একটি সমাজ কতটা পিছিয়ে আছে, তা বোঝার জন্য সব সময় অর্থনৈতিক পরিসংখ্যানের প্রয়োজন হয় না। কখনো একটি ধর্ষণের খবরের নিচে লেখা মন্তব্যগুলোই যথেষ্ট। কখনো ধর্মের নামে সংঘটিত সহিংসতার পর মানুষের প্রতিক্রিয়া, দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে গিয়ে নিজের অনিয়মকে অস্বীকার করার প্রবণতা, কিংবা একজন দরিদ্র মানুষের প্রতি সমাজের আচরণ পর্যবেক্ষণ করলেই বোঝা যায়, আমাদের মূল্যবোধের ভিত কতটা শক্ত।
বাংলাদেশকে নিয়ে আমার উদ্বেগের জায়গাটি ঠিক এখানে।
আমাদের সমাজে এমন কিছু মানসিকতা গভীরভাবে প্রোথিত, যেগুলো অন্যায়কে শুধু টিকিয়ে রাখে না, অনেক ক্ষেত্রে অন্যায়ের পক্ষে যুক্তিও তৈরি করে। এখানে একজন নারীকে নিজের স্বাধীনতার পক্ষে যুক্তি দিতে হয়, অথচ তার স্বাধীনতা নিয়ন্ত্রণ করতে চাওয়া মানুষটির কাছে জবাবদিহি চাওয়া হয় না। একজন দরিদ্র মানুষের ভুল সহজেই তার চরিত্রের পরিচয় হয়ে দাঁড়ায়, অথচ প্রভাবশালী মানুষের অনিয়মকে নানা অজুহাতে আড়াল করা হয়। ধর্মের কথা বলতে গিয়ে কেউ কেউ ভুলে যান মানুষের মর্যাদার কথা, আর নৈতিকতার দাবি করতে গিয়ে নিজেদের আচরণকেই প্রশ্নের ঊর্ধ্বে মনে করেন।
আমরা অন্যের পোশাক বিচার করি, কিন্তু নিজের দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে প্রশ্ন তুলি না। দুর্নীতির সমালোচনা করি, অথচ নিজের সুবিধার জন্য নিয়ম ভাঙার সুযোগ পেলে অনেক সময় পিছিয়ে আসি না। মেধার মূল্য চাই, কিন্তু পরিচিত কাউকে সুবিধা দেওয়ার সুযোগ পেলে যোগ্যতার কথা ভুলে যাই। ভিন্নমতকে সম্মান করার দাবি করি, কিন্তু নিজের বিশ্বাসের বিরোধী কোনো বক্তব্য সামনে এলে সেটিকে যুক্তি দিয়ে মোকাবিলা করার পরিবর্তে বক্তাকেই আক্রমণ করি।
এই প্রবণতাগুলোকে শুধু বিচ্ছিন্ন ব্যক্তিগত ব্যর্থতা বলে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। এগুলো আমাদের সামাজিক আচরণ, ন্যায়বোধ ও জবাবদিহির সঙ্গে সম্পর্কিত।
বাংলাদেশের সমস্যা শুধু এই নয় যে এখানে অন্যায় ঘটে। পৃথিবীর কোনো সমাজই অপরাধ, বৈষম্য কিংবা দুর্নীতি থেকে পুরোপুরি মুক্ত নয়। আরও গভীর সংকট তৈরি হয় তখন, যখন অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের চেয়ে অন্যায়ের পক্ষে অজুহাত তৈরি করা সহজ হয়ে যায়।
একটি সমাজের অবক্ষয় তখনই বিপজ্জনক হয়ে ওঠে, যখন মানুষ অন্যায়ের সঙ্গে শুধু আপস করে না, অন্যায়কে সঠিক প্রমাণ করার ভাষাও শিখে ফেলে।
১. নারীর স্বাধীনতা, ভুক্তভোগীর বিচার এবং অপরাধীর আড়াল
ধর্ষণের খবর প্রকাশিত হলে আমাদের সমাজে একটি পরিচিত প্রশ্ন উঠে আসে: মেয়েটি কী পরেছিল?
তারপর প্রশ্ন আসে, রাতে বাইরে ছিল কেন, একা চলাফেরা করত কেন, ছেলেদের সঙ্গে মিশত কেন, তার ব্যক্তিগত জীবন কেমন ছিল।
অপরাধ করেছে একজন মানুষ, অথচ আলোচনার কেন্দ্রে চলে আসেন সেই মানুষটি, যার অধিকার লঙ্ঘিত হয়েছে। অপরাধীর জবাবদিহির আগে শুরু হয় ভুক্তভোগীর জীবনযাপনের বিচার।
এটি শুধু ভিক্টিম ব্লেমিং নয়, ন্যায়বিচারের প্রশ্নটিকে অন্যদিকে সরিয়ে দেওয়ার একটি প্রবণতা।
একজন নারী কী পোশাক পরবেন, কোথায় যাবেন, কার সঙ্গে সম্পর্ক রাখবেন কিংবা কীভাবে জীবনযাপন করবেন, তার কোনোটিই অন্য কাউকে তার সম্মতি লঙ্ঘনের অধিকার দেয় না। পোশাক সম্মতি নয়, বন্ধুত্ব সম্মতি নয়, আর প্রেমের সম্পর্কও স্থায়ী সম্মতির বিকল্প নয়।
তবু নারীর স্বাধীনতাকে নিয়ন্ত্রণ করার মধ্যেই কেন অনেকে নিরাপত্তার সমাধান খোঁজেন?
