বিদ্যুৎ বিল নিয়ে সাধারণ মানুষের অভিযোগের শেষ নেই। বিশেষ করে যারা নির্দিষ্ট বেতনে সংসার চালান কিংবা যেসব পরিবারে একজন মাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি আছেন, তাদের কাছে মাস শেষে প্রিপেইড মিটারে টাকা ভরার মুহূর্তটা যেন এক ধরনের মানসিক পরীক্ষা। মাসের শুরুতে মনে হয় বেতনটা মোটামুটি আছে, আর মাসের শেষে মিটার এমনভাবে টাকা গিলে খায় যে মনে হয় বাসায় বুঝি একটা ছোটখাটো এটিএম মেশিন বসানো হয়েছে। বিদ্যুৎ ব্যবহার আগের মতোই, কিন্তু বিল যেন প্রতি মাসেই নিজের ইচ্ছামতো একটু একটু করে বড় হয়ে যায়।
২০১৪ সালে যখন দেশজুড়ে প্রিপেইড মিটার বসানো শুরু হলো, তখন সরকারের যুক্তি ছিল খুবই সুন্দর। বকেয়া বিল কমবে, বিদ্যুৎ চুরি কমবে, রাজস্ব বাড়বে। কথাগুলো ভুলও ছিল না। কিন্তু সেই গল্পের আরেকটা অধ্যায় ছিল, যেটা তখন খুব বেশি কেউ খেয়াল করেনি। প্রিপেইড মিটারের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বিদ্যুতের দামও নিয়মিত বাড়তে শুরু করল। পরে এমন অবস্থাও এলো, যখন গণশুনানির মতো ঝামেলায় না গিয়ে নির্বাহী আদেশেই দাম বাড়ানোর পথ খুলে দেওয়া হলো। কারণ একটাই, আইএমএফকে কথা দেওয়া হয়েছে। ঋণ চাইলে ভর্তুকি কমাতে হবে। ভর্তুকি কমাতে হলে দাম বাড়াতে হবে। হিসাবটা খুব সহজ, শুধু এই সমীকরণে সাধারণ মানুষের আয়ের অংশটা কোথাও লেখা ছিল না।
তারপর ২০২৪ সাল এল। জুলাইয়ে আন্দোলন, আগস্টে সরকার পরিবর্তন। অন্তর্বর্তী সরকার তাদের পুরো সময়টা বিদ্যুতের দাম না বাড়িয়েই পার করে দিল। কেউ বলবে সাহস ছিল না, কেউ বলবে রাজনৈতিক বাস্তবতা। কিন্তু নতুন নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় বসার কয়েক মাস না যেতেই আবার পুরোনো খবর ফিরে এল। বিদ্যুতের দাম বাড়ছে। মনে হলো সরকার বদলেছে, কিন্তু বিদ্যুতের বিলের চরিত্র বদলানোর কোনো ইচ্ছা নেই।
অবশ্য সরকারকে একা দোষ দিলেও পুরো সত্য বলা হবে না। একদিকে আইএমএফের চাপ, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজি আর জ্বালানি তেলের দাম। ঋণের কিস্তি চাইলে শর্তও মানতে হবে। সরকার এখনও জ্বালানি খাতে কয়েক হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দিচ্ছে। সেই চাপও বাস্তব। কিন্তু আরেকটা প্রশ্নও বাস্তব। এই বিপুল ভর্তুকির প্রয়োজনটাই বা তৈরি হলো কীভাবে?
এই জায়গাতেই পুরোনো গল্পটা আবার সামনে চলে আসে। বছরের পর বছর বেশি দামে বিদ্যুৎ কেনা হয়েছে। ক্যাপাসিটি চার্জের নামে বিদ্যুৎ উৎপাদন না করেও হাজার হাজার কোটি টাকা পরিশোধ করা হয়েছে। কুইক রেন্টালকে জরুরি সমাধান বলা হলেও সেটাই বছরের পর বছর স্থায়ী ব্যবসায় পরিণত হয়েছে। অসম চুক্তিতে দেশের মানুষকে বেশি দামে বিদ্যুৎ কিনতে হয়েছে, আর সেই বিলের টাকা শেষ পর্যন্ত গিয়েছে জনগণের পকেট থেকেই। সাধারণ মানুষ বিদ্যুৎ ব্যবহার করেছে, কিন্তু লাভের বিদ্যুৎ প্রবাহ গেছে অন্যদিকে।
সমস্যাটা এখানেই শেষ নয়। উৎপাদন খরচ বাড়লেও মানুষের আয় তো সেই গতিতে বাড়েনি। বরং মূল্যস্ফীতি, চাকরির অনিশ্চয়তা আর কমে যাওয়া ক্রয়ক্ষমতার চাপে মধ্যবিত্ত এখন এমন এক অবস্থায় দাঁড়িয়ে, যেখানে বিদ্যুতের বিল কয়েকশ টাকা বাড়লেও পুরো মাসের বাজারের হিসাব নতুন করে বসতে হয়। যারা নীতিনির্ধারণ করেন, তাদের কাছে হয়তো এই কয়েকশ টাকা খুব বড় কিছু নয়। কিন্তু একজন স্কুলশিক্ষক, ব্যাংক কর্মকর্তা, পোশাকশ্রমিক কিংবা ছোট ব্যবসায়ীর কাছে এই বাড়তি টাকাটাই মাসের শেষ সপ্তাহের মাছ, দুধ কিংবা সন্তানের কোচিং ফি।
