গেছে। উৎপাদনের মাধ্যমগুলো আগের মতোই মুষ্টিমেয় লুটেরা ও শোষক শ্রেণির হাতে কুক্ষিগত রয়েছে। বুর্জোয়া রাজনৈতিক দলগুলো ও মধ্যবিত্ত সুবিধাভোগী চক্র এই গণআন্দোলনকে ‘বিপ্লব’ হিসেবে চালিয়ে দিয়ে মূলত জনগণের প্রকৃত মুক্তির পথকে রুদ্ধ করেছে। এটি তাই কোনো সমাজতান্ত্রিক বা গণতান্ত্রিক বিপ্লব ছিল না, বরং এটি ছিল একটি জনবিক্ষোভ, যা পরবর্তীতে তার সঠিক গন্তব্য থেকে বিচ্যুত হয়ে বেহাত হয়ে পড়ে।
## মার্কিন অর্থনৈতিক সাম্রাজ্যবাদ
বাংলাদেশের সমসাময়িক রাজনীতি এবং ভূ-রাজনীতির চালচিত্রে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের ভূমিকা এবং তাদের অর্থনৈতিক স্বার্থ অত্যন্ত গভীর ও সুদূরপ্রসারী। সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলো কখনোই জনকল্যাণ, মানবাধিকার বা প্রকৃত গণতন্ত্রের টানে কোনো উন্নয়নশীল দেশের অভ্যন্তরীণ সংকটে হস্তক্ষেপ করে না; তাদের মূল লক্ষ্য থাকে শ্রমবাজার নিয়ন্ত্রণ, ভূ-কৌশলগত আধিপত্য বিস্তার এবং নিজেদের বাণিজ্যিক স্বার্থ ও বহুজাতিক কোম্পানির মুনাফা নিশ্চিত করা। জুলাইয়ের পটপরিবর্তনের ঠিক অব্যবহিত পরেই দেশের অর্থনীতিতে যে মার্কিন বাণিজ্য চুক্তি, শর্ত এবং আন্তর্জাতিক পুঁজির প্রেসক্রিপশনগুলোর বাস্তবায়ন দেখতে পাই, তা এই সাম্রাজ্যবাদী কাঠামোর ব্যর্থতারই চরম প্রমাণ। দেশের অর্থনীতিকে দীর্ঘমেয়াদে সাম্রাজ্যবাদী শক্তির করলে ন্যস্ত করার এই অপচেষ্টা প্রমাণ করে যে, অভ্যন্তরীণ ফ্যাসিবাদের পতন ঘটলেও সাম্রাজ্যবাদী আধিপত্যের নাগপাশ থেকে দেশের সার্বভৌমত্ব ও মেহনতি মানুষের শ্রম এখনো মুক্ত হতে পারেনি।
## প্রতিক্রিয়াশীল শক্তির উত্থান
বিপ্লবী তত্ত্বের অনুপস্থিতি এবং সঠিক রাজনৈতিক নেতৃত্বের শূন্যতার সুযোগ নিয়ে যেকোনো বড় গণঅভ্যুত্থানের ফায়দা লুটে নেয় প্রতিক্রিয়াশীল, উগ্র দক্ষিণপন্থী ও লুটেরা শ্রেণি। জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানের পর আমরা গভীর উদ্বেগের সাথে লক্ষ করেছি কীভাবে পুরোনো কাঠামোর সুবিধাভোগী দোসর এবং বিভিন্ন প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠী এই ঐতিহাসিক শূন্যতা পূরণের সুযোগ নিয়েছে। শ্রমজীবী মানুষের রক্তে ভেজা এই বিজয়কে তারা নিজেদের সংকীর্ণ রাজনৈতিক ও ধর্মীয় স্বার্থে ব্যবহার করতে শুরু করেছে। মাও সেতুং-এর শিক্ষা অনুযায়ী, গণমানুষের স্বতঃস্ফূর্ত বিদ্রোহ যখন কোনো সচেতন, সংগঠিত ও মার্ক্সবাদী-লেনিনবাদী বিপ্লবী শক্তির নেতৃত্বে পরিচালিত হয় না, তখন প্রতিক্রিয়াশীল শক্তি পেছনের দরজা দিয়ে এসে ক্ষমতার মসনদ দখল করে নেয়। জুলাইয়ের চূড়ান্ত পরিণতিতে ঠিক এই ঐতিহাসিক নির্মম সত্যটিই বারবার প্রতিভাত হয়েছে।
