প্রেম মানেই মুক্তি, এটাই আমরা শুনে এসেছি যুগের পর যুগ। প্রেম নাকি সব সীমানা ভাঙে, সমাজের শাসন অমান্য করে, আকাশ-পাতাল এক করে দেয়। কিন্তু একটু ভেবে দেখুন তো, আমরা যেভাবে প্রেম করি, তার পুরো ছকটা কি আসলে আমাদের নিজেদের তৈরি? নাকি কেউ আমাদের হয়ে সেটা অনেক আগেই লিখে রেখেছে? আমার এক বন্ধু সম্প্রতি ভালোবাসার মানুষটিকে জন্মদিনের উপহার দিতে গিয়ে বিপাকে পড়েছিল। তার ভাষায়, “বাজেট দশ হাজার টাকা। কিন্তু দশ হাজারে তো ভালোবাসা প্রকাশই হয় না!” কথাটা শুনে আমি থমকে গিয়েছিলাম। কবে থেকে ভালোবাসার সঙ্গে দামের একটা সরাসরি সম্পর্ক তৈরি হলো? অথচ আমরা সবাই এই সমীকরণটা মেনে নিয়েছি যে প্রেম করতে গেলে খরচ করতেই হবে। ফুল, চকলেট, রেস্তোরাঁর আলো, দামি ঘড়ি কিংবা বিদেশ ভ্রমণ; এই জিনিসগুলো ছাড়া যেন প্রেমই ‘প্রেম’ থাকে না।
আমরা ভাবি, এগুলো তো ব্যক্তিগত পছন্দ, নিজের ইচ্ছে। কিন্তু একটু পেছনে তাকালেই বোঝা যায়, এই পুরো ব্যাপারটা আমাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া। পুঁজিবাদ নিঃশব্দে প্রেমকে একটা পণ্যে রূপান্তরিত করেছে, আর সেই পণ্য কেনার জন্য আমরা আজীবন কিস্তি দিয়ে যাচ্ছি। আসুন, খুব সাদামাটাভাবে বিষয়টা ভেঙে দেখি।
১. প্রেমের স্ক্রিপ্ট: সিনেমা থেকে সত্যি না সত্যি বিজ্ঞাপন?
আমাদের প্রেম করার ধরনটা আসলে আগে থেকেই ঠিক করে দেওয়া। ছোটবেলা থেকে আমরা সিনেমা, নাটক আর বিজ্ঞাপন দেখে দেখে বড় হই। সেখানে দেখা যায়, নায়ক নায়িকাকে বলছে, “তোমাকে ছাড়া আমি অসম্পূর্ণ।” আর এই অসম্পূর্ণতা পূরণ করতে গিয়ে পর্দায় যা কিছু দেখানো হয়, তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে বিপণন।
লক্ষ করুন, রোমান্টিক ছবিতে প্রেমিক-প্রেমিকা কখনো ফুটপাতের চায়ের দোকানে বসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা গল্প করে না (করে তো এখন আর দেখানো হয় না)। দেখা যায় তারা কোনো দামি কফি শপে বসে, নির্দিষ্ট ব্র্যান্ডের কাপে চুমুক দিচ্ছে। বৃষ্টিতে ভিজলে সেই দৃশ্য বিক্রি করে নির্দিষ্ট পোশাকের কোম্পানি। ছুটির দিনে তারা সমুদ্র দেখতে যায় প্লেন চেপে, ট্রেনে নয়।
ফলাফল কী দাঁড়ায়? আমাদের অবচেতনে প্রেমের একটা ‘স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউর’ গেঁথে যায়। আমরা ভাবতে শুরু করি, প্রেম মানেই সপ্তাহান্তে রেস্তোরাঁয় ব্রাঞ্চ, প্রেম মানেই বছরে একবার পার্বত্য অঞ্চলে দামি রিসোর্টে যাওয়া, প্রেম মানেই সারপ্রাইজ গিফটের ছবি ইনস্টাগ্রামে পোস্ট করা। এই যে পুরো স্ক্রিপ্টটা, এটা কিন্তু প্রকৃতি আমাদের দেয়নি। এই স্ক্রিপ্ট লিখেছে বাজার। কারণ, এই স্ক্রিপ্ট ফলো করতে গেলেই আমাদের দরকার হয় টাকা, আর টাকা খরচ করলেই চলে বড় বড় কর্পোরেশনের লাভের চাকা।
