হয়তো ধীরে ধীরে হ’ত্যা করা হয়েছে তাকে। কে করেছে? আমরাই তো করলাম! দুজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের ব্যক্তিগত সম্পর্ক নিয়ে আমাদের নৈতিক আপত্তি থাকতেই পারে, কোনো সম্পর্ক আমাদের মূল্যবোধের সঙ্গে না-ও মিলতে পারে, কিন্তু তাই বলে একটা মানুষকে প্রকাশ্যে টেনে এনে, তার ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে হাজার হাজার মানুষের সামনে বিচার বসানোর অধিকারটা আমরা কোথায় পেলাম? ধরলাম, ঘটনাটা নৈতিকতার বাইরে গেছে, বেশ তো, তদন্তের জন্য পুলিশের হাতে তুলে দিতে পারতাম, আইন তার নিজের মতো চলত, কে দোষী কে নির্দোষ সেটা তদন্তে বের হতো, আদালত বিচার করত; কিন্তু আমরা তা করলাম না, আমরা নিজেরাই বিচারক হয়ে গেলাম। বরং ৭৫ বছরের একজন মানুষের ভূমিকা কী ছিল সেটা জানার আগে ১৯ বছরের একটা মেয়েকে চেপে ধরলাম, তার চরিত্রের পোস্টমর্টেম শুরু করলাম, সে লোভী কি না, সে প্রস্টিটিউট কি না, সে কেন সেখানে গেল, কী চেয়েছিল, তার উদ্দেশ্য কী ছিল, যেন মেয়েটার জীবনের প্রতিটি সিদ্ধান্তের হিসাব আমাদের কাছে জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক। কিন্তু সে যে মানুষ, তারও যে একটা জীবন ছিল, স্বপ্ন ছিল, ভুল করার অধিকার ছিল, পরিস্থিতির শিকার হওয়ার সম্ভাবনা ছিল, এমনকি নিজের পছন্দে কিছু করার অধিকারও ছিল, এই কথাটা আমরা কতজন ভাবলাম? আর সত্যি বলতে কী, আমি তো জানিই না সে কী চেয়েছিল, আপনিও জানেন না, আমরা কেউই জানি না; অথচ জানি না বলেই তো তদন্তের দরকার ছিল, ফেসবুকের রায়ের না। আমরা বড় অদ্ভুত জাতি, কারও ব্যক্তিগত জীবনে উঁকি দেওয়ার পর নিজেদের নৈতিকতার চশমাটা চোখে দিয়ে বসে যাই, তারপর মানুষটার চরিত্রের সার্টিফিকেট বানিয়ে ফেলি। এই দেশে ব্যক্তি স্বাধীনতার কথা বললে অনেকেই এমনভাবে তাকায় যেন খুব অদ্ভুত কোনো কথা বলেছি, এইটা জাপান না, এইটা শকুনে খামচে ধরা বাংলাদেশ; এখানে মানুষকে ছিঁড়ে খাওয়ার মতো খবর পেলেই আমরা জড়ো হয়ে যাই, শিশুকা’ম, পশুকা’ম, নারী নির্যাতন, ধর্ষ’ণ, ক্ষমতার অপব্যবহার, কত কী ঘটে, কত কিছু চাপা পড়ে যায়, কত মানুষ বিচার পায় না, কিন্তু কোন ছেলে কোন মেয়ের সঙ্গে কথা বলল, কে কাকে ভালোবাসল, কার সঙ্গে কার ছবি উঠল, কে কোথায় গেল, সেসব নিয়ে আমাদের নৈতিকতার ঘুম ভেঙে যায় খুব সহজে। তখন আমরা সবাই পুলিশ, সবাই বিচারক, সবাই আলেম, সবাই মনোবিজ্ঞানী, সবাই আবার চরিত্র বিশ্লেষকও। মেয়েটা হয়তো অন্য একটা জীবনের স্বপ্ন দেখেছিল, হয়তো অতি বয়স্ক কাউকে বিয়ে করা বা সম্পর্কের মধ্যে জড়িয়ে পড়া তার জীবনের পরিকল্পনাই ছিল না, হয়তো পরিস্থিতি তাকে সেখানে নিয়ে গেছে, হয়তো নিজের সিদ্ধান্তেই গেছে, হয়তো তার সঙ্গে অন্যায় হয়েছে, হয়তো হয়নি, আমরা কিছুই জানি না; অথচ আমরা এমনভাবে কথা বলছি যেন তার জীবনের সব পাতা আমাদের সামনে খোলা ছিল। থামলাম না আমরা, কারণ আমাদের হাতে ফেসবুক আছে। টিজিং করতে করতে, ট্রল করতে করতে, একটা মানুষকে নিয়ে হাসতে হাসতে, তার ছবি শেয়ার করতে করতে, তার ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে গল্প বানাতে বানাতে আমরা এমন একটা জায়গায় নিয়ে যাই তাকে, যেখানে সে নিজের কাছেই অপরাধী হয়ে ওঠে। তারপর একদিন যদি সে নিজেকে পৃথিবী থেকে সরিয়ে নেয়, আমরা খুব সহজে বলি, মানুষটা দুর্বল ছিল। একটু শক্ত হতে পারত। জীবনটা তার ছিল না যেন আমাদের ছিল! একটা মানুষ তখনই নিজেকে বিলিয়ে দেয়, যখন জীবন তাকে এমন কিছু দিয়ে দেয় যার ভার