সকল লেখা জানতে চাই
Searching…

সরকারি কর্মচারীর পর শ্রমিকের পালা কবে?

Fuad Hasan
Fuad Hasan মজদুরের নিয়মিত লেখক
পড়তে 7 মিনিট লাগতে পারে
এই লেখাটি 1 বার পড়েছে
সরকারি কর্মচারীর পর শ্রমিকের পালা কবে?

 সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বাড়ানো নিয়ে আমার কিছু প্রশ্ন আছে।

প্রথমেই একটা কথা পরিষ্কার করে বলা দরকার—সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন বাড়ানোর বিরোধিতা করার কোনো কারণ আমি দেখি না। একজন সরকারি কর্মচারীও এই দেশের নাগরিক; তাঁরও পরিবার আছে, বাজার আছে, বাড়িভাড়া আছে, সন্তানদের পড়াশোনা আছে। দীর্ঘ সময় ধরে মূল্যস্ফীতির চাপে তাঁর প্রকৃত আয় কমে গেলে বেতন পুনর্নির্ধারণের প্রয়োজনীয়তা থাকতেই পারে। বরং রাষ্ট্রের কর্মচারীদের জন্য একটি যৌক্তিক, নিয়মিত এবং মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বেতন কাঠামো থাকা উচিত।

কিন্তু প্রশ্নটা অন্য জায়গায়।

এই রাষ্ট্রের শ্রমিক, বেসরকারি চাকরিজীবী, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, ফ্রিল্যান্সার, নিম্নআয়ের মানুষ এবং অনানুষ্ঠানিক খাতের কর্মীদের জন্য রাষ্ট্রের নীতিটা কী?

আজকের বাংলাদেশে মূল্যস্ফীতি শুধু সরকারি চাকরিজীবীর সমস্যা নয়। জুলাই ২০২৬-এও দেশের মূল্যস্ফীতি ৮.৩২ শতাংশ ছিল। একই সময়ে দীর্ঘ সময় ধরে মজুরি বৃদ্ধির হার মূল্যস্ফীতির নিচে থাকার প্রবণতা দেখা গেছে—অর্থাৎ অনেক মানুষের নামমাত্র আয় বাড়লেও প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কমেছে।

এই বাস্তবতায় সরকারি কর্মচারীদের বেতন একবারে বড় আকারে পুনর্নির্ধারণ করা হলো। সর্বনিম্ন গ্রেডের মূল বেতন ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ছে। সরকারের যুক্তি—মূল্যস্ফীতি, জীবনযাত্রার ব্যয় এবং সরকারি কর্মচারীদের আর্থিক নিরাপত্তা বিবেচনা করেই এই সিদ্ধান্ত। যুক্তিটি একেবারে অযৌক্তিক নয়। কিন্তু আমার প্রশ্ন হলো, একই মূল্যস্ফীতির মধ্যে থাকা বেসরকারি চাকরিজীবীর জন্য রাষ্ট্রের সমান্তরাল পরিকল্পনাটি কোথায়?

একজন বেসরকারি চাকরিজীবীর বেতন বাড়ানোর সিদ্ধান্ত তাঁর নিয়োগকর্তার ওপর নির্ভর করে। অনেক প্রতিষ্ঠানে বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট মূল্যস্ফীতির সঙ্গে তাল মেলায় না, কোথাও আবার চাকরির নিরাপত্তাই অনিশ্চিত। শ্রমিকদের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও কঠিন। অভিযোগ করার বা নিজেদের অধিকার রক্ষায় কোথাও দাঁড়ানোর উপায় বা সুযোগটাও নেই। বাজারের দাম সরকারি-বেসরকারি আলাদা করে বাড়ে না—চাল, ডাল, তেল, বাসাভাড়া, চিকিৎসা, শিক্ষা, পরিবহন—সবকিছুর দাম সবার জন্যই একই বাজারে নির্ধারিত হয়।

তাহলে রাষ্ট্রের দায়িত্ব কি শুধু সরকারি কর্মচারীর আয় সমন্বয় করা?

রাষ্ট্রের প্রথম দায়িত্ব হবে এমন একটি অর্থনৈতিক পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে একজন বেসরকারি চাকরিজীবী কিংবা প্রত্যেক নাগরিক তাঁর বেতন দিয়ে সম্মানজনক জীবনযাপন করতে পারেন; একজন শ্রমিক তাঁর শ্রমের ন্যায্য মূল্য পান; একজন তরুণ দক্ষতা অর্জন করে কাজ পেতে পারেন; এবং একজন ছোট উদ্যোক্তা অযৌক্তিক প্রশাসনিক ব্যয়, ঘুষ ও অনিশ্চয়তার মধ্যে না জড়িয়ে ব্যবসা করতে পারেন।

এখানে আরও একটি অস্বস্তিকর প্রশ্ন হলো—সরকারি বেতন বাড়ানোর বিনিময়ে রাষ্ট্র জনগণকে কী দিচ্ছে?

