সকল লেখা জানতে চাই
Searching…

জোনাকির আলো অন্ধকার নুসরাত রুষা

শহরের ব্যস্ততা ছেড়ে নরসিংদীর এক নিভৃত রেস্টুরেন্টে অধরার পরিচয় হয় রাজীবের সাথে। শিল্প, সাহিত্য ও প্রকৃতির মাঝে গড়ে তোলা সেই রেস্টুরেন্টটি যেন এক স্বপ্নের জগত। কিন্তু সেই নান্দনিকতার আড়ালে লুকিয়ে ছিল এক নির্মম বাস্তবতা। রাজীবের গ্রেফতার ও পরবর্তী চিঠিতে উন্মোচিত হয় পুঁজিবাদী সমাজে টিকে থাকার কঠিন লড়াই।

Nusrat Rusha
পড়তে 6 মিনিট লাগতে পারে
এই লেখাটি 59 বার পড়েছে
জোনাকির আলো অন্ধকার
নুসরাত রুষা

অধরা, ক্যামেরার লেন্স দিয়ে সময়কে ধরে রাখতে চায় আর শব্দ দিয়ে ব্যাখ্যা করতে চায় সমাজকে। শহরের ব্যস্ততা, আন্দোলন, ক্যাম্পাসের তর্ক-বিতর্ক সব মিলিয়ে তার জীবন যেন একটানা ছুটে চলা। কিন্তু মাঝে মাঝে ক্লান্তি অনুভব করে। তখনই মনে পড়ে, ফিরে যাওয়া দরকার নিজের কাছে, নিজের জায়গায়।

পূজার ছুটিতে সে তাই নরসিংদীর বাড়িতে আসে। ট্রেনের জানালার পাশে বসে শহরের কংক্রিট ধীরে ধীরে মিলিয়ে যাচ্ছে সবুজে। মাঠ, নদী, খোলা আকাশ সব যেন তাকে ধীরে ধীরে টেনে নিচ্ছে এক অন্য শান্তির ভেতরে। ঠিক তখনই ফোন বেজে ওঠে। অপর প্রান্তে রাহুল, পত্রিকার সম্পাদক। অধরার লেখা তার পত্রিকায় নিয়মিত ছাপা হয়, পরিচয় আছে, কিন্তু সামনাসামনি কখনো দেখা হয়নি।

রাহুল জানালো, সে নরসিংদীতে এসেছে এবং আশা করছে অধরা তাকে শহর ঘুরিয়ে দেখাবে। অধরা আনন্দের সঙ্গে রাজি হয়ে গেল।বিকেলে শহরের এক নিরিবিলি জায়গায় দেখা হয়। প্রথমে অস্বস্তি থাকলেও দ্রুত সেটা কেটে যায়। রাহুলের কথায় স্থিরতা, অধরার মধ্যে প্রাণচাঞ্চল্য। তারা ঠিক করে নাগইরাকান্দি ব্রিজে ঘুরতে যাবেন।

ব্রিজের ওপর দাঁড়িয়ে নদীর দিকে তাকালে মনে হয় সময় ধীরে বয়ে যাচ্ছে। বাতাসে অদ্ভুত শান্তি। ব্রিজের পাশে ছোট চায়ের দোকানে তারা বসে। দু’কাপ চা আসে। রাহুল উকুলেলে বাজায়। হালকা সুর ভেসে ওঠে বাতাসে। অধরা ক্যামেরা বের করে। এই মুহূর্তটাকে ধরে রাখতে চায়। গান, চা, কথার মধ্যে সময় গড়িয়ে যায়।

দূরে কয়েকজন মানুষ চলে যাচ্ছে অচেনা রাস্তা ধরে। অধরা অবাক। এতবার এই জায়গায় আসা, অথচ এই পথটা সে কখনো খেয়াল করেনি। কৌতূহল নিয়ে সে চা-ওয়ালাকে জিজ্ঞেস করে। চা-ওয়ালা বলে, “মামা, ওইদিকে একটা মাটির রেস্টুরেন্ট আছে। যান, ঘুরে আসেন।”

