সকল লেখা জানতে চাই
Searching…

উপনিবেশে বিপ্লব: "সুনির্দিষ্ট পরিস্থিতির সুনির্দিষ্ট বিশ্লেষণ"

Sankalpa
Sankalpa মজদুরের নিয়মিত লেখক
পড়তে 17 মিনিট লাগতে পারে
এই লেখাটি 192 বার পড়েছে এ মাসে লেখকের লেখা 2 জন পাঠক পড়েছেন
উপনিবেশে বিপ্লব: "সুনির্দিষ্ট পরিস্থিতির সুনির্দিষ্ট বিশ্লেষণ"

স্তালিনবাদীরা প্রায়শই দাবি করেন যে উপনিবেশিক ও আধা-সামন্ততান্ত্রিক দেশগুলিতে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের পূর্বে একটি পৃথক "বুর্জোয়া-গণতান্ত্রিক" বা "নয়া গণতান্ত্রিক" পর্যায় অবশ্যম্ভাবী। এই যুক্তির পক্ষে তাঁরা সাধারণত লেনিনের সুপরিচিত "সুনির্দিষ্ট পরিস্থিতির সুনির্দিষ্ট বিশ্লেষণ" উদ্ধৃত করেন। কিন্তু ইতিহাসের নথিপত্র খতিয়ে দেখলে দেখা যায়, এই একই পদ্ধতি প্রয়োগ করেই কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিকের দ্বিতীয় কংগ্রেস (১৯২০) সম্পূর্ণ বিপরীত সিদ্ধান্তে পৌঁছেছিল।

কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিকের দ্বিতীয় কংগ্রেসের চতুর্থ অধিবেশনে লেনিন তাঁর উদ্বোধনী প্রতিবেদনে স্পষ্ট ভাষায় বলেন:

উপনিবেশিক ও জাতীয় প্রশ্নে বিমূর্ত সূত্র থেকে নয়, বরং বাস্তব অর্থনৈতিক তথ্য ও সুনির্দিষ্ট বাস্তবতা থেকে অগ্রসর হওয়াই প্রলেতারিয়েত ও কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিকের জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

অতএব, "সুনির্দিষ্ট পরিস্থিতির সুনির্দিষ্ট বিশ্লেষণ" যে মার্কসবাদী পদ্ধতিরই অংশ, সে বিষয়ে কোনো বিতর্ক নেই। কিন্তু প্রশ্ন হলো ভারত, চীন, জাভা, পারস্য, তুর্কিস্তান, বাশকিরিয়া, কোরিয়ার মতো দেশগুলির বাস্তব পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে কমিন্টার্ন কী সিদ্ধান্তে পৌঁছেছিল? স্তালিনবাদীদের দাবি এই বিশ্লেষণের ফল ছিল "আগে বুর্জোয়া সরকার, পরে সমাজতন্ত্র"। কিন্তু কংগ্রেসের গৃহীত থিসিস তার ঠিক বিপরীত কথা বলে।

কমিন্টার্ন স্পষ্টভাবে পুঁজিবাদী স্তরের অবশ্যম্ভাবিতা অস্বীকার করে

লেনিন তাঁর প্রতিবেদনে প্রশ্নটি সরাসরি উত্থাপন করেন:

প্রশ্নটি এভাবে উত্থাপিত হয়েছিল: মুক্তির পথে অগ্রসর পশ্চাৎপদ জাতিগুলির জন্য কি পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক বিকাশের পর্যায় অনিবার্য? ... আমরা এর উত্তর নেতিবাচক দিয়েছি। যদি বিজয়ী বিপ্লবী প্রলেতারিয়েত সুসংগঠিত ও ধারাবাহিক প্রচার পরিচালনা করে এবং সোভিয়েত সরকার তার সাধ্যমধ্যে সমস্ত উপায়ে তাদের সহায়তা করে, তবে এ ধরনের জনগণের জন্য পুঁজিবাদী বিকাশের পর্যায় অপরিহার্য—এমন ধারণা সঠিক নয়। আমাদের কর্তব্য কেবল সমস্ত উপনিবেশ ও পশ্চাৎপদ দেশে বিপ্লবী ক্যাডার ও কমিউনিস্ট দল গড়ে তোলাই নয়; আমাদের অবিলম্বে কৃষক সোভিয়েতের প্রচার চালাতে হবে এবং প্রাক-পুঁজিবাদী সামাজিক পরিস্থিতির উপযোগী করে সোভিয়েত সংগঠনের রূপ বিকশিত করার চেষ্টা করতে হবে। পাশাপাশি, কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিকের তাত্ত্বিকভাবেও ঘোষণা ও ব্যাখ্যা করা উচিত যে উন্নত দেশগুলির প্রলেতারিয়েতের সহায়তায় পশ্চাৎপদ দেশগুলি সোভিয়েত সংগঠনের স্তরে পৌঁছাতে পারে এবং ধারাবাহিক কয়েকটি বিকাশপর্ব অতিক্রম করে, এমনকি পুঁজিবাদী ব্যবস্থাকে এড়িয়ে গিয়েও কমিউনিজমে পৌঁছাতে পারে।

