সকল লেখা জানতে চাই
Searching…

কিউবান বিপ্লবকে রক্ষা করো: বিপ্লবের ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হবে আন্তর্জাতিক সংগ্রামে

কিউবান বিপ্লব আজ কেবল একটি দ্বীপের অস্তিত্বের লড়াই নয়, বরং বিশ্বজুড়ে সাম্রাজ্যবাদবিরোধী সংগ্রামের এক অগ্নিপরীক্ষা। মার্কিন অবরোধের মুখে দাঁড়িয়ে এই বিপ্লব প্রমাণ করেছে যে, বিচ্ছিন্নভাবে সমাজতন্ত্র টিকিয়ে রাখা অসম্ভব। এর ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হবে মেক্সিকো থেকে আর্জেন্টিনা পর্যন্ত ছড়িয়ে থাকা শ্রমিকশ্রেণির ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের মাধ্যমে।

Sankalpa
Sankalpa মজদুরের নিয়মিত লেখক
পড়তে 7 মিনিট লাগতে পারে
এই লেখাটি 49 বার পড়েছে এ মাসে লেখকের লেখা 2 জন পাঠক পড়েছেন
কিউবান বিপ্লবকে রক্ষা করো: বিপ্লবের ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হবে আন্তর্জাতিক সংগ্রামে

কিউবান বিপ্লব আজ এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। ছয় দশকেরও বেশি সময় ধরে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ অর্থনৈতিক অবরোধ, নাশকতা, কূটনৈতিক বিচ্ছিন্নতা এবং সরাসরি আগ্রাসনের হুমকি দিয়ে এই বিপ্লবকে ধ্বংস করার চেষ্টা করেছে। কিন্তু আজকের সংকটের বিশেষ তাৎপর্য এই যে, সাম্রাজ্যবাদ কেবল বাইরের চাপ দিয়েই নয়, কিউবার অভ্যন্তরীণ সংকটকেও কাজে লাগিয়ে বিপ্লবের চূড়ান্ত পরাজয় ঘটাতে চাইছে।

মার্কিন শাসকশ্রেণির কাছে কিউবা কেবল একটি দখলযোগ্য ছোট ক্যারিবীয় দ্বীপ। ১৯৫৯ সালের বিপ্লব তাদের নিজস্ব প্রভাববলয়ে এক ঐতিহাসিক সাম্রাজ্যবাদবিরোধী চ্যালেঞ্জের জন্ম দেয়। সেই কারণেই কিউবার শ্রমিকরাষ্ট্রকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করা বরাবরই ওয়াশিংটনের লক্ষ্য থেকেছে। প্রশাসন বদলেছে, কৌশল বদলেছে, কিন্তু এই লক্ষ্য বদলায়নি। আজ ট্রাম্প ও মার্কো রুবিওর নেতৃত্বে সেই নীতিই আরও নগ্ন, আরও আক্রমণাত্মক রূপ নিয়েছে। কোন আলাপ-আলোচনার প্রশ্ন নেই; তাদের কাছে একমাত্র গ্রহণযোগ্য নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ।

এই বাস্তবতার মধ্যেই কিউবার বর্তমান সংকটকে বিচার করতে হবে। যারা এখনও বিশ্বাস করেন যে কিছু অর্থনৈতিক ছাড়, কিছু বাজার সংস্কার বা সাম্রাজ্যবাদী শক্তির সঙ্গে সমঝোতার মাধ্যমে বিপ্লবকে রক্ষা করা সম্ভব, তারা ইতিহাসের কঠোর শিক্ষাকে অস্বীকার করছেন। সাম্রাজ্যবাদ কখনও শ্রমিকরাষ্ট্রের সঙ্গে স্থায়ী শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানে সন্তুষ্ট থাকে না। যতক্ষণ পর্যন্ত একটি শ্রমিকরাষ্ট্র টিকে থাকে, ততক্ষণ পর্যন্ত সেটিকে ধ্বংস করার প্রচেষ্টাও অব্যাহত থাকে।

