দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাস
বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাস এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। ১৮৭০ সালে ঢাকা জেলার বিক্রমপুরের তেলিরবাগ গ্রামে তাঁর জন্ম। শৈশব থেকেই তিনি অসাধারণ মেধা, প্রখর বুদ্ধিমত্তা এবং নেতৃত্বের গুণাবলির পরিচয় দেন। উচ্চশিক্ষার জন্য তাঁকে ইংল্যান্ডে পাঠানো হয়, যেখানে তিনি ইন্ডিয়ান সিভিল সার্ভিস (I.C.S.) পরীক্ষার প্রস্তুতি নেন। কিন্তু ব্রিটিশ শাসকদের ভারতবিদ্বেষী মনোভাব তাঁকে গভীরভাবে মর্মাহত করে। দেশের মর্যাদা ও আত্মসম্মানের প্রশ্নে তিনি সেই লোভনীয় সরকারি চাকরির পথ ত্যাগ করেন। দেশে ফিরে তিনি আইন পেশায় আত্মনিয়োগ করেন এবং অল্প সময়ের মধ্যেই একজন খ্যাতিমান ও সফল আইনজীবী হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করেন। জীবনের প্রথম পর্যায়ে তিনি সচ্ছল ও বিলাসবহুল জীবনযাপন করলেও দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ডাকে তাঁর জীবনে আসে এক আমূল পরিবর্তন। মহাত্মা গান্ধীর নেতৃত্বে অসহযোগ আন্দোলন শুরু হলে তিনি ব্যক্তিগত সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য ও বিলাসিতা পরিত্যাগ করে নিজেকে সম্পূর্ণরূপে দেশসেবার কাজে উৎসর্গ করেন। সরল জীবনযাপন, আত্মত্যাগ এবং জনগণের কল্যাণে নিরলস সংগ্রাম তাঁর জীবনের মূল আদর্শে পরিণত হয়। যদিও তাঁর রাজনৈতিক জীবন ছিল তুলনামূলকভাবে সংক্ষিপ্ত, তবুও সেই স্বল্প সময়ের মধ্যেই তিনি ভারতীয় রাজনীতিতে এক অনন্য উচ্চতা অর্জন করেন। তাঁর দূরদর্শী নেতৃত্ব, অসাম্প্রদায়িক চেতনা এবং জনগণের প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা তাঁকে ইতিহাসে ‘দেশবন্ধু’ হিসেবে অমর করে রেখেছে।
চিত্তরঞ্জন দাস ছিলেন মনেপ্রাণে অসাম্প্রদায়িক। তিনি বিশ্বাস করতেন যে, হিন্দু-মুসলিম ঐক্য প্রতিষ্ঠিত না হলে এবং উভয়ের সম্মিলিত প্রচেষ্টা না থাকলে বাংলা তথা ভারতবর্ষের রাজনৈতিক মুক্তি সম্ভব নয়। বাস্তববাদী এ রাজনীতিক ছিলেন মনে-প্রাণে বাঙালি। সমগ্র ভারতবর্ষের নেতা হলেও তিনি গর্ব করতেন একজন বাঙালি বলে। বাঙালি সংস্কৃতি, বাঙালি কৃষ্টি ও বাঙালি জীবনধারায় গভীরভাবে বিশ্বাসী এ দূরদৃষ্টিসম্পন্ন মানুষটি তাই বলেছিলেন যে, "নিজেকে আমি বাঙালি বলতে গর্ব অনুভব করি। বাঙালির রয়েছে নিজস্ব সাধনা, রয়েছে শাস্ত্র, কর্ম, ধর্ম, বীরত্ব, ইতিহাস এবং রয়েছে ভবিষ্যৎ। বাঙালিকে যে ঘৃণা করে, সে আমার বাংলাকে জানে না।
১৯২৩ সালের আইনসভা নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ভারতীয় রাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় আসে। অসহযোগ আন্দোলন স্থগিত হওয়ার পর কংগ্রেসের ভেতরে ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক কর্মপন্থা নিয়ে তীব্র মতপার্থক্য দেখা দেয়। দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাস, মতিলাল নেহরু এবং সুভাষ চন্দ্র বসুসহ একদল নেতা মনে করতেন যে, ব্রিটিশ সরকারের আইনসভা বয়কট না করে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করা উচিত। তাঁদের পরিকল্পনা ছিল নির্বাচিত আসনগুলো দখল করে