থিসিসের যুক্তি ছিল না যে, যেহেতু পূর্বদেশগুলিতে সামন্ততান্ত্রিক সম্পর্ক বিদ্যমান, তাই আগে জাতীয় বুর্জোয়াদের হাতে রাষ্ট্রক্ষমতা তুলে দিতে হবে। বরং সিদ্ধান্ত ছিল যে এই প্রাক-পুঁজিবাদী অবস্থার মধ্যেই সোভিয়েত রূপকে অভিযোজিত করতে হবে; কৃষক সোভিয়েত, শ্রমজীবী মানুষের সোভিয়েত এখনই গড়ে তুলতে হবে, কোনো মধ্যবর্তী বুর্জোয়া-গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রের জন্য অপেক্ষা করা চলবে না।

"বুর্জোয়া-গণতান্ত্রিক আন্দোলন" থেকে "জাতীয়-বিপ্লবী আন্দোলন": শব্দবদলের রাজনৈতিক তাৎপর্য

কমিশনের আলোচনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ সংশোধন আনা হয়েছিল। লেনিন নিজেই জানান যে কমিশন ইচ্ছাকৃতভাবে "bourgeois-democratic movement" শব্দবন্ধটি বাদ দিয়ে তার পরিবর্তে "national-revolutionary movement" গ্রহণ করে। তিনি কারণও ব্যাখ্যা করেন:

কমিউনিস্ট হিসেবে আমরা কেবল সেইসব বুর্জোয়া স্বাধীনতা আন্দোলনকে সমর্থন করব, যেগুলি প্রকৃত অর্থে বিপ্লবী এবং যাদের প্রতিনিধিরা আমাদেরকে কৃষক সমাজকে বিপ্লবীভাবে সংগঠিত করতে বাধা দেয় না। যদি তারা এর বিরোধিতা করে, তাহলে কমিউনিস্টদের কর্তব্য হবে সেই সংস্কারবাদী বুর্জোয়াদের বিরুদ্ধেও সংগ্রাম করা।

এই সংশোধনটি কেবল শব্দচয়নের পরিবর্তন ছিল না; এটি ছিল ঔপনিবেশিক বিপ্লব সম্পর্কে কমিন্টার্নের রাজনৈতিক অবস্থানের একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্দিষ্টকরণ। লেনিন প্রথমেই স্বীকার করেন যে উপনিবেশিক ও আধা-উপনিবেশিক সমাজে জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের সামাজিক ভিত্তি প্রধানত কৃষকসমাজ; আর সেই অর্থে এই আন্দোলনগুলির একটি বুর্জোয়া-গণতান্ত্রিক চরিত্র থাকাই স্বাভাবিক। তিনি স্পষ্টভাবে বলেন, এই দেশগুলিতে প্রলেতারীয় দলগুলি কৃষক আন্দোলনের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন ও তাকে বাস্তবে সমর্থন না করে কমিউনিস্ট রাজনীতি পরিচালনা করতে পারবে—এমন ধারণা কল্পনাবিলাস মাত্র।

কিন্তু কমিশনের আলোচনায় একটি মৌলিক বিষয় উত্থাপিত হয়। সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতা দেখিয়েছিল যে সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলি উপনিবেশগুলিতেও একটি সংস্কারবাদী জাতীয় বুর্জোয়া নেতৃত্ব গড়ে তুলতে সচেষ্ট হয়েছে। বহু ক্ষেত্রেই নিপীড়িত দেশের জাতীয় বুর্জোয়া একদিকে জাতীয় আন্দোলনের নেতৃত্ব দাবি করলেও, অন্যদিকে সাম্রাজ্যবাদী বুর্জোয়ার সঙ্গে সমঝোতা করে শ্রমিক, কৃষক ও বিপ্লবী শক্তির বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। অর্থাৎ "বুর্জোয়া-গণতান্ত্রিক" শব্দটি বিপ্লবী ও সংস্কারবাদী, এই দুই ভিন্ন প্রবণতার মধ্যে অপরিহার্য রাজনৈতিক পার্থক্যকে অস্পষ্ট করে দিচ্ছিল।