## কৃষক-শ্রমিক শক্তি বিরোধী প্রোপাগান্ডা
একটি সফল জনঅভ্যুত্থানের মাঠের মূল কারিগর ও চালিকাশক্তি থাকে দেশের খেটে খাওয়া কৃষক, দিনমজুর, রিকশাচালক, পাটকল ও পোশাকশিল্পের শ্রমিকেরা। কিন্তু জুলাই-পরবর্তী রাজনৈতিক বয়ান ও মূলধারার প্রচারণায় এই মূল শ্রমজীবী শ্রেণিটিকে সুকৌশলে প্রান্তিক বা অদৃশ্য করে রাখা হয়েছে। বুর্জোয়া গণমাধ্যম, বুদ্ধিজীবী সমাজ এবং মধ্যবিত্ত নেতৃত্ব বারবার কেবল ছাত্রসমাজ ও সুশীল সমাজের অবদানকে অতিরঞ্জিত করে প্রচার করেছে, অথচ কৃষক-শ্রমিক শ্রেণির নিজস্ব রাজনৈতিক দাবি, বাঁচার মতো মজুরি এবং শোষণমুক্তির স্লোগানগুলোকে পরিকল্পিত প্রোপাগান্ডার মাধ্যমে দমিয়ে রাখা হয়েছে। শ্রমিকদের ঘাম ও রক্তে আন্দোলন বেগবান হলেও ক্ষমতা হস্তান্তরের সময় তাদের কেবল ‘ফুয়েল’ বা ব্যবহার্য জনস্রোত হিসেবে গণ্য করা হয়েছে, যা শ্রেণি সংগ্রামের ইতিহাসে এক নগ্ন বিশ্বাসঘাতকতা।
## ফ্যাসিবাদ বিরোধী জনতার এক অপূর্ব শক্তি প্রদর্শন
সমস্ত সীমাবদ্ধতা, আদর্শগত শূন্যতা এবং চক্রান্তের পরেও জুলাই মাসের দিনগুলোতে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে যে অবিশ্বাস্য ও ঐতিহাসিক শক্তি প্রদর্শন করেছিল, তা ছিল অতুলনীয়। রাষ্ট্রীয় পেটোয়া বাহিনীর অস্ত্র, সাঁজোয়া যান, নির্বিচারে চালিত গুলি ও রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের সামনে দাঁড়িয়ে যেভাবে তরুণ সমাজ ও মেহনতি জনতা বুক চিতিয়ে লড়েছিল, তা প্রমাণ করে যে সংঘবদ্ধ জনতার শক্তির কাছে যেকোনো ফ্যাসিস্ট প্রাচীরই অত্যন্ত দুর্বল। এই অভ্যুত্থান আমাদের শিখিয়েছে কীভাবে ভয়কে জয় করে রাজপথ দখল করতে হয় এবং রাষ্ট্রযন্ত্রের নিপীড়নকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে ঘুরে দাঁড়াতে হয়। এই বীরত্ব ও সাহসিকতা বাংলাদেশের মুক্তিকামী মানুষের ইতিহাসে এক সোনালী অধ্যায় হয়ে থাকবে, যা যেকোনো নিপীড়নের বিরুদ্ধে ভবিষ্যৎ সংগ্রামের চিরন্তন অনুপ্রেরণা জোগাবে।
## উপসংহার
"আমার চোখে জুলাই" হলো একাধারে আশার আলো এবং গভীর বেদনার এক মিশ্র দলিল। এটি সম্ভাবনাময় এক বিপ্লবের বেহাত হয়ে যাওয়ার ইতিহাস, যেখানে মেহনতি মানুষের রক্ত ও ত্যাগের ওপর দাঁড়িয়ে আবারও পুরোনো শোষক, বুর্জোয়া ও প্রতিক্রিয়াশীল চক্র নিজেদের অবস্থান পাকাপোক্ত করেছে। তবে মার্ক্সবাদী-লেনিনবাদী ও মাও চিন্তাধারায় বিশ্বাসী কমিউনিস্টরা বিশ্বাস করে, ইতিহাস কখনো থেমে থাকে না। জুলাইয়ের এই রক্তক্ষয়ী অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের বামপন্থী শক্তিকে নতুন করে সংগঠিত হওয়ার এবং কৃষক-শ্রমিক-ছাত্রদের ঐক্যবদ্ধ করে একটি প্রকৃত শোষণহীন সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের পথ রচনার দুর্নিবার তাগিদ দিয়ে গেছে।
About the Author
Sadat Rameen Ahmed
একজন অ্যানারকো কমিউনিস্ট বিপ্লবী । এছাড়া নগন্য পরিচয় : ছাত্র, বুদ্ধিজীবী, লেখক ও কবি
প্রোফাইল দেখুন
মতামত
এখনও কোনো মতামত নেই।
প্রথম মতামতটি আপনিই দিন।
আলোচনায় অংশ নিতে লগ ইন করুন অথবা এ্যাকাউন্ট খুলুন