কারণ, একজন নারীকে নিষেধাজ্ঞার তালিকা ধরিয়ে দেওয়া সহজ, কিন্তু অপরাধীর জবাবদিহি নিশ্চিত করা, সম্মতির শিক্ষা দেওয়া এবং কার্যকর বিচারব্যবস্থার দাবি তোলা অনেক বেশি কঠিন। ফলে অপরাধের পরেও নারীকে নিজের পোশাক, চলাফেরা ও ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে কৈফিয়ত দিতে হয়।
এই মানসিকতার আরেকটি প্রকাশ দেখা যায় নারীবাদ, নারীশিক্ষা ও নারীর অর্থনৈতিক স্বাধীনতার বিরোধিতায়। একজন নারী নিজের অধিকার চাইলে তাকে অহংকারী বলা হয়, নিজের সিদ্ধান্ত নিলে অবাধ্য, আর প্রচলিত সামাজিক নিয়মের সমালোচনা করলে পুরুষবিদ্বেষী বলে দাগিয়ে দেওয়া হয়।
অথচ নারীবাদের মৌলিক দাবি পুরুষের অধিকার কেড়ে নেওয়া নয়। দাবি হলো, নারী হওয়ার কারণে একজন মানুষ যেন অধিকার, সুযোগ, নিরাপত্তা ও মর্যাদার ক্ষেত্রে বঞ্চিত না হন।
একজন নারী শিক্ষিত হলে কেন সেটি পরিবারের জন্য হুমকি হবে? নিজের উপার্জন থাকলে কেন তাকে পরিবারের প্রতি কম দায়িত্বশীল বলে ধরে নেওয়া হবে? নিজের জীবনের সিদ্ধান্ত নিজে নিলে কেন তার চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন উঠবে?
যে সম্পর্ক টিকে থাকার জন্য একজন মানুষকে নিজের স্বাধীনতা ত্যাগ করতে হয়, সেই সম্পর্কের সুস্থতা নিয়েই বরং প্রশ্ন তোলা উচিত।
সমস্যাটি যে কতটা গভীর, তার একটি প্রমাণ পাওয়া যায় বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো ও জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিলের ২০২৪ সালের জাতীয় নারী নির্যাতন জরিপে। ২০২৫ সালের অক্টোবরে প্রকাশিত জরিপ অনুযায়ী, নারীদের ৭৬ শতাংশ জীবনের কোনো পর্যায়ে স্বামী বা সাবেক স্বামীর কাছ থেকে অন্তত এক ধরনের সহিংসতার অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন। এর মধ্যে শারীরিক, যৌন, মানসিক ও অর্থনৈতিক সহিংসতার পাশাপাশি নিয়ন্ত্রণমূলক আচরণও অন্তর্ভুক্ত। আগের ১২ মাসে এই হার ছিল ৪৯ শতাংশ। জরিপে আরও দেখা যায়, সহিংসতার অভিজ্ঞতা থাকা নারীদের ৬২ শতাংশ কাউকে সেই অভিজ্ঞতার কথা জানাননি। সূত্র: জাতিসংঘের বাংলাদেশ কার্যালয়, ১৫ অক্টোবর ২০২৫।
এই পরিসংখ্যান শুধু সহিংসতার বিস্তার নয়, নীরবতার সামাজিক মূল্যও তুলে ধরে। একজন মানুষ যখন নির্যাতনের শিকার হয়েও মুখ খুলতে পারেন না, তখন প্রশ্নটি শুধু অপরাধীর থাকে না। প্রশ্ন ওঠে পরিবার, সামাজিক চাপ, সহায়তার সুযোগ এবং বিচারপ্রাপ্তির বাস্তবতা নিয়েও।
সমাধান নারীর জীবনকে আরও সংকুচিত করা নয়। প্রয়োজন সহিংসতার বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা, ভুক্তভোগীর নিরাপত্তা এবং এমন একটি মানসিকতা, যেখানে নারীর স্বাধীনতাকে অপরাধের কারণ হিসেবে দেখানো হবে না।
একজন নারী কতটা নিয়ন্ত্রিত, তা দিয়ে সমাজের নৈতিকতা মাপা যায় না। বরং তার স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা কতটা সুরক্ষিত, তা দিয়েই সমাজের ন্যায়বোধের পরীক্ষা হয়।
২. ধর্মের নামে সহিংসতা, মব জাস্টিস এবং আইনের শাসনের সংকট
ধর্ম মানুষের ব্যক্তিগত বিশ্বাসের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ধর্মীয় অনুশীলন অনেকের জীবনে আত্মসংযম, সহমর্মিতা ও নৈতিকতার চর্চাকে অর্থবহ করে তোলে। কিন্তু ধর্মীয় পরিচয় যখন অন্যের ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা কিংবা সহিংসতাকে বৈধতা দেওয়ার হাতিয়ার হয়ে ওঠে, তখন তা মানুষের অধিকার ও নিরাপত্তার প্রশ্নে পরিণত হয়।
কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ উঠল। অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের আগেই উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ল। মানুষ জড়ো হলো, হুমকি দেওয়া হলো, বাড়িঘরে হামলা হলো কিংবা কাউকে মারধর করা হলো। এরপর কেউ কেউ সেই সহিংসতাকেই ধর্মীয় মর্যাদা রক্ষার পদক্ষেপ হিসেবে উপস্থাপন করলেন।
কিন্তু অভিযোগের ভিত্তিতে শাস্তি দেওয়ার অধিকার জনতাকে কে দিয়েছে?