এই কারণেই কমিশন সর্বসম্মতিক্রমে সিদ্ধান্তে পৌঁছায় যে "বুর্জোয়া-গণতান্ত্রিক আন্দোলন" নয়, বরং "জাতীয়-বিপ্লবী আন্দোলন" (national-revolutionary movement) কথাটি ব্যবহার করা হবে। এর মাধ্যমে কমিন্টার্ন স্পষ্ট করে দেয় যে কমিউনিস্টরা কেবল সেই জাতীয় মুক্তি আন্দোলনকেই সমর্থন করবে, যা প্রকৃত অর্থে বিপ্লবী; যা কৃষকদের বিপ্লবী সংগঠন গড়ে তোলার বিরোধিতা করবে না; এবং যা শ্রমিক-কৃষকের স্বাধীন রাজনৈতিক সংগঠনকে দমিয়ে রাখার চেষ্টা করবে না। যদি কোনো জাতীয় বুর্জোয়া নেতৃত্ব সাম্রাজ্যবাদের সঙ্গে আপস করে বা জনগণের বিপ্লবী সংগঠনের বিরুদ্ধে দাঁড়ায়, তাহলে কমিউনিস্টদের কর্তব্য হবে তার বিরুদ্ধেও সংগ্রাম করা।

এই সংশোধনের ফলেই চূড়ান্তভাবে গৃহীত ষষ্ঠ থিসিসে "বুর্জোয়া-গণতান্ত্রিক মুক্তি আন্দোলন"-এর পরিবর্তে "বিপ্লবী মুক্তি আন্দোলন" শব্দবন্ধ স্থান পায় এবং একাদশ থিসিসেও একই পরিবর্তন করা হয়। অর্থাৎ কমিন্টার্ন সচেতনভাবেই এমন ভাষা পরিত্যাগ করে, যা জাতীয় বুর্জোয়া নেতৃত্বের সঙ্গে স্থায়ী বা নিঃশর্ত রাজনৈতিক জোটকে বৈধতা দিতে পারত। লেনিন এই প্রসঙ্গে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবাণী উচ্চারণ করেন। তিনি বলেন, এমন সংস্কারবাদী বুর্জোয়াদের মধ্যে দ্বিতীয় আন্তর্জাতিকের তথাকথিত "বীর"দেরও (heroes of the Second International) স্থান রয়েছে । তিনি উল্লেখ করেন যে উপনিবেশগুলিতেও ইতিমধ্যে এমন সংস্কারবাদী দল গড়ে উঠেছে, যাদের প্রতিনিধিরা অনেক সময় নিজেদের "সোশ্যাল ডেমোক্র্যাট" বা "সোশ্যালিস্ট" বলেও পরিচয় দেয়।

একাদশ থিসিস:

চূড়ান্তভাবে গৃহীত একাদশ থিসিসের (ঙ) উপধারায় বলা হয়:

কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিকের কর্তব্য উপনিবেশগুলির বিপ্লবী আন্দোলনকে কেবল এই উদ্দেশ্যে সমর্থন করা যে ভবিষ্যতের প্রকৃত কমিউনিস্ট প্রলেতারীয় দলগুলির উপাদান গড়ে তোলা যায়... তাদের নিজেদের জাতির অভ্যন্তরে বুর্জোয়া-গণতান্ত্রিক প্রবণতার বিরুদ্ধে সংগ্রামের জন্য প্রস্তুত করা... কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিক বিপ্লবী আন্দোলনের সঙ্গে নির্দিষ্ট পর্যায় পর্যন্ত একযোগে অগ্রসর হতে পারে, এমনকি তার সঙ্গে জোটও করতে পারে; কিন্তু তার সঙ্গে কখনোই একীভূত হতে পারে না এবং প্রলেতারীয় আন্দোলনের স্বাধীন চরিত্রকে—তা ভ্রূণাবস্থায় থাকলেও—অবশ্যই বজায় রাখতে হবে।

