"The creation of Bangladesh, was the rejection of the idea of Pakistan" এই উক্তি দিয়ে শুরু করছি, কেননা, ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্ম হয় একটি ধর্মভিত্তিক ইসলামিক রিপাবলিক হিসেবে, ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে যখন পাকিস্তানের শোষন ও অত্যাচারের শেকল ভেঙ্গে বাংলাদেশ স্বাধীন হয় তখন বাংলাদেশ একটি পিপলস রিপাবলিক রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। The founding vision of Bangladesh is rooted in the principles of democracy, secularism, socialism, and nationalism. কিন্তু আফসোস এই যে, দিন দিন বাংলাদেশ এই প্রিন্সিপাল হতে সরে গিয়ে একটি মৌলবাদি রাষ্ট্রে প্রায় পরিণত হয়েই যাচ্ছে। আমরা দেখেছি কীভাবে বাংলাদেশের জাতীয় সংসদের প্রধান বিরোধীদল জামাতে ইসলাম ও এরা জোটসঙ্গী হেফাজতে ইসলামের মত উগ্র ডানপন্থী ইসলামিস্ট ধর্মীয় ফ্যাসিস্ট রাজনৈতিক দলসমূহ এখন মেইনস্ট্রিম রাজনৈতিক দল হয়ে উঠেছে এবং প্রতিনিয়ত নরমালাইজ হচ্ছে। বাংলাদেশের মেইনস্ট্রিম রাজনৈতিক দলসমূহ এখন প্রকাশ্যে বক্তব্যে বলে বেড়ায় যে, একাত্তরে দেশ স্বাধীন হয়নি বরং পরাধীন হয়েছে, প্রকৃতপক্ষে তারা পাকিস্তান নামক ধর্মীয় ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্র থেকে আলাদা হওয়াটা মানতে পারে না তাই নানান দোহাই দিয়ে একাত্তরকে অস্বীকার করে। অথচ বাংলাদেশ তথা বেঙ্গল ডেল্টা ঐতিহাসিকভাবে ছিলো বৈচিত্র্যপূর্ণ সমাজ, আফসোস আজ দুই বাংলাতেই অর্থাৎ ভারতের পশ্চিম বাংলা প্রদেশ ও স্বাধীন বাংলাদেশ দুই বাংলাই সেই বৈচিত্র্য হারিয়ে ফেলেছে, পশ্চিম বাংলা আজ হিন্দুত্ববাদী আলস্ট্রা ফ্রাসিস্টদের দখলে আর পূর্ব বাংলা ইসলামী মৌলবাদী আল্ট্রা ফ্যাসিস্টদের দখলে।একদময় এই বৈচিত্র্যই এই অঞ্চলের সামাজিক বাস্তবতার অন্যতম শক্তি ছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন ঘটনা, বিশেষ করে ধর্মীয় অনুভূতিকে কেন্দ্র করে জনমত তৈরি, চাপ প্রয়োগ এবং কিছু ক্ষেত্রে প্রকল্প স্থগিতের মতো পরিস্থিতিয আবারও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এনে দিয়েছে: আমরা কি একটি সত্যিকারের বহুমতভিত্তিক গণতান্ত্রিক সমাজের দিকে এগোচ্ছি, নাকি ধীরে ধীরে মতপ্রকাশের পরিসর সংকুচিত হচ্ছে?
পলাশবাড়ীতে নির্মাণাধীন হিন্দুদের একটি ধর্মীয় মূর্তি ঘিরে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তা শুধু একটি স্থাপত্য বা শিল্প প্রকল্পের বিষয় নয়। বরং এটি একটি বৃহত্তর সামাজিক প্রবণতার প্রতিফলন , যেখানে ধর্মীয় আবেগ, রাজনৈতিক চাপ এবং সামাজিক গণমাধ্যমের প্রভাব একত্রিত হয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের পরিবেশকে প্রভাবিত করে।
ধর্ম বনাম চরমপন্থা: ভুল জায়গায় বিতর্ক
এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট করা জরুরি: সমস্যা ধর্ম নয়। সমস্যা তখনই তৈরি হয় যখন ধর্মীয় বিশ্বাসকে রাজনৈতিক বা সামাজিক নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়। যে কোনো ধর্মীয় সমাজেই ভিন্ন ব্যাখ্যা, মত ও অনুশীলন থাকে। কিন্তু যখন একটি নির্দিষ্ট ব্যাখ্যাকে একমাত্র বৈধ অবস্থান হিসেবে চাপিয়ে দেওয়া হয় এবং ভিন্নমতকে অগ্রহণযোগ্য বা শত্রু হিসেবে দেখা হয়, তখনই চরমপন্থার জন্ম হয়।
