আজাদ জম্মু ও কাশ্মীরকে দীর্ঘদিন ধরে একটি স্বশাসিত ও গণতান্ত্রিক অঞ্চল হিসেবে বিশ্বের সামনে উপস্থাপন করে এসেছে পাকিস্তান। কিন্তু ব্যাপারটা আসলেই কি তাই? সাম্প্রতিক ঘটনাবলি সেই দাবির বাস্তবতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। যৌথ আওয়ামী অ্যাকশন কমিটি (জেএএসি) ও আজাদ কাশ্মীর সরকারের মধ্যে চলমান সংঘাত বড় আকার ধারণ করেছে। আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ, এবং রাওয়ালাকোটে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ প্রমাণ করেছে যে জনগণের মতপ্রকাশ ও রাজনৈতিক অংশগ্রহণের ক্ষেত্র ক্রমেই সংকুচিত হয়ে পড়ছে। একজন ব্যবসায়ীর গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর যে পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে, তা ভয়াবহ। এটা কেবল একটি রাজনৈতিক সংকট নয়; বরং এটি শাসকগোষ্ঠী ও সাধারণ জনগণের মধ্যকার গভীর আস্থাহীনতার বহিঃপ্রকাশ।
আজাদ কাশ্মীরের জনগণ বহুদিন ধরেই প্রশাসনিক সংস্কার, জবাবদিহিতা এবং প্রতিনিধিত্বের প্রশ্ন তুলছে। কিন্তু এসব দাবির জবাবে সংলাপের পরিবর্তে নিষেধাজ্ঞা, গ্রেপ্তার ও বলপ্রয়োগের পথ বেছে নেওয়া হয়েছে। জেএএসিকে নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে এবং আন্দোলনকে দমনের পরিবর্তে আরও বিস্তৃত জনসমর্থনের সুযোগ করে দিয়েছে। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, জনপ্রিয় আন্দোলনকে প্রশাসনিক আদেশ দিয়ে থামানো যায় না। বরং তা আরও ছড়িয়ে পড়ে।
প্রশ্ন হলো-যে রাষ্ট্র কাশ্মীরিদের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের কথা বলে, সে কি নিজ নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলের জনগণের কণ্ঠস্বর শুনতে প্রস্তুত? আর তথাকথিত আজাদ কাশ্মীর সরকার কি সত্যিই জনগণের প্রতিনিধি, নাকি ইসলামাবাদের নীতিরই একটি সম্প্রসারিত রূপ?
দমন-পীড়নের মাধ্যমে রাজনৈতিক সংকটের সমাধান অসম্ভব
জেএএসিকে নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত আজাদ কাশ্মীর সরকারের জন্য একটি গুরুতর রাজনৈতিক ও গণতান্ত্রিক প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। একটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় কোনো সংগঠন বা আন্দোলনের দাবি সরকারের কাছে গ্রহণযোগ্য নাও হতে পারে, কিন্তু সেই মতবিরোধের সমাধান হওয়া উচিত আলোচনা, সংলাপ এবং সাংবিধানিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে। একটি জনপ্রিয় গণআন্দোলনকে নিষিদ্ধ করা রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠার পরিবর্তে আরও বেশি উত্তেজনা ও বিভাজন সৃষ্টি করতে পারে।
পাকিস্তান ও আজাদ কাশ্মীর প্রশাসন হয়তো মনে করছে যে নিষেধাজ্ঞা আরোপের মাধ্যমে বিরোধী কণ্ঠস্বরকে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে। কিন্তু ব্যাপারটা কি আসলেই এতো সোজা? ইতিহাস দেখায় যে জনগণের রাজনৈতিক দাবি ও অসন্তোষকে প্রশাসনিক শক্তি দিয়ে দীর্ঘমেয়াদে দমন করা যায় না। বরং এ ধরনের পদক্ষেপ আন্দোলনকে আরও ব্যাপক জনসমর্থন এনে দিতে পারে। হয়েছেও তাই। পূর্ব পাকিস্তানের মানুষকে দমন করতে গিয়ে বাংলাদেশ নাম স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্ম হয়েছে। বেলুচিস্তানে দমন পীড়ন করতে হয়ে সেটা আর তাদের নিয়ন্ত্রণেও ঠিকঠাক নাই।
রাওয়ালাকোটে সংঘর্ষে পুলিশ সদস্য ও বিক্ষোভকারীদের প্রাণহানি অত্যন্ত দুঃখজনক এবং এটি পুরো অঞ্চলের জন্য একটি সতর্কবার্তা। তবে এই ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত ছাড়া শুধুমাত্র আন্দোলনকারীদের দোষারোপ করা ন্যায়বিচারের নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। একজন বিক্ষোভকারীর গুলিবিদ্ধ হয়ে মৃত্যুর ঘটনাকে কেন্দ্র করে যে ক্ষোভের বিস্ফোরণ ঘটেছে, তা হঠাৎ সৃষ্টি হয়নি; এটি দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অসন্তোষ, প্রশাসনিক ব্যর্থতা এবং জনগণের মধ্যে জমে থাকা হতাশার বহিঃপ্রকাশ।
জনগণের অভিযোগ ও দাবিগুলোকে গুরুত্ব দিয়ে শোনার পরিবর্তে যখন শক্তি প্রয়োগ, গ্রেপ্তার এবং নিষেধাজ্ঞার পথ বেছে নেওয়া হয়, তখন পরিস্থিতি আরও অস্থির হয়ে ওঠে। তাই বর্তমান সংকটের সমাধান দমন-পীড়নে নয়, বরং সংলাপ, জবাবদিহিতা এবং জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকারের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শনের মধ্যেই নিহিত।
আজাদ কাশ্মীরের স্বায়ত্তশাসন: বাস্তবতা নাকি রাজনৈতিক প্রচারণা?
