## বাংলাদেশে নব্য-বিপ্লবী শক্তি: অটো-রিকশা শ্রমিক
## ভূমিকা
আধুনিক বাংলাদেশের মেগাসিটি থেকে শুরু করে মফস্বল শহর কিংবা সুদূর গ্রামাঞ্চলের ধূলিধূসর পথ—সর্বত্র আজ যে নামটি এক অবিচ্ছেদ্য এবং অবধারিত বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে, তা হলো 'অটোরিকশা'। কায়িক শ্রমের যান্ত্রিক বিবর্তন এবং পুঁজিবাদী অর্থনীতির তীব্র সংকটের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের শ্রমবাজারে জন্ম নিয়েছে এক নতুন ও বিশাল সামাজিক শক্তি। শহুরে মধ্যবিত্তের চোখে যারা কেবল 'যানজটের কারণ' কিংবা গ্রামীণ অর্থনীতির ভাঙন থেকে শহরে আশ্রয় নেওয়া প্রান্তিক মানুষ, মার্ক্সীয় রাজনৈতিক অর্থনীতির গভীর বিশ্লেষণে তারা কেবল সাধারণ চালক নন; তারা বর্তমান বাংলাদেশের উৎপাদন সম্পর্কের এক নতুন চালিকাশক্তি—এক **নব্য-বিপ্লবী প্রলেতারিয়েত শ্রেণি**।
নব্বইয়ের দশকের মুক্তবাজার অর্থনীতির আগ্রাসন, গ্রামীণ কুটিরশিল্পের ধ্বংস, কৃষির বাণিজ্যিকীকরণ এবং সর্বোপরি কর্মসংস্থানের চরম সংকটের ফলশ্রুতিতে বাংলাদেশের কোটি কোটি বেকার যুবকের শেষ আশ্রয়স্থল হয়ে উঠেছে এই ব্যাটারিচালিত ও গ্যাসচালিত অটোরিকশার সেক্টর। রাষ্ট্র যখন নাগরিকদের অন্ন, বস্ত্র ও কর্মসংস্থানের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে, তখন এই মানুষগুলো নিজেদের উদ্যোগে, ক্ষুদ্র ঋণের ফাঁদে পা দিয়ে কিংবা সহায়-সম্পত্তি বিক্রি করে এই মরণপণ পেশায় লিপ্ত হয়েছে। অথচ বুর্জোয়া রাষ্ট্রযন্ত্র, নীতিপ্রণেতা এবং শহুরে অভিজাত শ্রেণী এই বিশাল কর্মীবাহিনীকে বরাবরই অপরাধী বা পরগাছা হিসেবে চিহ্নিত করার এক সুদূরপ্রসারী কুৎসিত খেলায় মেতে উঠেছে।
তাদের ওপর চলছে বহুমুখী শোষণ—কখনও গ্যারেজ মালিকের মাধ্যমে, কখনও ক্ষমতাসীন দলের লেজুড়বৃত্তিক শ্রমিক সংগঠনের চাঁদাবাজিতে, আবার কখনও ট্রাফিক পুলিশ ও স্থানীয় মাস্তানদের প্রতিদিনের টোল আদায়ে। এই রচনায় আমরা মার্ক্সবাদী দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করব কীভাবে এই শ্রমজীবীরা বাংলাদেশের সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক পটভূমিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে এবং কীভাবে তাদের সঠিক শ্রেণিচেতনার মাধ্যমে একটি বিপ্লবী শক্তিতে রূপান্তরিত করা সম্ভব।
