২১শ শতকের ডিজিটাল অর্থনীতিতে শ্রমবাজার দ্রুত বদলে যাচ্ছে। স্মার্টফোনভিত্তিক প্ল্যাটফর্ম, মোবাইল অ্যাপ এবং অনলাইন সেবার বিস্তার নতুন ধরনের একটি অর্থনৈতিক কাঠামো তৈরি করেছে, যাকে বলা হচ্ছে “গিগ ইকোনোমি”। এই ব্যবস্থায় শ্রমিকরা স্থায়ী কর্মচারী হিসেবে নয়, বরং কাজভিত্তিক বা স্বল্পমেয়াদি চুক্তিতে কাজ করেন। খাবার ডেলিভারি, রাইড শেয়ারিং, অনলাইন ফ্রিল্যান্সিং কিংবা বিভিন্ন অনলাইন সেবা সব ক্ষেত্রেই এই মডেল দ্রুত বিস্তার লাভ করছে। বিশ্বব্যাপী Uber, DoorDash, Deliveroo, Amazon Flex এর মতো প্ল্যাটফর্ম এই ব্যবস্থাকে জনপ্রিয় করেছে। প্রযুক্তিনির্ভর এই অর্থনৈতিক কাঠামো একদিকে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করেছে, অন্যদিকে শ্রমের অনিশ্চয়তা ও বৈষম্যের নতুন প্রশ্নও সামনে নিয়ে এসেছে।
গিগ ইকোনোমির সবচেয়ে বড় বৈপরীত্য হলো শ্রমিকদের জন্য কাজটি অনিশ্চিত হলেও ক্রমাগত নতুন মানুষ এই খাতে প্রবেশ করছে। এর পেছনে রয়েছে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক বাস্তবতা। বিশ্বজুড়ে স্থায়ী চাকরির সুযোগ ক্রমশ কমছে, বিশেষ করে তরুণদের জন্য শ্রমবাজারে প্রবেশ করা কঠিন হয়ে উঠেছে। উন্নয়নশীল দেশগুলোতে বেকারত্ব এবং আংশিক বেকারত্বের সমস্যা আরও তীব্র। এই প্রেক্ষাপটে গিগ ইকোনোমি অনেকের জন্য দ্রুত আয়ের একটি সহজ পথ হয়ে উঠেছে। অধিকাংশ প্ল্যাটফর্মে কাজ শুরু করতে বড় ডিগ্রি বা দীর্ঘ নিয়োগ প্রক্রিয়ার প্রয়োজন হয় না একটি স্মার্টফোন, ইন্টারনেট সংযোগ এবং কখনো একটি মোটরসাইকেল বা সাইকেল থাকলেই কাজ শুরু করা সম্ভব। ফলে অনেক মানুষ এটিকে স্থায়ী পেশা নয়, বরং বেঁচে থাকার জন্য একটি “survival income” হিসেবে গ্রহণ করছে।
গিগ ইকোনোমির আরেকটি আকর্ষণ হলো কাজের সময়ের নমনীয়তা। এই ব্যবস্থায় শ্রমিকরা অনেক সময় নিজেদের সুবিধামতো কাজ করতে পারেন, ফলে পড়াশোনা, অন্য চাকরি বা ব্যক্তিগত জীবনের পাশাপাশি আয়ের সুযোগ তৈরি হয়। একই সঙ্গে শহুরে জীবনের দ্রুততা ও ডিজিটাল সেবার চাহিদা এই অর্থনৈতিক মডেলকে আরও বিস্তৃত করেছে। আধুনিক নগর জীবনে মানুষ দ্রুত সেবা চায় খাবার ডেলিভারি, অনলাইন শপিং বা রাইড শেয়ারিং তার উদাহরণ। এই চাহিদা পূরণ করতে গিগ শ্রমিকদের উপর নির্ভরতা ক্রমাগত বাড়ছে।
তবে গিগ ইকোনোমির এই বিস্তার শ্রমিকদের জন্য নতুন অনিশ্চয়তারও জন্ম দিয়েছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে প্ল্যাটফর্ম কোম্পানিগুলো গিগ কর্মীদের “স্বনির্ভর ঠিকাদার” বা independent contractor হিসেবে চিহ্নিত করে। ফলে তারা শ্রম আইনের অনেক মৌলিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত হন। স্থায়ী বেতন, স্বাস্থ্য বীমা, পেনশন, ছুটি বা দুর্ঘটনা সুরক্ষার মতো সুবিধা অনেক ক্ষেত্রেই তাদের জন্য অনুপস্থিত। উপরন্তু, অনেক প্ল্যাটফর্মে অ্যালগরিদম বা সফটওয়্যারই নির্ধারণ করে দেয় কোন শ্রমিক কখন কাজ পাবে, কত আয় হবে কিংবা কোন পরিস্থিতিতে তার অ্যাকাউন্ট বন্ধ হয়ে যাবে। অর্থনীতিবিদদের অনেকেই এই পরিস্থিতিকে “precarious labour” বা অনিরাপদ শ্রমব্যবস্থা হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
এই বাস্তবতার বিরুদ্ধে ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন দেশে গিগ শ্রমিকরা আন্দোলন শুরু করেছেন। তাদের মূল দাবি হলো গিগ কর্মীদের কর্মচারী হিসেবে আইনি স্বীকৃতি দেওয়া এবং শ্রমিকদের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করা। যুক্তরাজ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি মামলায় আদালত রায় দিয়েছে যে Uber-এর ড্রাইভারদের শুধুমাত্র স্বাধীন ঠিকাদার হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না তারা