সে আর ঠিকমতো সামলাতে পারে না। আর সেই ভারটা যে আমরাও একটু একটু করে বাড়িয়ে দিয়েছি কি না, সেই প্রশ্নটা আমরা নিজেদের করি না। আমরা শুধু শেষ দৃশ্যটা দেখি, তার আগের প্রতিটা দিন দেখি না। অথচ মানুষের শেষ সিদ্ধান্তের আগে কতগুলো ছোট ছোট মৃত্যু ঘটে, সেগুলোর কোনো খবর আমরা রাখি না। আত্মসম্মান মরে, মানুষের ওপর বিশ্বাস মরে, নিজের ওপর বিশ্বাস মরে, কাছের মানুষগুলো একে একে দূরে সরে যায়, তারপর একদিন মানুষটা নিজেই নিজের কাছে অসহ্য হয়ে ওঠে। এটা আত্মহ’নন, নাকি আমরা তাকে ধীরে ধীরে সেখানে পৌঁছে দিয়েছি, আমি জানি না। তাই সুষ্ঠু তদন্ত চাই। শুধু এই ঘটনার না, এর সঙ্গে জড়িত প্রতিটি বিষয়ের। কারণ ধীরে ধীরে হ’ত্যা হয়তো সর্বনিম্ন স্তরের সত্য; কোনো কিছু না হলে এটাই সত্যি, কিন্তু এরচেয়ে বড় কিছু যদি থেকে থাকে, সেটাও সামনে আসুক। আর একটা কথা খুব বলতে ইচ্ছে করছে, নাকি দাঁড়িটুপি আছে বলে তদন্তও থেমে যাবে? শুনেছি আলেমের দোষ ধরতে হয় না, তারা নাকি গুনাহের ঊর্ধ্বে। আমাদের জন্য গান শোনা পাপ, মেয়েদের সঙ্গে কথা বলা পাপ, প্রেম করা পাপ, মেয়েরা ঘর থেকে বের হলে কত রকমের প্রশ্ন; কিন্তু ধর্মীয় পরিচয় আছে এমন কারও বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ উঠলে হঠাৎ আমরা খুব সাবধান হয়ে যাই, বলি, আগে নিশ্চিত হওয়া দরকার। অবশ্যই নিশ্চিত হওয়া দরকার, সবার ক্ষেত্রেই। অভিযোগ উঠলেই কেউ অপরাধী হয়ে যায় না, আবার দাড়ি-টুপি থাকলেই কেউ তদন্তের ঊর্ধ্বে চলে যায় না। এই সহজ কথাটা আমরা কেন বুঝি না? ধর্মকে সম্মান করা আর ধর্মীয় পরিচয়কে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করা এক জিনিস না। কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ সত্যি হলে তার বিচার হবে, মিথ্যা হলে সেটাও পরিষ্কার হবে, কিন্তু পরিচয়ের কারণে সত্যটাকে চার দেয়ালের মধ্যে মিটিয়ে ফেলার চেষ্টা কেন থাকবে? আমরা কি ধর্মকে এতটাই দুর্বল করে ফেলেছি যে একজন মানুষের অপরাধ প্রকাশ পেলে ধর্মের সম্মান নষ্ট হয়ে যাবে? বরং অপরাধী যে-ই হোক, তাকে আইনের সামনে দাঁড় করানোই তো ধর্মের ন্যায়বোধকে সম্মান করা। আর ওই মেয়েটার কথা বারবার মনে পড়ছে। জানি না সে কী চেয়েছিল, জানি না তার জীবনে কী ঘটেছিল, জানি না শেষ রাতে তার মাথার ভেতর কী চলছিল। শুধু এটুকু জানি, সে একজন মানুষ ছিল। আমাদের মতোই। তারও হয়তো কিছু স্বপ্ন ছিল, কিছু লজ্জা ছিল, কিছু ভুল ছিল, কিছু ভালোবাসা ছিল, কিছু না বলা কথা ছিল। আমরা তাকে সেসব কিছু থেকে আলাদা করে শুধু একটা ভাইরাল ঘটনা বানিয়ে ফেললাম। তারপর আবার প্রশ্ন করছি, খু’ন নাকি আত্মহ’নন? জানি না। সত্যিই জানি না। কিন্তু জানার জন্য তদন্ত দরকার, বিচার দরকার, একটু ন্যায়বোধ দরকার। আমাদের ফেসবুকের রায় না।
About the Author
Muhammadullah Bin Mostofa
মজদুরের নিয়মিত লেখকAuthor|Editor|Publisher|Organizer
আমি মুহাম্মদুল্লাহ বিন মোস্তফা। কবিতা, গল্প, উপন্যাস ও প্রবন্ধ রচনার পাশাপাশি সাহিত্য সম্পাদনা ও সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করার লক্ষ্য নিয়ে নিয়মিত লিখি, নতুন লেখকদের উৎসাহিত করি এবং সৃজনশীল কাজের মাধ্যমে সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আনার স্বপ্ন দেখি। সাহিত্য, সংস্কৃতি ও মানবিক মূল্যবোধ আমার কাজের প্রধান অনুপ্রেরণা।
প্রোফাইল দেখুন
মতামত
এখনও কোনো মতামত নেই।
প্রথম মতামতটি আপনিই দিন।
আলোচনায় অংশ নিতে লগ ইন করুন অথবা এ্যাকাউন্ট খুলুন