সকল লেখা জানতে চাই
Searching…

কেন স্তালিন কমিন্টার্নকে সমাধিস্ত করলেন: একটি বর্ণনা

Sankalpa
Sankalpa মজদুরের নিয়মিত লেখক
পড়তে 17 মিনিট লাগতে পারে
এই লেখাটি 1 বার পড়েছে এ মাসে লেখকের লেখা 2 জন পাঠক পড়েছেন
কেন স্তালিন কমিন্টার্নকে সমাধিস্ত করলেন: একটি বর্ণনা

হাকিম মির্জা (কমলেশ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ছদ্মনাম)-র ‘After Thoughts on Dissolution of the Comintern’ প্রবন্ধ অবলম্বনে। প্রবন্ধটি প্রথম প্রকাশিত হয় Workers’ International News পত্রিকায়, ফেব্রুয়ারি ১৯৪৪-এ। পরে জুন ১৯৪৪-এ Fourth International পত্রিকায় ‘It Is Time to Break With Stalinism’ শিরোনামে এটি পুনঃপ্রকাশিত হয়।

লেখক ও তাঁর রাজনৈতিক যাত্রাপথ

হাকিম মির্জা ছিলেন বাঙালি বিপ্লবী কমলেশ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ছদ্মনাম। দুই পত্রিকার সম্পাদকীয় বিবরণ থেকেই জানা যায়, কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিকের প্রথম বিশ্ব কংগ্রেসের প্রতিষ্ঠাকালীন অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে তিনি ছিলেন। সচ্ছল পরিবারে জন্ম হলেও রাজনীতিতে তাঁর হাতেখড়ি হয়েছিল ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের মধ্য দিয়ে। ১৯৩০–৩২ সালের আইন অমান্য আন্দোলনে অংশ নেওয়ার অপরাধে তাঁকে ছয় মাস কারাবাসে থাকতে হয়। বাংলার ছাত্র আন্দোলনে ইন্দ্র সেনের সঙ্গে তাঁর পরিচয়। জনপ্রিয় ফ্রন্টের রাজনৈতিক লাইনের বিরোধিতা করতেন তাঁরা দুজনেই। পরে তাঁদের প্রাক্তন সহপাঠী অজিত কুমার রায় মুখার্জির প্রভাবে দুজনেই ত্রৎস্কিপন্থী হয়ে ওঠেন।

কলকাতার বাংলা মাসিক পূর্বাশা-য় লিখতেন কমলেশ। তরুণ কবি সঞ্জয় ভট্টাচার্য পত্রিকাটি সম্পাদনা করতেন; কংগ্রেস সোশ্যালিস্ট নেতা হুমায়ুন কবির ছিলেন এর পৃষ্ঠপোষক। কমলেশ নতুন পত্র-তেও লিখতেন, পরে পত্রিকাটির সম্পাদনার দায়িত্ব নেন। ১৯৩৯ সালে কলকাতার ত্রৎস্কিপন্থী গোষ্ঠীটি ‘বিপ্লবী সমাজতন্ত্রী লীগ’ (Revolutionary Socialist League) নামে আত্মপ্রকাশ করে। পরবর্তীকালে যুক্তপ্রদেশ ও বিহারের বলশেভিক-লেনিনবাদী পার্টি, বলশেভিক মজদুর পার্টি এবং সিংহলের কয়েকজন ত্রৎস্কিপন্থীর সঙ্গে এই গোষ্ঠী ঐক্যবদ্ধ হয়। ১৯৪২ সালের মধ্যে এই ঐক্যের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠে সর্বভারতীয় বলশেভিক-লেনিনবাদী পার্টি অফ ইন্ডিয়া। ১৯৪২ সালের আগস্ট আন্দোলনে এই পার্টি উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেছিল।

মির্জার প্রবন্ধটি প্রথম প্রকাশিত হয় WIL-এর মুখপত্রে। WIL ছিল ব্রিটেনের ত্রৎস্কিপন্থী গোষ্ঠীগুলির মধ্যে অন্যতম, যা পরবর্তীকালে রেভলিউশনারি কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে মিশে যায়। এই রাজনৈতিক যাত্রাপথের একটি বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে। ১৯৪৩ সালে কমিন্টার্নের বিলুপ্তির আগে পর্যন্ত মির্জা ত্রৎস্কিপন্থীদের এই সিদ্ধান্ত মেনে নেননি যে সেই আন্তর্জাতিক ইতিমধ্যেই মৃত। কমিন্টার্নের বিলুপ্তি তাঁকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছিল। কিন্তু বিস্ময় ও হতাশায় থেমে না থেকে তিনি ঘটনাগুলি খতিয়ে দেখেন। শেষ পর্যন্ত তাঁর উপলব্ধি হয়, কমিন্টার্নের এই পরিণতিকে স্তালিনের রাজনৈতিক লাইন থেকে আলাদা করে বোঝা সম্ভব নয়।

কমিন্টার্ন প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য কী ছিল?

