হরমুজ প্রণালি অচল হয়ে যাওয়ার পর বিশ্ব অর্থনীতি এমন এক তেল-সংকটের সামনে দাঁড়িয়েছিল, যা উড়োজাহাজ থেকে কারখানা—সবকিছু থামিয়ে দিতে পারত। বিপর্যয় ঠেকেছিল কোনো একক দেশ বা নেতার জাদুতে নয়; বিকল্প পাইপলাইন, জরুরি মজুত, কমে যাওয়া চাহিদা, চীনের অপ্রত্যাশিত আমদানি হ্রাস এবং সাময়িক যুদ্ধবিরতি একের পর এক প্রতিরক্ষার দেয়াল তুলে দিয়েছিল।
যে সকালে পৃথিবীর তেলপথ বন্ধ হয়ে গেল
বিশ্ব মানচিত্রে হরমুজ প্রণালি একটি সরু নীল রেখা। সবচেয়ে সংকীর্ণ জায়গায় এর প্রস্থ মাত্র কয়েক ডজন কিলোমিটার। অথচ এই ছোট জলপথ দিয়েই ২০২৫ সালে প্রতিদিন গড়ে প্রায় দুই কোটি ব্যারেল অপরিশোধিত তেল ও পরিশোধিত জ্বালানি চলাচল করত—বিশ্বের মোট তেল ব্যবহারের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এবং সমুদ্রপথের তেল-বাণিজ্যের প্রায় এক-চতুর্থাংশ।
২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর ইরান যখন প্রণালিটি কার্যত অচল করে দিল, তেলের জাহাজগুলো পারস্য উপসাগরে আটকে পড়তে শুরু করল। ইরাক, কুয়েত, কাতার, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের রপ্তানির বড় অংশের সামনে যেন হঠাৎ একটি লোহার দরজা নেমে এল।
এর ধাক্কা প্রথমে দেখা গেল দামের পর্দায়। মার্চে ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের গড় দাম ব্যারেলপ্রতি ১০৩ ডলারে উঠল। এপ্রিলের ভৌত বাজারে কিছু তেলের দাম ১৫০ ডলারের কাছাকাছি পৌঁছাল। এয়ারলাইনগুলো রুট কমাতে শুরু করল, শোধনাগারগুলো কাঁচামালের জন্য প্রতিযোগিতায় নামল, আমদানিনির্ভর দেশগুলো হিসাব করতে লাগল—ভান্ডারের তেল আর কত দিন চলবে?
ভয়টি শুধু বেশি দামের ছিল না। তেলের প্রবাহ দীর্ঘদিন বন্ধ থাকলে বিমান, ট্রাক, জাহাজ, কৃষিযন্ত্র, কারখানা ও বিদ্যুৎব্যবস্থার একটি অংশ থেমে যেতে পারত। খাদ্য ও সারের দাম বাড়ত, বৈদেশিক মুদ্রার সংকটে দুর্বল অর্থনীতিগুলো জ্বালানি কেনার ক্ষমতা হারাত। বিশ্ব একটি অন্ধকার সুড়ঙ্গে ঢুকে পড়েছিল। বের হওয়ার পথ তখনো দেখা যাচ্ছিল না।
প্রথম দেয়াল: মরুভূমির ভেতর দিয়ে পাইপলাইন
হরমুজ বন্ধ হলেও উপসাগরের সব তেল আটকে যায়নি। বহু বছর আগে এমন বিপদের কথা ভেবেই সৌদি আরব তার পূর্বাঞ্চলীয় তেলক্ষেত্র থেকে লোহিত সাগরের ইয়ানবু বন্দর পর্যন্ত পূর্ব–পশ্চিম পাইপলাইন তৈরি করেছিল। সংযুক্ত আরব আমিরাতও হাবশান থেকে হরমুজের বাইরের ফুজাইরা পর্যন্ত পাইপলাইন গড়ে রেখেছিল।
যুদ্ধ শুরু হলে এই দুই পথ পূর্ণ শক্তিতে ব্যবহার করা হয়। সৌদি পথ দিয়ে দৈনিক প্রায় ৪০ থেকে ৪৫ লাখ এবং আমিরাতের পথ দিয়ে প্রায় ১৫ লাখ ব্যারেল তেল বাইরে নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। প্রায় ৬০ লাখ ব্যারেল ফিরে আসে বিশ্ববাজারের নাগালে। এটি বিশাল পরিমাণ, কিন্তু হরমুজের স্বাভাবিক প্রবাহের তুলনায় যথেষ্ট নয়।