## ১. বাংলাদেশে এই শ্রেণির উদ্ভব
বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল রাষ্ট্রে 'নব্য-প্রলেতারিয়েত' বা নতুন শ্রমিক শ্রেণীর বিকাশ কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়, বরং এটি দীর্ঘমেয়াদী পুঁজিবাদী শোষণ ও সাম্রাজ্যবাদী নীতির অনিবার্য পরিণতি। আশির ও নব্বইয়ের দশকে বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ-এর কাঠামোগত সংস্কার কর্মসূচির (SAP) ধাক্কায় বাংলাদেশের গ্রামীণ অর্থনীতি ভেঙে পড়তে শুরু করে। কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্যের অভাব, সার-বীজের লাগামছাড়া দাম এবং কৃষিকে করপোরেট পুঁজিমালিকদের হাতে তুলে দেওয়ার চক্রান্তের কারণে লাখ লাখ কৃষক ভূমিহীন হয়ে পড়ে।
এই ভূমিহারা ও কর্মহীন গ্রামীণ যুবসমাজ যখন বাঁচার তাগিদে শহরমুখী হলো, তখন তারা দেখল জাতীয় শিল্পায়ন বলতে যা বোঝায় তা এ দেশে গড়ে ওঠেনি। দুর্নীতিগ্রস্ত রাষ্ট্রায়ত্ত কলকারখানাগুলো একে একে বন্ধ বা বেসরকারিকরণ করা হয়েছে। ফলে তৈরি হলো এক বিরাট শূন্যতা। এই শূন্যস্থান পূরণ করতে আসলো অনানুষ্ঠানিক খাত (Informal Sector)। শুরুতে প্যাডেলচালিত রিকশা এই শূন্যতা কিছুটা সামাল দিলেও, একবিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে প্রযুক্তির ছোঁয়া এবং কম খরচে যাতায়াতের তাগিদে বাজারে প্রবেশ করে ব্যাটারিচালিত ও মোটরচালিত অটোরিকশা।
অটোরিকশা চালক শ্রেণীটি কেবল একটি পরিবহন চালকদের দল নয়; এটি মূলত বাংলাদেশের গ্রামীণ পেটি-বুর্জোয়া সমাজ ও প্রান্তিক কৃষকদের দেউলিয়াত্বের একটি জীবন্ত দলিল। যারা গতকাল পর্যন্ত গ্রামে দুমুঠো ভাতের জন্য হাহাকার করত, আজ তারা শহুরে পিচঢালা সড়কে কিংবা গ্রামীণ ধুলায় ব্যাটারিচালিত রিকশার হ্যান্ডেল ধরে জীবনের সাথে যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে। রাষ্ট্র এদের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক কর্মসংস্থান দিতে পারেনি, দিতে পারেনি কোনো সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী। ফলে নিজের পুঁজি বলতে কেবল ঘাম আর শরীর সম্বল করে এই বিপুল জনগোষ্ঠী নিজেদের অজান্তেই বাংলাদেশের অর্থনীতি ও রাজনীতির এক শক্তিশালী চালিকাশক্তিতে পরিণত হয়েছে।
## ২. জনগণের দৃষ্টিভঙ্গি
বাংলাদেশের উনাসিক শহুরে মধ্যবিত্ত এবং উচ্চবিত্ত শ্রেণীর চোখে অটোরিকশা চালকদের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি সবসময়ই অবজ্ঞাপূর্ণ, দ্বিমুখী এবং নিষ্ঠুর। বুর্জোয়া গণমাধ্যম এবং ট্রাফিক পুলিশের অপপ্রচারের কারণে সাধারণ মানুষের মনে এই ধারণা গেঁথে দেওয়া হয়েছে যে, এই চালকরাই দেশের সমস্ত যানজট, বিশৃঙ্খলা এবং দুর্ঘটনার মূল