১৯১৯ সালের ১৫ মার্চ লেনিন ও বলশেভিক পার্টি কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠা করেন। উদ্দেশ্য ছিল আন্তর্জাতিক সমাজতন্ত্রের বিকাশে সাহায্য করা এবং বিশ্ববিপ্লবকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া। লেনিন স্পষ্ট করে দিয়েছিলেন, সারা পৃথিবীতে পুঁজিবাদের উচ্ছেদ এবং সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত না হওয়া পর্যন্ত আন্তর্জাতিকের কাজ শেষ হবে না। কমিন্টার্নের নিজস্ব সংবিধানেও এই লক্ষ্য ঘোষিত হয়েছিল।

কমিন্টার্ন নিজেকে কমিউনিস্ট পার্টিগুলির একটি আন্তর্জাতিক সংঘ হিসেবেই সীমাবদ্ধ রাখেনি। তার লক্ষ্য ছিল একটি ‘বিশ্ব কমিউনিস্ট পার্টি’ হিসেবে বিশ্বজুড়ে শ্রমিক শ্রেণি ও দরিদ্র কৃষকদের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশকে বিপ্লবের পক্ষে জয় করা। বিশ্বব্যাপী প্রলেতারীয় একনায়কত্ব প্রতিষ্ঠা, সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত প্রজাতন্ত্রগুলির বিশ্ব ইউনিয়ন গঠন, শ্রেণিবিভক্ত সমাজের অবসান এবং সাম্যবাদের প্রথম পর্যায়ে উত্তরণ, এসবই ছিল তার ঘোষিত লক্ষ্য। আন্তর্জাতিকের সর্বোচ্চ কর্তৃপক্ষ ছিল বিশ্ব কংগ্রেস, যার প্রতি দুই বছর অন্তর বসার কথা। কর্মসূচি ও সাংগঠনিক নিয়মাবলি পরিবর্তন করার অধিকারও ছিল একমাত্র এই কংগ্রেসের।

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট: এই অংশে মূল প্রবন্ধের বাইরে একটি বিষয় যোগ করা জরুরি। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময়, ১৯১৪ সালে, দ্বিতীয় আন্তর্জাতিকের প্রধান পার্টিগুলি নিজ নিজ দেশের বুর্জোয়া শ্রেণির পাশে দাঁড়িয়েছিল। আন্তর্জাতিক শ্রমিক সংহতির পরিবর্তে তারা সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধের সমর্থনে এগিয়ে আসে। এই বিশ্বাসঘাতকতার অভিজ্ঞতা থেকেই নতুন বিপ্লবী আন্তর্জাতিক গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা সামনে আসে।

লেনিনের কাছে সোভিয়েত প্রজাতন্ত্র নিজেই চূড়ান্ত লক্ষ্য ছিল না; সেটি ছিল বিশ্ববিপ্লবের অগ্রগতির একটি ঘাঁটি। লেনিনের মৃত্যুর পর স্তালিনও তাঁর শপথবাক্যে কথাটি স্বীকার করেছিলেন। ১৯২৪ সালের ৩০ জানুয়ারি প্রাভদা-য় প্রকাশিত সেই শপথের সম্পূর্ণ অংশই মির্জা উদ্ধৃত করেন। সেখানে বলা হয়েছিল, লেনিন ‘কখনও সোভিয়েত প্রজাতন্ত্রকে চূড়ান্ত লক্ষ্য হিসেবে দেখেননি’; বরং একে দেখেছিলেন ‘সমগ্র বিশ্বের শ্রমজীবী মানুষের পুঁজির বিরুদ্ধে বিজয়কে সহজতর করার একটি অপরিহার্য সংযোগসূত্র’ হিসেবে। অর্থাৎ সোভিয়েত রাষ্ট্রের অস্তিত্বের উদ্দেশ্য ছিল বিশ্ববিপ্লবকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া। কমিন্টার্ন সেই কাজেরই আন্তর্জাতিক সংগঠন। তাকে সোভিয়েত রাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতির অধীনস্থ একটি কূটনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে দেখার কোনও অবকাশ ছিল না। বরং বিশ্ব প্রলেতারিয়েতের বিপ্লবী পার্টি হিসেবে কমিন্টার্নের বিকাশের উপরই সোভিয়েত রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নির্ভর করত।