সরকারি কর্মচারীদের বেতন জনগণের করের অর্থে দেওয়া হয়। একজন রিক্সা চালক থেকে দিনমজুর এর টাকার একটা অংশ থেকেই সকল সরকারের বেতন-ভাতা, সুবিধাদির যোগান হয়। অথচ, তাদের জীবনমানের দৃশ্যমান পরিবর্তন ও উন্নয়নের জন্য নতুন কোন রূপরেখা কোন সরকারের সময়েই দেখা যায় না।

এজন্য বলতে হচ্ছে, একটা নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর বেতন বাড়ানোটা অন্যায় নয়; এর সঙ্গে জবাবদিহিতা, দক্ষতা, সেবার মান এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা না থাকাটা অন্যায়। বৃহৎ জনগোষ্ঠীর বৃহৎ অংশকে যুগ যুগ ধরে অদেখা করে রাখাটা অন্যায়।

বাস্তব অভিজ্ঞতা ও সাম্প্রতিক জরিপগুলো আমাদের স্বস্তিদায়ক কোনো চিত্র দেখায় না। ট্রানস্পারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ-এর ২০২৫ সালের “ন্যাশনাল হাউজহোল্ড সার্ভে” অনুযায়ী, সরকারি ও অন্যান্য ই-সেবা নিতে গিয়ে ৮১.৬ শতাংশ পরিবার কোনো না কোনো ধরনের দুর্নীতির অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছে এবং ৬৩.৬ শতাংশ ঘুষ দেওয়ার কথা জানিয়েছে। জরিপে অনুমিত ঘুষের পরিমাণ ১২,৬৩৩ কোটি টাকা। একই সময়ে “বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো” -এর  সিটিজেন পারসেপশন সার্ভে”-তে সরকারি সেবা গ্রহণকারীদের ৩১.৬৭ শতাংশ গত এক বছরে ঘুষ দেওয়ার কথা জানিয়েছেন।

অবশ্যই এর অর্থ এই নয় যে সব সরকারি কর্মকর্তা দুর্নীতিগ্রস্ত। এমন কথা বলা অন্যায় হবে। অসংখ্য সৎ ও নিষ্ঠাবান সরকারি কর্মচারী আছেন। কিন্তু রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় দুর্নীতি যদি এত ব্যাপক হয়, তাহলে বেতন বৃদ্ধির পাশাপাশি “বেতন বাড়ালাম, এবার সেবার মান ও জবাবদিহিতাও বাড়বে”-এই চুক্তিটাও জনগণের সঙ্গে স্পষ্ট হওয়া দরকার।

আর এখানেই প্রশ্নটা শুধু বর্তমান বেতনস্কেলে সীমাবদ্ধ থাকে না। প্রশ্নটা গিয়ে পড়ে আমাদের রাষ্ট্র পরিচালনার ধারাবাহিকতার ওপর। আওয়ামী লীগ সরকার, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এবং বর্তমান নির্বাচিত সরকার—সরকার বদলালেও রাষ্ট্রের কিছু মৌলিক সমস্যা কেন একই থেকে যায়?

আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ সময়ে ২০১৫ সালে অষ্টম জাতীয় বেতনস্কেল দেওয়া হয়েছিল। তখনও সরকারি কর্মচারীদের মূল বেতন গ্রেড ভেদে প্রায় দ্বিগুণ হয়েছিল—সর্বনিম্ন ৮,২৫০ এবং সর্বোচ্চ ৭৮,০০০ টাকা নির্ধারিত হয়। একই দীর্ঘ সময়ে সেবা খাতে দুর্নীতি নিয়ে TIB-এর ধারাবাহিক জরিপগুলোও গুরুতর চিত্র তুলে ধরেছে; ২০০৯ থেকে এপ্রিল ২০২৪ পর্যন্ত বিভিন্ন সেবা নিতে আনুমানিক ১,৪৬,২৫২ কোটি টাকা ঘুষ বা অননুমোদিত অর্থ লেনদেনের হিসাব দিয়েছে TIB।

অর্থাৎ সমস্যা শুধু “কোন সরকার কত বেতন দিল”—এত সরল নয়। সমস্যা হলো, রাষ্ট্র তার কর্মচারীদের জন্য যে ব্যয় করে, তার বিনিময়ে নাগরিক কতটা দক্ষ, স্বচ্ছ ও দুর্নীতিমুক্ত সেবা পাচ্ছে।