কিন্তু কিউবার সংকটকে কেবল নেতৃত্বের ভুল নীতির ফল হিসেবে দেখলেও ভুল হবে। এই সংকটের শিকড় আরও গভীরে প্রোথিত। কিউবান বিপ্লব শুরু থেকেই এক অসম্ভব দায়িত্ব কাঁধে নিয়েছিল—একটি ছোট, অর্থনৈতিকভাবে অনুন্নত দ্বীপে সমাজতন্ত্র নির্মাণের চেষ্টা। এই প্রচেষ্টা কেবল তখনই স্থায়ী সাফল্য অর্জন করতে পারত, যদি তা সমগ্র লাতিন আমেরিকায় সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের সূচনা ঘটাতে সক্ষম হতো।

এই প্রশ্নটি আজও নির্ণায়ক।

মার্কসবাদ কখনও একটি দেশে বিচ্ছিন্নভাবে সমাজতন্ত্র নির্মাণের ধারণাকে গ্রহণ করেনি। কিউবার অর্থনীতি, তার বাজার, তার প্রযুক্তিগত সামর্থ্য কিংবা তার প্রাকৃতিক সম্পদ, কোনোটিই এমন নয় যে দীর্ঘকাল ধরে এককভাবে সাম্রাজ্যবাদী বিশ্ববাজারের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে থাকতে পারবে। মার্কিন অবরোধ এই বাস্তবতাকে আরও নির্মম করে তুলেছে। ফলে কিউবার অস্তিত্বের প্রশ্ন শেষ পর্যন্ত আন্তর্জাতিক শ্রেণিসংগ্রামের প্রশ্নে পরিণত হয়েছে।

এই কারণেই কিউবার ভবিষ্যৎ কেবল হাভানায় নির্ধারিত হবে না। তার ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হবে মেক্সিকো সিটি, বোগোতা, সাও পাওলো, বুয়েনোস আইরেস, সান্তিয়াগো এবং সমগ্র লাতিন আমেরিকার কারখানা, খনি, ক্ষেত এবং শ্রমিক মহল্লাগুলিতে। কিউবার বিপ্লব হয় মহাদেশব্যাপী বিপ্লবের সূচনা হিসেবে বিকশিত হবে, নয়তো সাম্রাজ্যবাদী অবরোধের মাঝে ধীরে ধীরে শ্বাসরোধের শিকার হবে।

ইতিহাসও আমাদের সেই শিক্ষাই দেয়। বিপ্লব কখনও বিচ্ছিন্ন বীরত্বের মাধ্যমে স্থায়ী হয় না। পাহাড়ে সশস্ত্র গেরিলা সংগ্রাম একটি বিপ্লবের সূচনা করতে পারে, কিন্তু সমগ্র মহাদেশকে মুক্ত করতে পারে না। সেই কাজ কেবল সংগঠিত শ্রমিকশ্রেণিই করতে পারে, যারা দরিদ্র কৃষক, ভূমিহীন জনগণ এবং শহরের নিপীড়িত মানুষের নেতৃত্ব গ্রহণ করে পুঁজিবাদী রাষ্ট্রক্ষমতাকে উৎখাত করতে সক্ষম।

আজ লাতিন আমেরিকার সামনে সেই ঐতিহাসিক কর্তব্যই আবারও উপস্থিত হয়েছে।

অথচ এই পথের পরিবর্তে গত কয়েক দশকে অসংখ্য তথাকথিত "বামপন্থী" সরকার শ্রমিকদের বিপ্লবী শক্তিকে সংসদীয় সমঝোতা, জাতীয় উন্নয়নের বিভ্রম এবং বুর্জোয়া রাষ্ট্রযন্ত্রের সীমার মধ্যে বন্দি করেছে। কোথাও কোথাও তারা সাময়িক কিছু সংস্কার করেছে, কিন্তু সাম্রাজ্যবাদের সঙ্গে চূড়ান্ত সংঘর্ষ এড়িয়ে চলেছে। ফলাফল আজ স্পষ্ট। যতক্ষণ পরিস্থিতি অনুকূল ছিল, তারা টিকে ছিল; সংকট গভীর হতেই তাদের সীমাবদ্ধতাও প্রকাশ্যে এসেছে।