সরকার বদলেছে, কিন্তু রাষ্ট্রের সেই পুরোনো আমলাতন্ত্র তো বদলায়নি। তারা এখনও একই অফিসে বসে একই ফাইল ঘোরায়। শুধু মন্ত্রীর নাম বদলায়, ফাইলের রঙ বদলায়, কিন্তু কৌশল খুব একটা বদলায় না। তারা সব সময় এমন একটা পথ খোঁজে, যেখান থেকে রাজস্বও আসবে, আবার রাজনৈতিক দায়টাও যতটা সম্ভব কম থাকবে।
ঠিক তখনই সামনে আসে নতুন ধারণা। বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থায় বেসরকারি খাতকে আরও বড় ভূমিকা দেওয়া হবে।
শুনতে খুব আধুনিক। খুব সংস্কারমুখীও লাগে। কিন্তু বাংলাদেশে "সংস্কার" শব্দটার একটা অদ্ভুত ইতিহাস আছে। এই শব্দের আড়ালে অনেক সময় এমন সব ব্যবসা জন্ম নেয়, যেগুলোর লাভের অঙ্ক জনগণ কোনো দিন পুরোটা জানতে পারে না।
বেসরকারি প্রতিষ্ঠান সমাজসেবা করতে আসে না। তারা বিনিয়োগ করবে, লাভও করবে। এটাই স্বাভাবিক। তারপর শুরু হবে নতুন হিসাব। নতুন খাম্বা লাগবে, পুরোনো খুঁটি বদলাতে হবে, নতুন ট্রান্সফরমার বসবে, স্মার্ট মিটার আসবে, তার বদলাবে, আধুনিকায়ন হবে। শুনতে দারুণ লাগে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই আধুনিকায়নের বিলটা কার হাতে যাবে? অবশ্যই বিদ্যুতের গ্রাহকের হাতে।
তারপর একদিন দেখা যাবে বিদ্যুতের বিলে শুধু বিদ্যুতের দাম নেই। সঙ্গে আছে সার্ভিস চার্জ, মিটার চার্জ, রক্ষণাবেক্ষণ চার্জ, অবকাঠামো উন্নয়ন চার্জ, হয়তো একদিন ব্যস্ত সময়ে আলাদা ট্যারিফও। বিল দেখে তখন মনে হবে বিদ্যুতের চেয়ে চার্জের সংখ্যাই বেশি।
তবে আমার সবচেয়ে বড় কৌতূহল অন্য জায়গায়।
এই বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো কারা?
খাম্বা, ট্রান্সফরমার, সাবস্টেশন আর মিটারের হাজার হাজার কোটি টাকার ব্যবসা কার হাতে যাবে?
আমরা তো খুব বেশি পুরোনো কথা বলছি না। কিছুদিন আগেও দেশের সবচেয়ে লাভজনক জ্বালানি প্রকল্পগুলো ঘুরেফিরে একই কয়েকটি গোষ্ঠীর হাতেই যেত। তখন বলা হতো সবই জাতীয় স্বার্থে। পরে দেখা গেল জাতীয় স্বার্থের চেয়ে ব্যক্তিগত স্বার্থের মিটারটাই অনেক দ্রুত ঘুরছিল।
তাহলে এবার কী হবে?
ইতিহাস কি আবার নতুন পোশাক পরে ফিরে আসবে? শুধু কোম্পানির নাম বদলাবে, আর ব্যবসার ধরন একই থাকবে?
সবচেয়ে মজার বিষয় হলো, তখন সরকারের জন্যও একটা দারুণ সুবিধা তৈরি হবে। জনগণ দাম বাড়ার অভিযোগ করলে খুব শান্ত গলায় বলা যাবে, "এটা তো সরকার বাড়ায়নি। এটা বেসরকারি কোম্পানি আর নিয়ন্ত্রক কমিশনের সিদ্ধান্ত।"
দায়ও গেল, দামও বাড়ল। এর চেয়ে সুন্দর সমাধান আর কী হতে পারে!
এক সময় ক্যাপাসিটি চার্জ ছিল। বিদ্যুৎ উৎপাদন না করেও টাকা দেওয়া হতো। এখন যদি বিতরণের নামে খাম্বা, তার, ট্রান্সফরমার আর স্মার্ট মিটারের নতুন গল্প শুরু হয়, তাহলে সাধারণ মানুষের কাছে পার্থক্যটা কোথায়? আগে বিদ্যুৎকেন্দ্র ছিল লাভের খনি। এখন কি সেই খনি একটু একটু করে খাম্বার গোড়ায় চলে আসছে? এসব ভাবতে ভাবতেই মাথায় শুধু একটা কথাই ঘুরতে থাকে। স্যার, সবে তো এলেন। এখনই বিদ্যুতের খাম্বাগুলোর দিকে এত মায়া কেন?
Plan to privatise power distribution to improve accountability, service: Minister -বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস)
photo card courtesy : spotlightnews24
About the Author
mustafa kemal atarturk
Financial analyst
মানুষ মরে গেলে পঁচে যায় আর বেঁচে থাকলে বদলায়
প্রোফাইল দেখুন
মতামত
এখনও কোনো মতামত নেই।
প্রথম মতামতটি আপনিই দিন।
আলোচনায় অংশ নিতে লগ ইন করুন অথবা এ্যাকাউন্ট খুলুন