পাকিস্তান আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আজাদ কাশ্মীরকে একটি স্বাধীন ও স্বশাসিত অঞ্চল হিসেবে তুলে ধরলেও বাস্তবে অঞ্চলটির রাজনৈতিক কাঠামো বহু সীমাবদ্ধতায় আবদ্ধ। গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত সিদ্ধান্তে ইসলামাবাদের প্রভাব সুস্পষ্ট। ফলে আজাদ কাশ্মীরের নির্বাচিত সরকারের স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।
শরণার্থীদের জন্য বরাদ্দকৃত আসন নিয়ে চলমান বিতর্কও এই বাস্তবতাকে সামনে এনেছে। জেএএসি এই আসনগুলো বিলুপ্ত করার দাবি তুলেছে, কারণ তাদের মতে এটি স্থানীয় জনগণের রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বকে বিকৃত করে। দাবিটি বিতর্কিত হতে পারে, কিন্তু সেই বিতর্কের সমাধান হওয়া উচিত উন্মুক্ত রাজনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে। পরিবর্তে সরকার সংগঠনটিকে নিষিদ্ধ করে মূল প্রশ্ন থেকে দৃষ্টি সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছে।
একটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সাংবিধানিক প্রশ্নের সমাধান সংসদীয় বিতর্ক ও জনমতের ভিত্তিতে হওয়া উচিত। কিন্তু যখন জনগণের দাবিকে নিরাপত্তা ইস্যুতে পরিণত করা হয়, তখন রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আজাদ কাশ্মীর সুপ্রিম কোর্টও স্পষ্টভাবে বলেছে যে, সাংবিধানিক পরিবর্তন চাপের মুখে নয়, বরং পূর্ণ গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে হওয়া উচিত। অথচ সেই গণতান্ত্রিক পরিবেশই বর্তমানে প্রশ্নবিদ্ধ।
পাকিস্তানের কাশ্মীর নীতির অন্তর্নিহিত দ্বন্দ্ব
পাকিস্তান বহু দশক ধরে কাশ্মীর প্রশ্নে আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। কিন্তু আজাদ কাশ্মীরে চলমান ঘটনাবলী সেই অবস্থানের সঙ্গে একটি স্পষ্ট বৈপরীত্য সৃষ্টি করেছে। যদি জনগণের মতামত ও রাজনৈতিক অংশগ্রহণকে সত্যিই গুরুত্ব দেওয়া হয়, তাহলে কেন শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের প্রতি সহনশীলতা দেখানো হচ্ছে না?
এই দ্বৈত মানদণ্ড পাকিস্তানের নৈতিক অবস্থানকে দুর্বল করে। একদিকে আন্তর্জাতিক মঞ্চে গণতন্ত্র ও জনগণের অধিকারের কথা বলা, অন্যদিকে নিজ নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলে ভিন্নমতকে দমন করা-এই দুই অবস্থান একসঙ্গে টেকসই হতে পারে না। জনগণের প্রতি আস্থা না রেখে প্রশাসনিক শক্তির ওপর নির্ভরশীলতা শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক বৈধতাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে।
আজাদ কাশ্মীরের সংকট কেবল একটি আঞ্চলিক রাজনৈতিক বিরোধ নয়; এটি গণতন্ত্র, প্রতিনিধিত্ব ও জবাবদিহিতার বৃহত্তর প্রশ্নের সঙ্গে জড়িত। পাকিস্তান সরকার এবং আজাদ কাশ্মীর প্রশাসন যদি সত্যিই স্থিতিশীলতা ও শান্তি চায়, তাহলে তাদের প্রথম পদক্ষেপ হওয়া উচিত নিষেধাজ্ঞার রাজনীতি থেকে সরে এসে সংলাপের পথ বেছে নেওয়া। জনগণের কণ্ঠস্বরকে শত্রু হিসেবে দেখা নয়, বরং গণতান্ত্রিক অংশীদার হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়াই হতে পারে দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের ভিত্তি। অন্যথায় আজকের সংকট আগামী দিনের আরও বড় অস্থিরতার সূচনা হয়ে থাকবে। আজকের কাশ্মীর - নতুন স্বাধীনতার ডাক দিতে পারে।
হুমায়ূন আহমেদ শ্রাবণ
পর্তুগাল প্রবাসী সাংবাদিক ও গবেষক।
মতামত
এখনও কোনো মতামত নেই।
প্রথম মতামতটি আপনিই দিন।
আলোচনায় অংশ নিতে লগ ইন করুন অথবা এ্যাকাউন্ট খুলুন