এই দ্বান্দ্বিক যুক্তিকে বুঝতে পারা অত্যন্ত জরুরি। স্তালিনবাদীরা উপনিবেশ, আধা-উপনিবেশে বুর্জোয়াদের সাথে রাজনৈতিক জোট করতে অস্বীকার করা বলশেভিক-লেনিনবাদীদের গোঁড়া বলে উপহাস করে। অথচ তারা নিজেরাই পুরনো মেনশেভিক দ্বিস্তরীয় বিপ্লবের তত্ত্বের গোঁড়ামি থেকে বেরিয়ে আসতে অক্ষম। উল্টোদিকে এমন অনেক অতিবামপন্থী ধারা রয়েছে যারা জাতীয় বিপ্লবী আন্দোলনে কোনরকম অংশগ্রহণকে বাতিল করে দেয়। এটাও সঠিক মার্কসবাদী অবস্থান নয়, বরং গোঁড়া সঙ্কীর্ণতাবাদের প্রকাশ।

লক্ষণীয় যে, থিসিসের খসড়া প্রস্তুতির সময়েই বলশেভিক নেতৃত্বের অভ্যন্তরে "বুর্জোয়া" ধারণাটি নিয়ে বিভ্রান্তি স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল। চিচেরিন (তৎকালীন পররাষ্ট্র কমিসার) লেনিনের থিসিসের একটি ভুল ব্যাখ্যা দেন, জাতীয় মুক্তি আন্দোলনকে সমর্থন এবং জাতীয় বুর্জোয়ার সঙ্গে সমঝোতার প্রশ্নে তিনি লেনিনের বুর্জোয়া ও কৃষকের মধ্যেকার সুনির্দিষ্ট পার্থক্যটি উপেক্ষা করেন। এর জবাবে লেনিন স্পষ্ট ভাষায় লেখেন: "আমি কৃষকদের সঙ্গে মৈত্রীর উপরেই অধিক গুরুত্ব আরোপ করছি (যা বুর্জোয়াদের সঙ্গে মৈত্রীর সমার্থক নয়)।" এখানেই স্পষ্ট হয়ে যায় থিসিসের প্রকৃত বার্তা "জাতীয় বুর্জোয়ার সঙ্গে জোট" নয়, বরং কৃষক জনগণের সঙ্গে মৈত্রী, যা পরবর্তীকালে "জাতীয়-বিপ্লবী আন্দোলন" শব্দবন্ধের মধ্য দিয়ে থিসিসের মূল পাঠে সুনির্দিষ্টভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়। অর্থাৎ, শ্রেণিসমঝোতার প্রবণতা কমিন্টার্নের প্রতিষ্ঠাকালেই বলশেভিক নেতৃত্বের একাংশের মধ্যে বিদ্যমান ছিল, যা লেনিনকে সরাসরি হস্তক্ষেপ করে সংশোধন করতে হয়েছিল।

স্তালিনের ক্ষেত্রেও একই থিসিস-প্রক্রিয়ায় একটি গুরুতর ভুলের নথিভুক্ত প্রমাণ পাওয়া যায়, তবে তা বুর্জোয়া প্রশ্নে নয়, জাতীয় নিপীড়নের প্রকৃতি সম্পর্কেই। ১৯২০ সালের ১২ জুন লেনিনকে লেখা এক চিঠিতে স্তালিন সোভিয়েত প্রজাতন্ত্রগুলির মধ্যে স্বায়ত্তশাসনভিত্তিক যুক্তরাষ্ট্রীয় সম্পর্ক এবং স্বাধীন প্রজাতন্ত্রগুলির মধ্যেকার যুক্তরাষ্ট্রীয় সম্পর্ক — এই দুইয়ের মধ্যে লেনিনের প্রস্তাবিত পার্থক্যটি অস্বীকার করেন। স্তালিনের নিজের ভাষায়: "এই দুই ধরনের যুক্তরাষ্ট্রীয় সম্পর্কের মধ্যে বাস্তবে কোনো পার্থক্য নেই, অথবা থাকলেও তা এতই সামান্য যে তা উপেক্ষণীয়।" অর্থাৎ, প্রকৃত জাতীয় স্বাধীনতা ও কেন্দ্রের অধীনস্থ স্বায়ত্তশাসনের মধ্যেকার রাজনৈতিক পার্থক্যকেই স্তালিন তুচ্ছ জ্ঞান করেন, যা জাতীয় নিপীড়নের প্রশ্নে তাঁর একটি মৌলিক ভ্রান্তি প্রকাশ করে। এই একই অবস্থান তিনি ১৯২২ সালে আরও সুসংহতভাবে তুলে ধরেন তাঁর কুখ্যাত "স্বায়ত্তশাসনীকরণ" (autonomisation) পরিকল্পনায়, যেখানে তিনি প্রস্তাব করেন যে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীন সোভিয়েত প্রজাতন্ত্রগুলিকে (যেমন ইউক্রেন, জর্জিয়া) সমমর্যাদার অংশীদার হিসেবে নয়, বরং রুশ সোভিয়েত ফেডারেটিভ রিপাবলিকের অধীনস্থ স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হোক। জীবনের শেষ সক্রিয় রাজনৈতিক সংগ্রামে লেনিন এই পরিকল্পনার তীব্র বিরোধিতা করেন তাঁর "জাতীয়তা প্রশ্ন অথবা 'স্বায়ত্তশাসনীকরণ'" প্রবন্ধে এবং পলিটব্যুরোর কাছে লেখা "ইউএসএসআর গঠন প্রসঙ্গে" চিঠিতে। এই লেখাগুলিতে তিনি বৃহৎ-রুশ-জাত্যভিমানের (Great-Russian chauvinism) বিরুদ্ধে তাঁর সবচেয়ে কঠোর সতর্কবার্তা উচ্চারণ করেন।