হলিউড থেকে বলিউড, বিজ্ঞাপন থেকে ধারাবাহিক নাটক। সবখানেই তারা আমাদের শেখায় যে প্রেম প্রকাশ করতে গেলে আয়োজন লাগে। যে প্রেমে ফুল নেই, দামি ঘড়ি নেই, আলোকোজ্জ্বল ভ্রমণ নেই, সেই প্রেম যেন কিছুটা ফ্যাকাশে, অসম্পূর্ণ। আমরা নিজেদের অজান্তেই বিশ্বাস করে ফেলি যে, আবেগ যত গভীরই হোক, তার প্রমাণ দিতে হবে কেনাকাটার বস্তু দিয়ে। একটা সময় পর আমরা আর নিজের জন্য ভালোবাসি না; আমরা ভালোবাসতে শুরু করি ওই চিত্রনাট্যটাকে। ইন্সটাগ্রামের রিলে সুন্দর করে সাজানো ডেটের ছবি দেখে যে দীর্ঘশ্বাস পড়ে, সেটা আসলে কার তৈরি চাহিদা? এই পুরো আয়োজনটা একটা ইন্ডাস্ট্রি। আপনি যখন ভাবেন, “আহা, এরকম একটা প্রেম আমি চাই,” তখনই আপনি ওই ইন্ডাস্ট্রির খপ্পরে পড়েছেন। প্রেম তখন আর অনুভূতি থাকে না, সেটা হয়ে ওঠে একটা ‘লাইফস্টাইল ব্র্যান্ড’, যা কিনতে গেলে মাসের পর মাস বেতন গচ্চা দিতে হয়।
২. ভালোবাসার মুদ্রা যখন টাকা, মন তখন গৌণ
পুঁজিবাদের সবচেয়ে নির্মম অথচ সফল প্রকল্পগুলোর একটি হলো অনুভূতিকে বস্তু দিয়ে মাপার ব্যবস্থা করা। আপনি কাউকে কতটা ভালোবাসেন, সেটা এখন আর আপনার ব্যবহার, ধৈর্য কিংবা সহমর্মিতা দিয়ে বিচার করা হয় না; বিচার করা হয় আপনি কোন মাসে কতগুলো লাল গোলাপ কিনছেন, আর গিফটের প্যাকেটের ভেতর কোন দামি ব্র্যান্ড লুকিয়ে আছে, তার ওপর।
পুঁজিবাদ বড় চালাকি করে আমাদের ভাষা বদলে দিয়েছে। আগে প্রেম মানে ছিল অনুভূতির আদান-প্রদান, ত্যাগ, একে অন্যের পাশে থাকা। কিন্তু এখন আমরা অজান্তেই বিশ্বাস করি, “যত টাকা, তত ভালোবাসা।” বাজার আমাদের শিখিয়েছে যে ভালোবাসা ‘ডেমোনস্ট্রেট’ করতে হয়। আর প্রদর্শন করতে গেলে তো প্রপস লাগবে। এখন প্রশ্ন হলো, এই প্রদর্শনের ধারণাটা এলো কোথা থেকে?
একবার ভেবে দেখুন ভ্যালেন্টাইনস ডে-র কথা। পৃথিবীজুড়ে একটা পুরো সপ্তাহজুড়ে চলা এই উৎসবের পেছনে একটাই ইঞ্জিন; ভোক্তাবাদ। ফুলচাষী থেকে শুরু করে গ্রিটিংস কার্ড কোম্পানি, চকলেট প্রস্তুতকারক থেকে পাঁচতারা হোটেল, সবাই বছরের এই একটা দিনের জন্য মুখিয়ে থাকে। তারা আমাদের বোঝায়, “আপনার অনুভূতি আছে তো? তাহলে কিনুন। কিনুন, নইলে আপনার ভালোবাসা প্রমাণিত হবে না।”
একটা কৌতুককর কিন্তু ভয়াবহ সত্যি হলো, হীরের আংটি। আমরা সবাই জানি, বিয়ের সময় হীরের আংটি পরানো ‘চিরন্তন প্রেমের প্রতীক’। অথচ এই ‘চিরন্তন প্রেমের’ রীতিটা চালু হয়েছিল ১৯৩০-এর দশকে, ডি বিয়ার্স নামক এক হীরক কোম্পানির অকল্পনীয় বিজ্ঞাপনী প্রচারণার মাধ্যমে। তারা বাজারে ঢুকিয়ে দেয়, “হীরে চিরন্তন” (Diamonds are Forever)। তার মানে, যে অনুভূতি হাজার বছরের মানব সভ্যতার, তার প্রমাণ রাখতে গেলে আপনার একটা নির্দিষ্ট কার্বনের টুকরা কিনতেই হবে, যেটা একচেটিয়া ব্যবসা করে একটা কোম্পানি। আমরা এই নির্মিত গল্পটাকেই এখন ‘ঐতিহ্য’ ভাবছি।