১৯১৯ সালের মার্চে রাশিয়ায় গৃহযুদ্ধ চলছে, তেরোটি বিদেশি সেনাবাহিনী সোভিয়েত রাষ্ট্র আক্রমণ করেছে, আর বলশেভিকদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে মস্কোর আশপাশের সামান্য একটি অঞ্চল। দেশটি অর্থনৈতিকভাবে পশ্চাৎপদ, শিল্পায়ন প্রায় হয়ইনি। মির্জার তুলনা অনুযায়ী, হিটলারের সেনাবাহিনী যখন স্তালিনগ্রাদে পৌঁছেছিল, তার চেয়েও ভয়াবহ ছিল কমিন্টার্ন প্রতিষ্ঠার সময়কার পরিস্থিতি। এমন পরিস্থিতিতেও লেনিন ও বলশেভিকরা আন্তর্জাতিক গড়ে তুলেছিলেন। কারণ, তাঁরা ভরসা রেখেছিলেন পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের শ্রমিকদের শ্রেণিসংগ্রামের ক্ষমতার উপর, ‘চার্চিল, রুজভেল্ট ও অন্যান্য শ্রেণিশত্রুদের’ উপর নয়। এই আস্থার বাস্তব ভিত্তিও ছিল। জলি জর্জ-সহ বিভিন্ন জাহাজের যাত্রা আটকে দেওয়া, কৃষ্ণসাগরে ফরাসি নৌবাহিনীর জাহাজগুলিতে বিদ্রোহ এবং সোভিয়েত রাশিয়া আক্রমণকারী সেনাদের সঙ্গে বলশেভিকদের ভ্রাতৃত্ব স্থাপনের ঘটনা বিদেশি হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। মির্জার মতে, এই পদক্ষেপগুলিই সোভিয়েত ইউনিয়নকে রক্ষা করেছিল। বিপ্লবী আন্তর্জাতিকতাবাদ তাই নিছক আদর্শগত অঙ্গীকার ছিল না। বিপ্লবকে রক্ষা করার সবচেয়ে কার্যকর উপায়ও ছিল সেটিই।

ঔপনিবেশিক দেশগুলির মানুষের কাছেও সোভিয়েত ইউনিয়ন ও কমিন্টার্ন ছিল শ্রদ্ধা, আশা ও রাজনৈতিক পথনির্দেশের কেন্দ্র। শত শত ভারতীয় সরাসরি সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপনের চেষ্টা করেছিলেন। নানা ভুল-বোঝাবুঝি ও হতাশা সত্ত্বেও ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টি কমিন্টার্নের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখেছিল। তবে তাকে ব্রিটিশ কমিউনিস্ট পার্টির মাধ্যমে কাজ করতে হতো।

২২ মে ১৯৪৩: কমিন্টার্নের বিলুপ্তি

১৯৪৩ সালের ২২ মে কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিকের কার্যনির্বাহী কমিটি (ECCI) আন্তর্জাতিককে বিলুপ্ত করার সুপারিশ করে। এই সিদ্ধান্তের পক্ষে যে যুক্তিগুলি দেওয়া হয়েছিল, মির্জা সেগুলিকে একে একে খণ্ডন করেন।

১. ‘মৌলিক লক্ষ্যগুলি অর্জিত হয়েছে’

কমিন্টার্নের লক্ষ্য যদি সত্যিই অর্জিত হয়ে থাকে, তবে পৃথিবীর বাস্তব পরিস্থিতি কীভাবে ব্যাখ্যা করা হবে? পুঁজিবাদ তখনও বিশ্বজুড়ে আধিপত্য বিস্তার করে রয়েছে। সাম্রাজ্যবাদ ও ফ্যাসিবাদের শোষণ-দমনের শৃঙ্খলে শ্রমজীবী মানুষ বরং আগের চেয়েও বেশি আবদ্ধ। কমিন্টার্নের ঘোষিত লক্ষ্য ছিল বিশ্বব্যাপী প্রলেতারীয় একনায়কত্ব ও সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা। তার কোনওটিই অর্জিত হয়নি। তাহলে কোন যুক্তিতে বলা যায়, আন্তর্জাতিকের আর প্রয়োজন নেই?

