রোনালদল লাল কার্ড পেলে কি পর্তুগালের রাষ্ট্রপ্রধানের ফোনে আইন পাল্টে ফেলতো ফিফা? বা অন্য কোনো দেশের বেলায়... ফিফার 'বিশেষ ক্ষমতাবল'র ফিচারটা ফিফার কোথায় নথিভুক্ত আছে? রোনালদো গেলো, ধরলাম বর্তমান বিশ্বকাপজয়ী দলের হিসেবে মেসির মাঠ ছাড়ার আদেশ কি কোনো লবিংয়ে বাতিল হতো? উত্তরটা আপনিও জানেন, আমিও জানি, উত্তরটাঃ না।
কিন্তু ২০২৬ বিশ্বকাপের মঞ্চে এমন এক নগ্নরূপী ‘খেল’ দেখল বিশ্ব! যা ফুটবলকে শুধু কলঙ্কিতই করেনি, বরং বিশ্ব ক্রীড়া প্রশাসনের লজ্জা নামক কফিনে শেষ পেরেক ঠুকে দিয়েছে। মার্কিন স্ট্রাইকার ফোলারিন বালোগানের নিষেধাজ্ঞা স্থগিতের ঘটনাটি কি নিছক একটি ফুটবলীয় সিদ্ধান্ত, নাকি বৈশ্বিক ক্রীড়াঙ্গনে ‘আগলি আমেরিকান’ দম্ভের নতুন মহড়া?
ঘটনার সূত্রপাত বসনিয়া বনাম আমেরিকার রাউন্ড ৩২ এর নকআউট ম্যাচে। সেই ম্যাচে ৪৫ মিনিটে গোলও করেন মার্কিন স্ট্রাইকার বালোগান। কিন্তু খেলার ৬৪ মিনিটে পান লাল কার্ড... স্বাভাবিকভাবেই মাঠ ছাড়তে বাধ্য হোন বালোগান। নিয়ম অনুযায়ী, লাল কার্ড পাওয়া ম্যাচের পরবর্তী নকআউট ম্যাচেও স্কোয়াডে থাকার নিয়ম নেই। কিন্তু নাটক শুরু হলো এরপরই। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ফোনকল দেন ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোকে, একটা কলেই ফুটবলের নিয়মকানুনগুলো স্রেফ ব্যবহৃত টিস্যু পেপারে পরিণত হলো। তথাকথিত 'ফিফার বিশেষ ক্ষমতাবল' নামের এক বিতর্কিত অযুহাতে, নিষেধাজ্ঞা স্থগিত করা হলো বালোগানের। ২০২৬ সালে এসেও সকলের চোখে সামনে এমন নগ্নরূপ, এ ক্ষমতার দাপট ও অপব্যবহার ছাড়া কিছুইনা।
আমরা যারা সাধারণ মানুষ, প্রতিদিনের জীবন-সংগ্রামে নিয়মের যাঁতাকলে পিষ্ট হই। 'আমাদের জন্য নিয়ম এক আর ক্ষমতার অলিন্দে থাকা ব্যক্তিদের জন্য নিয়ম অন্য' এই দ্বিমুখী নীতিই বিশ্বজুড়ে শোষণের মূল হাতিয়ার। যখন দেখেন ফিফার মতো একটি আন্তর্জাতিক সংস্থা মার্কিন বাজারের অর্থের ঝনঝনানিতে মাথা নত করে দেয়, তখন বুঝতে হবে এই বিশ্বব্যবস্থায় সাধারণের জন্য কোনো নিরপেক্ষ বিচার নেই।
আপনার কর্মক্ষেত্র বা রাষ্ট্রীয় কাঠামোতেও যখন প্রভাবশালীরা নিয়ম ভেঙে পার পেয়ে যায়, তখন ফুটবলের এই ঘটনাটি সেই একই চিত্রনাট্যের প্রতিচ্ছবি হয়ে ওঠে, না-ক
মজার বিষয় হলো, ট্রাম্প প্রশাসনের ‘মাগা’ (MAGA) এজেন্ডার সাথে বালোগানের মতো অভিবাসী বংশোদ্ভূত খেলোয়াড়ের সম্পর্ক। একদিকে তারা অভিবাসীদের তাড়িয়ে দিতে চায়, অন্যদিকে নিজের দেশের সাফল্যের প্রয়োজনে সেই অভিবাসী রক্তকেই জাতীয় গর্ব হিসেবে তুলে ধরে। এই ভণ্ডামিতে ফিফার সায় দেওয়া প্রমাণ করে, ফুটবল এখন আর কেবল খেলা নেই, এটি এখন রাজনৈতিক ও বাণিজ্যিক হাতিয়ার। ইনফান্তিনো কি তবে ফুটবলের অভিভাবক, নাকি হোয়াইট হাউসের বাণিজ্যিক এজেন্ট?
বেলজিয়ামের কোচ রুডি গার্সিয়া একে ‘এপ্রিল ফুল’ বলে উপহাস করলেও, এটি আসলে ফুটবল ইতিহাসের এক ট্র্যাজেডি। সাবেক ফিফা সভাপতি সেপ ব্ল্যাটার পর্যন্ত যেখানে এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন, সেখানে সাধারণ দর্শকদের চুপ থাকার কোনো উপায় নেই।
মনে রাখবেন, যখন মাঠের রেফারি ক্ষমতার নির্দেশে সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করেন, তখন মাঠে থাকা প্রতিটি খেলোয়াড়ের পরিশ্রম ধুলোয় মিশে যায়। আজ বালোগানের জন্য এই ছাড়, কাল অন্য কোনো শক্তিশালী রাষ্ট্রের দাপটে পুরো টুর্নামেন্টের ফলাফলই হয়তো ওলটপালট হয়ে যাবে।
ফিফার এই অন্ধকারের দি যাত্রা আমাদের একটি পরিষ্কার বার্তা দিচ্ছেঃ নিয়ম কেবল দুর্বলদের জন্য, আর শক্তিমানদের জন্য আকাশ উন্মুক্ত। আমরা কি এভাবে ফুটবলের মৃত্যু দেখবো! নাকি সময় এসেছে ফিফার এই বাণিজ্যিক দাসত্বকে প্রত্যাখ্যান করার?
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পূর্বে ফুটবল বিশ্বকাপের যে রূপ, সেই নগ্নরূপ ফিরে এসেছে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের স্বেচ্ছাচারী মনোভাবের বিপরীতে ফিফা প্রেসিডেন্টের ডোন্ট ডিস্টার্ব পলিসি! ইতিহাসে এই কলঙ্ক লিখে রাখা জরুরি। এই ঘটনা সর্বত্র কর্তৃত্ববাদী আগ্রাসনের নিদর্শন হয়ে থাকবে, তা নিশ্চিত করা জরুরি।
About the Author
কাজী সফিকুল ইসলাম রাব্বী 🔴
মজদুরের নিয়মিত লেখকJournalism & Teaching
Activist
প্রোফাইল দেখুন
মতামত
এখনও কোনো মতামত নেই।
প্রথম মতামতটি আপনিই দিন।
আলোচনায় অংশ নিতে লগ ইন করুন অথবা এ্যাকাউন্ট খুলুন