সকল লেখা জানতে চাই
Searching…

নিরন্তর বিপ্লব: উৎপত্তি ও প্রয়োগের প্রশ্ন

Sankalpa
Sankalpa মজদুরের নিয়মিত লেখক
পড়তে 8 মিনিট লাগতে পারে
এই লেখাটি 1 বার পড়েছে এ মাসে লেখকের লেখা 2 জন পাঠক পড়েছেন
নিরন্তর বিপ্লব: উৎপত্তি ও প্রয়োগের প্রশ্ন

বিশ শতকের সূচনায় এসে রুশ মার্কসবাদীরা একটি বিষয়ে মোটামুটি একমত ছিলেন: আসন্ন বিপ্লব হবে বুর্জোয়া-গণতান্ত্রিক বিপ্লব, যার লক্ষ্য হবে আধা-সামন্ততান্ত্রিক স্বৈরতন্ত্রকে উৎখাত করা এবং কৃষি সমস্যার সমাধান করা। কিন্তু এই বিপ্লবের নেতৃত্ব কোন শ্রেণি দেবে এবং বিপ্লবের পর কী ঘটবে, এই প্রশ্নে তাঁদের মধ্যে তীব্র মতপার্থক্য ছিল। সেখান থেকেই তিনটি অবস্থান গড়ে ওঠে: মেনশেভিক অবস্থান, লেনিনের অবস্থান এবং ত্রৎস্কির নিরন্তর বিপ্লবের তত্ত্ব।

মার্কস ও এঙ্গেলস ইতিমধ্যেই লক্ষ্য করেছিলেন যে ১৮৪৮ সালের জার্মান বুর্জোয়া শ্রেণি ইতিহাসের মঞ্চে এসেছিল "খুব দেরিতে"। বার্লিনের ব্যারিকেডে শ্রমিকদের বিজয়ে আতঙ্কিত হয়ে তারা বিপ্লব সম্পূর্ণ করার পরিবর্তে পুরনো ব্যবস্থার সঙ্গে জোট বেঁধেছিল। ১৮৫০ সালে কমিউনিস্ট লীগের উদ্দেশে দেওয়া মার্কসের ভাষণে বিপ্লবকে "নিরন্তর" করে তোলার আহ্বান জানানো হয়েছিল, যতক্ষণ না প্রলেতারিয়েত রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করছে। পরবর্তীতে এঙ্গেলসও ইঙ্গিত করেছিলেন যে, কোনো পশ্চাৎপদ দেশে যদি একটি পরিণত বিপ্লবী পার্টি থাকে, তাহলে সেই পার্টি ঐতিহাসিক পরিস্থিতির চাপে তার "স্বাভাবিক সময়ের" আগেই ক্ষমতা দখল করতে বাধ্য হতে পারে।

ত্রৎস্কি এই ইঙ্গিতগুলির ওপর ভিত্তি করে নিজের চিন্তা গড়ে তোলেন। তাঁর "সম্মিলিত ও অসম বিকাশ"-এর ধারণা এই চিন্তার একটি কাঠামোগত ভিত্তি তৈরি করে। দেরিতে বিকশিত পুঁজিবাদী দেশগুলি আগের দেশগুলির ইতিহাসকে হুবহু পুনরাবৃত্তি করে না। তারা সবচেয়ে উন্নত প্রযুক্তি আমদানি করে এবং মধ্যবর্তী কয়েকটি পর্যায় অতিক্রম করে যেতে পারে।

ত্রৎস্কির তত্ত্ব

১৯০৫ সালের বিপ্লবের সময় ত্রৎস্কি তাঁর ধারণাগুলি বিকশিত করেন। সেই সময় তিনি সেন্ট পিটার্সবুর্গ সোভিয়েতের সভাপতি ছিলেন। তাঁর যুক্তি ছিল মোটামুটি এইরকম:

  • রুশ শিল্প ছিল বিদেশি পুঁজিনির্ভর, অত্যন্ত কেন্দ্রীভূত এবং স্বৈরতান্ত্রিক রাষ্ট্রের পৃষ্ঠপোষকতায় গড়ে ওঠা। ফলে বুর্জোয়া শ্রেণি কোনো রাজনৈতিক সংগ্রামের মধ্য দিয়ে ক্ষমতা অর্জন না করেই অর্থনৈতিক আধিপত্য লাভ করেছিল। একই সঙ্গে তার পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা বৃহৎ প্রলেতারিয়েতকে সে ৎসারের তুলনায় বেশি ভয় করত।

  • কৃষকসমাজ ছিল ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা এবং অভ্যন্তরীণভাবে বিভক্ত। তারা লড়াই করতে জানলেও নিজেরা নেতৃত্ব দিতে অক্ষম ছিল। এই ঐতিহাসিক দায়িত্ব পূরণ করতে পারে একমাত্র প্রলেতারীয় শ্রেণি।

  • শ্রমিকদের সরকার ন্যূনতম কর্মসূচির মধ্যে নিজেকে আটকে রাখতে পারে না। আট ঘণ্টা কর্মদিবসের দাবিতে সংগ্রামের অভিজ্ঞতাই এর কারণ দেখায়: মালিকরা যদি লক-আউট দিয়ে পাল্টা জবাব দেয়, তাহলে শ্রমিকরা রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ এবং কারখানা পুনরায় খুলে দেওয়ার দাবি করবে; আর সেটিই "সমাজতন্ত্রের দিকে যাওয়ার পথ"। ক্ষমতায় থাকা প্রলেতারিয়েত কারখানার দরজার বাইরে এক ধরনের শাসন মেনে নিয়ে ভেতরে মালিকের কর্তৃত্ব মেনে নিতে রাজি হবে না।

  • এই ধরনের একটি সরকার শুরুতে কৃষকদের সমর্থন ধরে রাখতে পারে জমির পুনর্বন্টনের মতন গণতান্ত্রিক কর্তব্য পূরণের মাধ্যমে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে তার শ্রেণিগত নীতি এই সামাজিক ভিত্তিকে সংকুচিত করবে।

  • একটি পশ্চাৎপদ দেশে বিচ্ছিন্ন অবস্থায় এই রাষ্ট্র টিকে থাকতে পারবে না; বিপ্লবকে উন্নত দেশগুলিতে ছড়িয়ে পড়তে হবে। সমাজতন্ত্র সম্পূর্ণ হতে পারে কেবল আন্তর্জাতিক স্তরে।

অতএব ত্রৎস্কির মতে, পশ্চাৎপদ দেশগুলির গণতান্ত্রিক কর্তব্যগুলি সম্পন্ন করা সম্ভব কেবল প্রলেতারীয় একনায়কত্বের মধ্য দিয়ে। আর সেই প্রলেতারীয় শাসন পরবর্তীতে সমাজতান্ত্রিক পদক্ষেপের দিকে অগ্রসর হবে।

লেনিনের প্রাথমিক দ্বিমত

লেনিনও মনে করতেন যে উদারপন্থী বুর্জোয়া শ্রেণি প্রতিবিপ্লবী এবং তিনিও বিপ্লবের নেতৃত্ব প্রলেতারিয়েতের হাতে দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তাঁর প্রস্তাব ছিল "প্রলেতারিয়েত ও কৃষকের বিপ্লবী-গণতান্ত্রিক একনায়কত্ব"। তাঁর যুক্তি ছিল:

  • কৃষকরাই হবে প্রধান মিত্র এবং কেন্দ্রীয় কাজ হবে জমির পুনর্বণ্টন। এর ফলে পুঁজিবাদ শক্তিশালী হবে এবং একটি রক্ষণশীল কৃষক-মালিক শ্রেণি গড়ে উঠবে।

  • সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটদের সাময়িক সরকারে যোগ দেওয়া উচিত, কিন্তু নিজেদের ন্যূনতম কর্মসূচির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকা উচিত। সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা "অসম্ভব", এবং কৃষক সংখ্যাগরিষ্ঠতার পরিস্থিতিতে সমাজতন্ত্রের দিকে এগোনোর চেষ্টা হবে "অসঙ্গত"।