২. আন্তর্জাতিককে বিলুপ্ত করার অধিকার কার ছিল?

কমিন্টার্নের নিজস্ব সংবিধান অনুযায়ী, কর্মসূচি ও নিয়মাবলি পরিবর্তন করার অধিকার ছিল একমাত্র বিশ্ব কংগ্রেসের। ফলে আন্তর্জাতিককে বিলুপ্ত করার সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাও কেবল বিশ্ব কংগ্রেসের ছিল। অথচ যে ECCI-এর হাতে এই ক্ষমতা ছিল না, তারাই কার্যত আন্তর্জাতিককে বিলুপ্ত করে দিল। সাংগঠনিক নিয়মের দিক থেকেও এই সিদ্ধান্ত ছিল অবৈধ।

৩. ‘যুদ্ধের সময় কংগ্রেস করা কঠিন’

যুদ্ধের পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিকের কংগ্রেস করা সম্ভব নয়, এই যুক্তিও মির্জার কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। ১৯১৯ থেকে ১৯২১ সালের মধ্যে গৃহযুদ্ধ ও বিদেশি হস্তক্ষেপের চরম প্রতিকূলতার মধ্যেই পাঁচটি কংগ্রেস অনুষ্ঠিত হয়েছিল। অথচ পরবর্তী তথাকথিত শান্তির সময়ে সংবিধানে নির্ধারিত প্রতি দুই বছর অন্তর কংগ্রেস করার নিয়মই পরিত্যক্ত হয়। ১৯২৪ সালের পঞ্চম কংগ্রেস ECCI-কে এমন কোনও অনুমতি দেয়নি যে ষষ্ঠ কংগ্রেসকে ১৯২৮ সাল ও সপ্তম কংগ্রেসকে ১৯৩৫ সাল পর্যন্ত পিছিয়ে রাখা যাবে।

৪. ‘কমিউনিস্ট পার্টিগুলি পরিণত হয়েছে’

ব্রিটিশ কমিউনিস্ট পার্টির অভিজ্ঞতা থেকে মির্জা এই যুক্তিকেও অসার বলে ব্যাখ্যা করেন। তাঁর মতে, একটি সত্যিকারের পরিণত কমিউনিস্ট পার্টি গণভিত্তি অর্জন করবে, শ্রমিক শ্রেণির মধ্যে প্রভাব বিস্তার করবে এবং বিপ্লবের নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষমতা অর্জন করবে। ব্রিটিশ পার্টি সেই পথে এগোয়নি। ভারতে তার সংকীর্ণতাবাদী ট্রেড ইউনিয়ননীতি, শ্রমিক ও কৃষকদের মধ্যে পৃথক পার্টি গড়ে তোলার নামে অনুসৃত সংকীর্ণতাবাদী অবস্থান এবং জাতীয় মুক্তি আন্দোলনের প্রতি ভুল দৃষ্টিভঙ্গি ছিল তার ব্যর্থতার গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত। বেন ব্র্যাডলি-সহ পার্টির অন্য নেতারাও এই ভুলগুলি স্বীকার করেছিলেন। পার্টি কখনও দক্ষিণপন্থী, কখনও বামপন্থী বিচ্যুতির মধ্যে দোদুল্যমান থেকেছে। সদস্যসংখ্যা ছিল অল্প, সাধারণ জনগণের মধ্যে তার প্রতি আস্থাও ছিল সামান্য। মির্জার হিসাব অনুযায়ী, তখন পার্টিতে যত সদস্য ছিল, তার অন্তত দ্বিগুণ ইতিমধ্যেই পার্টি ছেড়ে চলে গিয়েছিল।

একটি সত্যিকারের পরিণত পার্টি যদি গড়ে উঠত, তবে তা গণপার্টিতে পরিণত হতো এবং হয়তো যুদ্ধ প্রতিরোধ করত। বাস্তবে ঘটেছিল ঠিক উল্টোটা। আমেরিকান কমিউনিস্ট পার্টি নিজেকেই বিলুপ্ত করে দেয়। তারা ‘শ্রমিক, কৃষক ও পুঁজির’ মধ্যে সহযোগিতার কথা বলে, খোলাবাজার অর্থনীতিকে সমর্থন করে এবং পুঁজিবাদী গণতন্ত্রকে স্বয়ং চূড়ান্ত লক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করে। যুদ্ধের পরে ‘গৃহযুদ্ধ’ এড়ানোর অজুহাতে এই অবস্থান নেওয়া হয়েছিল। মস্কো, কায়রো ও তেহরান সম্মেলনের পর এই রাজনৈতিক লাইন আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ব্রিটিশ কমিউনিস্ট পার্টির ডেইলি ওয়ার্কার এই অবস্থানকে সমর্থন করে। পার্টির নেতা হ্যারি পলিট তো ওই সম্মেলনগুলিকে অক্টোবর বিপ্লবের চেয়েও বড় ঘটনা বলে প্রশংসা করেছিলেন।