উৎস। ব্যক্তিগত গাড়ির শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কাঁচের আড়ালে বসে থাকা অভিজাত সমাজ ভুলে যায় যে, যে রাষ্ট্রে গণপরিবহন ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছে, যেখানে ট্রেন বা বাসে মানুষের বাদুড়ঝোলা হয়ে যাতায়াত করতে হয়, সেখানে লাখ লাখ সাধারণ মানুষের কর্মস্থলে পৌঁছানোর একমাত্র স্বস্তিদায়ক ও সুলভ মাধ্যম হলো এই অটোরিকশা।
জনগণের একটি বড় অংশ এদেরকে 'অশিক্ষিত', 'উচ্ছৃঙ্খল' এবং 'আইন অমান্যকারী' হিসেবে দেখতে ভালোবাসে। কিন্তু তারা কখনো খতিয়ে দেখে না এই বিশৃঙ্খলার নেপথ্যে কোন শক্তি কাজ করছে। কোন নিয়মে একটি গাড়ি রাস্তায় নামবে, কোথায় তার গ্যারেজ হবে, আর ট্রাফিক পুলিশের কত টাকা চাঁদা দিতে হবে—এর প্রতিটি ছক তৈরি করে ক্ষমতাশালীরা। চালকরা কেবল সেই শোষণের যাঁতাকলে পিষ্ট হওয়া বাধ্যগত বলির পাঁঠা।
এই নেতিবাচক জনমতের কারণে সমাজে অটোরিকশা চালকদের কোনো সামাজিক মর্যাদা বা আত্মমর্যাদা অবশিষ্ট থাকে না। রাস্তায় সামান্য একটু ধাক্কা লাগলে পথচারী বা প্রাইভেট কারের মালিকরা যেভাবে তাদের ওপর চড়াও হয়, তা প্রমাণ করে যে বুর্জোয়া সমাজে শ্রমজীবী মানুষের জীবনের মূল্য কতটুকু তুচ্ছ। এই ক্রমাগত অপমান ও সামাজিক অবমূল্যায়ন চালকদের মনস্তত্ত্বে এক গভীর ক্ষত তৈরি করে, যা তাদের ব্যক্তিত্বের স্বাভাবিক বিকাশকে অবরুদ্ধ করে দেয়।
## ৩. তাদের ওপর শোষণের কৌশল
অটোরিকশা শ্রমিকদের ওপর শোষণের জাল এত সূক্ষ্ম এবং বহুমুখী যে, সাধারণ চোখে তা ধরা পড়ে না। এর পেছনে কাজ করছে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট ও পুঁজিবাদী শোষণযন্ত্র। শোষণের এই কৌশলগুলোকে কয়েকটি স্পষ্ট স্তরে ভাগ করা যায়:
* **গ্যারেজ মালিক ও মহাজনী শোষণ:** বেশিরভাগ চালকেরই নিজস্ব অটোরিকশা কেনার সামর্থ্য নেই। তাদের প্রতিদিনের আয়ের একটি বড় অংশ চলে যায় গ্যারেজ মালিকদের পকেটে 'জমা' বা ভাড়ার নামে। ব্যাটারি চার্জ দেওয়া, রিকশার রক্ষণাবেক্ষণ এবং প্রতিদিনের নির্দিষ্ট ভাড়া মেটাতে গিয়ে চালককে রোদে পুড়ে বৃষ্টিতে ভিজে ১৫ থেকে ১৮ ঘণ্টা খাটতে হয়।
* **চাঁদাবাজির বহুমুখী জাল:** সড়ক থেকে শুরু করে গ্যারেজ পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে রয়েছে চাঁদাবাজির দৌরাত্ম্য। স্থানীয় রাজনৈতিক দলের ক্যাডার, তথাকথিত শ্রমিক সংগঠনের ভুঁইফোড় নেতা এবং ট্রাফিক পুলিশ—সবাই মিলে এই অসহায় শ্রমিকদের রক্ত চুষে খায়। সকালবেলা গাড়ি বের করার সময়ই টোকেন বা চাঁদার নামে তাদের উপার্জনের একটা অংশ কেড়ে নেওয়া হয়।