৩. ‘শুধু তুমি আর আমি’: যেখান থেকে বিপ্লব দেখা যায় না
পুঁজিবাদী সমাজের জন্য সবচেয়ে ভয়ের জিনিস হলো, নির্যাতিত মানুষেরা যখন একজোট হয়। শ্রমিক যখন একা থাকে, তখন সে দুর্বল; যখন সে তার সহকর্মীদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মেলায়, তখন সে শক্তিশালী। এই শক্তিকে ভাঙতেই পুঁজিবাদ ‘রোমান্টিক প্রেমের’ আদর্শ ব্যবহার করে এক অদ্ভুত বিভাজন তৈরি করে।
আপনি নিশ্চয়ই দেখবেন, যখন কেউ প্রেমে পড়ে, তখন তার জগৎটা সীমিত হয়ে আসে। “আমাদের এই ছোট্ট সংসার”, “আমরা বাকি পৃথিবী বদলাতে চাই না, শুধু একটু শান্তি চাই” এই সংলাপগুলো খুব সুখকর লাগে। কিন্তু এই ‘শান্তির’ ধারণাটাই আদতে আত্মঘাতী। কারণ, আপনার ব্যক্তিগত শান্তির প্রতিযোগিতায় আপনি যখন মাসের পর মাস অফিসের অতিরিক্ত কাজ করছেন, প্রেমিকার জন্য গাড়ির ডাউনপেমেন্ট জোগাড় করছেন, তখন আপনার পাশের বসা সহকর্মীটা চাকরি হারাচ্ছে কি না, সেদিকে আপনার নজর থাকে না। আপনি ব্যস্ত আপনার ‘ইএমআই’ নিয়ে, আপনার সম্পর্কের অশান্তি নিয়ে।
রাজনৈতিক তাত্ত্বিকরা এটাকে বলেন ‘নিরাপত্তাহীনতার ব্যক্তিগত সমাধান’। সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন করে, প্রতিটি দম্পতিকে একটি ক্ষুদ্র গৃহকেন্দ্রিক বুদ্বুদে বন্দি করে ফেলা হয়। এই বুদ্বুদের ভেতরে তারা যখন নিজেদের ছোটখাটো সুখ-দুঃখ নিয়ে ব্যস্ত, তখন বাইরে বড় পুঁজি অনায়াসে পৃথিবীটাকে শোষণ করে খাচ্ছে। প্রেম এখানে বিপ্লবের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়, হয়ে ওঠে এক ধরনের রাজনৈতিক ঘুমের ওষুধ।
৪. সোয়াইপ, সিলেক্ট, ডিলিট: প্রেমের বিনিময় কেন্দ্র
প্রযুক্তি যে পুঁজিবাদের এই প্রোপাগান্ডাকে আরও ভয়াবহ করে তুলেছে, তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ মোবাইলের ডেটিং অ্যাপগুলো। এই অ্যাপগুলোর অ্যালগরিদম আমাদের এক নতুন মানসিকতায় অভ্যস্ত করে তুলছে, যার নাম ‘শপিং কার্ট মেন্টালিটি’। প্রেম এখন আর রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ কারও চোখে চোখ পড়ে যাওয়া নয়। ডেটিং অ্যাপগুলো যেভাবে আমাদের সম্পর্ক তৈরি করার পদ্ধতি বদলে দিয়েছে, তা পুঁজিবাদী যুক্তির এক চরম বিজয়। ভাবুন তো, ফোনের স্ক্রিনে মানুষের ছবি ভেসে উঠছে, আর আপনি এক সেকেন্ডের মধ্যে ডানে বা বামে সুইপ করছেন। এটা হুবহু শপিং করার মতো। এখানে মানুষ নিজেই একটা পণ্য। তার ছবিটা হচ্ছে পণ্যের প্যাকেট, আর বায়োডাটা হলো গুণাগুণের তালিকা।