সূত্র: V. I. Lenin, Draft Theses on National and Colonial Questions, টীকা [1], Collected Works, ২য় ইংরেজি সংস্করণ, Progress Publishers, Moscow, 1965, খণ্ড ৩১; অতিরিক্ত নির্দেশনা: খণ্ড ৩৬ ও Lenin Miscellany XXXVI, পৃ. ৪৯৬-৯৮।

এম. এন. রায়ের পরিপূরক থিসিস: ভারতীয় অভিজ্ঞতা থেকেও একই সিদ্ধান্ত

ভারতের প্রতিনিধি এম. এন. রায়ের গৃহীত পরিপূরক থিসিসেও একই বক্তব্য পুনর্ব্যক্ত হয়। তিনি লেখেন:

কৃষি প্রশ্নকে শুরুতেই সম্পূর্ণ কমিউনিস্ট নীতির ভিত্তিতে সমাধান করার চেষ্টা ভুল হবে। বিপ্লবের বিকাশের প্রথম পর্যায়ে উপনিবেশগুলিতে বিপ্লবকে সম্পূর্ণ ক্ষুদ্র-বুর্জোয়া দাবির কর্মসূচির ভিত্তিতেই পরিচালিত করতে হবে—যেমন ভূমি বণ্টন ইত্যাদি। কিন্তু এখান থেকে এই সিদ্ধান্তে পৌঁছানো চলবে না যে উপনিবেশগুলিতে নেতৃত্ব বুর্জোয়া গণতন্ত্রীদের হাতে ছেড়ে দেওয়া যেতে পারে। বরং এর বিপরীতে, প্রলেতারীয় দলগুলির কর্তব্য হলো কমিউনিস্ট ধ্যানধারণার ব্যাপক ও নিবিড় প্রচার চালানো এবং প্রথম সুযোগেই শ্রমিক ও কৃষক পরিষদ (সোভিয়েত) গঠন করা। এই পরিষদগুলিকে উন্নত পুঁজিবাদী দেশগুলির সোভিয়েত প্রজাতন্ত্রগুলির ন্যায় কাজ করতে হবে, যাতে সমগ্র বিশ্বে পুঁজিবাদী ব্যবস্থার চূড়ান্ত উচ্ছেদ সাধিত হয়।

এই পার্থক্যটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দাবির বিষয়বস্তু সাময়িকভাবে ক্ষুদ্র-বুর্জোয়া চরিত্রের হতে পারে; কিন্তু নেতৃত্ব কখনোই বুর্জোয়ার হাতে যাবে না। অথচ, পরবর্তীকালে স্তালিনবাদী নীতি, বিশেষত চীনে কুওমিনতাঙের সঙ্গে জোট (১৯২৫–২৭) এবং পরবর্তী "নয়া গণতন্ত্র" তত্ত্ব, এই দুই প্রশ্নকে এক করে দেয়। নেতৃত্বও বুর্জোয়াদের অধীনস্থ করা হয়। ১৯২০ সালের থিসিস এই বিপদের বিরুদ্ধে আগেভাগেই সতর্ক করেছিল।