অভিযোগ গুরুতর হলে তদন্ত করতে হবে। প্রমাণ পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী বিচার হতে হবে। জনতা নিজেরাই বিচারক ও শাস্তিদাতা হয়ে উঠলে সেখানে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হয় না। বরং আইনের শাসনকে প্রকাশ্যে অস্বীকার করা হয়।
এই বিপদ শুধু ধর্মীয় অভিযোগে সীমাবদ্ধ নয়। কাউকে চোর সন্দেহ করা, অপরাধী মনে করা কিংবা তার বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত অভিযোগ ওঠা, কোনোটিই গণপিটুনি দেওয়ার বৈধতা দেয় না। অভিযোগ সত্য হলেও মব জাস্টিস ন্যায়বিচার নয়। আর অভিযোগ মিথ্যা হলে একজন নিরপরাধ মানুষের জীবন ধ্বংস হয়ে যেতে পারে।
মব সহিংসতার প্রকৃত ব্যাপ্তি নিয়েও তথ্যের বড় ব্যবধান রয়েছে। দ্য ডেইলি স্টার-এ ২০ অক্টোবর ২০২৬ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে মানবাধিকার সংগঠন HRSS-এর পর্যবেক্ষণের বরাতে বলা হয়েছে, জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত দেশে ৩৯৮টি মব সহিংসতার ঘটনায় অন্তত ১৮৭ জন নিহত হয়েছেন। অন্যদিকে, একই সময়ের জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হিসাব সংবাদমাধ্যমে ৬৩টি ঘটনা এবং ৪০ জন নিহতের তথ্য জানিয়েছে। HRSS-এর হিসাব ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হিসাব।
এই সংখ্যাগুলো ভিন্ন তথ্য সংগ্রহ ও গণনার পদ্ধতির ভিত্তিতে তৈরি, তাই এগুলোকে সরাসরি তুলনীয় বলা যায় না। তবে এত বড় ব্যবধানের কারণ স্বচ্ছভাবে ব্যাখ্যা করা জরুরি। জনতার হাতে সহিংসতা ঠেকানোর পাশাপাশি ঘটনাগুলোর নির্ভরযোগ্য নথিভুক্তিও রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধা কিংবা অপরাধের প্রতি ক্ষোভ, কোনোটিই অন্য মানুষের জীবন ও সম্পত্তির ওপর আক্রমণের অনুমতি দেয় না। একটি রাষ্ট্রের শক্তি প্রকাশ পায় জনতার দাবি মেনে শাস্তি দেওয়ার মধ্যে নয়, বরং উত্তেজনার মধ্যেও প্রমাণ ও আইনের ভিত্তিতে বিচার নিশ্চিত করার মধ্যে।
ধর্মের নামে অন্যায়ের সমালোচনা করা মানেই ধর্মকে আক্রমণ করা নয়। বরং ধর্মীয় পরিচয়কে অন্যায়ের ঢাল হিসেবে ব্যবহার করার চেষ্টা হলে সেটিকে প্রশ্ন করা জরুরি। একইভাবে, কোনো ব্যক্তির অপরাধের দায় তার পুরো ধর্মীয় সম্প্রদায়ের ওপর চাপিয়ে দেওয়াও ন্যায়সংগত নয়।
যে সমাজে জনতার ক্রোধ বিচারপ্রক্রিয়ার বিকল্প হয়ে ওঠে, সেখানে শেষ পর্যন্ত কারও নিরাপত্তাই নিশ্চিত থাকে না।
৩. দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতি: অন্যের অনিয়মে ক্ষোভ, নিজের বেলায় আপস
দুর্নীতির বিরুদ্ধে কথা বলা সহজ। নিজের সুবিধার জন্য দুর্নীতির সুযোগ প্রত্যাখ্যান করা তুলনামূলকভাবে কঠিন।
আমরা ঘুষের সমালোচনা করি, কিন্তু কোনো কাজ দ্রুত করিয়ে নেওয়ার জন্য অনিয়মের সুবিধা পেতে চাই কি না, সেই প্রশ্নটি এড়িয়ে যাই। নিয়োগে স্বজনপ্রীতির বিরুদ্ধে কথা বলি, কিন্তু নিজের পরিচিত কেউ যোগ্যতার বাইরে সুযোগ পেলে তাকে প্রত্যাখ্যান করতে কতজন প্রস্তুত থাকি?
এই দ্বিচারিতা দুর্নীতির সামাজিক ভিত্তিকে শক্তিশালী করে।
দুর্নীতি শুধু সরকারি অর্থ আত্মসাতের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। স্বজনপ্রীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার, নিয়মের অসৎ ব্যবহার এবং ব্যক্তিগত সম্পর্কের ভিত্তিতে সুযোগ বণ্টনও ন্যায্যতার কাঠামোকে দুর্বল করে। এর ফলে যোগ্য মানুষ বঞ্চিত হন, প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে আস্থা কমে এবং পরিশ্রমের পরিবর্তে পরিচিতিকে সাফল্যের পথ হিসেবে বিবেচনা করার প্রবণতা বাড়ে।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের ২০২৫ সালের দুর্নীতির ধারণাসূচকে বাংলাদেশের স্কোর ছিল ১০০-এর মধ্যে ২৪ এবং অবস্থান ছিল ১৮২টি দেশের মধ্যে ১৫০তম। সূচকটি সরকারি খাতের দুর্নীতি সম্পর্কে বিশেষজ্ঞ ও ব্যবসায়ীদের ধারণা পরিমাপ করে; এটি দেশের প্রতিটি দুর্নীতির ঘটনা বা প্রত্যেক নাগরিকের অভিজ্ঞতার সরাসরি গণনা নয়। তবু ফলাফলটি প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি নিয়ে গুরুতর উদ্বেগের ইঙ্গিত দেয়। সূত্র: ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ, ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬।
এখানে সমাধান শুধু মানুষকে সৎ হওয়ার উপদেশ দেওয়া নয়। দরকার স্বচ্ছ নিয়োগপ্রক্রিয়া, জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠান, কার্যকর তদন্ত এবং নিয়মের সমান প্রয়োগ। কিন্তু প্রতিষ্ঠান সংস্কারের দাবির পাশাপাশি ব্যক্তিগত সুবিধার জন্য অন্যায়কে প্রশ্রয় দেওয়ার মানসিকতাও বদলাতে হবে।
যে ব্যক্তি দুর্নীতির বিরুদ্ধে কথা বলেন, কিন্তু নিজের স্বার্থে নিয়ম ভাঙাকে অপরাধ মনে করেন না, তার প্রতিবাদ নীতির চেয়ে সুবিধার প্রতি বেশি অনুগত।
দুর্নীতিবিরোধী অবস্থানের প্রকৃত পরীক্ষা তখনই হয়, যখন অন্যায়ের সুযোগটি নিজের সামনে আসে।
৪. শিক্ষিত বেকারত্ব: ডিগ্রি আছে, সুযোগ কোথায়?