* **আইনগত ও প্রাতিষ্ঠানিক শোষণ:** রাষ্ট্র কখনো অটোরিকশাকে বৈধ বাহন হিসেবে স্বীকৃতি দেয় না, আবার এর চলাচল সম্পূর্ণ নিষিদ্ধও করে না। এই আইনি ধূসর অবস্থাকে কাজে লাগিয়ে পুলিশ প্রশাসন ও স্থানীয় প্রশাসন প্রতিনিয়ত তাদের কাছ থেকে ঘুষ আদায় করে। গাড়ি আটকে জরিমানা বা আটকের ভয় দেখিয়ে এই প্রাতিষ্ঠানিক চাঁদাবাজি তাদের পঙ্গু করে দেয়।
## ৪. সামাজিক অবস্থা
### সমাজে মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি
সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির দিক থেকে অটোরিকশা চালকদের অবস্থান সমাজের একদম তলানিতে। প্রথাগত সমাজব্যবস্থায় মানুষের মর্যাদা নির্ধারিত হয় তার ব্যাংক ব্যালেন্স, পদমর্যাদা এবং পেশার ওপর। যেহেতু এই পেশায় কোনো হোয়াইট-কলার বা বুদ্ধিবৃত্তিক তকমা নেই, তাই সমাজের তথাকথিত ভদ্রসমাজ এদেরকে অবহেলার চোখে দেখে। বিয়েশাদি, সামাজিক অনুষ্ঠান কিংবা পারিবারিক পরিসরে তাদের অবস্থান সবসময়ই প্রান্তিক। তাদের সন্তানরা স্কুলে গেলে অন্য শিশুদের অভিভাবক বা শিক্ষকদের বৈষম্যের শিকার হয়, যা তাদের পুরো পরিবারকে একটি মানসিক বিচ্ছিন্নতার মধ্যে ঠেলে দেয়।
### সমাজে তাদের আত্মমর্যাদা
আত্মমর্যাদা হলো মানুষের এমন এক মনস্তাত্ত্বিক অধিকার, যা তাকে মাথা উঁচু করে বাঁচতে শেখায়। কিন্তু অটোরিকশা চালকদের ক্ষেত্রে এই আত্মমর্যাদাবোধ প্রতিদিন ভূলুণ্ঠিত হয়। ট্রাফিক পুলিশের একটি ধমক, যাত্রীর সাথে ভাড়া নিয়ে সামান্য কথা কাটাকাটি, কিংবা স্থানীয় মাস্তানের গায়ে হাত তোলার ঘটনা তাদের আত্মসম্মানকে ধূলিসাৎ করে দেয়। পরিবার ও সমাজে নিজেকে সবসময় 'ছোট' বা 'নিচুতলার' মানুষ হিসেবে ভাবতে বাধ্য হওয়ার কারণে তাদের ভেতরে এক ধরনের দীর্ঘস্থায়ী হীনম্মন্যতা তৈরি হয়।
### সমাজে তাদের ব্যক্তিত্বের পতন
মার্ক্সবাদী মনস্তত্ত্বে শ্রমিকের ব্যক্তিত্বের বিকাশ ঘটে তার সৃজনশীল কাজের মাধ্যমে। কিন্তু যখন কোনো মানুষকে পেটের দায়ে প্রতিদিন ১৮ ঘণ্টা একটি ধাতব কাঠামোর ওপর বসে থেকে যান্ত্রিকভাবে পথ চলতে হয়, তখন তার মানবিক সত্তা হারিয়ে যেতে থাকে। অতিরিক্ত ক্লান্তি, পুষ্টিকর খাবারের অভাব, বিশ্রামহীন জীবন এবং প্রতিনিয়ত অপমানিত হওয়ার গ্লানি তাদের ব্যক্তিত্বে এক ধরনের অবক্ষয় ডেকে আনে। এই মানসিক চাপ থেকে মুক্তির জন্য অনেকে মাদকাসক্ত হয়ে পড়ে বা পারিবারিক সহিংসতায় জড়িয়ে পড়ে, যা তাদের ব্যক্তিত্বের চূড়ান্ত পতনকে ত্বরান্বিত করে।