প্রথম দেয়ালটি ধাক্কা সামলেছিল। বিপর্যয় থামাতে পারেনি।
দ্বিতীয় দেয়াল: মাটির নিচের জরুরি ভান্ডার
এরপর খুলতে শুরু করল রাষ্ট্রগুলোর জরুরি তেলের ভান্ডার। কোথাও বিশাল ইস্পাতের ট্যাংকে, কোথাও পাহাড়ের গুহায়, আবার যুক্তরাষ্ট্রে মাটির গভীরের লবণগুহায় বহু বছর ধরে রাখা ছিল এই তেল। এগুলো স্বাভাবিক বাণিজ্যের জন্য নয়; যুদ্ধ, অবরোধ কিংবা বড় সরবরাহ-বিপর্যয়ের সময় ব্যবহারের জন্য।
১১ মার্চ আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার ৩২ সদস্য দেশ একসঙ্গে ৪০ কোটি ব্যারেল তেল বাজারে ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেয়। এটি ছিল ইতিহাসের সবচেয়ে বড় সমন্বিত জরুরি মজুতমুক্তি—২০২২ সালে ইউক্রেন যুদ্ধের পর ছাড়া পরিমাণেরও দ্বিগুণের বেশি।
জাহাজগুলোকে নতুন উৎসে পাঠানো হলো, শোধনাগারে জমা তেল ব্যবহার করা হলো, সরকারি ভান্ডার থেকে প্রতিদিন বাজারে ব্যারেল যোগ হতে থাকল। এই মজুত নতুন তেল তৈরি করেনি; সময় কিনেছিল। যুদ্ধ থামানো বা হরমুজ খুলে দেওয়ার জন্য কয়েকটি মূল্যবান মাস।
কিন্তু সময়েরও দাম আছে। মে ও জুনে শিল্পোন্নত দেশগুলোর ভান্ডার দ্রুত কমতে থাকে। আইইএর হিসাবে শুধু জুনেই ওইসিডি দেশগুলোর মোট মজুত ৬ কোটি ২০ লাখ ব্যারেল কমে যায়। জরুরি তেল অসীম নয়। দ্বিতীয় দেয়ালেও ফাটল দেখা দিচ্ছিল।
তারপর চীনের বন্দরে জাহাজ কমতে শুরু করল
এই সময় বাজার বিশ্লেষকেরা একটি অস্বাভাবিক পরিবর্তন লক্ষ্য করলেন। পৃথিবীর সবচেয়ে বড় তেল আমদানিকারক চীনের বন্দরে আগের মতো জাহাজ আসছে না। যুদ্ধের আগে দেশটি সমুদ্রপথে প্রতিদিন প্রায় এক কোটি ১৭ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল আনত। মে মাসে কেপলারের জাহাজ-তথ্যে সেই প্রবাহ নেমে আসে প্রায় ৬২ লাখ ব্যারেলে। পাইপলাইনের তেলসহ সরকারি হিসাবে মোট আমদানিও কমে দৈনিক প্রায় ৭৮ লাখ ব্যারেলে দাঁড়ায়—আট বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন।
একটি সংকুচিত বাজারে প্রতিদিন কয়েক মিলিয়ন ব্যারেলের ক্রেতা হঠাৎ সরে দাঁড়ানোর অর্থ ছিল অসাধারণ। চীন আগের হারে তেল কিনতে থাকলে ইউরোপ, যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, ভারত ও অন্য আমদানিকারকদের একই ব্যারেলের জন্য আরও বেশি দাম দিতে হতো। দুর্বল মুদ্রার দেশগুলো প্রতিযোগিতা থেকেই ছিটকে পড়ত।
চীন তার আমদানি কমিয়ে কোনো ঘোষণা দেয়নি। বিশ্বকে উদ্ধারের দাবিও করেনি। তবু তার বন্দরে অনুপস্থিত সেই জাহাজগুলোই হয়ে উঠল সংকটের তৃতীয় এবং সবচেয়ে অপ্রত্যাশিত প্রতিরক্ষা। প্রশ্ন ছিল—নিজের কারখানা, যানবাহন ও শহর সচল রেখেও দেশটি এত তেল কেনা বন্ধ করল কীভাবে?