একজন তরুণ বছরের পর বছর পড়াশোনা করে ডিগ্রি অর্জন করেন। পরিবার তার পেছনে অর্থ ব্যয় করে, তিনি নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রত্যাশা তৈরি করেন। তারপর চাকরির বাজারে প্রবেশ করে দেখেন, শিক্ষাগত যোগ্যতা থাকলেও উপযুক্ত কাজের সুযোগ সীমিত। কখনো নিয়োগপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে, কখনো অভিজ্ঞতার অভাব বাধা হয়ে দাঁড়ায়, আবার কখনো অর্জিত শিক্ষার সঙ্গে কাজের বাজারের চাহিদার মিল পাওয়া যায় না।
এই পরিস্থিতিকে শুধু তরুণদের অলসতা কিংবা দক্ষতার অভাব বলে ব্যাখ্যা করা অন্যায় সরলীকরণ।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের ২০২৬ সালের বাংলাদেশবিষয়ক প্রতিবেদনে শ্রমশক্তি জরিপের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ২০২৪ সালে উচ্চশিক্ষিত তরুণদের বেকারত্বের হার ছিল প্রায় ২৫.৭ শতাংশ। উচ্চশিক্ষিত নারীদের ক্ষেত্রে সামগ্রিক বেকারত্বের হার ছিল ১৬.৬৬ শতাংশ, যেখানে উচ্চশিক্ষিত পুরুষদের হার ছিল ৬.৩৭ শতাংশ। প্রথম সংখ্যাটি উচ্চশিক্ষিত তরুণদের জন্য, আর পরের দুটি উচ্চশিক্ষিত নারী ও পুরুষের বিস্তৃত গোষ্ঠীর জন্য। সূত্র: IMF, Bangladesh Article IV Consultation, ২০২৬।
এই তথ্য একটি অস্বস্তিকর বাস্তবতার দিকে নির্দেশ করে: শিক্ষা অর্জনের পরও বিপুলসংখ্যক তরুণের জন্য উপযুক্ত কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা বড় চ্যালেঞ্জ।
এমন পরিস্থিতিতে মেধার মূল্য, নিয়োগের স্বচ্ছতা এবং প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। যদি তরুণেরা বিশ্বাস করতে শুরু করেন যে যোগ্যতার চেয়ে পরিচিতি, সুপারিশ কিংবা প্রভাব বেশি কার্যকর, তাহলে শুধু চাকরির অভাব নয়, প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে আস্থার সংকটও তৈরি হয়।
সামাজিকভাবে আবার অনেক সময় বেকার তরুণকে ব্যর্থ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তার সংগ্রামের পেছনে থাকা কাঠামোগত সমস্যাগুলো উপেক্ষা করে ব্যক্তিগত যোগ্যতা নিয়ে মন্তব্য করা হয়। অথচ কর্মসংস্থানের সুযোগ, শিল্পের বিকাশ, দক্ষতার সঙ্গে চাকরির চাহিদার সামঞ্জস্য এবং স্বচ্ছ নিয়োগপ্রক্রিয়া ছাড়া সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়।
একটি সমাজ তার তরুণদের কাছ থেকে পরিশ্রম, যোগ্যতা ও দায়িত্বশীলতা চাইতে পারে। কিন্তু সেই সমাজেরও দায়িত্ব হলো তাদের জন্য ন্যায্য সুযোগ তৈরি করা।
তরুণদের শুধু ধৈর্য ধরতে বলা যথেষ্ট নয়। তাদের জন্য কার্যকর সুযোগ তৈরি হচ্ছে কি না, সেটিও জবাবদিহির বিষয়।
৫. শ্রেণিবৈষম্য: অর্থ আছে বলে মর্যাদা বেশি?