নদীর পাড় ধরে হাঁটতে হাঁটতে তারা পৌঁছে সেই রেস্টুরেন্টে। ছোট্ট ঘর, চারপাশে গাছপালা, ঝুলে থাকা হারিকেন, কুপি সব মিলিয়ে যেন সময় থেমে আছে। ভেতরে ঢুকেই অধরা থমকে দাঁড়ায়। চারপাশে বই, পুরোনো ক্যামেরা, ক্যাসেট, নানা জিনিস। স্থানটা যেন এক স্মৃতির ভাণ্ডার।

হঠাৎ তার চোখে পড়ে এক কাসেট। সে হাতে তুলে নেয়। চোখে বিস্ময়, তারপর আনন্দ। এই কাসেটটাই সে অনেকদিন ধরে খুঁজছিল। অধরা রেস্টুরেন্টের মালিক রাজীবের কাছে এগুলো আপনার কি না জানতে চাইল। রাজীব কিছুক্ষণ চুপচাপ অধরার দিকে তাকিয়ে থাকলেন, তারপর হেসে বললেন, ‘হ্যাঁ… আপনি একটি নিতে চাইলে নিতে পারেন। অধরা অবাক হয়ে হাসে। সে ক্যাসেট হাতে নেয়, চোখে আনন্দ ও কৃতজ্ঞতার আলো।

রাত নেমে এসেছে। রেস্টুরেন্টের মাচায় বসে চা খায়। সামনে নদী, চারপাশে জোনাকি। কথা কম, কিন্তু অনেক কিছু বলা হয়ে যাচ্ছে। এই মুহূর্তটি তার মনে গভীর ছাপ ফেলে।

কয়েকদিন পর অধরা আবার সেই রেস্টুরেন্টে আসে। এবার সে একা। রেস্টুরেন্টটি এখনও বন্ধ। সাইবোর্ডে লেখা নাম্বার দেখে কল দেয়, কিন্তু কেউ রিসিভ করে না। অধরা এক ঘন্টা রোদে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করে। এক ঘন্টা পর রাজীব কল ব্যাক করে জানায়, সে আসছে এবং অধরাকে ব্রিজের কাছে চায়ের দোকানে অপেক্ষা করতে বলে।

অধরা চায়ের দোকানে বসে প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করতে থাকে। সে দেখে নদীতে ছোটো ছোটো বাচ্চারা গোসল করছে, আর কিছু ছেলে স্কুল ফাঁকি দিয়ে দোকানে এসে সিগারেট কিনে খাচ্ছে। অধরা ভাবতে থাকে কত কম বয়সেই এই শিশুরা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। সে চা-ওয়ালাকে কঠোর স্বরে প্রশ্ন করে, “আপনি বাচ্চাদের কাছে সিগারেট বিক্রি করেন কেন?” দোকানদার শান্ত স্বরে উত্তর দেয়, “আমি বিক্রি না করলেও ওরা অন্য দোকান থেকে ঠিকই কিনে খাবে।”

পরক্ষণেই রাজীব আসে, পুরনো দিনের বাইকে অধরাকে পিছনে বসিয়ে রেস্টুরেন্টে নিয়ে যায়। ক‍্যাসেট দেওয়ার কৃতজ্ঞতা স্বরূপ, রাজীবকে অধরা  রেস্টুরেন্টের লাইব্রেরিতে কিছু বই উপহার দিতে চায়। অধরা খাবার অর্ডার দেয়, আর রেস্টুরেন্টের বিড়াল ও ময়না পাখির সঙ্গে খুনসুটি করতে শুরু করে। সে প্রকৃতির কিছু ছবি তুলেও রাখে। তখন ছিল শরৎকাল, চারপাশে নদীর পানি আর কাশফুলে ভরা।

রাজীব নিজে পিজ্জা বানিয়ে এনে অধরার সামনে পরিবেশন করে। অধরা বসে প্রশংসা করে, “আপনি সত্যিই সুন্দরভাবে এই জায়গা তৈরি করেছেন, নান্দনিকভাবে সব মিলিয়ে অসাধারণ।” রাজীব জানান, সে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছে, বাম রাজনীতিতে যুক্ত ছিল, তবে কিছু বছর ইংল্যান্ডে গিয়ে পুঁজিবাদী বিশ্বব্যবস্থার ওপর হতাশ হয়ে গ্রামে ফিরে এসেছে। রেস্টুরেন্টটি বিক্রি হয় না, শুধু প্রকৃতি আর বইয়ের মাধ্যমে শান্তি উপভোগ করার জন্য। সে বলে, “জীবন কি কয় দিনের, এত বুর্জোয়া জীবন লিড করলে লাভ কী?”