তেলের পাহাড়: বহু বছরের নীরব প্রস্তুতি
উত্তর লুকিয়ে ছিল চীনের উপকূল ও শিল্পাঞ্চলে ছড়িয়ে থাকা বিশাল ট্যাংকগুলোর ভেতর। দেশটি তার কৌশলগত ও বাণিজ্যিক মজুতের পূর্ণ হিসাব প্রকাশ করে না। তাই স্যাটেলাইটে ট্যাংকের ভাসমান ছাদের উচ্চতা, শোধনাগারের ব্যবহার এবং জাহাজ চলাচল দেখে বাইরের প্রতিষ্ঠানগুলো তেলের পরিমাণ অনুমান করে।
মার্কিন জ্বালানি তথ্য প্রশাসনের হিসাবে, ২০২৫ সালে চীন প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১১ লাখ ব্যারেল করে কৌশলগত ভান্ডারে যোগ করেছিল। ডিসেম্বর নাগাদ মজুত প্রায় ১৪০ কোটি ব্যারেলে পৌঁছায়। কেপলার যুদ্ধের শুরুতে স্থলভিত্তিক অপরিশোধিত তেলের পরিমাণ ধরেছিল প্রায় ১২০ কোটি ব্যারেল।
অর্থাৎ যুদ্ধ যখন বিশ্ববাজারের দরজায় আঘাত করল, চীনের ভেতরে আগে থেকেই তেলের একটি পাহাড় তৈরি ছিল। আমদানি কমলেও শোধনাগারগুলো সেই ভান্ডার থেকে তেল নিতে পারল। বাইরের বাজারে চীনা চাহিদা কমল, কিন্তু দেশের ভেতরের সরবরাহ একবারে ভেঙে পড়ল না। জুনে চীনের মজুত প্রায় ৪ কোটি ১০ লাখ ব্যারেল কমে যাওয়ার হিসাব দেখায়, এই ঢাল সত্যিই ব্যবহৃত হচ্ছিল।
এই প্রস্তুতির পেছনে ছিল দীর্ঘদিনের একটি ভয়। চীনের সামুদ্রিক তেল আমদানির বড় অংশ মালাক্কা প্রণালি হয়ে আসে। কোনো সংঘাতে সেই পথ বন্ধ হলে দেশের অর্থনীতি যেন হাঁটু গেড়ে না বসে, সে জন্য বেইজিং বহু বছর ধরে মজুত, স্থলপথের পাইপলাইন এবং বিকল্প জ্বালানি ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে। হরমুজের যুদ্ধ সেই ব্যবস্থার প্রথম বড় পরীক্ষা হয়ে দাঁড়াল।
শুধু মজুত নয়, বদলে যাওয়া অর্থনীতি
চীনের আরেকটি সুবিধা তৈরি হয়েছিল রাস্তায় ও রেলপথে। আইইএর হিসাবে ২০২৫ সালেই দেশটির বৈদ্যুতিক যানবাহন দৈনিক প্রায় ১০ লাখ ব্যারেল সম্ভাব্য তেলের ব্যবহার ঠেকিয়েছে। ২০২৬ সালের প্রথমার্ধে চীনে নতুন-জ্বালানি যানবাহনের সংখ্যা প্রায় ৪ কোটি ৯০ লাখে পৌঁছায়। এটি মোট গাড়ির ১৩ শতাংশের কিছু বেশি—তবু বিশ্বের বৃহত্তম বৈদ্যুতিক বহর।
তেলের দাম বাড়লে এই বহর, দ্রুতগতির রেল, মেট্রো এবং বিদ্যুৎচালিত গণপরিবহন একসঙ্গে একটি বিকল্প পথ খুলে দেয়। মানুষের চলাচল পুরোপুরি বন্ধ না করেও পেট্রল ও বিমান জ্বালানির চাহিদা কিছুটা কমানো সম্ভব হয়। বহু বছরের ভর্তুকি, শিল্পনীতি ও অবকাঠামো বিনিয়োগ তখন জরুরি জ্বালানি নিরাপত্তায় রূপ নেয়।
চীন একই সঙ্গে পেট্রল, ডিজেল ও জেট ফুয়েল রপ্তানিতে কঠোর নিয়ন্ত্রণ দেয়। ফলে দেশীয় বাজারে জ্বালানি ধরে রাখা গেলেও এশিয়ার আমদানিনির্ভর প্রতিবেশীরা আরও চাপে পড়ে। জাহাজের তথ্য পরে দেখিয়েছে, রপ্তানি পুরোপুরি বন্ধ হয়নি; কিন্তু পরিমাণ ব্যাপকভাবে কমেছিল। একটি দেশের প্রতিরক্ষা অন্য দেশের সংকট বাড়িয়ে দিতে পারে—জ্বালানি রাজনীতির নির্মম সত্য এটিই।