জাতীয় ও ঔপনিবেশিক প্রশ্নে ১৯২০ সালের কমিন্টার্নের এই অবস্থান পরবর্তী দশকগুলিতে আমলাতন্ত্রের হাতে সংশোধনবাদী পথে পরিবর্তিত হয়। এই পরিবর্তনের সবচেয়ে স্পষ্ট দলিলগুলির একটি হলো ১৯৫১ সালে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির নেতাদের সঙ্গে স্তালিনের আলোচনা। সেখানে তিনি ভারতের বিপ্লবের চরিত্র, জাতীয় বুর্জোয়ার ভূমিকা এবং সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের সময়কাল সম্পর্কে যে অবস্থান তুলে ধরেন, তা ১৯২০ সালের কমিন্টার্নের গৃহীত থিসিসগুলির থেকে একটি স্পষ্ট রাজনৈতিক বিচ্যুতি নির্দেশ করে।

১৯৫১ সালে স্তালিন: একই "সুনির্দিষ্ট পরিস্থিতি" থেকে সম্পূর্ণ বিপরীত সিদ্ধান্ত

১৯৫১ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে মস্কোয় স্তালিনের সঙ্গে ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির চারজন প্রতিনিধি — সি. রাজেশ্বর রাও, এস. এ. ডাঙ্গে, এ. কে. ঘোষ এবং এম. বাসবপুন্নাইয়া সাক্ষাৎ করেন। এই বৈঠকের পেছনে ছিল সিপিআই-এর অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সংকট। ১৯৪৮ সালের কলকাতা কংগ্রেসে বি. টি. রণদিভের নেতৃত্বে পার্টি যে লাইন গ্রহণ করেছিল তার মূল কথা ছিল, ভারত তখনই সরাসরি সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে, এবং অবিলম্বে সশস্ত্র বিদ্রোহের পথে যাওয়া প্রয়োজন। এই লাইন অনুসরণ করেই তেলেঙ্গানায় সশস্ত্র কৃষক সংগ্রাম পরিচালিত হয়। কিন্তু ১৯৪৯ সালে কমিনফর্মের পত্রিকায় প্রকাশিত একটি প্রবন্ধে এই রণদিভে-লাইনের কড়া সমালোচনা করা হয় এবং তার বদলে "চীনা পথ" অনুসরণের কথা বলা হয়। অর্থাৎ, সরাসরি সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব নয়, বরং একটি কৃষি-বিপ্লবভিত্তিক পর্যায়ে আবদ্ধ থাকা। এই সমালোচনার পর সিপিআই-এর অভ্যন্তরে লাইন নিয়ে তীব্র মতবিরোধ ও বিভ্রান্তি তৈরি হয়। নেতৃত্বের মধ্যে ঐকমত্য ছিল না বিপ্লবের চরিত্র, সংগ্রামের রূপ (সশস্ত্র বিদ্রোহ, না গণসংগ্রাম), জাতীয় বুর্জোয়া ও নেহরু সরকারের প্রতি অবস্থান ইত্যাদি প্রশ্নে। প্রসঙ্গত ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টির জন্মলগ্ন থেকেই তার একটি সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের কর্মসূচী ছিল। এছাড়াও মার্কসবাদী অনুশীলন সমিতি ও ভগৎ সিংদের এইচএসআরএদের কর্মসূচীও সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবেরই ছিল।

আলোচ্য পরিস্থিতিতে সিপিআই কেন্দ্রীয় কমিটি সরাসরি স্তালিনের কাছে "পরামর্শ" চেয়ে প্রতিনিধিদল পাঠায়। প্রায় তিন ঘণ্টা ধরে চলা এই কথোপকথনে স্তালিন ভারতীয় বিপ্লবের চরিত্র, জাতীয় বুর্জোয়ার ভূমিকা, ভূমি জাতীয়করণের প্রশ্ন, সশস্ত্র সংগ্রাম বনাম গণআন্দোলনের কৌশল, এবং নেহরু সরকার সম্পর্কে সিপিআই-এর অবস্থান, এই সমস্ত বিষয়ে তার নির্দিষ্ট বক্তব্য পেশ করেন, যা পরবর্তীতে সিপিআই-এর নীতিনির্ধারণী দলিলে সরাসরি প্রতিফলিত হয়।

এই আলোচনায় স্তালিন নিজেই তার দ্বিস্তরীয় বিপ্লবের তত্ত্ব ব্যাখ্যা করেন। স্তালিন বলেন:

ভারতে আসন্ন বিপ্লব একটি বুর্জোয়া-গণতান্ত্রিক বিপ্লব... এটি সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব নয়।

তিনি আরও ব্যাখ্যা করেন যে প্রথম পর্যায়ের লক্ষ্য হবে "সামন্ত জমিদারতন্ত্রের" বিলোপ এবং ব্যক্তিগত কৃষক মালিকানা প্রতিষ্ঠা (যা অবশ্যই একটি গণতান্ত্রিক কর্তব্য এবং নিরন্তর বিপ্লবের তত্ত্ব অনুযায়ী একটি ক্রান্তিকালীন দাবি যা সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের কর্মসূচীর সাথেই যুক্ত)। কিন্তু স্তালিন সমাজতন্ত্রক একটি ভবিষ্যৎ "দ্বিতীয় পর্যায়ে" ঠেলে দেন। এটি ১৯২০ সালের কমিন্টার্নের অবস্থানের সম্পূর্ণ বিপরীত।

স্তালিন ভারতীয় কমিউনিস্টদের স্পষ্ট নির্দেশ দেন:

বড় পুঁজিপতিদের উৎপাদনের উপকরণ বাজেয়াপ্ত করার দাবি আমি সমর্থন করি না... যদি তোমাদের কর্মসূচিতে তা থাকে, তাহলে তা বাদ দিয়ে দাও… বিপ্লবের সমস্যাগুলি ধাপে ধাপে সমাধান করতে হয়... আজ একজন শত্রুকে পরাজিত করো, কাল অন্যজনকে।

তিনি যুক্তি দেন, জাতীয় বুর্জোয়াদের অধিকাংশকে প্রশমিত বা নিজের দিকে টেনে আনতে হবে, নইলে তারা শত্রু শিবিরে প্রবেশ করবে। এখানে মনে পড়ে যায় কমরেড ভগৎ সিংয়ের সেই মন্তব্য।

লালাজি বলছেন, আমাদের সমাজতান্ত্রিক ভাবধারার ফলে পুঁজিপতিরা সরকারের সাথে গিয়ে যুক্ত হবে। অসামান্য! তাহলে পূর্বে এরা কোথায় ছিল? কতজন পুঁজিপতি পরিবর্তনের অগ্রদূত হয়েছেন? বিপ্লবের সময় যারা তাদের স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তি ক্ষতিগ্রস্ত হবে মনে করে, তারাই বিপ্লবের বিরোধিতা করে। এরকম পরিস্থিতিতে তাদের (পুঁজিপতিদের) তুষ্টিবিধানের জন্য নিজের আদর্শকে ত্যাগ করা এবং আমাদের উদ্দেশ্যের ক্ষতিসাধন করা যথার্থ নয়। আরেকটি বিষয় হল কোন পরিস্থিতি তাদের মুনাফার অনুকূলে হবে তা নিয়েই পুঁজিপতিরা চিন্তিত থাকবে। [‘লাজপত রাই ও যুব সম্প্রদায়’ (১৯২৮), ভগৎ সিং নির্বাচিত রচনাবলী : একটি বামপন্থী শিক্ষার্থী-যুব সঙ্কলন, প্রকাশক: নয়া দিশা ]

এরপর ১৯৩৯ সালে ত্রৎস্কি তার ‘ভারতীয় শ্রমিকদের প্রতি খোলা চিঠি’তে একই ধরণের কথা বলেছেন। দ্রষ্টব্য, যে এই বক্তব্য প্রাক-অধঃপতন কমিন্টার্নের নীতির সাথে সম্পূর্ণরূপে সামঞ্জস্যপূর্ণ। উপরন্তু, ত্রৎস্কির বিরুদ্ধে যেই অভিযোগ তোলা হয় যে তিনি কৃষক সংগ্রামকে গুরুত্ব দিতেন না, তাও খণ্ডিত হয় এই লেখায়:

ভারতীয় বুর্জোয়া (পুঁজিপতিরা) বিপ্লবী সংগ্রাম পরিচালনা করতে পারে না। ব্রিটিশ পুঁজিবাদের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত ভারতীয় বুর্জোয়া তার নিজের সম্পত্তিনাশের ভয়ে সর্বদা শঙ্কিত। জনগণকে সকলের থেকে বেশি ভয় করে বলেই সে যে-কোনও মূল্যে কিনতে চায় সাম্রাজ্যবাদের শুভেচ্ছা। আর, উপর থেকে অর্থাৎ আইন পরিষদের ভিতর দিয়ে সংস্কারের মিথ্যা আশায় জনগণকে সে ভুলিয়ে রাখার চেষ্টা করে।