আইনসভার ভেতর থেকেই ঔপনিবেশিক সরকারের নীতির বিরোধিতা করা। অন্যদিকে রাজা গোপালাচারী, কস্তুরী রঙ্গ আইয়ার এবং ড. আনসারীর মতো নেতারা এই পরিকল্পনার বিরোধিতা করেন। ফলে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস দুটি ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েপরিবর্তনকামী (Pro-changers) এবং পরিবর্তনবিরোধী (No-changers)। ১৯২২ সালের গয়া অধিবেশনে গান্ধীবাদী নেতাদের বয়কট প্রস্তাব গৃহীত হলে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাস কংগ্রেস সভাপতির পদ ত্যাগ করেন। নিজের রাজনৈতিক অবস্থানে অটল থেকে তিনি ১৯২২ সালের ৩১ ডিসেম্বর গয়ায় মতিলাল নেহরু, হাকিম আজমল খান, ভি. জে. প্যাটেল, কেলকার, সত্যমূর্তি ও জয়াকারের সহযোগিতায় “কংগ্রেস খিলাফত স্বরাজ দল” প্রতিষ্ঠা করেন। পরবর্তীতে এটি সংক্ষেপে “স্বরাজ দল” (Swaraj Party) নামে পরিচিতি লাভ করে। দলের সভাপতি নির্বাচিত হন দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাস এবং সাধারণ সম্পাদক হন মতিলাল নেহরু। স্বরাজ দলের কর্মসূচি দ্রুতই ভারতীয় জনগণের মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করে। বিশেষ করে দেশবন্ধুর উদার ও অসাম্প্রদায়িক নেতৃত্ব হিন্দু ও মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের আস্থা অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এই জনপ্রিয়তাই পরবর্তীকালে বেঙ্গল প্যাক্ট প্রণয়নের জন্য একটি অনুকূল রাজনৈতিক পরিবেশ সৃষ্টি করেছিল।
বেঙ্গল প্যাক্ট, ১৯২৩
বিংশ শতাব্দীর সূচনালগ্নে বাংলার রাজনৈতিক অঙ্গনে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা ঘটে। এ. কে. ফজলুল হক, দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাস, হোসেন শহীদ সোহ্রাওয়ার্দী, ব্যারিস্টার আবদুল্লাহ্ রসুলসহ একদল দূরদর্শী নেতার আবির্ভাবে বাংলার রাজনীতিতে আসে গুণগত পরিবর্তন। তাঁরা কেবল রাজনৈতিক নেতৃত্বই দেননি, বরং সাম্প্রদায়িক বিভাজনের ঊর্ধ্বে উঠে একটি ঐক্যবদ্ধ ও প্রগতিশীল বাংলার স্বপ্ন দেখেছিলেন। এ. কে. ফজলুল হক ছিলেন প্রকৃত অর্থে একজন অসাম্প্রদায়িক বাঙালি নেতা। অন্যদিকে, চিত্তরঞ্জন দাস ও হোসেন শহীদ সোহ্রাওয়ার্দী তাঁদের উদার দৃষ্টিভঙ্গি, রাজনৈতিক প্রজ্ঞা এবং ভবিষ্যৎ চিন্তার জন্য সমসাময়িক রাজনীতিতে বিশেষ মর্যাদা লাভ করেছিলেন। তবে খেলাফত আন্দোলনের ব্যর্থতার পর বাংলায় হিন্দু-মুসলিম সম্পর্ক ক্রমশ অবনতির দিকে যেতে থাকে। সাম্প্রদায়িক বিভেদের এই সংকটময় পরিস্থিতিতে বাংলার প্রগতিশীল নেতারা উপলব্ধি করেন যে, পারস্পরিক সমঝোতা ও সহযোগিতা ছাড়া রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা সম্ভব নয়। এই উপলব্ধি থেকেই এ. কে. ফজলুল হক, দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাস, হোসেন শহীদ সোহ্রাওয়ার্দী, মোহাম্মদ আবদুল করিম, মাওলানা আকরাম খান, মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী, মাওলানা মুজিবর রহমানসহ বিশিষ্ট নেতৃবৃন্দ একাধিক বৈঠক ও আলোচনায় মিলিত হন। দীর্ঘ আলোচনা ও মতবিনিময়ের পর হিন্দু ও মুসলমান সম্প্রদায়ের ন্যায্য দাবি-দাওয়া এবং রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের প্রশ্নে একটি ঐতিহাসিক সমঝোতা প্রতিষ্ঠিত হয়। এই সমঝোতাই ইতিহাসে ‘বেঙ্গল প্যাক্ট’ নামে পরিচিত। ১৯২৩ সালের ১৬ ডিসেম্বর দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাসের নেতৃত্বাধীন স্বরাজ পার্টির কাউন্সিল সভায় চুক্তিটি আনুষ্ঠানিকভাবে গৃহীত হয়। বাংলার সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও রাজনৈতিক সহযোগিতার ইতিহাসে বেঙ্গল প্যাক্ট একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত।
বেঙ্গল প্যাক্টের বিভিন্ন দিক ও শর্তাবলি
১। স্বায়ত্তশাসনের বুনিয়াদ প্রতিষ্ঠা করাই হবে এ চুক্তির উদ্দেশ্য।
২। বঙ্গীয় আইনসভায় হিন্দু-মুসলমানদের মধ্যে প্রতিনিধি নির্বাচিত হবে জনসংখ্যার ভিত্তিতে।
৩। ১৯০৯ সালে প্রবর্তিত পৃথক নির্বাচন ব্যবস্থা চালু থাকবে।
৪। স্থানীয় স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রত্যেক জেলার সংখ্যাগরিষ্ঠ সম্প্রদায় শতকরা ৬০টি আসন এবং সংখ্যালঘিষ্ঠ সম্প্রদায় শতকরা ৪০টি আসন লাভ করবে।
৫। সরকারি দপ্তরে মুসলমানদের জন্য শতকরা ৫৫টি চাকরি সংরক্ষিত থাকবে এবং যে পর্যন্ত তারা সমতার পর্যায়ে না পৌঁছে সে পর্যন্ত তাদের মধ্য হতে শতকরা ৮০ জনকে ন্যূনতম যোগ্যতার ভিত্তিতে সরকারি চাকরিতে নিয়োগ করা হবে।
৬। চাকরির ক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত সমতা অর্জনের পর থেকে মুসলমান জনগণ চাকরির শতকরা ৫৫ ভাগ পাবে এবং অমুসলমানগণ শতকরা ৪৫ ভাগ পাবে এবং অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে হিন্দু জনগণ ২০ ভাগ চাকরি পাবেন।
৭। কোনো সম্প্রদায়ের ধর্ম সম্পর্কিত কোনো আইন ব্যবস্থাপক সভায় পাস করতে হলে সে সম্প্রদায়ের নির্বাচিত তিন-চতুর্থাংশ সদস্যের সমর্থন থাকতে হবে।
৮। মসজিদের সম্মুখে গান-বাজনাসহ মিছিল করা চলবে না। গরু জবাই করার ক্ষেত্রে কোনো প্রকার হস্তক্ষেপ করা হবে না।
বেঙ্গল প্যাক্ট”-এর সমর্থনে চিত্তরঞ্জন দাস আইন পরিষদে বলেন যে, "স্বরাজের বুনিয়াদ রচনা আমাদের প্রধান লক্ষ্য। স্বরাজ লাভের পর আমাদের সরকার হিন্দু সরকার না মুসলমান সরকার এরূপ কোনো সংশয় যাতে আমাদের মনে জাগ্রত না হয় সেজন্য আমরা এ চুক্তিতে প্রত্যেক সম্প্রদায়ের ন্যায়সঙ্গতভাবে প্রাপ্য অংশ নির্ধারিত করেছি আমি চাই এজন্য হিন্দু মুসলিম উভয়ে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে পারস্পরিক অবিশ্বাস নির্মূল করার জন্য সংগ্রাম করে যাবে।
ঐতিহাসিক 'বেঙ্গল প্যাক্ট' হিন্দু-মুসলমান সম্প্রীতি সৃষ্টি ও বৃদ্ধিতে এবং পশ্চাৎপদ মুসলিম জনগণের স্বার্থ সংরক্ষণে ও উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। ফলে চিত্তরঞ্জন দাস কলিকাতা কর্পোরেশনের মেয়র এবং হোসেন শহীদ সোহ্রাওয়ার্দী ডেপুটি মেয়র নির্বাচিত হন। কিন্তু ১৯২৫ সালে ১৬ জুন চিত্তরঞ্জন দাসের আকস্মিক মৃত্যুর ফলে হিন্দু-মুসলিম সম্প্রীতি বিনষ্ট হয় এবং 'বেঙ্গল-প্যাক্ট' কার্যত অচল হয়ে পড়ে। এর ফলে হিন্দু-মুসলমান মিলনের সম্ভাবনাও তিরোহিত হয়।
মতামত
এখনও কোনো মতামত নেই।
প্রথম মতামতটি আপনিই দিন।
আলোচনায় অংশ নিতে লগ ইন করুন অথবা এ্যাকাউন্ট খুলুন