  • সরকারের কাজ হবে একটি গণপরিষদ আহ্বান করা এবং একটি বুর্জোয়া-গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা। সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব আসবে কয়েক দশক পরে, এবং তার আগে পশ্চিমে বিপ্লব ঘটতে হবে।

লেনিনের এই সূত্রটি ইচ্ছাকৃতভাবেই অনির্দিষ্ট ছিল; বিপ্লবের পর কোন শ্রেণি রাষ্ট্রক্ষমতায় চূড়ান্ত আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করবে, তা তিনি আগে থেকে নির্ধারণ করে দেননি। ত্রৎস্কির সাথে অবশ্য অনেক বিষয়ে ঐকমত্য ছিল: বুর্জোয়া শ্রেণির ভূমিকা সম্পর্কে তাঁদের একই ধরনের ধারণা ছিল, তাঁরা উভয়েই প্রলেতারীয় নেতৃত্বের পক্ষে ছিলেন, কৃষকদের শহরের ওপর নির্ভরশীল মনে করতেন এবং পশ্চিমে বিপ্লবের প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করতেন। পার্থক্য ছিল বিপ্লব-পরবর্তী রাষ্ট্রের শ্রেণিগত চরিত্র এবং রাশিয়া প্রথমে সমাজতান্ত্রিক রূপান্তরের সূচনা করতে পারবে কি না এই প্রশ্নে।

পরবর্তীতে স্তালিন ত্রৎস্কির অবস্থানকে বিকৃত করে দাবি করেন যে তিনি কৃষকদের উপেক্ষা করেছিলেন। কিন্তু ১৯০৫ সালেই তাঁর তত্ত্বে কৃষকদের সমর্থন ছিল অপরিহার্য, যদিও কৃষক ও প্রলেতারিয়েতের অবস্থানকে সমান বলে দেখানো হয়নি।

১৯১৭

ফেব্রুয়ারি বিপ্লব ছিল স্বতঃস্ফূর্ত এবং মূলত শহরকেন্দ্রিক। সোভিয়েতগুলির হাতে বাস্তব ক্ষমতা ছিল, কিন্তু তারা সেই ক্ষমতা বুর্জোয়া সাময়িক সরকারের হাতে তুলে দেয়। সাময়িক সরকার যুদ্ধ চালিয়ে যায় এবং জমি বা রুটি, কোন সমস্যারই সমাধান দিতে পারেনি। লেনিন পরবর্তীতে এই দুই পর্যায়ের মধ্যে তীব্র পার্থক্য তুলে ধরেছিলেন: সাময়িক সরকারের গণতন্ত্রীরা আট মাসেও রাজতন্ত্রের অবশেষকে সম্পূর্ণ নির্মূল করতে পারেনি, অথচ বলশেভিকরা "কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই" জমিদারদের জমি থেকে উৎখাত করেছিল।

পেত্রোগ্রাদের বলশেভিক নেতৃত্ব এক দশক ধরে বিপ্লবী-গণতান্ত্রিক একনায়কত্বের সূত্রে শিক্ষিত হওয়ায় মেনশেভিক ও এসআরদের অনুসরণ করতে থাকে। কামেনেভ লেনিনের এপ্রিল থিসিস প্রত্যাখ্যান করেছিলেন, কারণ তাঁর মতে সেই থিসিস ধরে নিচ্ছে যে বুর্জোয়া বিপ্লব ইতিমধ্যেই সম্পূর্ণ হয়েছে এবং সেটিকে "তাৎক্ষণিকভাবে" সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবে রূপান্তর করার কথা বলছে।

এরপর লেনিন তাঁর পুরনো সূত্র পরিত্যাগ করেন। তিনি সেটিকে "মৃত" এবং "সেকেলে" বলে অভিহিত করেন এবং যারা তাকে আঁকড়ে ধরে ছিলেন, সেই "পুরনো বলশেভিকদের" এমন অবশেষ হিসেবে দেখান, যাদের স্থান ইতিহাসের আর্কাইভে। তাঁর যুক্তি ছিল, সমাজতন্ত্রের দিকে "প্রথম সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ" শুরু করতে হলে সোভিয়েতগুলিকে ক্ষমতা নিতে হবে। কৃষি সমস্যার সমাধানও সম্ভব কেবল এমন একটি প্রলেতারীয় রাষ্ট্রের মাধ্যমে, যা বন্ধক রাখা জমির ওপর নিয়ন্ত্রণকারী ব্যাংকগুলিকে পরাস্ত করতে সক্ষম।