এই অভিজ্ঞতা আরেকটি মৌলিক সত্যকে সামনে আনে। শ্রমিকশ্রেণির মুক্তির দায়িত্ব কোনো জাতীয় বুর্জোয়া সরকার, কোনো "প্রগতিশীল" রাষ্ট্রনেতা কিংবা কোনো বামপন্থী বোনাপার্টিস্ট প্রশাসনের ওপর ন্যস্ত করা যায় না। ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে, সংকটের মুহূর্তে এরা শেষ পর্যন্ত আপস করে, পিছিয়ে যায় অথবা সরাসরি শ্রমিকশ্রেণির সংগ্রামকে বিশ্বাসঘাতকতার মুখে ঠেলে দেয়। সেই কারণেই বিপ্লবের প্রতিরক্ষা নির্ভর করতে পারে কেবল স্বাধীন শ্রমিক রাজনীতির ওপর।

কিউবার ঘটনাবলি আজ বিশ্বজুড়ে কমিউনিস্টদের কাছেও এক গুরুতর রাজনৈতিক পরীক্ষা। বিপ্লবের প্রতি সংহতি মানে সরকারের প্রতিটি পদক্ষেপের সমর্থন নয়। আবার নেতৃত্বের ভুলের সমালোচনা করতে গিয়ে সাম্রাজ্যবাদী প্রচারের সঙ্গে একাত্ম হয়ে যাওয়াও চলবে না। প্রকৃত আন্তর্জাতিকতাবাদ দাবি করে, একদিকে কিউবান বিপ্লবের নিঃশর্ত প্রতিরক্ষা, অন্যদিকে বিপ্লবকে দুর্বল করে এমন প্রতিটি নীতির বিরুদ্ধে নির্ভীক রাজনৈতিক সংগ্রাম।

সবচেয়ে বড় ভুল হবে আসন্ন বিপদের সামনে হতাশায় আত্মসমর্পণ করা। কিউবার বিপ্লব যদি আজ ভয়াবহ সংকটের মধ্যেও টিকে থাকে, তবে তা কেবল কিউবার জনগণের জন্য নয়; সমগ্র বিশ্বের শ্রমিকশ্রেণির জন্যও অপরিসীম তাৎপর্য বহন করবে। আবার যদি তা পরাজিতও হয়, তবে সেই পরাজয়কে চূড়ান্ত বলে মেনে নেওয়া চলবে না। ইতিহাসে শ্রমিকশ্রেণি বহুবার পরাজিত হয়েছে; কিন্তু প্রতিটি পরাজয়ই ভবিষ্যৎ সংগ্রামের জন্য শিক্ষা, অভিজ্ঞতা এবং নতুন শক্তির উৎস হয়ে উঠেছে।

আজ তাই কমিউনিস্টদের কর্তব্য দ্বিমুখী। প্রথমত, সাম্রাজ্যবাদী অবরোধ, হস্তক্ষেপ এবং প্রতিবিপ্লবী ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে কিউবান বিপ্লবকে নিঃশর্তভাবে রক্ষা করা। দ্বিতীয়ত, অতীতের সাফল্য ও বর্তমান সংকট, উভয় থেকেই শিক্ষা নিয়ে আন্তর্জাতিক বিপ্লবী আন্দোলনকে নতুন ভিত্তির ওপর পুনর্গঠনের কাজে আত্মনিয়োগ করা।