একবার ভেবে দেখুন, আপনি যখন টিন্ডার বা বাম্বলের স্ক্রিনে তাকিয়ে আছেন, তখন আপনার আচরণটা ঠিক কেমন? আপনি হয়তো সেকেন্ডের মধ্যে বিচার করছেন ছবিটা ভালো, নামটা পছন্দ হলো, বায়োডাটাটা জমলো, হয় ‘হ্যাঁ’, নয় ‘না’। এই যে তাৎক্ষণিক মূল্যায়ন ও বাছাই করার প্রবণতা, এটা ঠিক সেই একই মানসিকতা, যা আপনি অনলাইন শপিং সাইটে জুতো বা টি-শার্ট বাছাইয়ের সময় ব্যবহার করেন। এই অ্যাপগুলো আমাদের মধ্যে এক ধরণের ‘ব্রাউজিং মেন্টালিটি’ তৈরি করে দিয়েছে। আপনি কখনোই সন্তুষ্ট নন, কারণ আপনি জানেন, আরও পাঁচ মিনিট পরেই হয়তো এর চেয়েও ‘ভালো’ কোনো প্রোডাক্ট স্ক্রিনে চলে আসবে। এই যে অসীম সম্ভাবনার ভ্রম, এটাই বাজারকে চাঙ্গা রাখে।
এই অ্যাপগুলো আমাদের বোঝায়, ভালোবাসা হলো অফুরন্ত এক সম্ভাবনার বাজার। আজকেরটাকে বাদ দিলে কাল আরও হাজারটা অপশন আসবে। এর ফলে আমরা সম্পর্কের বাস্তব জটিলতা, ধৈর্য ও ত্যাগের প্রক্রিয়া থেকে মুখ ফিরিয়ে নিই। আমরা এমন একজন মানুষ খুঁজি, যে একইসাথে সব চাহিদা মেটাবে একজন ‘পারফেক্ট প্রোডাক্ট’। আর পারফেক্ট প্রোডাক্ট বলে কিছু না থাকায় আমরা ঘুরতেই থাকি ভোক্তার মতো, এক দোকান থেকে আরেক দোকানে। এই যে অসীম সম্ভাবনার ভ্রম, এটাই বাজারকে চাঙ্গা রাখে। আমরা মানুষের সঙ্গে গভীর সম্পর্ক গড়ার চেষ্টা করি না, বরং আমরা সম্পর্কে বসাই ‘পারফরম্যান্স রিভিউ’। একটু খামতি দেখলেই মন বলে ওঠে, “নেক্সট!” আমাদের বাবা-মায়ের প্রজন্ম যেখানে একে অন্যের ত্রুটি মেনে নিয়ে সম্পর্কটাকে গড়ে তুলতেন, আমরা সেখানে ত্রুটি দেখলেই তাকে ‘ডিলিট’ করি। এভাবে পুঁজিবাদ আমাদের শেখায় যে প্রেম কোনো স্থায়ী বন্ধন নয়, প্রেম হলো ব্যবহার করার জিনিস। আর ব্যবহার শেষ হয়ে গেলে সেটাকে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে নতুন কেনাটাই বুদ্ধিমানের কাজ। পুঁজিবাদ এই চক্রান্তেই আনন্দ পায়, কারণ একাকী ও হতাশ মানুষই সবচেয়ে বেশি খরচ করে।
৫. ভোগবাদের বিপরীতে দাঁড়ানো এক ‘পকেটহীন’ ভালোবাসা
তাহলে কি সমস্ত ভালোবাসাই ফাঁকি? মোটেও না। কিন্তু যান্ত্রিক প্রচারণার বাইরে গিয়ে ভালোবাসতে হলে আমাদের সচেতন হতে হবে যে আমরা আসলে কার ইচ্ছাপূরণ করছি। সত্যিকারের প্রেম কোনো ইন্ডাস্ট্রি নয়। সেই প্রেমে কোনো কাস্টমাইজড প্যাকেজ নেই। সেই প্রেম মানে একসাথে বসে ভাত খাওয়া, শরীর খারাপে পাশে বসে থাকা, রাত জেগে জীবনের দুশ্চিন্তার কথা শেয়ার করা।
ভালোবাসা আসলে একটি বিপ্লবী কাজ হতে পারে, যদি আমরা সেটাকে বাজারের হাত থেকে ছিনিয়ে নিতে পারি। প্রেম মানে শুধু একজনের জন্য গান গাওয়া নয়; প্রেম মানে অন্যায়ের বিরুদ্ধে একে অন্যের হাত ধরে দাঁড়িয়ে যাওয়া। যে প্রেমে মানুষকে ‘নিজের’ করে নেওয়া হয় ভোগ করার জন্য নয়, বরং মুক্ত করে দেওয়া হয় সব রকম শোষণের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য, সেই প্রেমই আসল। পুঁজিবাদ আমাদের শেখায়, “পাও, কিনো, দেখাও।” আর জীবন শেখায়, “থাকো, দাও, লুকিয়ে রাখো।”