আমাদের সমাজে মানুষের আর্থিক অবস্থান অনেক সময় তার প্রতি আচরণের ধরন নির্ধারণ করে। কারও বাড়ি, গাড়ি, পোশাক কিংবা পেশা দেখে তাকে সম্মান দেওয়া হয়। অন্যদিকে, পরিচ্ছন্নতাকর্মী, গৃহকর্মী, রিকশাচালক কিংবা নিম্ন আয়ের শ্রমজীবী মানুষের প্রতি এমন আচরণ করা হয়, যা সামাজিক মর্যাদার সমতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
একজন ধনী ব্যক্তির বক্তব্য শোনার সুযোগ বেশি, অথচ একজন দরিদ্র মানুষ একই পরিস্থিতিতে সহজেই অপমানের শিকার হতে পারেন। একজন সেবাকর্মী নিজের কাজ করছেন বলে তাকে অসম্মানজনক ভাষায় কথা বলা হয়, যেন পারিশ্রমিকের বিনিময়ে কাজ করার অর্থ নিজের মর্যাদা বিসর্জন দেওয়া।
এই মানসিকতা এমন একটি সামাজিক শ্রেণিবিন্যাসকে স্বাভাবিক করে, যেখানে মানুষের মূল্য তার সম্পদ দিয়ে নির্ধারিত হয়।
অথচ শ্রমের মর্যাদা থাকা উচিত, শ্রমিকের সামাজিক অবস্থান যা-ই হোক। একজন পরিচ্ছন্নতাকর্মী কিংবা রিকশাচালক যে সেবা দিচ্ছেন, তা সমাজের দৈনন্দিন জীবন সচল রাখার অংশ। তাঁর সঙ্গে সম্মানজনক আচরণ করা কোনো দয়া নয়, বরং মানুষের প্রাপ্য মর্যাদার স্বীকৃতি।
শ্রেণিবৈষম্যের আরেকটি দিক হলো সুযোগের অসমতা। ভালো শিক্ষা, চিকিৎসা, নিরাপদ বাসস্থান এবং ন্যায্য কর্মসংস্থানে প্রবেশের সুযোগ সবার জন্য সমান না হলে শুধু ব্যক্তিগত পরিশ্রমের কথা বলে বৈষম্যের ব্যাখ্যা দেওয়া যায় না।
ব্যক্তিগত উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু প্রত্যেক মানুষের সূচনাবিন্দু এক নয়। একজনের কাছে শিক্ষার জন্য অর্থ, পরিচিতি ও নিরাপদ পরিবেশ রয়েছে, অন্যজনকে পরিবারের জীবিকা নির্বাহের জন্য অল্প বয়সেই কাজ করতে হয়। তাদের ফলাফলকে শুধু ব্যক্তিগত যোগ্যতার তুলনা দিয়ে বিচার করা বাস্তবতাকে উপেক্ষা করা।
একইভাবে, নারীর যৌতুকজনিত নির্যাতন, শিশুবিবাহ, শ্রমজীবী মানুষের অধিকার উপেক্ষা কিংবা দরিদ্র মানুষের প্রতি অবজ্ঞা, এসবকে আলাদা বিচ্ছিন্ন ঘটনা মনে করলে সমস্যার গভীরতা বোঝা যায় না। এসবের মধ্যে ক্ষমতা, অর্থনৈতিক নির্ভরতা এবং সামাজিক মর্যাদার অসম বণ্টনের প্রভাব থাকতে পারে।
মানুষের পকেটের ওজন দিয়ে তার মর্যাদা মাপা শুরু করলে সমাজে সমতার কথা বলা নিছক ভণ্ডামিতে পরিণত হয়।
৬. রাজনীতি যখন মতাদর্শ নয়, পরিচয়ের যুদ্ধ
রাজনীতি মানুষের জীবন, অধিকার ও রাষ্ট্রের ভবিষ্যতের সঙ্গে সম্পর্কিত। তাই রাজনৈতিক মতপার্থক্য স্বাভাবিক এবং প্রয়োজনীয়। সমস্যা তৈরি হয় যখন রাজনৈতিক পরিচয় মানুষের বিচারবোধকে নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করে।
নিজের পছন্দের দল বা গোষ্ঠীর কেউ অন্যায় করলে তা ছোট করে দেখা হয়। প্রতিপক্ষের কেউ একই কাজ করলে কঠোর জবাবদিহি দাবি করা হয়। নিজের পক্ষের অনিয়মের জন্য প্রেক্ষাপট খোঁজা হয়, অন্য পক্ষের ভুলকে তার পুরো গোষ্ঠীর চরিত্রের প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরা হয়।
এই মানসিকতায় নীতি গৌণ হয়ে পড়ে, পরিচয় মুখ্য হয়ে ওঠে।
কিন্তু কোনো রাজনৈতিক দল কিংবা মতাদর্শের প্রতি সমর্থন তার প্রতিটি কাজকে ন্যায়সংগত করে না। নিজের পক্ষের অন্যায়েরও সমালোচনা করতে না পারলে রাজনৈতিক আনুগত্য নাগরিক দায়িত্বকে দুর্বল করে। রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিরপেক্ষ ও জবাবদিহিমূলক রাখার দাবি তখন দলীয় সুবিধার কাছে পরাজিত হওয়ার ঝুঁকিতে থাকে।
আরও বিপজ্জনক হলো, রাজনৈতিক বিরোধ যখন ব্যক্তিগত শত্রুতায় পরিণত হয়। মতপ্রকাশের কারণে কাউকে হুমকি দেওয়া, অপমান করা কিংবা তার নিরাপত্তা বিঘ্নিত করার প্রবণতা কোনো সুস্থ রাজনৈতিক সংস্কৃতির লক্ষণ নয়।
একটি সমাজে ক্ষমতার পরিবর্তন ঘটলেই যদি পুরোনো অন্যায়ের জায়গায় নতুন অন্যায় প্রতিষ্ঠিত হয়, তাহলে মূল সমস্যার সমাধান হয় না। ক্ষমতার অধিকারী কারা, শুধু সেটি বদলানো যথেষ্ট নয়। ক্ষমতার ব্যবহার কীভাবে নিয়ন্ত্রিত হবে, জবাবদিহি কীভাবে নিশ্চিত হবে এবং নাগরিক অধিকার কীভাবে সুরক্ষিত থাকবে, সেগুলোও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