এরপর লেনিন ধারাবাহিকভাবে অক্টোবরকে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব এবং নতুন রাষ্ট্রকে প্রলেতারিয়েতের একনায়কত্ব হিসেবে অভিহিত করেন। এটাই নিরন্তর বিপ্লবের তত্ত্বটির যথার্থতা প্রমাণ করে। শেষ পর্যন্ত বুর্জোয়া-গণতান্ত্রিক কাজগুলি প্রলেতারীয় শাসনের অধীনেই সম্পন্ন হয়েছিল। লেনিনের নিজের পরবর্তী মূল্যায়নে, যা তিনি ১৯২১ সালে লিখেছিলেন, এই সম্পর্কটিকে তিনি কীভাবে বুঝতে শুরু করেছিলেন তার সবচেয়ে স্পষ্ট ব্যাখ্যা পাওয়া যায়। বিপ্লবের বুর্জোয়া-গণতান্ত্রিক কর্তব্যগুলি, যেমন রাজতন্ত্রের উচ্ছেদ, সামাজিক এস্টেটভিত্তিক ব্যবস্থা ও সামন্ততান্ত্রিক ভূমিমালিকানার উচ্ছেদ, নারীর অধীনতা দূর করা এবং জাতীয় নিপীড়নের অবসান, বিপ্লবের সমাজতান্ত্রিক কার্যকলাপেরই "পাশাপাশি, একটি 'উপজাত ফল' হিসেবে" সম্পন্ন হয়েছিল। এই দুই বিপ্লবের মধ্যে কোনো "চীনের প্রাচীর" ছিল না: "প্রথমটি দ্বিতীয়টিতে বিকশিত হয়। দ্বিতীয়টি, তার অগ্রগতির পথে, প্রথমটির সমস্যাগুলির সমাধান করে।"

উপসংহার

নিরন্তর বিপ্লবের মূল বক্তব্য হল: যেসব দেশে পুঁজিবাদ দেরিতে বিকশিত হয়েছে, সেখানে ভীরু ও দুর্বল বুর্জোয়া শ্রেণির পক্ষে গণতান্ত্রিক কর্তব্যগুলি সম্পূর্ণ করা সম্ভব নয়। তাই কেবল প্রলেতারীয় নেতৃত্বাধীন একটি শাসনই সেই কাজগুলি সম্পন্ন করতে পারে। কিন্তু সেই শাসনকে এরপর পুঁজিবাদের সীমা অতিক্রম করে এগোতে হবে এবং টিকে থাকার জন্য বিশ্ববিপ্লবের দিকে তাকাতে হবে। ১৯১৭ সালের রাশিয়া ও তৎপরবর্তী সকল বিপ্লব ও প্রতিবিপ্লবের অভিজ্ঞতা এই ব্যাখ্যাকে সমর্থন করে।


Sankalpa

About the Author

Sankalpa

মজদুরের নিয়মিত লেখক

শিক্ষার্থী

বই পড়ি, প্রশ্ন করি, তর্ক করি। সাহিত্য, ইতিহাস আর রাজনীতি নিয়ে ভাবতে ভালোবাসি। বিশেষ করে সমাজকে তার অন্তর্নিহিত দ্বন্দ্ব, পরিবর্তন ও সম্ভাবনার মধ্য দিয়ে বোঝার চেষ্টা করি। জটিল বিষয়কে সহজ করে বোঝার চেয়ে, তাকে গভীরভাবে বোঝার চেষ্টাটাকেই বেশি মূল্য দিই।

প্রোফাইল দেখুন

মতামত

এখনও কোনো মতামত নেই।

প্রথম মতামতটি আপনিই দিন।

আলোচনায় অংশ নিতে লগ ইন করুন অথবা এ্যাকাউন্ট খুলুন

Reading

Font size

Auto scroll
Slow Fast