সিলেটিদের নিয়ে আপনাদের সাম্প্রতিক এই ধারাবাহিক কদর্যতা দেখে সত্যি বলতে বিস্মিত হওয়ার চেয়ে বিস্মিত হচ্ছি আপনাদের অবিমৃষ্যকারিতায়; কারণ ব্যঙ্গ করারও একটি নান্দনিকতা আছে, বিদ্রূপেরও একটি বুদ্ধিবৃত্তিক শৃঙ্খলা আছে, এমনকি অপমানেরও একটি ন্যূনতম কাণ্ডজ্ঞান থাকা দরকার! কিন্তু আপনাদের এসব পোস্টে ব্যঙ্গের চেয়ে বাচালতা, রসবোধের চেয়ে কদর্থকল্পনা, যুক্তির চেয়ে দুরভিসন্ধি এবং রুচির চেয়ে রুচিবিকলতারই যেন অধিক প্রতিভাস ঘটছে! কোনো একটি অঞ্চলের মানুষকে নিয়ে রসিকতা করা অপরাধ নয়, আঞ্চলিক উচ্চারণ নিয়ে ঠাট্টা করাও পৃথিবীর কোথাও নিষিদ্ধ নয়; কিন্তু যখন সেই রসিকতা ক্রমশ একটি জনগোষ্ঠীর ভাষা, পরিচয়, সংস্কৃতি, ইতিহাস ও আত্মমর্যাদাকে অবজ্ঞাতব্য করে তোলার চেষ্টা করে, যখন মানুষকে মানুষ হিসেবে দেখার নৈর্ব্যক্তিক সামর্থ্যটুকুও বিসর্জন দিয়ে তাদের প’শু, যৌ’নতার পাত্র কিংবা কোনো নিম্নতর সত্তার সঙ্গে তুলনা করা হয়, তখন সেটিকে আর নিরীহ রসিকতা বলে অভ্যুপগম্য করার মতো কাণ্ডজ্ঞান কারও থাকা উচিত নয়। বরং তখন প্রশ্ন উঠতেই পারে এই অতিশয়োক্তিপ্রবণতা কি নিছক হাস্যরসের ফল, নাকি দীর্ঘদিনের কোনো দুরভিসন্ধিপরায়ণ মানসিকতার অবচেতন বহিঃপ্রকাশ? কারণ একজন মানুষ অন্য একজন মানুষকে পছন্দ না করতেই পারেন, একটি অঞ্চলের ভাষা তাঁর কর্ণকুহরে অপরিচিত ঠেকতেই পারে, কোনো আঞ্চলিক সংস্কৃতির সঙ্গে তাঁর আত্মিক সাযুজ্য নাও থাকতে পারে; কিন্তু সেই ব্যক্তিগত অনীহাকে একটি সম্পূর্ণ জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে কদর্য সাধারণীকরণে রূপান্তর করার যে স্বেচ্ছাচারী প্রবণতা, সেটি নিছক মতামত নয়—এটি অপ্রমিতজ্ঞতা, অবিনিবিষ্টচিত্ততা এবং একধরনের অস্মিতাপরায়ণ অর্বাচীনতার প্রকাশ। সিলেটি মানুষ কে, সিলেটি ভাষা কী, সিলেটের ইতিহাসের স্তরগুলো কোথায়, এই ভূখণ্ডের সঙ্গে বৃহত্তর বাংলার সম্পর্ক কীভাবে নির্মিত হয়েছে, সিলেটের প্রবাসী ইতিহাস কীভাবে একটি অঞ্চলের অর্থনীতি ও সামাজিক মনস্তত্ত্বকে বদলে দিয়েছে—এসব বিষয়ে সামান্য অধীতবিদ্যাও যাঁদের নেই, তাঁরাই যখন ফেসবুকের কয়েকটি মিম, অর্ধসত্য ও বাগাড়ম্বরপূর্ণ বাক্য দিয়ে একটি সমগ্র জনগোষ্ঠীর চরিত্র নির্ধারণে নেমে পড়েন, তখন তাঁদের বক্তব্যকে মতাদর্শ বলা যায় না, ইতিহাসচেতনা বলা যায় না, এমনকি সুস্থ ব্যঙ্গবোধও বলা যায় না; সেটি বরং অবিমৃষ্যকারিতার এক দীর্ঘ ও বেদনাদায়ক প্রদর্শনী। সবচেয়ে হাস্যকর বিষয় হলো, আপনারা সিলেটিদের নিয়ে যত কথা বলছেন, সিলেট সম্পর্কে তত কম জানাচ্ছেন; অর্থাৎ আপনাদের বক্তব্যের ভেতর তথ্যের উপস্থিতির চেয়ে আত্মম্ভরিতাপূর্ণ অজ্ঞতার উপস্থিতিই বেশি। কোনো একটি মানচিত্র দেখিয়ে, কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনার ছবি জুড়ে দিয়ে, দু-চারটি কদর্য শব্দের সঙ্গে কিছু আঞ্চলিক বিদ্বেষ মিশিয়ে একটি জনগোষ্ঠীর পরিচয় নির্মাণ করা যায় না; ইতিহাস এত সহজলভ্য