বিদ্যুৎব্যবস্থায় চীন কয়লার ব্যবহারও উচ্চ পর্যায়ে রাখে। ২০২৫ সালে দেশটি ৭৮ গিগাওয়াট নতুন কয়লাভিত্তিক সক্ষমতা চালু করেছিল; ২০২৬ সালের এপ্রিলেও কয়লা উৎপাদন ছিল উঁচু স্তরে। এতে বিদ্যুৎ সরবরাহে তেলের বিকল্প তৈরি হলেও মূল্যটি ছিল দূষণ ও কার্বন নিঃসরণ। বিশ্ব এক তাৎক্ষণিক তেল-বিপর্যয় এড়াতে গিয়ে জলবায়ুর দীর্ঘমেয়াদি বিপদকে আরও একটু বড় করল।
নিষেধাজ্ঞার আড়ালে গড়ে ওঠা বিকল্প তেলপথ
চীনের মজুতের বড় অংশ গড়ে উঠেছিল এমন এক সময়ে, যখন রাশিয়া ও ইরান পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার কারণে সীমিতসংখ্যক ক্রেতার কাছে ছাড়ে তেল বিক্রি করছিল। কথিত ‘শ্যাডো ফ্লিট’, মাঝসমুদ্রে জাহাজ বদল, তেলের উৎস অন্য দেশ হিসেবে দেখানো, স্বাধীন ‘টিপট’ শোধনাগার এবং ডলারের বাইরের লেনদেন—সব মিলিয়ে একটি সমান্তরাল বাণিজ্যপথ তৈরি হয়।
আটলান্টিক কাউন্সিলের হিসাবে, নিষেধাজ্ঞাগ্রস্ত উৎপাদকদের মধ্যে ক্রেতা পাওয়ার প্রতিযোগিতা ২০২৫ সালে সর্বোচ্চ ছাড়ের সময় চীনকে প্রতিদিন প্রায় ২ কোটি ৮৮ লাখ ডলার সাশ্রয় করেছিল। কম দামের সেই তেল ট্যাংকে জমেছে; রেনমিনবি ও ছোট আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ব্যবহার লেনদেনকে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার নাগালের বাইরে রাখতে সাহায্য করেছে।
এই ব্যবস্থার নৈতিক ও রাজনৈতিক মূল্যও ছিল। চীনের সস্তা তেল রাশিয়া ও ইরানের রাষ্ট্রীয় আয়ের পথ খোলা রেখেছে। একই নেটওয়ার্ক পরে চীনকে বিশ্ববাজার থেকে সরে দাঁড়ানোর সুযোগ দিয়েছে। যুদ্ধ, নিষেধাজ্ঞা ও প্রতিদ্বন্দ্বিতার ভেতরে গড়ে ওঠা সেই মজুত শেষ পর্যন্ত বৈশ্বিক সংকটের একটি বড় ধাক্কা শোষণ করেছে। ইতিহাস প্রায়ই এমন বৈপরীত্যে এগোয়।
শেষ দরজা খুলল সাময়িক যুদ্ধবিরতিতে
পাইপলাইন, জরুরি ভান্ডার ও চীনের আমদানি হ্রাস বিশ্বকে বাঁচার সময় দিয়েছিল। কিন্তু হরমুজের প্রবাহ না ফিরলে এই ব্যবস্থা বেশিদিন টিকত না। জুনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সাময়িক সমঝোতার পর উপসাগরীয় তেল রপ্তানি দৈনিক প্রায় ৬৫ লাখ ব্যারেল বেড়ে এক কোটি ৬১ লাখ ব্যারেলে পৌঁছায়। যুদ্ধপূর্ব প্রায় দুই কোটি ৪০ লাখ ব্যারেলের তুলনায় তখনো কম, কিন্তু অন্ধকার সুড়ঙ্গের শেষে প্রথম বাস্তব আলো ছিল সেটিই।
বিশ্ব উৎপাদন জুলাইয়েও যুদ্ধপূর্ব অবস্থার চেয়ে দৈনিক প্রায় ৯৪ লাখ ব্যারেল নিচে ছিল। নতুন সংঘর্ষে মাসের শেষ দিকে ব্রেন্ট আবার ১০০ ডলার ছাড়ায়। অর্থাৎ বিপদ সম্পূর্ণ কাটেনি। কিন্তু মার্চে যে আকস্মিক পতন বিশ্ব অর্থনীতিকে বন্ধ করে দিতে পারত, তার ধারাবাহিকতা ভেঙে গেছে। বাজার সময় পেয়েছে, কিছু প্রবাহ ফিরেছে এবং ব্যবহার নতুন বাস্তবতার সঙ্গে মানিয়ে নিয়েছে।