২০২৪-২৬ সালের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়েও মূল্যস্ফীতি, ব্যাংকিং খাত, কর্মসংস্থান, শ্রমিকের মজুরি এবং রাষ্ট্রীয় সংস্কারের প্রশ্নগুলো সামনে এসেছে। কিন্তু এই সময়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা সম্ভবত এটিই—শুধু সরকার বদলালেই রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক কাঠামো বদলায় না। পুরোনো আমলাতান্ত্রিক কাঠামো, দুর্বল জবাবদিহিতা, ক্ষমতার রাজনীতি চর্চা এবং নাগরিক সেবার সমস্যা সংস্কার না করলে নতুন সরকারও একই সমস্যার মুখোমুখি হবে।

এই জায়গা থেকেই বর্তমান সরকারের সামনে আমার প্রত্যাশা। কারণ বর্তমান সরকারকে বিচার করতে হলে শুধু তাদের আজকের সিদ্ধান্ত নয়, তাদের রাজনৈতিক অতীত এবং ভবিষ্যৎ রাষ্ট্র পরিচালনার দৃষ্টিভঙ্গিও বিবেচনায় রাখতে হবে। বিএনপি ১৯৯১ সালে যখন ক্ষমতায় এসেছিল, তখন বাংলাদেশের অর্থনীতি আজকের মতো ছিল না। ২০০১ সালেও ছিল না। আজকের বাংলাদেশ অনেক বড়, অনেক বেশি জটিল এবং অনেক বেশি আন্তঃনির্ভরশীল অর্থনীতি।

তাই পুরোনো রাজনীতির পুরোনো ফর্মুলা দিয়ে নতুন বাংলাদেশ পরিচালনা করা যাবে না।

আজকের তরুণরা সরকারি চাকরি চায়—কিন্তু শুধু সরকারি চাকরি নয়।

  • তারা ভালো বেসরকারি চাকরি চায়।

  • তারা উদ্যোক্তা হতে চায়।

  • তারা দক্ষতা অর্জন করে দেশে কাজ করতে চায়।

  • তারা চাইলে বিদেশে গিয়ে সম্মানের সঙ্গে কাজ করতে চায়।

  • তারা এমন একটি রাষ্ট্র চায় যেখানে যোগ্যতা থাকলে সুযোগ পাওয়া যায়।

আমি চাই এই সরকার নতুন রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংস্কৃতির উদাহরণ তৈরি করুক। আওয়ামী লীগের ভুলের পুনরাবৃত্তি না করে, বিএনপির নিজেদের অতীতের ভালো উদ্যোগগুলোকে আরও আধুনিক করে এবং নিজেদের অতীতের ভুলগুলো স্বীকার করে এগিয়ে যাক।

আমরা এমন একটি রাষ্ট্র চাই না যেখানে সরকারি চাকরি মানেই নিরাপদ আয়, আর বেসরকারি চাকরি মানেই অনিশ্চয়তা।

আমরা এমন অর্থনীতি চাই যেখানে সরকারি-বেসরকারি—উভয় ক্ষেত্রের কর্মীই তাঁর শ্রমের ন্যায্য মূল্য পাবেন।

ক্ষমতা ধরে রাখার রাজনীতি নয়—রাষ্ট্রকে শক্তিশালী করার রাজনীতি হোক।

একই সঙ্গে বেসরকারি খাতের জন্যও একটি জাতীয় নীতিগত কাঠামো দরকার—যেখানে মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বিবেচনায় ন্যায্য মজুরি, নিয়মিত বেতন পর্যালোচনা, কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তা, সামাজিক সুরক্ষা এবং শ্রমিকের অধিকার নিশ্চিত করার বাস্তব ব্যবস্থা থাকবে।

রাষ্ট্র যদি এক পক্ষের আয় বাড়ানোর দায়িত্ব নেয়, তাহলে অন্য পক্ষের আয় ও জীবনযাত্রার নিরাপত্তার ব্যাপারটিও তার নীতির অংশ হওয়া উচিত।

এটা আমার আপত্তি নয় - প্রশ্ন।

Fuad Hasan

About the Author

Fuad Hasan

মজদুরের নিয়মিত লেখক

Author, Editor, and Social Development Practitioner

Fuad Hasan is a Bangladeshi writer, editor, and development practitioner whose work spans literature, education, social development, and public affairs. With years of experience contributing to literary publications, journals, reports, and editorial projects, he explores issues related to society, culture, labor, migration, and human development. Drawing on both community engagement and literary practice, his writing seeks to connect lived experiences with broader social realities.

প্রোফাইল দেখুন

মতামত

এখনও কোনো মতামত নেই।

প্রথম মতামতটি আপনিই দিন।

আলোচনায় অংশ নিতে লগ ইন করুন অথবা এ্যাকাউন্ট খুলুন

Reading

Font size

Auto scroll
Slow Fast