এই অবস্থানের বিপরীতে মির্জা লেনিন ও বলশেভিকদের শিক্ষার কথা স্মরণ করিয়ে দেন। পুঁজিবাদী রাষ্ট্র যখন শ্রমিক শ্রেণির সংগ্রামকে দমন করতে এগিয়ে আসে, তখন সংঘাতের পরিণতি গৃহযুদ্ধের দিকে গড়াতে পারে। বিপ্লবী নেতৃত্বের কাজ শ্রমিকদের সেই সম্ভাব্য সংঘাতের জন্য প্রস্তুত করা, শ্রেণিসংগ্রামকে জয়ী করার মতো সংগঠন ও নেতৃত্ব গড়ে তোলা। সংস্কারবাদী বিশ্বাসঘাতক ম্যাকডোনাল্ড ও কাউৎস্কির মতো শান্তিপূর্ণ পথের অলীক প্রতিশ্রুতি দিয়ে শ্রমিকদের সংগ্রাম থেকে সরিয়ে নেওয়া নয়।

কমিন্টার্নের বিলুপ্তির গভীরতর কারণ: জাতীয়তাবাদী অধঃপতন

কেবল বিচ্ছিন্ন প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়, মির্জার মতে, সোভিয়েত ইউনিয়নের অভ্যন্তরে ঘটে যাওয়া মৌলিক রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবর্তনগুলির সঙ্গে এই সিদ্ধান্তের অঙ্গাঙ্গি সম্পর্ক ছিল।

তিনি কয়েকটি পরিবর্তনের দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।

  • লাল ফৌজের পুনর্গঠন:  সেনাবাহিনীকে পুঁজিবাদী কাঠামোর আদলে পুনর্গঠন করা হয়। একটি বিশেষ সুবিধাভোগী অফিসার শ্রেণি গড়ে ওঠে। ব্রিটেন ও আমেরিকার তুলনায় বেতন ও সুযোগ-সুবিধার বৈষম্য অনেক বেড়ে যায়। জারতন্ত্রের আমলের মতো সামরিক পোশাক ও পদক চালু হয়, সঙ্গে আসে ‘প্রুশীয় শৃঙ্খলা’।

  • ‘সোভিয়েত কোটিপতিদের’ প্রশংসা:  ডেইলি ওয়ার্কার এবং রেগ বিশপের একটি পুস্তিকায় ‘সোভিয়েত কোটিপতিদের’ প্রশংসা করা হয়। মির্জার চোখে এটি ছিল মজুরি ও সুযোগ-সুবিধার তীব্র বৈষম্যেরই লক্ষণ।

  • অর্থোডক্স চার্চকে রাষ্ট্রের স্বীকৃতি:  মার্কসবাদীরা ধর্মীয় স্বাধীনতার পক্ষে থাকলেও, মির্জার মতে, রাষ্ট্রের এই পদক্ষেপ বলশেভিকদের আপসহীন ধর্মবিরোধী অবস্থান থেকে বিচ্যুতির পরিচায়ক।

  • সহশিক্ষার অবসান ও উচ্চশিক্ষায় ফি চালু:  শিক্ষাক্ষেত্রেও এই পরিবর্তনগুলি সমাজতান্ত্রিক আদর্শ থেকে সরে যাওয়ার লক্ষণ হিসেবে দেখা দেয়।

  • আন্তর্জাতিক সংগীতের পরিবর্তে জাতীয় সংগীত:  আন্তর্জাতিক প্রলেতারীয় সংহতির প্রতীককে সরিয়ে জাতীয় প্রতীককে প্রতিষ্ঠা করা হয়।