সুষ্ঠু রাজনৈতিক সংস্কৃতির জন্য নিজের দলের সমালোচনা করার স্বাধীনতা, বিরোধী মতের প্রতি ন্যায্য আচরণ এবং প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি অপরিহার্য।
নিজের পক্ষের জয়কে সত্যের চেয়ে বড় করে দেখলে শেষ পর্যন্ত সবাই সত্য হারায়।
৭. সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম: গুজব, অপমান এবং জনতার আদালত
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম মানুষের বক্তব্য প্রকাশের সুযোগ বাড়িয়েছে। কিন্তু একই সঙ্গে গুজব, সংঘবদ্ধ হয়রানি এবং জনতার বিচার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রও তৈরি করেছে।
কোনো অভিযোগ প্রকাশিত হলেই অনেক সময় তথ্য যাচাইয়ের আগে কাউকে অপরাধী ঘোষণা করা হয়। তার ব্যক্তিগত তথ্য ছড়িয়ে দেওয়া হয়, ছবি নিয়ে অপমান করা হয় কিংবা অন্যদেরও আক্রমণে অংশ নিতে উৎসাহিত করা হয়। বক্তব্যের যুক্তির উত্তর না দিয়ে বক্তার ব্যক্তিগত জীবনকে আক্রমণের লক্ষ্য বানানো হয়।
এটি সমালোচনা নয়, অনেক ক্ষেত্রে চরিত্রহনন।
একটি পোস্ট হাজার মানুষ শেয়ার করলেই তা সত্য হয়ে যায় না। জনতার ক্ষোভ কোনো অভিযোগের চূড়ান্ত প্রমাণ নয়। কারও বক্তব্য ভুল হলে তার সমালোচনা করা যায়, কিন্তু ব্যক্তিগত তথ্য ছড়িয়ে হয়রানি করা কিংবা প্রমাণ ছাড়া অপরাধী ঘোষণা করা গ্রহণযোগ্য নয়।
এখানে তথ্য যাচাইয়ের অভ্যাসও প্রশ্নের মুখে পড়ে। কোনো বক্তব্য নিজের বিশ্বাসের সঙ্গে মিললে সহজেই গ্রহণ করা হয়, আর বিপরীত বক্তব্য হলে তা যাচাইয়ের আগেই প্রত্যাখ্যান করা হয়। ফলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কখনো কখনো সত্য অনুসন্ধানের পরিবর্তে পূর্বধারণাকে আরও শক্তিশালী করে।
এর বাস্তব পরিণতি আছে। ভুল তথ্য কারও সম্মান নষ্ট করতে পারে, ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশ নিরাপত্তা বিপন্ন করতে পারে এবং উসকানিমূলক বক্তব্য বাস্তব জীবনে সহিংসতার পরিবেশ তৈরি করতে পারে।
প্রযুক্তির ব্যবহার বেড়েছে বলেই সমাজ যুক্তিবাদী হয়ে উঠেছে, এমন নয়। প্রযুক্তির সঙ্গে দায়িত্ববোধ না বাড়লে দ্রুত ছড়িয়ে পড়া তথ্যের পাশাপাশি দ্রুত ছড়িয়ে পড়বে ভুল, বিদ্বেষ ও বিভাজনও।
৮. মানসিক স্বাস্থ্য ও পরিবার: অনুভূতিকে দুর্বলতা ভাবার মূল্য
সামাজিক সংকট শুধু প্রকাশ্য অপরাধ বা রাজনৈতিক আচরণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। পরিবারে শিশুদের সঙ্গে আচরণ, মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কে ধারণা এবং আবেগ প্রকাশের সুযোগও একটি সমাজের মূল্যবোধকে প্রভাবিত করে।
কেউ নিজের মানসিক কষ্টের কথা বললে তাকে দুর্বল বলা হয়। সাহায্য চাইলে তাকে অতিরিক্ত সংবেদনশীল বলে উপহাস করা হয়। শিশু ভুল করলে বোঝানোর পরিবর্তে অপমান করা হয়, প্রশ্ন করলে চুপ থাকতে বলা হয়, আর নিজের অনুভূতি প্রকাশ করলে সেটিকে গুরুত্বহীন বলে উড়িয়ে দেওয়া হয়।
এভাবে মানুষকে সমস্যা সমাধান শেখানোর পরিবর্তে কষ্ট লুকাতে শেখানো হয়।
একটি শিশুকে শাসন করা আর তাকে ভয় দেখিয়ে নিয়ন্ত্রণ করা এক বিষয় নয়। সীমারেখা শেখানো জরুরি, কিন্তু সেই সীমারেখার নামে তার আত্মসম্মান ক্ষুণ্ন করা কিংবা তার অনুভূতিকে অস্বীকার করা সুস্থ বিকাশের নিশ্চয়তা দেয় না।
মানসিক স্বাস্থ্যসংক্রান্ত সমস্যা থাকলে সব সময় শুধু ধৈর্য ধরার উপদেশ যথেষ্ট নয়। কখনো নিরাপদ পরিবেশ, সামাজিক সহায়তা কিংবা পেশাদার সাহায্যের প্রয়োজন হতে পারে। এসব প্রয়োজনকে লজ্জার বিষয় বানালে মানুষ সাহায্য চাইতে নিরুৎসাহিত হন।
পরিবারের ভেতরেও পারস্পরিক সম্মান, আবেগ প্রকাশের সুযোগ এবং ভুল স্বীকার করার সংস্কৃতি জরুরি। বড়রা যদি ভিন্নমতকে অপমান করেন, দুর্বলকে ছোট করেন কিংবা নিজের আচরণের দায় নিতে অস্বীকার করেন, তাহলে পরবর্তী প্রজন্ম শুধু উপদেশ শুনে বিপরীত মূল্যবোধ শিখবে, এমন প্রত্যাশা বাস্তবসম্মত নয়।
শিশুরা আমরা কী বলি, শুধু তা শেখে না। আমরা কী করি, সেটিও শেখে।
৯. নাগরিক দায়িত্ব: অধিকার চাই, কিন্তু নিজের দায়িত্ব কতটা মানি?