... ব্রিটেনের যথেচ্ছ শাসনের বিরুদ্ধে যদি ভারতীয় বুর্জোয়া সংগ্রামের সামান্যতম পথেও পা বাড়ায়, শ্রমিকরা স্বভাবতই তা সমর্থন করবে। কিন্তু তার নিজস্ব পদ্ধতিতেই, বলিষ্ঠ শ্লোগান তুলেই সমর্থন করবে। গণসমাবেশের মধ্য দিয়ে, ধর্মঘটের মারফত, মিছিল ডেকে এবং পরিস্থিতি আর শক্তিসমূহের পারস্পরিক সম্বন্ধ অনুযায়ী চরম সংগ্রামের প্রস্তুতির ভিতর দিয়ে সমর্থন করবে। এভাবে সমর্থন করার জন্য দরকার শ্রমিকের নিজস্ব সংগঠনের, প্রয়োজন বুর্জোয়া নেতৃত্ব থেকে বিচ্ছেদ। কেন না, সর্বাগ্রে তাকে বিপ্লবের অপরিহার্য শক্তি হিসাবে কৃষকদের উপর প্রভাব বিস্তার করতে হবে। কেবল শ্রমিক শ্রেণিই পারে একটি নির্ভীক আর বলিষ্ঠ কৃষক বিদ্রোহের কর্মসূচী উপস্থিত করতে, পারে লক্ষ লক্ষ কৃষককে জাগিয়ে তুলতে তাদের দেশি শোষক আর বিদেশি শাসকের বিরুদ্ধে। মজুর আর দরিদ্র চাষীর মৈত্রীই হচ্ছে একমাত্র সৎ, বিশ্বাসী আর নির্ভরযোগ্য মৈত্রী যা ভারতীয় বিপ্লবকে বিজয়ের পথে নিয়ে যেতে পারে। [লিয়ঁ ট্রটস্কি নির্বাচিত রচনাবলী (খণ্ড ১), নয়া আন্তর্জাতিক প্রকাশনী]

সুতরাং, জাতীয় ও ঔপনিবেশিক প্রশ্নে ১৯২০ সালের কমিন্টার্নের থিসিসগুলি স্পষ্টভাবে দেখায় যে বলশেভিক-লেনিনবাদী কৌশলের ভিত্তি ছিল প্রলেতারিয়েতের স্বাধীন নেতৃত্ব, শ্রেণিসমঝোতা নয়। পরবর্তীকালে স্তালিনবাদ এই অবস্থান থেকে সরে এসে দ্বিস্তরীয় বিপ্লব ও জাতীয় বুর্জোয়ার ওপর নির্ভরতার নীতি গ্রহণ করে। ফলে "সুনির্দিষ্ট পরিস্থিতির সুনির্দিষ্ট বিশ্লেষণ"-এর নামে যে তত্ত্ব আজ প্রচার করা হয়, তার সঙ্গে ১৯২০ সালের কমিন্টার্নের প্রকৃত অবস্থানের মৌলিক পার্থক্য অনস্বীকার্য।


#কমিন্টার্ন #উপনিবেশে_বিপ্লব #লেনিন #স্তালিনবাদ #মার্কসবাদ #ভারত #রাজনৈতিক_তত্ত্ব
Sankalpa

About the Author

Sankalpa

মজদুরের নিয়মিত লেখক

শিক্ষার্থী

বই পড়ি, প্রশ্ন করি, তর্ক করি। সাহিত্য, ইতিহাস আর রাজনীতি নিয়ে ভাবতে ভালোবাসি। বিশেষ করে সমাজকে তার অন্তর্নিহিত দ্বন্দ্ব, পরিবর্তন ও সম্ভাবনার মধ্য দিয়ে বোঝার চেষ্টা করি। জটিল বিষয়কে সহজ করে বোঝার চেয়ে, তাকে গভীরভাবে বোঝার চেষ্টাটাকেই বেশি মূল্য দিই।

প্রোফাইল দেখুন

মতামত

এখনও কোনো মতামত নেই।

প্রথম মতামতটি আপনিই দিন।

আলোচনায় অংশ নিতে লগ ইন করুন অথবা এ্যাকাউন্ট খুলুন

Reading

Font size

Auto scroll
Slow Fast