শ্রমিক হিসেবে কিছু অধিকার পাওয়ার যোগ্য। এই রায়ের ফলে ন্যূনতম মজুরি ও ছুটির মতো সুবিধা নিয়ে নতুন আলোচনা শুরু হয়। ইউরোপীয় ইউনিয়নও গিগ শ্রমিকদের আইনি স্বীকৃতি ও সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করার জন্য নতুন নীতিমালা নিয়ে আলোচনা করছে। স্পেনে “Riders Law” নামে একটি আইন পাস হয়েছে, যেখানে ডেলিভারি কর্মীদের কর্মচারী হিসেবে পুনঃশ্রেণিবদ্ধ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একইভাবে যুক্তরাষ্ট্রে বিভিন্ন শ্রম সংগঠন ও মানবাধিকার সংগঠন গিগ কর্মীদের অধিকারের প্রশ্ন তুলছে এবং প্ল্যাটফর্ম কোম্পানিগুলোর জবাবদিহিতা দাবি করছে।
বৈশ্বিক অর্থনীতির দৃষ্টিকোণ থেকে গিগ ইকোনোমি শ্রমবাজারের কাঠামোতে বড় পরিবর্তন এনেছে। ঐতিহ্যগত শিল্প অর্থনীতিতে শ্রমিকরা দীর্ঘমেয়াদি চাকরিতে যুক্ত থাকতেন এবং তাদের জন্য সামাজিক সুরক্ষার ব্যবস্থা থাকত। কিন্তু গিগ ইকোনোমি সেই কাঠামোকে ভেঙে চুক্তিভিত্তিক ও অস্থায়ী কাজের দিকে শ্রমবাজারকে ঠেলে দিচ্ছে। এই মডেল কোম্পানিগুলোর জন্য লাভজনক, কারণ এতে শ্রম ব্যয় কমে যায়। পেনশন, স্বাস্থ্য বীমা, ছুটি বা অন্যান্য সামাজিক সুবিধার খরচ বহন করতে হয় না। ফলে প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো কম খরচে বড় পরিসরে সেবা পরিচালনা করতে পারে। কিন্তু সমালোচকেরা মনে করেন, এই ব্যবস্থায় কর্পোরেট লাভ বাড়লেও শ্রমিকদের আয় ও নিরাপত্তা অনিশ্চিত থেকে যায়।
এই বাস্তবতা সমাজতান্ত্রিক অর্থনৈতিক চিন্তাধারার সঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিতর্ক তৈরি করেছে। সমাজতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী শ্রমিকের অধিকার, সামাজিক সুরক্ষা এবং ন্যায্য আয় নিশ্চিত করা অর্থনীতির একটি মৌলিক লক্ষ্য হওয়া উচিত। গিগ ইকোনোমিকে সমাজতান্ত্রিক কাঠামোর সঙ্গে খাপ খাওয়াতে হলে কয়েকটি কাঠামোগত পরিবর্তন প্রয়োজন। অর্থনীতিবিদদের একটি অংশ “platform cooperative” ধারণা সামনে এনেছেন, যেখানে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মালিকানা শ্রমিকদের মধ্যেই থাকবে। অর্থাৎ রাইডার বা ড্রাইভাররাই প্ল্যাটফর্মের অংশীদার হবেন এবং লাভের অংশ পাবেন। এর ফলে মালিক ও শ্রমিকের মধ্যকার বৈষম্য কমতে পারে।
একই সঙ্গে গিগ শ্রমিকদের আইনি স্বীকৃতি ও সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। ন্যূনতম মজুরি, স্বাস্থ্য বীমা, দুর্ঘটনা সুরক্ষা এবং পেনশন ব্যবস্থার মতো সুবিধা থাকলে এই খাতের শ্রমিকরা আরও নিরাপদভাবে কাজ করতে পারবেন। অনেক অর্থনীতিবিদ বেতন বৈষম্য কমানোর জন্য “pay ratio” বা বেতন অনুপাত ব্যবস্থার কথাও বলেছেন, যেখানে প্রতিষ্ঠানের সর্বোচ্চ বেতন ও সর্বনিম্ন বেতনের মধ্যে একটি সীমা নির্ধারণ করা হবে। পাশাপাশি প্ল্যাটফর্ম কোম্পানিগুলোর মুনাফার একটি অংশ শ্রমিকদের মধ্যে ভাগ করার ব্যবস্থাও বৈষম্য কমাতে সহায়ক হতে পারে।
অতএব, গিগ ইকোনোমি আধুনিক ডিজিটাল অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা হলেও এটি শ্রমবাজারের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জও তৈরি করেছে। প্রযুক্তি, প্ল্যাটফর্ম এবং দ্রুত সেবার চাহিদা এই ব্যবস্থাকে আরও বিস্তৃত করবে এটি প্রায় নিশ্চিত। কিন্তু একই সঙ্গে শ্রমিকের অধিকার, সামাজিক সুরক্ষা এবং ন্যায্য আয়ের প্রশ্নও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। ভবিষ্যতের অর্থনৈতিক কাঠামো তাই কেবল প্রযুক্তিনির্ভর হবে না; বরং প্রযুক্তি, শ্রম এবং সামাজিক ন্যায্যতার মধ্যে একটি নতুন ভারসাম্য তৈরি করাই হবে বড় চ্যালেঞ্জ।
মতামত
এখনও কোনো মতামত নেই।
প্রথম মতামতটি আপনিই দিন।
আলোচনায় অংশ নিতে লগ ইন করুন অথবা এ্যাকাউন্ট খুলুন