নয়, সংস্কৃতি এত অর্বাচীন নয়, মানুষের আত্মপরিচয়ও আপনাদের কদর্থকল্পনার মতো এত ঠুনকো নয়। বাংলাদেশ কোনো একরৈখিক ভূখণ্ড নয় যে তার প্রতিটি মানুষকে একই উচ্চারণে, একই খাদ্যাভ্যাসে, একই লোকস্মৃতিতে, একই সাংস্কৃতিক রীতিতে এবং একই আঞ্চলিক চেতনায় কথা বলতে হবে; এই ভূখণ্ডের সৌন্দর্য তার বহুত্বে, তার ভাষিক বৈচিত্র্যে, তার উপভাষার স্বাতন্ত্র্যে, তার আঞ্চলিক স্মৃতির বহুস্বরিকতায়। সিলেটি মানুষ সিলেটি বলবে, চাটগাঁইয়া মানুষ চাটগাঁইয়া বলবে, বরিশালের মানুষ বরিশাইল্যা বলবে—এতে কারও জাতীয় পরিচয় খর্ব হয় না; বরং একটি রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে কতগুলো স্বাতন্ত্র্য পাশাপাশি বেঁচে থাকতে পারে, সেটিই তার সভ্যতার পরিমাপ। অথচ আপনাদের কদর্থকল্পনা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, সিলেটি স্বাতন্ত্র্যাভিমানিতাকেও আপনারা বিচ্ছিন্নতাবাদ, আঞ্চলিক ঔদ্ধত্য কিংবা কোনো অদৃশ্য ষড়যন্ত্রের প্রমাণ হিসেবে দাঁড় করাতে চাইছেন। এ এক অদ্ভুত পরমুখাপেক্ষিতাবাদ! নিজস্ব যুক্তি ও তথ্যের ওপর দাঁড়াতে না পেরে অন্যের পরিচয়কে ছোট করে নিজের পরিচয়ের উচ্চতা প্রমাণ করার ব্যর্থ প্রয়াস। মনে রাখবেন, অন্যের মাথা নিচু করলেই নিজের মাথা উঁচু হয় না; বরং যে মানুষ নিজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য অন্যের মর্যাদা ক্ষুণ্ন করতে বাধ্য হয়, তার শ্রেষ্ঠত্বের ভিতটি শুরু থেকেই বালির ওপর নির্মিত। সিলেটিদের নিয়ে এই ধরনের উসকানিমূলক বাচালতা ছড়িয়ে আপনারা হয়তো মুহূর্তের জন্য কিছু হাসির রিঅ্যাকশন, কিছু শেয়ার কিংবা কয়েকজন অবিনিবিষ্ট দর্শকের বাহবা পেয়ে যেতে পারেন; কিন্তু একটি জাতিগোষ্ঠীর ইতিহাস, ভাষা ও সাংস্কৃতিক অস্তিত্বকে আপনারা একটিও মিম দিয়ে নস্যাৎ করতে পারবেন না। ইতিহাস তো ফেসবুকের কমেন্ট বক্সে রচিত হয় না, কোনো জনগোষ্ঠীর অস্তিত্ব কয়েকজন বাচাল বাগাড়ম্বরকারীর অনুমোদনের ওপর ইতিহাস নির্ভরশীল নয়, আর সংস্কৃতি এমন কোনো ভঙ্গুর কাচের পাত্রও নয় যে অর্বাচীন মূঢ়দের কদর্য মন্তব্যে সেটি চূর্ণ হয়ে যাবে। বরং এই ধরনের পোস্ট যত বাড়বে, ততই স্পষ্ট হবে কারা যুক্তির আশ্রয় নিতে অক্ষম, কারা অনভিসন্ধিৎসু, কারা অধীতবিদ্যাবিমুখ, কারা কেবল প্রগল্ভতার ওপর দাঁড়িয়ে নিজেদের প্রজ্ঞাবান বলে প্রতিপন্ন করতে চান। আপনারা সিলেটিদের নিয়ে যে ভাষায় কথা বলতেছেন, সেই ভাষাই আপনাদের পরিচয় বহন করছে; কারণ মানুষ তার শত্রু সম্পর্কে যা বলে, তার চেয়েও বেশি নিজের সম্পর্কে প্রকাশ করে তার বলার ভঙ্গিতে। সিলেটিদের নিয়ে আপনাদের কৌতুক তাই সিলেটিদের চরিত্রের দলিল নয়; এটি আপনাদের চরিত্রেরই দলিল। আর যদি সত্যিই আপনাদের বক্তব্যে কোনো ঐতিহাসিক আপত্তি থাকে, কোনো রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকে, কোনো সাংস্কৃতিক সমালোচনা থাকে—তবে সামনে আসুন, তথ্য দিন, সূত্র দিন, যুক্তি দিন, ইতিহাসের সঙ্গে