## ৫. অর্থনৈতিক অবস্থা
### তাদের কোন শ্রেণীতে ফেলা যায়?
মার্ক্সবাদী রাজনৈতিক অর্থনীতির সুনির্দিষ্ট কাঠামোর আলোকেও এদের শ্রেণীগত অবস্থান অত্যন্ত স্পষ্ট। এদেরকে **'নিম্ন-নিম্নবিত্ত' (Lumpenproletariat বা প্রান্তিক প্রলেতারিয়েত ও আংশিক পেটি-বুর্জোয়া)** শ্রেণীতে ফেলা যায়। কারখানার শ্রমিকদের মতো এরা সরাসরি কোনো বৃহৎ উৎপাদনের সাথে যুক্ত নয়, আবার বুর্জোয়াদের মতো উৎপাদনের উপায়ের (Means of Production) মালিকও নয়। এদের নিজস্ব কোনো গাড়ি নেই; গ্যারেজ মালিক বা মহাজন হলো পুঁজির মালিক, আর চালক হলো কেবল তার শ্রমশক্তি বিক্রয়কারী এক আধুনিক কুলি। তবে তাদের মাঝে একটি নিজস্ব স্বাধীন পেশার মোহ বা ক্ষুদ্র পুঁজির মালিক হওয়ার সুপ্ত বাসনা থাকে, যা তাদের পেটি-বুর্জোয়া মানসিকতার সাথে যুক্ত করে।
### তাদের দৈনিক আয়ের স্বল্পতা
মুক্তবাজার অর্থনীতির এই চরম মুদ্রাস্ফীতির বাজারে অটোরিকশা চালকদের দৈনিক আয় সমুদ্রের মাঝে এক ফোঁটা জলের মতো। সারাদিন হাড়ভাঙা পরিশ্রমের পর গ্যারেজের ভাড়া, ব্যাটারি চার্জ খরচ এবং চাদার টাকা মিটিয়ে চালকের হাতে যা থাকে, তা দিয়ে বর্তমান বাজারদরে পরিবারের তিন বেলা অন্নসংস্থান করা অসম্ভব। চাল-ডাল-তেল-লবণের অগ্নিমূল্যের বাজারে তাদের এই দৈনিক মজুরি তাদের কেবল বেঁচে থাকার লড়াইয়ে টিকিয়ে রাখে, সঞ্চয় বা ভবিষ্যতের কোনো সুরক্ষা নিশ্চিত করতে পারে না।
### জরুরি ভিত্তিতে ধার-দেনা ও মহাজনী ঋণ
দৈনিক আয়ের এই স্বল্পতার কারণে তাদের জীবনে কোনো আপৎকালীন বা জরুরি তহবিল থাকে না। পরিবারের কারো মারাত্মক অসুস্থতা, দুর্ঘটনা বা কোনো সামাজিক আনুষ্ঠানিকতার খরচ মেটাতে গিয়ে তাদের দ্বারস্থ হতে হয় স্থানীয় মহাজন, চড়া সুদের কারবারি কিংবা বিভিন্ন এনজিওর কাছে। একবার এই মহাজনী ঋণের জালে জড়িয়ে পড়লে তা থেকে বের হওয়া আর সম্ভব হয় না। এক ঋণ শোধ করতে গিয়ে আরেকটি ঋণ নিতে হয়, যা তাদের চিরস্থায়ী ঋণের এক অন্তহীন চক্রে বন্দি করে রাখে।
## ৬. রাজনৈতিক অবস্থা
### তাদের পেটি-বুর্জোয়া মানসিকতা
অটোরিকশা চালকদের রাজনৈতিক চরিত্রের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো তাদের পেটি-বুর্জোয়া মানসিকতা। এরা সম্মিলিতভাবে প্রলেতারিয়েত হওয়া সত্ত্বেও ব্যক্তিগতভাবে প্রত্যেকে একটি 'স্বাধীন মালিক' হওয়ার স্বপ্ন দেখে। তাদের আজীবনের সুপ্ত বাসনা থাকে—কখনও ব্যাংক ঋণ বা ধার করে নিজের একটি অটোরিকশা কেনা হবে। এই ব্যক্তিগত মালিকানার মোহ তাদের মাঝে সংহতি গড়ে উঠতে দেয় না। তারা নিজেদেরকে সামগ্রিক শ্রমিক শ্রেণীর অংশ না ভেবে একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী বা প্রতিযোগী হিসেবে দেখতে শুরু করে।