এই চরমপন্থা শুধু ধর্মীয় পরিসরেই সীমাবদ্ধ থাকে না ,এটি রাষ্ট্রীয় নীতি, সামাজিক আচরণ এবং ব্যক্তিগত স্বাধীনতার ওপরও প্রভাব ফেলে। ফলে শিল্প, ইতিহাস, গবেষণা বা সাংস্কৃতিক উদ্যোগও বিতর্কের কেন্দ্রে চলে আসে এবং অনেক ক্ষেত্রে বাস্তবায়ন বাধাগ্রস্ত হয়।
গণতন্ত্রের জন্য সবচেয়ে বড় পরীক্ষা: ভিন্নমত সহ্য করার ক্ষমতা
একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হলো ভিন্নমত সহ্য করার ক্ষমতা। ভিন্ন ধর্ম, ভিন্ন বিশ্বাস, এমনকি ধর্মহীনতা , সবই একটি মুক্ত সমাজের অংশ। যখন কোনো সমাজে এই ভিন্নতাকে ভয় বা শত্রুতার চোখে দেখা শুরু হয়, তখন গণতন্ত্র তার মৌলিক ভিত্তি হারাতে শুরু করে।
বাংলাদেশের মতো সমাজে যেখানে ধর্মীয় পরিচয় অত্যন্ত সংবেদনশীল একটি বিষয়, সেখানে দায়িত্ব আরও বেশি। কারণ ধর্মীয় আবেগকে রাজনৈতিক বা সামাজিক চাপের মাধ্যমে ব্যবহার করলে তা সহজেই বিভাজন সৃষ্টি করতে পারে এবং সংখ্যালঘু ও ভিন্নমতাবলম্বীদের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা বাড়াতে পারে।
সোশ্যাল মিডিয়া ও জনমতের দ্রুত উগ্রতা
আধুনিক সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এই প্রবণতাকে আরও জটিল করেছে। একটি ঘটনা দ্রুত ভাইরাল হয়ে যাওয়ার পর সেখানে আবেগপ্রবণ প্রতিক্রিয়া, গুজব এবং চরম অবস্থান তৈরি হয়। অনেক সময় প্রকৃত তথ্যের চেয়ে আবেগই বেশি প্রভাবশালী হয়ে ওঠে।
এর ফলে সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া যুক্তির বদলে চাপের মধ্যে চলে আসে। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বা স্থানীয় প্রশাসনও জনচাপের মুখে নীতিগত অবস্থান থেকে সরে আসতে বাধ্য হয়, যা দীর্ঘমেয়াদে আইনের শাসনের জন্য ক্ষতিকর।
সমাধান: সহনশীলতা, শিক্ষা ও প্রতিষ্ঠানগত শক্তি
এই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসার পথ কোনো একটি গোষ্ঠীকে দায়ী করার মধ্যে নেই। বরং প্রয়োজন তিনটি স্তরে পরিবর্তন:
প্রথমত, শিক্ষা ব্যবস্থায় সমালোচনামূলক চিন্তা, ইতিহাস ও বৈচিত্র্যের প্রতি সহনশীলতা বাড়ানো।
দ্বিতীয়ত, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে আরও শক্তিশালী করা, যাতে সিদ্ধান্ত চাপ বা ভয় নয়, আইন ও নীতির ভিত্তিতে নেওয়া হয়।
তৃতীয়ত, সামাজিক পর্যায়ে ধর্মীয় বা আদর্শগত ভিন্নতাকে শত্রুতা নয়, বরং সহাবস্থানের অংশ হিসেবে গ্রহণ করার সংস্কৃতি গড়ে তোলা।
পলাশবাড়ীতে একটি নির্মাণাধীন ধর্মীয় ভাস্কর্য/মূর্তি ঘিরে যে বিরোধ, প্রতিবাদ, ঘৃণা ও চাপ তৈরি হয়েছে, তা দেখিয়ে দেয়, বাংলাদেশের মতো বহুধর্মীয় ও বহুসাংস্কৃতিক সমাজে ধর্মীয় আবেগকে রাজনৈতিক ও সামাজিক চাপের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার প্রবণতা এখনো শক্তিশালী। এখানে সমস্যা ধর্মকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া চরমপন্থী মানসিকতা, যা ভিন্ন মত, শিল্প, ইতিহাস বা সাংস্কৃতিক প্রকাশকেও সহ্য করতে চায় না।
একটি আধুনিক রাষ্ট্রে মতপার্থক্য থাকা স্বাভাবিক। কিন্তু যখন কোনো সমাজে ধর্মীয় বা রাজনৈতিক উগ্রবাদী গোষ্ঠীর চাপের কারণে বিশ্বাস, ধর্মীয় আবেগ, শিল্প, ইতিহাস বা সাংস্কৃতিক উদ্যোগ বন্ধ হয়ে যায়, তখন সেটি গণতান্ত্রিক পরিসরের জন্য উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। একদম রিসেন্টলি আমরা দেখেছি কিভাবে ব্রাহ্মনবাড়িয়ায় 'বনলতা সেন' নামক সিনেমার প্রদর্শনী বন্ধ করে দিয়েছে উগ্রডানপন্থীরা এভাবে বিগত কিছু সময়ে প্রতিনিয়ত শিল্পকর্ম, মঙ্গল শোভাযাত্রা, লিঙ্গ স্বাধীনতার আন্দোলন, নাটক, গান, বাউল গান, সাহিত্যিক কার্যক্রম ইত্যাদি দফায় দফায় মব করে বন্ধ করে দিয়েছে এই উগ্রডানপন্থীরা। রাষ্ট্রযন্ত্র প্রতিটাবার ডিরেক্ট অর ইনডিরেক্টলি উগ্রডানপন্থীদের প্রশ্রয় দিয়েছে যা হতাশাজনক, এতে রাষ্ট্রের নিরপেক্ষতা প্রশ্নবিদ্ধ হয় এবং সংখ্যালঘু ও ভিন্নমতাবলম্বীদের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হতে পারে।
এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই সমস্যা কোনো একটি ধর্ম বা জনগোষ্ঠীর সমস্যা নয়। বরং এটি একটি রাজনৈতিক-সামাজিক বাস্তবতা, যেখানে কিছু চরমপন্থী মতাদর্শ ধর্মীয় পরিচয়কে ব্যবহার করে বিভাজন তৈরি করে। এর ফলে সাধারণ ধর্মবিশ্বাসী মানুষের সাথে চরমপন্থার একটি অযথা মিশ্রণ তৈরি হয়, যা আরও বিভ্রান্তিকর ও বিপজ্জনক।
ভারতে মসজিদ ভাঙ্গাটা যেমন ধর্মীয় উগ্রবাদ তেমনি বাংলাদেশে মন্দির ভাঙ্গাটাও ধর্মীয় উগ্রবাদ, এই সহজ সমীকরনটা সবাই অস্বীকার করে। ভারতীয় উপমহাদেশে আজও মানুষকে মানুষ এবং সিটিজেন হিসেবে দেখা হয়না, এখানে আজও মানুষকে তার ধর্মীয়, লিঙ্গ, বর্ণ ইত্যাদির লেন্স্ব দেখা হয় । প্রতিবেশী দেশগুলোর বিভিন্ন ধর্মীয় স্থাপনা নিয়ে বিরোধ বা সীমাবদ্ধতার উদাহরণ টেনে আনা গেলেও, সেটি সমস্যার সার্বজনীন দিকটাই দেখায়, অর্থাৎ ধর্মীয় পরিচয় যখন রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে ব্যবহৃত হয়, তখনই তা উত্তেজনা ও বৈষম্য সৃষ্টি করে। তাই সমাধান কোনো একপাক্ষিক অভিযোগে নয়, বরং নীতিগতভাবে ধর্মনিরপেক্ষতা, আইনের শাসন এবং নাগরিক অধিকারের সুরক্ষার মধ্যেই নিহিত।
বাংলাদেশ যদি সত্যিই একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে অগ্রসর হতে চায়, তবে সেখানে ভিন্নমত, নাস্তিকতা, ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের অধিকার এবং সাংস্কৃতিক স্বাধীনতাকে সমানভাবে সুরক্ষা দিতে হবে। একইসাথে ধর্মীয় অনুভূতির নামে সহিংসতা, ভয় দেখানো বা মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সীমিত করার যে কোনো প্রবণতার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রকে স্পষ্ট অবস্থান নিতে হবে।
কারণ শেষ পর্যন্ত একটি সমাজের শক্তি তার একরূপতায় নয়, বরং তার বৈচিত্র্যকে সহ্য করার ক্ষমতায়। এবং সেই সহনশীলতাই গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় ভিত্তি।
বাংলাদেশ যদি সত্যিই একটি আধুনিক, গণতান্ত্রিক এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্র হিসেবে এগোতে চায়, তাহলে ভিন্নমতকে দমন নয়, বরং তাকে জায়গা দেওয়ার মানসিকতা তৈরি করতে হবে। ধর্মীয় বিশ্বাসের প্রতি সম্মান যেমন জরুরি, তেমনি ভিন্ন চিন্তা, ধর্মহীনতা এবং সাংস্কৃতিক স্বাধীনতার প্রতিও সমান সম্মান থাকা জরুরি।
কারণ শেষ পর্যন্ত একটি সমাজের পরিপক্বতা বোঝা যায় সে তার সবচেয়ে অস্বস্তিকর ভিন্নমতকেও কতটা সহ্য করতে পারে, সেখানেই গণতন্ত্রের প্রকৃত শক্তি নিহিত।
রাষ্ট্রযন্ত্রকে অবশ্যই সমাজে প্রতিনিয়ত বাড়তে থাকা ধর্মীয় ফ্যাসিজম, উগ্রবাদ, চরম ডানপন্থা, কমিউনালিজম ও কট্টরপন্থাকে নির্মূল করতে হবে। সমাজ ও রাষ্ট্রকে এগিয়ে নিতে হলে সকল মানুষের সমান অধিকার নিশ্চিত করতে হবে এবং উগ্রবাদীদের নির্মূল করতে হবে ।
About the Author
Tamim Hossain Pavel
Study
A young activist committed to secular, liberal, and democratic values.
প্রোফাইল দেখুন
মতামত
এখনও কোনো মতামত নেই।
প্রথম মতামতটি আপনিই দিন।
আলোচনায় অংশ নিতে লগ ইন করুন অথবা এ্যাকাউন্ট খুলুন