অধরা জানায়, সে দেশের বাইরে চলে যাবে। রাজীব কিছুক্ষণ চুপ থাকে এবং বলে, “আপনার মতো মানুষেরা যদি দেশ ছেড়ে চলে যায়, তাহলে দেশের ভবিষ্যৎ কী হবে? যান, তবে ফিরে আসিয়েন।” এই কথাটি শুনে অধরার মনে দুঃখের সৃষ্টি হয়। সে বুঝতে পারে, এদেশের সুন্দর প্রকৃতি ছেড়ে তাকে একদিন বিদেশে যেতে হবে, কারণ এই সমাজটা স্বাধীনচেতা মেয়েদের জন্য নয়।

রাজীব প্রশ্ন করে, “আপনার এলাকায় কি সত্যিই মুক্তিযোদ্ধাকে জুতার মালা দিয়ে ঘুরিয়েছে?” অধরা জানায়, “হ্যাঁ, রাজাকারদের অত্যাচারে মুক্তিযোদ্ধারা হেনস্থার শিকার হচ্ছে। রাজীব বললো দেশের তরুণ প্রজন্ম ইতিহাস জানে না। স্বাধীনতার বিরোধী শক্তি যা প্রচার করছে, নতুন প্রজন্ম সেটিই বিশ্বাস করছে। কেউ কেউ বলছে দুই হাজার মানুষ মারা গেছে একাওর সালে। ভারতের ষড়যন্ত্রে বাঙালি বিচ্ছিন্ন হওয়ার চেষ্টা করছে।”

অধরা মাথা নাড়েন, “হ্যাঁ।” এরপর তারা একসাথে চা খায়, নদীতে নৌকা ভ্রমণ করে, বিকেলে রাজীব বাইকে ব্রিজ পার করে দেয়। অধরার কাছে সেই দিনটি ভীষণ ভালো ছিল। সে ছবিগুলো ও অভিজ্ঞতা দিয়ে একটি ফিচার ও গল্প লিখে। গল্প প্রকাশ হবার পর অনেক মানুষ রেস্টুরেন্টটি দেখতে আসে।

একদিন অধরা তার এক ভার্সিটির বান্ধবীকে নিয়ে সেখানে যায়, কিন্তু রেস্টুরেন্টটি তালাবদ্ধ। চায়ের দোকানদার জানায়, রাজীব মাদক ব্যবসায় জড়িত থাকার কারণে গ্রেফতার হয়েছে। অধরা মন খারাপ করে ঢাকায় ফিরে আসে। সে বিশ্বাসই করতে পারে না যে, রাজীবের মতো সাহিত্যমনা একজন এই কাজ করতে পারে।

অনেক দিন পরে, হঠাৎ এক চিঠি আসে রাজীবের পক্ষ থেকে:

“প্রিয় অধরা,

পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থার কাছে আমি হেরে গেছি। অনেক চেষ্টা করেও আমার সিম্পল স্বপ্নের জীবন সম্ভব হয়নি। শুধু শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতির জন্য বাঁচলে এখানে না খেয়ে মরতে হয়।

ইতি, রাজীব।”

গল্প: নুসরাত রুষা, শিক্ষার্থী,ঢাকা বিশ্ববিদ‍্যালয়

#জোনাকির_আলো_অন্ধকার #বাংলা_গল্প #সাহিত্য #নুসরাত_রুষা #নরসিংদী #সমাজ_বাস্তবতা #গল্প #বাংলাদেশ
Nusrat Rusha

About the Author

Nusrat Rusha

Student Activist

প্রোফাইল দেখুন

মতামত

এখনও কোনো মতামত নেই।

প্রথম মতামতটি আপনিই দিন।

আলোচনায় অংশ নিতে লগ ইন করুন অথবা এ্যাকাউন্ট খুলুন

Reading

Font size

Auto scroll
Slow Fast