### আদর্শ সুসংহত করার প্রতিবন্ধকতা
তাদের মাঝে বিপ্লবী রাজনৈতিক আদর্শ সুসংহত করার পথে রয়েছে পাহাড়সম প্রতিবন্ধকতা। প্রথমত, দিনভর পেটের টানে খাটতে গিয়ে তাদের রাজনৈতিক চিন্তা বা পড়াশোনার কোনো সময় বা সুযোগ থাকে না। দ্বিতীয়ত, বুর্জোয়া রাজনৈতিক দলগুলো সবসময় শ্রমিকদের বিভক্ত করে রাখতে নানা ফন্দিফিকির আঁটে। ক্ষমতাসীন দলগুলো তাদের নিজস্ব শ্রমিক সংগঠন বা ফ্রন্টের নামে এই চালকদের ব্যবহার করে নিজেদের রাজনৈতিক ফায়দা হাসিল করে, কিন্তু শ্রমিকদের মৌলিক অধিকার রক্ষার বেলায় সম্পূর্ণ উদাসীন থাকে।
### মার্ক্সবাদী দৃষ্টিকোণে তাদের রাজনৈতিক চরিত্র বিশ্লেষণ
মার্ক্সবাদের আলোকে বিচার করলে দেখা যায়, অটোরিকশা চালকরা হলো শহুরে প্রলেতারিয়েত আন্দোলনের এক সম্ভাবনাময় বিস্ফোরক উপাদান। যদিও বর্তমানে তাদের মধ্যে পেটি-বুর্জোয়া মোহ এবং লুম্পেনসুলভ বিচ্ছিন্নতা কাজ করছে, তবুও যখনই বুর্জোয়া রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রত্যক্ষ শোষণ, পুলিশের নির্মম নির্যাতন এবং চাঁদাবাজির জাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে তাদের পিঠ দেয়ালে ঠেকে যায়, তখনই তারা স্বতঃস্ফূর্ত বিদ্রোহের জন্ম দেয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশের বিভিন্ন শহরে অটোরিকশা চালকদের স্বতঃস্ফূর্ত সড়ক অবরোধ ও বিক্ষোভ তারই প্রমাণ দেয়। সঠিক মার্ক্সবাদী-লেনিনবাদী দিশা এবং সংগঠিত নেতৃত্ব পেলে এই বিশাল শক্তি বুর্জোয়া ব্যবস্থার ভিত কাঁপিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে।
## ৭. তাদের মাঝে সংগঠন করা
### তাদের মাঝে সংগঠন করার কৌশল
অটোরিকশা চালকদের বিক্ষিপ্ত ও বিচ্ছিন্ন শক্তিকে একটি সুসংহত রাজনৈতিক শক্তিতে রূপান্তর করতে হলে গতানুগতিক ট্রেড ইউনিয়ন রাজনীতির বাইরে এসে নতুন কৌশল অবলম্বন করতে হবে। তাদের কর্মক্ষেত্র যেহেতু নির্দিষ্ট কোনো কারখানা বা মিল নয়, বরং খোলা সড়ক এবং গ্যারেজ, তাই তাদের সংগঠিত করার কাজটিও হতে হবে নমনীয় এবং বহুমুখী। গ্যারেজভিত্তিক ছোট ছোট কমিটি এবং রুটভিত্তিক সমবায় সমিতি গঠনের মাধ্যমে তাদের সাথে নিবিড় সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে। তাদের দৈনন্দিন অর্থনৈতিক দাবি—যেমন চাঁদাবাজি বন্ধ, নির্দিষ্ট রুট পারমিট, পুলিশের হয়রানি ও হয়রানিমূলক জরিমানা রোধ—কে ইস্যু বানিয়ে আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে।