আমরা রাষ্ট্রের ব্যর্থতা নিয়ে কথা বলি, যা নাগরিক অধিকার ও জবাবদিহির জন্য জরুরি। কিন্তু নিজের আচরণের দায় নেওয়ার প্রশ্নটি অনেক সময় উপেক্ষিত হয়।
জনসাধারণের স্থানে ময়লা ফেলা, ট্রাফিক আইন অমান্য করা, ফুটপাত দখল করা, লাইনে দাঁড়ানোর নিয়ম ভাঙা কিংবা নিজের সুবিধার জন্য অন্যের চলাচল বাধাগ্রস্ত করাকে অনেকেই সামান্য বিষয় মনে করেন।
কিন্তু নাগরিক জীবনের নিয়মগুলোই নির্ধারণ করে, মানুষ পরস্পরের অধিকার কতটা সম্মান করে।
রাষ্ট্রের দায়িত্ব নিরাপদ ফুটপাত, কার্যকর গণপরিবহন, পরিকল্পিত নগরব্যবস্থা এবং আইন প্রয়োগ নিশ্চিত করা। নাগরিকের দায়িত্ব সেই ব্যবস্থার মধ্যে অন্যের অধিকারকে সম্মান করা। এক পক্ষের ব্যর্থতা অন্য পক্ষকে সব দায়িত্ব থেকে মুক্ত করে না।
একইভাবে, দুর্নীতির বিরুদ্ধে কথা বলে নিজের সুবিধার জন্য ঘুষের সুযোগ খোঁজা, ন্যায়বিচারের দাবি করে নিজের পছন্দের মানুষের অন্যায় আড়াল করা কিংবা আইনের সমান প্রয়োগ চেয়ে নিজের বেলায় ব্যতিক্রম প্রত্যাশা করা, এসব আচরণে মৌলিক অসংগতি রয়েছে।
নিজের সামান্য সুবিধাকে অন্যের অধিকার ক্ষুণ্ন করার যথেষ্ট কারণ মনে করলে সামাজিক ন্যায়বিচারের দাবি দুর্বল হয়ে পড়ে।
নাগরিক দায়িত্বের অর্থ রাষ্ট্রের সমালোচনা বন্ধ করা নয়। বরং রাষ্ট্রকে জবাবদিহির আওতায় আনার পাশাপাশি নিজের আচরণেও ন্যায্যতার চর্চা করা।
১০. পরিবর্তনের শুরু কোথায়?
এই সমস্যাগুলোকে শুধু ব্যক্তিগত নৈতিকতার অভাব বলে ব্যাখ্যা করা যথেষ্ট নয়। প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা, স্বচ্ছতার অভাব, বৈষম্যমূলক সামাজিক নিয়ম এবং জবাবদিহির ঘাটতিও অন্যায়কে টিকিয়ে রাখতে পারে।
যৌন সহিংসতা ও মব হামলার নিরপেক্ষ তদন্ত এবং বিচার নিশ্চিত করতে হবে। নিয়োগ ও সেবায় স্বজনপ্রীতি কমাতে স্বচ্ছতা বাড়াতে হবে। আইন যেন পরিচয় ও প্রভাব নির্বিশেষে সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে। শিক্ষায় যুক্তিবোধ, তথ্য যাচাই এবং ভিন্নমতের প্রতি শ্রদ্ধার চর্চা বাড়াতে হবে।
সামাজিক ও ধর্মীয় নেতৃত্বের দায়িত্ব হলো মানুষের আবেগকে উত্তেজিত করে সহিংসতা ছড়ানো নয়, বরং উত্তেজনার মধ্যেও মানবিক মর্যাদা ও ন্যায়বিচারের পক্ষে দাঁড়ানো। রাজনৈতিক নেতৃত্বের দায়িত্বও একইভাবে ক্ষমতার ব্যবহারে জবাবদিহি নিশ্চিত করা।
কিন্তু কাঠামোগত পরিবর্তনের পাশাপাশি ব্যক্তিগত আত্মসমালোচনাও জরুরি।
আমি কি নিজের সুবিধার জন্য নিয়ম ভাঙতে প্রস্তুত? নিজের গোষ্ঠীর কেউ অন্যায় করলে কি তার জবাবদিহি চাই? আর্থিক অবস্থান কিংবা সামাজিক পরিচয়ের কারণে কি মানুষের প্রতি আচরণ বদলে ফেলি? কোনো অভিযোগ যাচাই না করে কি তা ছড়িয়ে দিই? নিজের বিশ্বাসের বিপরীতে গেলেও সত্যকে স্বীকার করতে পারি?