এই পরিবর্তনগুলিকে একত্রে বিচার করে মির্জার সিদ্ধান্ত, সোভিয়েত শাসকরা আর সোভিয়েত ইউনিয়নকে বিশ্ববিপ্লবের দুর্গ হিসেবে দেখছিলেন না। তাঁরা তাকে একটি স্বতন্ত্র জাতিরাষ্ট্র হিসেবে বিবেচনা করতে শুরু করেছিলেন। জাতীয় স্বার্থের নামে সমাজতন্ত্রকে আমলাতন্ত্রের তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক লাভের অধীনস্থ করা হচ্ছিল। এর অর্থ ছিল, ‘অক্টোবর বিপ্লবের সমগ্র মতাদর্শটিকে উল্টে দেওয়া’। কমিন্টার্নের বিলুপ্তি এই জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক লাইনেরই অনিবার্য পরিণতি। সোভিয়েত রাষ্ট্রের উপর ক্রমশ কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা আমলাতন্ত্র কমিন্টার্নকে বিশ্ববিপ্লবের সংগঠন হিসেবে নয়, বরং মিত্র সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলির সঙ্গে কূটনৈতিক দর-কষাকষির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে শুরু করেছিল। আন্তর্জাতিককে বিলুপ্ত করা ছিল সেই অধঃপতনেরই চূড়ান্ত প্রকাশ।

ভারতের অভিজ্ঞতা: ঔপনিবেশিক প্রশ্নে স্তালিনবাদের পরীক্ষা

মির্জা তাঁর যুক্তির সত্যতা যাচাই করেন ঔপনিবেশিক মুক্তিসংগ্রামের প্রশ্নে। সোভিয়েত ইউনিয়ন যখন জাতিপুঞ্জে যোগ দেয় এবং ফ্রান্স, ব্রিটেন ও অন্যান্য পুঁজিবাদী রাষ্ট্রের সঙ্গে জোট গড়ে তোলে, তখন ঔপনিবেশিক দেশগুলির সংগ্রামকে খর্ব করে স্তালিনবাদী আমলাতন্ত্রের স্বার্থের অধীনস্থ করা হয়। ভারতের অভিজ্ঞতা থেকেই তিনি এই রাজনৈতিক পরিবর্তনের কয়েকটি দৃষ্টান্ত তুলে ধরেন।

১. সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী সংগ্রামকে গুটিয়ে নেওয়া

১৯২৭ সালে লীগ এগেনস্ট ইম্পিরিয়ালিজম প্রতিষ্ঠায় ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস অংশগ্রহণ করে এবং ১৯২৮ সালে সংগঠনটির সঙ্গে যুক্ত হয়। ECCI, ব্রিটিশ কমিউনিস্ট পার্টি ও আর. পি. দত্ত এই পদক্ষেপকে সমর্থন করেছিলেন। কিন্তু ১৯৩০-এর দশকের মাঝামাঝি সংগঠনটি ভেঙে দেওয়া হয়। তার সঙ্গে সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী সংগ্রাম ও যুদ্ধবিরোধী আন্দোলনকেও গুটিয়ে নেওয়া হয়। অথচ যুদ্ধ শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ভারতীয় শ্রমিক শ্রেণি তার যুদ্ধবিরোধী মনোভাব স্পষ্ট করেছিল। বোম্বাইয়ের ৮০ হাজার শ্রমিক রাজনৈতিক ধর্মঘটে অংশ নেন। এই ঘটনা দেখায়, শ্রমিকদের মধ্যে সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধের বিরুদ্ধে সংগ্রামের বাস্তব সম্ভাবনা ছিল। কিন্তু কমিউনিস্ট নেতৃত্ব সেই সম্ভাবনাকে বিপ্লবী পথে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার পরিবর্তে গুটিয়ে নেওয়ার পথেই হাঁটল।

২. জাতীয় মুক্তি ও কৃষিবিপ্লবের প্রশ্নে দ্বিচারিতা

১৯৩৫ সালের আগস্টে অনুষ্ঠিত কমিন্টার্নের সপ্তম কংগ্রেসে ওয়াং মিং ভারতীয় কমিউনিস্টদের বলেছিলেন, তাঁরা জনগণকে বিজয়ী সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী ও কৃষিবিপ্লবের পথে নেতৃত্ব দিতে পারেন। আর. পি. দত্ত তাঁর   India To-day বইয়ের উপসংহারে লিখেছিলেন, নির্ণায়ক সংগ্রাম আসন্ন এবং ভারতের স্বাধীনতার সঙ্গে ব্রিটিশ শ্রমিক শ্রেণির সংগ্রামের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। কিন্তু এই বিপ্লবী সম্ভাবনার সঙ্গে বাস্তবে অনুসৃত রাজনৈতিক লাইনের বিরোধ ছিল তীব্র। স্বাধীনতা ও সাম্রাজ্যবাদের উচ্ছেদকে অবিলম্বে সংগ্রামের কেন্দ্রে আনার পরিবর্তে কমিউনিস্ট নেতৃত্ব ক্রমশ এমন এক সমঝোতার পথে এগোয়, যা ঔপনিবেশিক শাসনের অবসানকে পিছিয়ে দেয়।

৩. ‘জাতীয় সরকার’: কোন শ্রেণির স্বার্থে?