### প্রচার কৌশল
তাত্ত্বিক লিফলেট বা ভারী মার্ক্সবাদী পরিভাষায় রচিত পোস্টার এই খেটে খাওয়া মানুষের কাছে পৌঁছানো সম্ভব নয়। প্রচার কৌশল হতে হবে অত্যন্ত সহজ, বোধগম্য এবং তাদের জীবনের সাথে সম্পৃক্ত। লোকসংগীত, পথনাটক, দেওয়াল লিখন, সহজ ভাষায় রচিত প্যামফ্লেট এবং আজকের ডিজিটাল যুগের কথা মাথায় রেখে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের অডিও-ভিজুয়াল ক্লিপ ব্যবহার করে তাদের সচেতন করতে হবে। তাদের প্রতিদিনের শোষণের কাহিনীগুলোকে তাদের নিজেদের ভাষায় প্রচার করতে হবে, যাতে তারা বুঝতে পারে যে তাদের এই দুর্গতি কোনো ব্যক্তিগত ব্যর্থতা নয়, বরং এই বৈষম্যমূলক পুঁজিবাদী ব্যবস্থার ফল।
### সাংগঠনিক কাঠামো
তাদের সাংগঠনিক কাঠামো হতে হবে গণতান্ত্রিক কেন্দ্রীয়তানির্ভর (Democratic Centralism) এবং একই সাথে অত্যন্ত সুরক্ষিত ও নমনীয়। যেহেতু বুর্জোয়া রাষ্ট্রযন্ত্র এবং শাসকশ্রেণীর পেটুয়া বাহিনী যেকোনো বিপ্লবী শ্রমিক সংগঠনকে দমন করতে তৎপর থাকে, তাই প্রকাশ্য সংগঠনের পাশাপাশি গোপন বা অর্ধ-গোপন সেলুলার কাঠামো গড়ে তুলতে হবে। এই কাঠামোর নেতৃত্ব বাইরের কোনো তথাকথিত বুদ্ধিজীবী বা বুর্জোয়া রাজনীতিবিদদের হাতে না রেখে স্বয়ং চালকদের মধ্য থেকেই লড়াকু ও সচেতন শ্রমিকদের মধ্য থেকে তুলে আনতে হবে।
## উপসংহার
বাংলাদেশের সমসাময়িক রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে অটোরিকশা শ্রমিকরা আজ আর কেবল একটি পরিবহন চালকগোষ্ঠী নয়; তারা শহুরে প্রলেতারিয়েত আন্দোলনের এক নতুন ও অবধারিত শক্তি। গ্রামীণ অর্থনীতির ধ্বংসস্তূপ থেকে উঠে আসা এই কোটি কোটি মেহনতি মানুষ প্রতিদিন যে বৈষম্য, শোষণ ও অবমাননার শিকার হচ্ছে, তা দীর্ঘমেয়াদে টিকতে পারে না। তাদের পেটি-বুর্জোয়া মোহ এবং বিচ্ছিন্নতাকে কাটিয়ে যদি সঠিক মার্ক্সবাদী শ্রেণিচেতনার আলোয় দীক্ষিত করা যায়, তবে তারা কেবল নিজেদের মুক্তির পথই খুঁজে নেবে না, বরং বাংলাদেশের সামগ্রিক শোষণমূলক বুর্জোয়া কাঠামোর বিরুদ্ধে এক অপ্রতিরোধ্য বিপ্লবী জোয়ার সৃষ্টি করবে।
শহরের পিচঢালা সড়কে যাদের ঘাম ঝরে প্রতিদিন, তাদের হাত ধরেই রচিত হতে পারে এক নতুন ও বৈষম্যহীন সাম্যবাদী সমাজ। সময় এসেছে এই নব্য-বিপ্লবী শক্তিকে সঠিকভাবে চেনার, তাদের পাশে দাঁড়ানোর এবং তাদের মুক্তির সংগ্রামকে চূড়ান্ত পরিণতির দিকে এগিয়ে নেওয়ার।
About the Author
Sadat Rameen Ahmed
একজন অ্যানারকো কমিউনিস্ট বিপ্লবী । এছাড়া নগন্য পরিচয় : ছাত্র, বুদ্ধিজীবী, লেখক ও কবি
প্রোফাইল দেখুন
মতামত
এখনও কোনো মতামত নেই।
প্রথম মতামতটি আপনিই দিন।
আলোচনায় অংশ নিতে লগ ইন করুন অথবা এ্যাকাউন্ট খুলুন