এই লড়াই সমগ্র লাতিন আমেরিকার, সমগ্র বিশ্বের শ্রমিকশ্রেণির লড়াই। সাম্রাজ্যবাদকে পরাজিত করার একমাত্র পথ আন্তর্জাতিক সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের পথ। সেই সংগ্রামের জন্য প্রয়োজন প্রতিটি দেশে বিপ্লবী কমিউনিস্ট শক্তিকে পুনর্গঠন করা এবং তাদের আন্তর্জাতিক ঐক্য গড়ে তোলা। বিচ্ছিন্ন জাতীয় সংগ্রাম নয়, একটি নতুন বিপ্লবী আন্তর্জাতিকের ভিত্তিতেই কেবল সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে বিশ্বব্যাপী আক্রমণ সংগঠিত করা সম্ভব।

কিউবার বিপ্লব আজও শেষ হয়ে যায়নি। যতদিন তার অর্জনের কিছু অংশও টিকে আছে, ততদিন তাকে রক্ষা করার সংগ্রামও শেষ হয়নি। কিন্তু এই সংগ্রাম কেবল প্রতিরক্ষার সংগ্রামে সীমাবদ্ধ হতে পারে না। তাকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে আন্তর্জাতিক বিপ্লবের কর্মসূচির পথে। এই কারণেই আজ কিউবাকে রক্ষা করার প্রশ্ন অবিচ্ছেদ্যভাবে যুক্ত নতুন বিপ্লবী আন্তর্জাতিক গড়ে তোলার প্রশ্নের সঙ্গে।

এই লড়াইয়ে সাময়িক পরাজয় আসতে পারে। কিন্তু কমিউনিস্টদের কাছে পরাজয় কখনও ইতিহাসের শেষ কথা নয়। রোজা লুক্সেমবুর্গ, যিনি নিজেও প্রতিবিপ্লবের হাতে নিহত হয়েছিলেন, সেই শিক্ষা দিয়েই গেছেন—

"বার্লিনে শৃঙ্খলা বিরাজ করছে!"—হে নির্বোধ পদলেহীদের দল! তোমাদের এই "শৃঙ্খলা"র ভিত বালির ওপর নির্মিত। আগামীকালই বিপ্লব পুনরায় অস্ত্রের ঝনঝনানিতে জেগে উঠবে, আর তোমাদের আতঙ্কে স্তব্ধ করে দিয়ে বজ্রকণ্ঠে ঘোষণা করবে—

আমি ছিলাম, আমি আছি, আমি থাকবই!

বিশেষ দ্রষ্টব্য:
১। ২৮ জুন ২০২৬ তারিখে অস্ট্রেলিয়ার কমিউনিস্ট ইউনিটির কেন্দ্রীয় কমিটি কর্তৃক গৃহীত থিসিস।
২। স্পার্টাসিস্ট (ইংরেজি সংস্করণ), বিশেষ পরিশিষ্ট, ৩০ জুন ২০২৬।

#কিউবান_বিপ্লব #সমাজতন্ত্র #সাম্রাজ্যবাদ #কিউবা #লাতিন_আমেরিকা #শ্রমিকশ্রেণি #আন্তর্জাতিকতাবাদ #কমিউনিস্ট
Sankalpa

About the Author

Sankalpa

মজদুরের নিয়মিত লেখক

শিক্ষার্থী

বই পড়ি, প্রশ্ন করি, তর্ক করি। সাহিত্য, ইতিহাস আর রাজনীতি নিয়ে ভাবতে ভালোবাসি। বিশেষ করে সমাজকে তার অন্তর্নিহিত দ্বন্দ্ব, পরিবর্তন ও সম্ভাবনার মধ্য দিয়ে বোঝার চেষ্টা করি। জটিল বিষয়কে সহজ করে বোঝার চেয়ে, তাকে গভীরভাবে বোঝার চেষ্টাটাকেই বেশি মূল্য দিই।

প্রোফাইল দেখুন

মতামত

এখনও কোনো মতামত নেই।

প্রথম মতামতটি আপনিই দিন।

আলোচনায় অংশ নিতে লগ ইন করুন অথবা এ্যাকাউন্ট খুলুন

Reading

Font size

Auto scroll
Slow Fast