এই পরিবর্তনের একটি স্পষ্ট উদাহরণ বেন ব্র্যাডলির বক্তব্য। ১৯৪২ সালের ২৫ এপ্রিল   World News & Views পত্রিকায় তিনি কংগ্রেসের ‘জাতীয় সরকার’-এর দাবির প্রতি সমর্থন জানান। যুদ্ধ শেষ না হওয়া পর্যন্ত প্রধান রাজনৈতিক প্রশ্নগুলি স্থগিত রাখতে ‘সমস্ত অংশ’ সম্মত হয়েছে, এই বিষয়টিকেও তিনি ইতিবাচকভাবে তুলে ধরেন। মির্জা প্রশ্ন করেন, সেই প্রধান প্রশ্নগুলি আসলে কী ছিল? ভারতের স্বাধীনতা এবং ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের উচ্ছেদ। এই প্রশ্নগুলিকেই যুদ্ধ শেষ হওয়া পর্যন্ত পিছিয়ে দেওয়ার অর্থ ছিল ঔপনিবেশিক শাসনের অবসানের সংগ্রামকে স্থগিত রাখা। ‘জাতীয় সরকার’-এর স্লোগান সর্বজনীন ভোটাধিকারের ভিত্তিতে গণপরিষদ গঠনের লেনিনবাদী উত্তরণকালীন দাবিকে সরিয়ে দিয়েছিল।

কেমন হতো সেই জাতীয় সরকার? দেশীয় রাজন্যবর্গ, কংগ্রেস, মুসলিম লীগ, উদারপন্থী, হিন্দু মহাসভা এবং কমিউনিস্টদের নিয়ে একটি জোট। অর্থাৎ পরস্পরবিরোধী শ্রেণিস্বার্থের প্রতিনিধিদের একই সরকারে সামিল করা। মির্জার মতে, এই ধরনের সরকার তার অভ্যন্তরীণ শ্রেণিবিরোধের কারণে দুর্বল থাকত এবং শেষ পর্যন্ত ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ত। এখানেই জনপ্রিয় ফ্রন্টের রাজনীতির মৌলিক সমস্যা। জাতীয় ঐক্যের নামে শ্রমিক শ্রেণিকে বুর্জোয়া ও অন্যান্য শাসকশ্রেণির অংশের সঙ্গে একই রাজনৈতিক কাঠামোয় বেঁধে ফেলা। স্বাধীন শ্রেণিরাজনীতির পরিবর্তে শ্রেণি-সমঝোতাকে অগ্রাধিকার দেওয়া। এর ফলে সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী সংগ্রামের লক্ষ্যই আপসের শিকার হয়।

৪. ‘জনযুদ্ধ’ লাইন কার স্বার্থ রক্ষা করেছিল?

ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টির উপর চাপিয়ে দেওয়া ‘জনযুদ্ধ’ (People’s War) লাইনও মির্জার সমালোচনার কেন্দ্রে ছিল। তাঁর মতে, এই নীতি কার্যত ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের স্বার্থ রক্ষা করেছিল। ভারত অক্ষশক্তির দখলে চলে গেলেও ব্রিটিশ শাসকরা যে নিজেদের ঔপনিবেশিক কর্তৃত্ব শিথিল করতে রাজি ছিল না, তা স্পষ্ট। অথচ কমিউনিস্ট পার্টিকে এমন একটি রাজনৈতিক লাইনে পরিচালিত করা হয়, যাতে ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে স্বাধীনতাসংগ্রামকে গৌণ করে যুদ্ধকালীন ঐক্যকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। এর সঙ্গে মুসলিম লীগের সঙ্গে ঐক্য স্থাপনের দাবিও যুক্ত হয়। মির্জা স্মরণ করিয়ে দেন, আর. পি. দত্ত নিজেই লিখেছিলেন যে মুসলিম লীগ ব্রিটিশদের মদতে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল জাতীয় ফ্রন্টকে বিভক্ত করার উদ্দেশ্যে। তা সত্ত্বেও ‘জনযুদ্ধ’ লাইনের ফলে ‘জনস্বেচ্ছাসেবক’ (People’s Volunteers) বাহিনী মুসলিম লীগ কর্মীদের পাশাপাশি কাজ করতে থাকে। ঢাকার মতো জায়গায় স্থানীয় লীগ মন্ত্রিসভার অধীনে এই বাহিনীগুলি মুসলিম লীগের ‘এসএস’-এর মতো ভূমিকা পালন করেছিল বলে মির্জা অভিযোগ করেন।