একটি উদ্ধার নয়, প্রতিরক্ষার একটি শৃঙ্খল
বিশ্ব তেলের মহাবিপর্যয় এড়িয়েছিল কয়েকটি অসম্পূর্ণ প্রতিরক্ষা একসঙ্গে কাজ করায়। মরুভূমির পাইপলাইন প্রথম কয়েক মিলিয়ন ব্যারেল ফিরিয়ে এনেছে। ৪০ কোটি ব্যারেলের জরুরি ভান্ডার সময় কিনেছে। বেশি দাম ও সংকট চাহিদা কমিয়েছে। চীনের মজুত, বৈদ্যুতিক পরিবহন ও আমদানি পতন বাজারের সবচেয়ে বড় ক্রেতাকে সাময়িকভাবে সরিয়ে দিয়েছে। শেষে যুদ্ধবিরতি হরমুজের কিছু প্রবাহ ফিরিয়ে এনেছে।
প্রতিটি দেয়াল একা দুর্বল ছিল। একসঙ্গে তারা পতন ঠেকিয়েছে।
চীনের ভূমিকা এখানে বিশেষ, কারণ দেশটি তেল উৎপাদন করে বিশ্বকে বাঁচায়নি; বরং বাজার থেকে কম তেল কিনে অন্যদের জন্য জায়গা তৈরি করেছে। উৎপাদকদের সরবরাহ যেমন দাম বদলায়, তেমনি এখন সবচেয়ে বড় ক্রেতার সিদ্ধান্তও বিশ্বদাম নাড়িয়ে দিতে পারে। বৈশ্বিক তেল-ক্ষমতার পুরোনো মানচিত্রে তাই একটি নতুন কেন্দ্র স্পষ্ট হয়েছে।
কিন্তু এই সাফল্য বিনামূল্যে আসেনি। জরুরি ভান্ডার খালি হয়েছে, কয়লার ব্যবহার বেড়েছে, এশিয়ায় পরিশোধিত জ্বালানির ঘাটতি তৈরি হয়েছে এবং উচ্চ দাম কোটি কোটি মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়িয়েছে। বিপর্যয় এড়ানো গেছে; তার খরচ এড়ানো যায়নি।
বাংলাদেশের ঘরে পৌঁছানো ধাক্কা
ঢাকা হরমুজ থেকে হাজার কিলোমিটার দূরে। কিন্তু একটি সরু প্রণালিতে জাহাজ থেমে গেলে তার শব্দ বাংলাদেশের রান্নাঘর, বাসস্ট্যান্ড, সেচপাম্প ও কারখানায় শোনা যায়। জ্বালানি ও এলএনজি আমদানির বাড়তি খরচ বৈদেশিক মুদ্রার ভান্ডার এবং সরকারি অর্থে নতুন চাপ তৈরি করেছে।
মে মাসে বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশকে এলএনজি আমদানির অর্থ জোগাতে ৩৫ কোটি ডলারের অতিরিক্ত সহায়তা অনুমোদন করে। জুলাইয়ে সরকার আরও পাঁচ লাখ টন জ্বালানি কেনার উদ্যোগ নেয়, যার আনুমানিক ব্যয় ৬২ কোটি ২৫ লাখ ডলারের বেশি। সরকারি নথির হিসাবে, ফেব্রুয়ারি থেকে এপ্রিলের মধ্যে আমদানি করা ডিজেলের গড় দাম ১১৮ শতাংশের বেশি বেড়েছিল।
এই অঙ্ক শেষ পর্যন্ত কাগজে আটকে থাকে না। জ্বালানি ব্যয় বাড়লে পণ্য পরিবহন, কৃষি উৎপাদন, বিদ্যুৎ ও শিল্পের খরচ বাড়ে। রাষ্ট্র দাম নিয়ন্ত্রণ করলে ভর্তুকির বোঝা বাড়ে; দাম ছেড়ে দিলে পরিবারকে সরাসরি মূল্য দিতে হয়। ধনী দেশ তেলের ভান্ডার খুলে সময় কিনতে পারে, চীন ১৪০ কোটি ব্যারেলের দেয়াল তুলতে পারে—কিন্তু বাংলাদেশের মতো দেশের সুরক্ষা অনেক পাতলা। বৈশ্বিক জ্বালানি ব্যবস্থার বৈষম্য এখানেই সবচেয়ে স্পষ্ট।
শেষ কথা