ইতিহাসের মোকাবিলা করুন, ভাষার সঙ্গে ভাষার তর্ক করুন, সংস্কৃতির সঙ্গে সংস্কৃতির বিতর্ক করুন। কিন্তু যুক্তির জায়গায় যৌ’ন ইঙ্গিত, ইতিহাসের জায়গায় মিম, বিশ্লেষণের জায়গায় কদর্থকল্পনা এবং সমালোচনার জায়গায় একটি জনগোষ্ঠীকে হেয় করার প্রবণতা নিয়ে দাঁড়িয়ে নিজেকে সাহসী বা রসিক ভাবার মধ্যে যে মূঢ়মতিত্ব আছে, সেটি সত্যিই করুণ। কারণ দুর্বিনীতাচারী হওয়া সহজ, রুচিশীল হওয়া কঠিন; বাচাল হওয়া সহজ, প্রাজ্ঞ হওয়া কঠিন; অন্যকে হেয় করা সহজ, নিজের বক্তব্যকে প্রমাণ করা কঠিন; আর একটি জনগোষ্ঠীকে নিয়ে অশ্লীল রসিকতা করা সহজ, সেই জনগোষ্ঠীর ইতিহাস বুঝে তার সঙ্গে নৈর্ব্যক্তিকভাবে তর্ক করা অত্যন্ত কঠিন। আপনাদের কাছে তাই শেষ পর্যন্ত একটি কথাই—সিলেটিদের ভালোবাসতেই হবে, এমন কোনো দাবি নেই; সিলেটি ভাষা আপনাদের ভালো লাগতেই হবে, এমনও নয়; সিলেটের কোনো রাজনৈতিক বা সাংস্কৃতিক অবস্থানের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করার অধিকারও আপনাদের আছে। কিন্তু দ্বিমতকে বিদ্বেষে, সমালোচনাকে অবমাননায় এবং রসিকতাকে কদর্যতায় নামিয়ে আনার যে স্বেচ্ছানুবর্তিতা, সেটিকে স্বাধীন চিন্তা বলে চালিয়ে দেওয়া যাবে না। সিলেটিদের অপমান করলে সিলেট ছোট হয় না; ছোট হয় অপমানকারীর মানসিকতার পরিধি। সিলেটি ভাষাকে বিকৃত করে উপহাস করলে ভাষার মৃত্যু ঘটে না; প্রকাশ পায় উপহাসকারীর অপ্রমিতজ্ঞতা। একটি অঞ্চলের মানুষকে প’শুত্বের উপমায় নামিয়ে আনলে সেই মানুষগুলোর মর্যাদা কমে না; বরং মানুষের প্রতি মানুষের যে ন্যূনতম শিষ্টাচার, সেটিই আপনাদের বক্তব্যের ভেতর থেকে নির্বাসিত হয়ে যায়। অতএব আরও মিম বানান, আরও বাচাল হোন, আরও কদর্থকল্পনা করুন—কিন্তু মনে রাখবেন, প্রতিটি কুরুচিপূর্ণ বাক্য আপনাদের বিরুদ্ধে একটি করে সাক্ষ্য রেখে যাচ্ছে। ইতিহাসের কাছে নয়তো অন্তত ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে। আর ইতিহাসের সবচেয়ে নির্মম দিকটি হলো—সে অনেক কিছু ক্ষমা করে, কিন্তু একটি সময়ের মানুষের বুদ্ধিবৈকল্য, রুচিবিকলতা ও দুরভিসন্ধিপরায়ণতাকে প্রায় কখনোই ভুলে যায় না।
থিংক অ্যাবাউট ইট! টা টা!
সিলেটিদের নিয়ে আপনাদের নোংরামি আপনাদেরই চরিত্রের দলিল
About the Author
Muhammadullah Bin Mostofa
মজদুরের নিয়মিত লেখকAuthor|Editor|Publisher|Organizer
আমি মুহাম্মদুল্লাহ বিন মোস্তফা। কবিতা, গল্প, উপন্যাস ও প্রবন্ধ রচনার পাশাপাশি সাহিত্য সম্পাদনা ও সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করার লক্ষ্য নিয়ে নিয়মিত লিখি, নতুন লেখকদের উৎসাহিত করি এবং সৃজনশীল কাজের মাধ্যমে সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আনার স্বপ্ন দেখি। সাহিত্য, সংস্কৃতি ও মানবিক মূল্যবোধ আমার কাজের প্রধান অনুপ্রেরণা।
প্রোফাইল দেখুন
মতামত
এখনও কোনো মতামত নেই।
প্রথম মতামতটি আপনিই দিন।
আলোচনায় অংশ নিতে লগ ইন করুন অথবা এ্যাকাউন্ট খুলুন