প্রথমদিকে মির্জা ও তাঁর সহযোদ্ধারা এই অবস্থানকে সৎ উদ্দেশ্য থেকে উদ্ভূত একটি ভুল বলে ভেবেছিলেন। কিন্তু পরবর্তী ঘটনাবলি তাঁদের কাছে বিষয়টি স্পষ্ট করে দেয়। এই নীতি কোনও বিচ্ছিন্ন ভুল ছিল না। স্তালিনের বৃহত্তর রাজনৈতিক লাইনেরই প্রতিফলন ছিল। যুদ্ধের পরে ‘বিশৃঙ্খলা’ ও গৃহযুদ্ধ ঠেকানোর অজুহাতে পুঁজিবাদের সঙ্গে পূর্ণ সহযোগিতার পথ তৈরি করাই ছিল সেই লাইনের উদ্দেশ্য। এভাবে ভারতের জাতীয় মুক্তিসংগ্রামকে মস্কো আমলাতন্ত্রের কূটনীতির স্বার্থে অধীনস্থ করা হয়। ঔপনিবেশিক জনগণের মুক্তির আকাঙ্ক্ষা এবং শ্রমিক শ্রেণির বিপ্লবী সম্ভাবনাকে পিছনে ঠেলে দেওয়া হয় সোভিয়েত আমলাতন্ত্রের তাৎক্ষণিক স্বার্থের জন্য।

উপসংহার: কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিক তার পরেও বেঁচে ছিল

একজন বিপ্লবীর কাছে দুটি বিষয় মৌলিক: শ্রমিক শ্রেণির স্বার্থের প্রতি অবিচল আনুগত্য এবং সমগ্র পৃথিবীতে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত না হওয়া পর্যন্ত শ্রেণিসংগ্রাম চালিয়ে যাওয়ার দৃঢ় প্রত্যয়। মির্জার মতে, যে পার্টি পুঁজিবাদকে কার্যকর ও স্থিতিশীল করে তোলার উদ্দেশ্যে যুদ্ধোত্তর সহযোগিতার প্রচার করে, যে পার্টি পুঁজিবাদ ও সমাজতন্ত্রের মধ্যে ‘শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান ও সহযোগিতা’র কথা বলে, সেই পার্টি এই দুই পরীক্ষাতেই ব্যর্থ। কমিন্টার্নের বিলুপ্তি আন্তর্জাতিক প্রলেতারীয় বিপ্লবের ঐতিহ্যের অবসান ঘটাতে পারেনি। মির্জার উপসংহার, বলশেভিক পার্টির নেতৃত্বে কমরেড লেনিন যে ‘প্রকৃত কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিক’ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, তা চতুর্থ আন্তর্জাতিকের মধ্যে সেদিনও বেঁচে ছিল।



Sankalpa

About the Author

Sankalpa

মজদুরের নিয়মিত লেখক

শিক্ষার্থী

বই পড়ি, প্রশ্ন করি, তর্ক করি। সাহিত্য, ইতিহাস আর রাজনীতি নিয়ে ভাবতে ভালোবাসি। বিশেষ করে সমাজকে তার অন্তর্নিহিত দ্বন্দ্ব, পরিবর্তন ও সম্ভাবনার মধ্য দিয়ে বোঝার চেষ্টা করি। জটিল বিষয়কে সহজ করে বোঝার চেয়ে, তাকে গভীরভাবে বোঝার চেষ্টাটাকেই বেশি মূল্য দিই।

প্রোফাইল দেখুন

মতামত

এখনও কোনো মতামত নেই।

প্রথম মতামতটি আপনিই দিন।

আলোচনায় অংশ নিতে লগ ইন করুন অথবা এ্যাকাউন্ট খুলুন

Reading

Font size

Auto scroll
Slow Fast