এসব প্রশ্নের উত্তর সব সময় স্বস্তিদায়ক নাও হতে পারে। তবু সমাজ পরিবর্তনের দাবি বিশ্বাসযোগ্য করতে হলে সেগুলোর মুখোমুখি হওয়া জরুরি।
আত্মসমালোচনা মানে সব সমস্যার দায় নিজের ওপর নেওয়া নয়। এর অর্থ হলো, যে অন্যায়ের সমালোচনা করি, নিজের আচরণেও তার কোনো প্রকাশ আছে কি না, তা পরীক্ষা করার সাহস রাখা।
একই সঙ্গে মনে রাখতে হবে, ব্যক্তিগত পরিবর্তন রাষ্ট্রের দায়িত্বের বিকল্প নয়। নাগরিকের আচরণ বদলাতে হবে, আবার প্রতিষ্ঠানকেও কার্যকর হতে হবে। ন্যায়বিচারের ভার কোনো ভুক্তভোগীর সাহস কিংবা সাধারণ মানুষের সদিচ্ছার ওপর ছেড়ে দেওয়া যায় না।
উপসংহার: যে সমাজ অন্যায়কে স্বাভাবিক করে, তার অগ্রগতির দাবি প্রশ্নের মুখে পড়বেই
বাংলাদেশ কোথায় যাচ্ছে, তার উত্তর শুধু অর্থনৈতিক বাস্তবতা কিংবা রাষ্ট্রের নীতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। উত্তর রয়েছে আমরা কাকে সম্মান করি, কার স্বাধীনতাকে স্বীকার করি, দুর্বল মানুষের অধিকার রক্ষায় কতটা আন্তরিক থাকি এবং অন্যায়ের মুখোমুখি হলে কার পাশে দাঁড়াই, তার মধ্যেও।
আমরা যদি ধর্ষণের জন্য নারীর পোশাককে দায়ী করি, তবে অপরাধীর দায় আড়াল করার ঝুঁকি তৈরি করি। যদি ধর্মের নামে মব সহিংসতাকে সমর্থন করি, তবে আইনের শাসন দুর্বল করি। যদি দুর্নীতির নিন্দা করে নিজের সুবিধার জন্য অনিয়মকে মেনে নিই, তবে নিজেরাই সেই সংস্কৃতিকে টিকিয়ে রাখতে সাহায্য করি। যদি যোগ্যতার চেয়ে পরিচয়কে প্রাধান্য দিই, তবে ন্যায্য সুযোগের ভিত্তি নষ্ট করি। আর যদি ভিন্নমতকে শত্রু মনে করি, তবে সমাজের আত্মসমালোচনা ও সংশোধনের পথ সংকুচিত করি।
এসব সমস্যার মধ্যে একটি সাধারণ সূত্র রয়েছে: নিজের সুবিধা, পরিচয় কিংবা বিশ্বাসের স্বার্থে অন্যের অধিকারকে কম গুরুত্বপূর্ণ মনে করার প্রবণতা।
দেশকে ভালোবাসা মানে তার প্রতিটি সামাজিক বাস্তবতাকে সমর্থন করা নয়। অন্যায়কে প্রশ্ন করা, দুর্বল মানুষের পাশে দাঁড়ানো এবং প্রচলিত বিশ্বাসের মধ্যে থাকা বৈষম্যকে চ্যালেঞ্জ করাও দেশকে ভালোবাসার অংশ।
বাংলাদেশে অন্যায়ের বিরুদ্ধে কাজ করছেন এমন মানুষ আছেন। ভুক্তভোগীদের পাশে দাঁড়াচ্ছেন, দুর্নীতির বিরুদ্ধে কথা বলছেন, মানবাধিকার রক্ষার চেষ্টা করছেন এবং সামাজিক মূল্যবোধ নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন, এমন মানুষের উপস্থিতি গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু তাদের উপস্থিতি আমাদের সমস্যাগুলো উপেক্ষা করার অজুহাত হতে পারে না।
প্রশ্নটি তাই বাংলাদেশে ভালো মানুষ আছেন কি না, তা নয়। প্রশ্ন হলো, অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ কতটা কার্যকর, প্রতিষ্ঠান কতটা জবাবদিহিমূলক এবং মানুষ নিজের ভুল সংশোধন করতে কতটা প্রস্তুত।
একটি সমাজের পশ্চাৎপদতা তখনই গভীর হয়, যখন দুর্নীতিকে কৌশল, স্বজনপ্রীতিকে স্বাভাবিকতা, অন্ধ আনুগত্যকে বিশ্বাস, বৈষম্যকে ঐতিহ্য এবং সহিংসতাকে ন্যায়বিচার বলে মেনে নেওয়া শুরু হয়।
আমাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে, আমরা কি এমন একটি সমাজ চাই, যেখানে মানুষের মর্যাদা তার সম্পদ, লিঙ্গ, ধর্ম কিংবা রাজনৈতিক পরিচয়ের ওপর নির্ভর করবে, নাকি এমন একটি সমাজ চাই, যেখানে ন্যায়বিচার ও অধিকার সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য হবে?
বাংলাদেশকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য এই প্রশ্নগুলো এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। কেবল রাষ্ট্রের ব্যর্থতা নিয়ে কথা বললে হবে না, সামাজিক মানসিকতাকেও প্রশ্ন করতে হবে। আবার ব্যক্তিগত আচরণের পরিবর্তনের কথা বলে রাষ্ট্র ও প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বও আড়াল করা যাবে না।
কারণ, ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গড়তে হলে ব্যক্তির বিবেক এবং প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহি, দুটিই জরুরি।
একটি দেশকে পেছনে টেনে রাখার জন্য সব সময় বাইরের শত্রুর প্রয়োজন হয় না। কখনো কখনো নিজেদের ভেতরে লালন করা বৈষম্য, স্বজনপ্রীতি, অন্ধ আনুগত্য এবং অন্যায়ের প্রতি নীরবতাই যথেষ্ট।
বাংলাদেশকে ভালোবাসলে তাই শুধু দেশের সম্ভাবনা নিয়ে কথা বলুন না, তার সংকটগুলোকেও প্রশ্ন করুন। অন্যায়কে অন্যায় বলুন, নিজের সুবিধাজনক অন্যায়কেও। কারণ, যে সমাজ নিজের ভুল স্বীকার করতে শেখে না, সে সমাজ নিজের ভবিষ্যৎ বদলানোর সুযোগও হারায়।
প্রকৃত অগ্রগতির শুরু তখনই, যখন আমরা অন্যায়ের সঙ্গে অভ্যস্ত হয়ে যাওয়াকে স্বাভাবিক মনে করা বন্ধ করি।
About the Author
Prokash Singha
মজদুরের নিয়মিত লেখকMusician
Singer | Songwriter | Composer | Writer | Speaker
প্রোফাইল দেখুন
মতামত
এখনও কোনো মতামত নেই।
প্রথম মতামতটি আপনিই দিন।
আলোচনায় অংশ নিতে লগ ইন করুন অথবা এ্যাকাউন্ট খুলুন