হরমুজের দরজা বন্ধ হওয়ার মুহূর্তে পৃথিবী একটি গভীর অন্ধকার সুড়ঙ্গে ঢুকে পড়েছিল। তারপর একে একে আলো জ্বলে—মরুভূমির পাইপলাইন, মাটির নিচের জরুরি ভান্ডার, চীনের বন্দরে কমে যাওয়া জাহাজ, বৈদ্যুতিক গাড়ি ও রেল, এবং অবশেষে সাময়িক যুদ্ধবিরতি। কোনো আলোই একা পথ দেখানোর মতো উজ্জ্বল ছিল না। সবগুলো মিলেই পৃথিবীকে সামনে এগোনোর সুযোগ দিয়েছে।
এই অল্পের জন্য বেঁচে যাওয়া আমাদের একটি সতর্কবার্তাও দেয়। তেলের ওপর দাঁড়ানো বিশ্ব অর্থনীতি এখনো কয়েক কিলোমিটার জলপথ, কয়েকটি রাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত এবং গোপন মজুতের ওপর নির্ভরশীল। পরবর্তী সংকটের আগে শুধু আরও তেল জমিয়ে রাখলেই হবে না। গণপরিবহন, নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ, বৈদ্যুতিক যান, দক্ষ শিল্প এবং ন্যায্য আন্তর্জাতিক সহায়তায় বিনিয়োগ করতে হবে। কারণ প্রকৃত জ্বালানি নিরাপত্তা মানে কেবল বাজার সচল রাখা নয়—সংকটের মূল্য যেন বারবার সবচেয়ে দুর্বল মানুষকে দিতে না হয়, সেটিও নিশ্চিত করা।
তথ্যসূত্র
1. International Energy Agency, [IEA Member countries to carry out largest ever oil stock release](https://www.iea.org/news/iea-member-countries-to-carry-out-largest-ever-oil-stock-release-amid-market-disruptions-from-middle-east-conflict), ১১ মার্চ ২০২৬।
2. International Energy Agency, [Oil Market Report—July 2026](https://www.iea.org/reports/oil-market-report-july-2026), জুলাই ২০২৬।
3. International Energy Agency, [Oil Market Report—May 2026](https://www.iea.org/reports/oil-market-report-may-2026), মে ২০২৬।
4. U.S. Energy Information Administration, [China, the United States, and Japan hold most strategic oil inventories in 2025](https://www.eia.gov/todayinenergy/detail.php?id=67504), ২০ এপ্রিল ২০২৬।
5. U.S. Energy Information Administration, [Hormuz closure and related production outages are key drivers in EIA’s latest forecast](https://www.eia.gov/pressroom/releases/press586.php), ৭ এপ্রিল ২০২৬।
6. Kpler, [Drawing down: How the market is absorbing the Hormuz shock](https://www.kpler.com/blog/drawing-down-how-the-market-is-absorbing-the-hormuz-shock-2), ১৩ মে ২০২৬।
7. Kpler, [Iran war and the Strait of Hormuz: Oil market implications six weeks in](https://www.kpler.com/fr/blog/iran-war-and-the-strait-of-hormuz-oil-market-implications-six-weeks-in), ৭ এপ্রিল ২০২৬।
8. Reuters, [China curtailing, not banning fuel exports, shipping data shows](https://www.marketscreener.com/news/china-curtailing-not-banning-fuel-exports-shipping-data-shows-ce7e50d3d188f52d), ২০ এপ্রিল ২০২৬।
