সকল লেখা জানতে চাই
Searching…

বুলেটের শূন্য বণ্টন হোক সংবিধানের প্রথম শর্ত

দেশের ভেতরে-বাইরে শ্রমিকদের ওপর যতই অত্যাচার চলুক না কেন, ডলারের প্রবাহ তো ঠিক রাখতে হবে, তারপর সেই ঘাম আর রক্ত মাখা ডলারের একটা বড় অংশ বিদেশে পাচার করে বেগম পাড়ার জৌলুশও বাড়াতে হবে। কাজেই মুখ্য সমস্যায় হাত দেওয়া যাবে না, আশেপাশের গৌণ বিষয়গুলো নিয়েই মেতে থাকতে হবে। মূলত ক্ষমতা যখন মানবতা দেখায় তখন ক্ষমতা আর ব্যবসা হাতে রেখেই দেখায়, হাতে রাখার জন্যেই দেখায়।

S M  Abu Taher
পড়তে 6 মিনিট লাগতে পারে
এই লেখাটি 181 বার পড়েছে
বুলেটের শূন্য বণ্টন হোক সংবিধানের প্রথম শর্ত

ইউরোপীয় মানবতার অন্যতম গর্বের বিষয় হলো—প্রায় দুই শতাব্দী আগের ব্রিটিশ সরকারের দাস প্রথা বিলুপ্তিকরণ। এটা ইতিবাচক নিঃসন্দেহে তবে নির্বিশেষে কিংবা নিঃশেষে নয়।

১৮৩৮ সালে যখন তারা দাস প্রথা তুলে দিল, তখন ক্ষতিপূরণ হিসাবে দাস মালিকদের দিল সেই সময়ের ২০ মিলিয়ন পাউন্ড (এখনকার কয়েক শ’ বিলিয়ন পাউন্ডের সমান)। আর দাসদের কী দিল? কিছুই না। ফলে দাসেরা হঠাৎ একদিন নিজেদের বিরাট এক স্বাধীন শুন্য হিসাবে আবিষ্কার করল—যেখানে তাদের মাথার ওপরে ছাদ নাই, পেটে খাবার নাই, পকেটে পয়সা নাই, চাষ করার জমি নাই। কারণ সেখানে সঞ্চয়ের কোনো সুযোগ ছিলো না। দাস হিসাবে তারা ছিলো গবাদি পশুরও অধম (কারো কারো মতে বানর থেকে মানুষে বিবর্তিত হতে গিয়ে পথ হারানো পাপীর দল), পারিশ্রমিক তো পেতোই না, তিন বেলা খাবারও জুটত না অনেক সময়।  তাই স্বাধীনতার পরেও বেশিরভাগই বাধ্য হলেন নামমাত্র পারিশ্রমিকে সেই একই কাদা ঘেঁটে যেতে; সেই একই শোষণের কব্জায় থাকতে আরও কয়েক প্রজন্ম। সরাসরি না থাকলেও এই শুন্যতার রেশ এখনও শেষ হয়নি।

“The slave went free; stood a brief moment in the sun; then moved back again toward slavery.”- W. E. B. Du Bois, Black Reconstruction in America

ব্রিটিশ সরকার তখন কোনো ক্ষতিপূরণ না দিলেও অন্তত খেয়ে পরে বাঁচার মতো ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ করে দিতে পারত, কিন্তু সেটা তারা করে নাই। পুনর্বাসনের কোনো চেষ্টাই করে নাই। একদিকে যেমন স্বাধীনতা ঘোষণা করে মহানুভব সাজা গেল, নিজেদের ভালোমানুষী উদযাপন করা গেল অন্যদিকে দাস কেন্দ্রিক অর্থনীতিও আগের জায়গায়ই থাকল। এভাবেই আমরা বাজারি মানবতার খাতিরে “শূন্য” শ্রম (বিনা পারিশ্রমিক) থেকে “প্রায় শূন্য” শ্রমের (সামান্য পারিশ্রমিক) যুগে এলাম। যেখানে “শূন্য” শ্রমকে অস্বাভাবিক অমানবিক ভাবা হয় আর “প্রায় শূন্য” বা “সস্তা” শ্রমকে খুব স্বাভাবিক, যথেষ্ট মানবিক ভাবা হয়। তাছাড়া আগে জোর করে দাস বানাতে হলেও এখন লোকে স্বেচ্ছায়ই দাস হতে চায়, ইউরোপীয় মানবতার মূল জয়টা মনে হয় এখানেই।

“Capital is dead labour, which, vampire-like, lives only by sucking living labour, and lives the more, the more labour it sucks.”- Karl Marx, Capital: A Critique of Political Economy Volume 1

আর এই ধরনের ঘটনা যে শুধু ইউরোপেই পাওয়া যায় তা না, আমাদের এখানেও আছে। যেমন গার্মেন্টস শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণের ক্ষেত্রে ন্যায্যতার চাইতে মালিক পক্ষের সুবিধাই মূল বিবেচ্য বিষয়। ব্যবসা যতই রমরমা হোক, সরকার যতই ভর্তুকি দিক, ঈদ এলেই দেখা যায় শ্রমিকদের বেতন বোনাস বাকির খাতায়। আবার প্রবাসী শ্রমিকদের সুবিধার্থে বিমান বন্দরে আলাদা লাউঞ্জের কথা হয়, কিন্তু তাদের—বিশেষ করে নারী শ্রমিকদের আরব দেশগুলোতে যে নির্যাতন-নিপীড়নের শিকার হতে হয় এটা নিয়ে সরকারের কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নাই, দূতাবাসগুলোরও তেমন কোনো মাথাব্যথা নাই।

