২০২৬ সালের ফিফা বিশ্বকাপ ক্রীড়াজগতের ইতিহাসে কেবল একটি সাধারণ প্রতিযোগিতা হিসেবে নয়, বরং বৈশ্বিক political ক্ষমতার দাপট এবং কর্পোরেট পুঁজিতন্ত্রের নগ্ন বহিঃপ্রকাশের হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে।
মাঠের রেফারিং এবং ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি (ভিএআর) প্রযুক্তির মতো বিতর্কিত সিদ্ধান্তগুলো যেভাবে সংবেদনশীল ম্যাচগুলোর ভাগ্য নির্ধারণ করেছে, তা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা না। এই টুর্নামেন্টে স্বাগতিক রাষ্ট্রের নির্বাহী ক্ষমতার প্রভাব, ফিফার রাজনৈতিক আপসকামিতা এবং বহুজাতিক সম্প্রচার মাধ্যমের বাণিজ্যিক স্বার্থের মেলবন্ধন আধুনিক ফুটবলের তথাকথিত নিরপেক্ষ আইনি কাঠামোকে ভেঙে চুরমার করেছে।
বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া অপেক্ষাকৃত দুর্বল ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর বিরুদ্ধে প্রযুক্তির অতি-সক্রিয় প্রয়োগ এবং ক্ষমতাধর রাষ্ট্র ও তার মহাতারকা ব্র্যান্ডগুলোর সুরক্ষায় প্রাতিষ্ঠানিক নিষ্ক্রিয়তা, ক্রীড়া জগতে এক নতুন সাম্রাজ্যবাদী সিস্টেমের জন্ম দিয়েছে। যা ফিফার ব্যবসায়ীক চিন্তার পাশাপাশি ক্ষমতাধর রাষ্ট্রের সাথে সুসম্পর্কের চেষ্টা, দিনের আলোরমতো পরিষ্কার হয়ে গেছে।
আমরা যারা সাধারণ মানুষ, প্রতিদিনের জীবন-সংগ্রামে নিয়মের যাঁতাকলে পিষ্ট হই, আমাদের বাস্তব জীবনের সাথে ফুটবলের এই নগ্নতার তফাতটা কোথায়? আপনার কারখানায় যখন সামান্য লেট-প্রেজেন্টের জন্য শ্রমিকের দিনমজুরির টাকা কাটা যায়, আর মালিকপক্ষের কোটি টাকার ব্যাংক লোন কিংবা ট্যাক্স ফাঁকি এক টেবিলে বসে মাফ হয়ে যায়, এই দ্বিমুখী নীতিই তো বিশ্বজুড়ে শোষণের মূল হাতিয়ার...
ফুটবলের মাঠ আর কর্পোরেট দুনিয়ার এই শোষণের চিত্রনাট্য হুবহু মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে। আমরা কি ক্ষমতার অপব্যবহার, আর ক্ষমতার ভাগিদারদের তৈরি করা নিয়মকে হাদিস হিসেবে কবুল করবো?
সবচেয়ে বড় ভণ্ডামিটদেখুন করপোরেট পুঁজিতন্ত্রের। যখন বাজার বড়, যখন স্পনসরশিপের বিলিয়ন ডলারের ঝনঝনানি সামনে থাকে, তখন নীতি-নৈতিকতা কোনো বালাই থাকেনা। ঠিক যেমনটি দেখা গেল আটলান্টা স্টেডিয়ামে আর্জেন্টিনা বনাম মিশরের রাউন্ড অব ১৬-এর ম্যাচে...
আমি একজন বাফুফের প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত রেফারি, চলুন যাই আর্জেন্টিনা-মিশরের মাঠে। ম্যাচে মিশর যখন ২-০ তে এগিয়ে গেলো, তখনই ফরাসি রেফারি ফ্রাঁসোয়া লেতেক্সিয়ারকে দিয়ে টেনে আনা হলো মাঠের অপরপ্রান্তে বেশ খানেক পূর্বে ঘটে যাওয়া একটি হালকা ফাউল। রেফারি কোর্স করার সময় আমাদের বারবার শেখানো হয়েছিলঃ 'রেফারির ক্ষমতা কখনোই প্রদর্শনীর বিষয় ন। খেলায় যদি বড়সড় শারীরিক আক্রমণ এবং পাল্টা আক্রমণের সম্ভাবনা না থাকে, তাহলে ছোটখাটো ফাউল হলেও খেলা চালিয়ে নিতে হবে।' ফ্রান্স রেফারিও ঠিক সেটিই করেছিলেন, এতো ছোট ফাউল আমলে নেননি। কিন্তু যখনই গোল হয়ে গেলো, ঘটনাটি কাজে লাগানো হলো। দুনিয়ায় ফিফা বলেন, এএফসি বলেন, বা বাফুফে- যেকোনো পর্যায় থেকে রেফারি কোর্স সম্পন্ন করাদের চোখে এটি একটিঃ বিশেষ ক্ষমতাবল হিসেবে পরিচিত। যদি মাঠে রেফারি কোন পক্ষের কাছ থেকে চাপে থাকে, তবে এমন সিদ্ধান্তগুলো ব্যবহার করতে পারে। সে যাইহোক...