আমাদের সম্পর্কগুলোকে পুঁজির এই থাবা থেকে বাঁচাতে গেলে শুধু অনুভূতি নয়, বোধেরও দরকার। যখন প্রেমিকাকে জিজ্ঞেস করবেন, “কি গিফট চাই?”, তার আগে একবার ভাববেন তো, আপনাকে জিজ্ঞেসটা করিয়ে নিচ্ছে কে? হয়তো উত্তর পাবেন, আপনার মনের গভীরের যত্নটুকুই সবচেয়ে বড় উপহার। আর এই বোধটুকু জন্ম নেওয়া মানেই এক বিশাল বাজারের পতন ঘটিয়ে দেওয়া। পুঁজিবাদ চায় আপনি ভাবুন, ‘প্রেমই সব, বাকি সব অপ্রয়োজনীয়’। কিন্তু প্রকৃত প্রেম বোধ হয় সেখানে, যেখানে মানুষ বুঝতে পারে, ‘শুধু প্রেমই যথেষ্ট নয়, দরকার ন্যায়বিচার, দরকার সমতা।’ আর সেই অনুভবের জায়গাটা পুরোপুরি বিনা পয়সার। সেখানে কোনো পুঁজির প্রবেশাধিকার নেই।
---
শেষ কথা
যে বন্ধু উপহারের দাম নিয়ে চিন্তিত ছিল, তাকে আমি শেষমেশ বলেছিলাম, “যে ভালোবাসা দশ হাজার টাকার রসিদ দেখে শান্তি পায়, সেটা আসলে ভালোবাসা নয়, সেটা বাজারের সঙ্গে চুক্তি। আর চুক্তিতে অনুভূতির দাম দেওয়া যায় না, শুধু পণ্যের দাম দেওয়া যায়।” কথাটা শুনে সে কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর ধীরে ধীরে বলল, “জানিস, আসল সমস্যাটা অন্য জায়গায়। এই রসিদটা ওর জন্য না, সমাজের জন্য। ওর আসলে কিছুই দরকার নেই, তবু দশ হাজার টাকার প্রমাণ ছাড়া যেন প্রেমটা অদৃশ্য থেকে যায়।” আমি থমকে গেলাম। ঠিক এই জায়গাটাতেই তো পুঁজিবাদ জিতে যায়, যখন প্রেম আর প্রেম থাকে না, হয়ে ওঠে প্রদর্শনীর অনুষঙ্গ; যখন অনুভূতিকে টিকিয়ে রাখতে গেলে ক্যাশ মেমো দরকার হয়।
আমরা যতই অস্বীকার করি না কেন, আমরা প্রায় সবাই এই প্রচারণার ভুক্তভোগী। ক্যান্ডেল লাইট ডিনারের টেবিলে বসে আমরা হয়তো আত্মতৃপ্তি পাই, কিন্তু বুঝতে পারি না যে এই আয়োজনটা আসলে একটা অর্থনৈতিক চক্রের অংশ। সম্পর্কে সন্দেহ বাড়ছে, মানসিক অবসাদ বাড়ছে, কারণ আমরা শিখে গেছি যে প্রেম মানে ‘অধিকার’ করা। অথচ আমরা সকলে জানি, মানুষ পণ্য নয়। প্রেম কোনো ব্র্যান্ডেড দ্রব্য নয়, যার মেয়াদ শেষ হওয়ার তারিখ থাকবে। সত্যিকারের ভালোবাসা হলো সেই স্বস্তির জায়গা, যেখানে পকেট ফাঁকা হয় না, বরং হৃদয়টা পরিপূর্ণ হয়। পুঁজিবাদ চায় আমরা সবসময় ক্ষুধার্ত থাকি, যাতে আমরা আরও কিনি। কিন্তু প্রেম তো পেট ভরে দেওয়ার নাম। এই দ্বন্দ্বটা বোঝা গেলেই হয়তো আমরা বুঝতে পারব, প্রেম কোনো প্রচারণা নয়; প্রেম হলো পৃথিবীর সবচেয়ে বড় বিদ্রোহ।
About the Author
Talha Mohammad Chowdhury
মজদুরের নিয়মিত লেখকReader, writer, and observer. Interested in politics, history, economics, satire, and the contradictions of modern society. Here to learn, question, and contribute to meaningful discussions.
প্রোফাইল দেখুন
মতামত
এখনও কোনো মতামত নেই।
প্রথম মতামতটি আপনিই দিন।
আলোচনায় অংশ নিতে লগ ইন করুন অথবা এ্যাকাউন্ট খুলুন