২০২৫ সালের দশ মাসে সৌদি আরবে যাওয়া নারী শ্রমিকদের মধ্যে ৪৮ জনের মরদেহ এসেছে। গোটা মধ্যপ্রাচ্য থেকে এসেছে ৩১১ জনের মরদেহ; যার মধ্যে ৫৩ জনই আত্মহত্যা আর ১২০ জন স্ট্রোকে মারা যান বলে জানানো হয়। মৃত নারীদের বয়স ২০ থেকে ৪০ বছর। সৌদি আরবে ৬৭ শতাংশ নারী শ্রমিকের মধ্যে অত্যাচার-নিপীড়ন, কর্মক্ষেত্রে জুলুমে মারা যান প্রায় ৩৮ শতাংশ।

দেশের ভেতরে-বাইরে শ্রমিকদের ওপর যতই অত্যাচার চলুক না কেন, ডলারের প্রবাহ তো ঠিক রাখতে হবে, তারপর সেই ঘাম আর রক্ত মাখা ডলারের একটা বড় অংশ বিদেশে পাচার করে বেগম পাড়ার জৌলুশও বাড়াতে হবে। কাজেই মুখ্য সমস্যায় হাত দেওয়া যাবে না, আশেপাশের গৌণ বিষয়গুলো নিয়েই মেতে থাকতে হবে। মূলত  ক্ষমতা যখন মানবতা দেখায় তখন ক্ষমতা আর ব্যবসা হাতে রেখেই দেখায়, হাতে রাখার জন্যেই দেখায়।

জুলাই অভ্যুত্থান পরবর্তী নতুন বাংলাদেশে সবাই যখন ক্রেডিট কামড়াকামড়িতে ব্যস্ত, তখনও পাওনার দাবিতে রাস্তায় নেমে গুলিতে প্রাণ হারিয়েছে শ্রমিকেরা। এটা শুধু আন্দোলন দমনের হিসাব না, শ্রমিকদের যে নাগরিক হিসাবে কোনো মূল্য নাই, উপনিবেশোত্তর বাংলাদেশে তারা যে এখনও ঔপনিবেশিক প্রজা সেই হিসাবও। যে ইন্টেরিম সরকার সব ধরনের আন্দোলনে দারুণ নমনীয়, মব নিয়ন্ত্রণে ভীষণ অক্ষম ছিলো  তারাই আবার যেকোনো শ্রমিক আন্দোলনে নির্বিবাদে নিদারুণ নিষ্ঠুরতা প্রদর্শন করেছে। বড় পুঁজির প্রতি অতি উৎসাহী আনুগত্য প্রদর্শনই রাষ্ট্রের মূল কাজ, বাকি সব অপশনাল। আর এইসব হিসাব নিকাশ যে শুধু শ্রমিকেই আটকে থাকবে এমন না। বন্দুকের নল প্রয়োজনমতো রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক কিংবা নৈতিক কোনো প্রতিপক্ষকেই ছাড়বে না।

“Man is human only to the extent to which he tries to impose himself on another man in order to be recognized by him. As long as he has not been effectively recognized by the other, it is this other who remains the focus of his actions. His human worth and reality depend on this other and on his recognition by the other. It is in this other that the meaning of his life is condensed.” - Frantz Fanon, Black Skin, White Masks


নতুন বাংলাদেশ চাইলে বৈষম্য বিরোধিতা শুধু সরকারি চাকরির চক্রে বাঁধা থাকলে চলবে না। কাকে গুলি করা যাবে কাকে গুলি করা যাবে না সেই ব্যপারেও বৈষম্য নিরসন করতে হবে সবার আগে। নাগরিক হিসাবে সবার বেঁচে থাকার অধিকারের নিশ্চয়তা দিতে হবে। “৭৷ (১) প্রজাতন্ত্রের সকল ক্ষমতার মালিক জনগণ”ধরনের হাওয়াই মিঠাই মার্কা কথা কিংবা“৩২। আইনানুযায়ী ব্যতীত জীবন ও ব্যক্তিস্বাধীনতা হইতে কোন ব্যক্তিকে বঞ্চিত করা যাইবে না।”এমনব্ল্যাকহোল যুক্ত কথা দিনশেষে ক্ষমতার পক্ষেই যায়। কাজেই রাষ্ট্র যেকোনো ধরনের ট্যাগের দোহাই দিয়ে নির্বিচারে নাগরিক হত্যা করতে পারবে না এইটাই হতে হবে সংবিধানের প্রথম শর্ত। কোনো “যদি”, “কিন্তু” ছাড়াই এই শর্ত সরাসরি সাধারণের বুঝতে পারার মতো ভাষায় লেখা থাকতে হবে। আর প্রত্যেকটা বিচারবহির্ভূত হত্যার ক্ষেত্রে বিচারবিভাগীয় তদন্ত হতে হবে—এটাও স্পষ্টভাবে থাকতে হবে সংবিধানে। দল, মত, ন্যারেটিভ নির্বিশেষে সবারই এই দাবি তোলা উচিত যদি না তারা পতিত স্বৈরাচারের রেখে যাওয়া শোষণযন্ত্র দখল করে পুনরায় ফ্যাসিবাদ কায়েম করতে চায়।

S M  Abu Taher

About the Author

S M Abu Taher

কবি এবং ক্রীড়নক

প্রোফাইল দেখুন

মতামত

এখনও কোনো মতামত নেই।

প্রথম মতামতটি আপনিই দিন।

আলোচনায় অংশ নিতে লগ ইন করুন অথবা এ্যাকাউন্ট খুলুন

Reading

Font size

Auto scroll
Slow Fast