৫৯ মিনিটে মোস্তফা জিকোর দুর্দান্ত প্রতিআক্রমণ থেকে করা বৈধ গোলটি বাতিল হলো। কেন? কারণ লিওনেল মেসি আর আর্জেন্টিনার ‘ব্র্যান্ড ভ্যালু’ যদি নক-আউটেই বিদায় নেয়, তবে সিলিকন ভ্যালি আর বহুজাতিক ব্রডকাস্টারদের পকেটে যে টান পড়বে!
শোষণ শুধু মাঠে কিংবা ব্যাংক অ্যাকাউন্টে সীমাবদ্ধ থাকেনি, তা প্রবেশ করেছে হোস্ট রাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতিতেও। ২০২৬ বিশ্বকাপ সাক্ষী হয়ে রইল ইরানের জাতীয় দলের ওপর মার্কিন প্রশাসনের নগ্ন নিপীড়নের। ইরানের ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতি মেহেদী তাজসহ ১১ জন কর্মকর্তাকে ভিসা দেওয়া হয়নি। নিরাপত্তার সস্তা অজুহাতে ইরান দলকে অ্যারিজোনার ক্যাম্প থেকে তাড়িয়ে মেক্সিকোর সীমান্ত শহর তিজুয়ানায় পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল। প্রতি ম্যাচের দিন তিজুয়ানা থেকে বিমানে উড়ে এসে যুক্তরাষ্ট্রে খেলতে হতো এবং ম্যাচ শেষেই আবার ফেরত যেতে হতো। দলটা একটা ম্যাচও হারেনি, তবুও কি কি হয়েছে ইতিহাসে লিখা থাকবে...
একই শ্বেতাঙ্গ আধিপত্যবাদী আচরণের শিকার সোমালি রেফারি ওমর আব্দুলকাদির আরতান বা ইরাকি স্ট্রাইকার আইমেন হুসেইন। আর যখন ইরানের বিরুদ্ধে গ্রুপ পর্বের গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে অতিরিক্ত সময়ে শোজা খলিলজাদেহের গোলটি ভিএআর অত্যন্ত সূক্ষ্ম অফসাইডের অজুহাতে বাতিল করে তাদের টুর্নামেন্ট থেকে ছিটকে দিল, মার্কিন হোমল্যান্ড সিকিউরিটি সেক্রেটারি মার্কওয়েন মুলিন জনসমক্ষে খুশিতে নাচলেন!
ক্রীড়া ক্ষেত্রের এই সাম্রাজ্যবাদী রূপ আমাদের মনে করিয়ে দেয়, ক্ষমতাধরদের কাছে দুর্বল রাষ্ট্রের নাগরিকেরা শুধুই দ্বিতীয় শ্রেণীর মানুষ।
আজ সময় এসেছে আধুনিক ফুটবলের এই কর্পোরেট দাসত্ব ও ফিফার প্রাতিষ্ঠানিক চাটুকারিতাকে প্রত্যাখ্যান করার। ফিফার বিচার বিভাগকে আন্তর্জাতিক লবিং থেকে মুক্ত করা, ভিএআর-এর ক্ষমতা সংকুচিত করা।
আমরা শুধু গ্যালারিতে বসে কর্পোরেট পুঁজিপতিদের এই তামাশা দেখতে জন্মাইনি। ফুটবল পৃথিবীর কোটি কোটি শোষিত-নিপীড়িত মানুষের বেঁচে থাকার শেষ ভরসা। জরাজীর্ণ জীবন নিয়েও এই ফুটবলের দিকে তাকিয়ে থাকে ব্রাজিলসহ পৃথিবীর শত শত দেশের লক্ষ লক্ষ পরিবার। ফুটবলের আত্মাকে বাঁচাতে নব্য শোষকদের বিরুদ্ধে যার যার সাধ্যমত অবস্থান নেওয়া আমাদের নৈতিক দায়িত্ব।
About the Author
কাজী সফিকুল ইসলাম রাব্বী 🔴
মজদুরের নিয়মিত লেখকJournalism & Teaching
Activist
প্রোফাইল দেখুন
মতামত
এখনও কোনো মতামত নেই।
প্রথম মতামতটি আপনিই দিন।
আলোচনায় অংশ নিতে লগ ইন করুন অথবা এ্যাকাউন্ট খুলুন