9. International Energy Agency, [Global EV Outlook 2026—Executive summary](https://www.iea.org/reports/global-ev-outlook-2026/executive-summary), ২০২৬।
10. National Bureau of Statistics of China, [Energy Production in April 2026](https://www.stats.gov.cn/english/PressRelease/202605/t20260519_1963756.html), ১৯ মে ২০২৬।
11. Global Energy Monitor ও Centre for Research on Energy and Clean Air, [Built to peak: Coal power expansion runs out of room in China](https://globalenergymonitor.org/research/built-peak-coal-power-expansion-runs-out-room-china), ফেব্রুয়ারি ২০২৬।
12. Atlantic Council, [Energy Sanctions Dashboard](https://www.atlanticcouncil.org/energy-sanctions-dashboard/), ২০২৬।
13. U.S.-China Economic and Security Review Commission, [China’s Facilitation of Sanctions and Export Control Evasion](https://www.uscc.gov/research/chinas-facilitation-sanctions-and-export-control-evasion), ১৪ নভেম্বর ২০২৫।
14. World Bank, [Middle East War to Spark Biggest Energy Price Surge in Four Years](https://www.worldbank.org/en/news/press-release/2026/04/28/commodity-markets-outlook-april-2026-press-release), ২৮ এপ্রিল ২০২৬।
15. World Bank, [Support to Help Navigate Fuel Market Volatility in Bangladesh](https://www.worldbank.org/en/news/factsheet/2026/05/18/world-bank-support-to-help-navigate-fuel-market-volatility-in-bangladesh), ১৮ মে ২০২৬।
16. Bangladesh Sangbad Sangstha, [Govt to import another 500,000 tonnes of fuel to boost reserves](https://www.bssnews.net/special-stories/402402), ৪ জুলাই ২০২৬।
17. Associated Press, [Mideast oil producers step up plans to bypass the Strait of Hormuz](https://apnews.com/article/896c02f0c978986fff0ae7fc389ea51f), ২৩ জুলাই ২০২৬।
18. Reuters, [China’s May crude imports slumped to an eight-year low](https://www.bairdmaritime.com/amp/story/shipping/tankers/chinas-eight-year-low-in-oil-imports-offers-relief-for-global-prices), ৯ জুন ২০২৬।
19. Associated Press, [Gas, groceries and back-to-school items are where shoppers might see higher oil prices surface](https://apnews.com/article/5cdf2386055896c1dfc4d9499196b085), ২৩ জুলাই ২০২৬।
20. China Quietly Saved Rest of The World(https://youtu.be/BkA0bkb6ZO0?si=gP4RaL3GPtQetLrN), ২৩ জুলাই ২০২৬।
মতামত
এখনও কোনো মতামত নেই।
প্রথম মতামতটি আপনিই দিন।
আলোচনায় অংশ নিতে লগ ইন করুন অথবা এ্যাকাউন্ট খুলুন