সকল লেখা জানতে চাই
Searching…

নজরুল: শ্রেণী, মতাদর্শ ও আত্তীকরণের রাজনীতি

কাজী নজরুল ইসলামকে নিয়ে আজকের বাংলাদেশে যে আত্তীকরণের রাজনীতি চলছে, তা মূলত একটি নির্বাচনী স্মৃতিভ্রংশ। রক্ষণশীল সমাজ যে কবিকে একসময় ইসলামের শত্রু বলে বর্জন করেছিল, আজ তাঁকেই ধর্মীয় পরিচয়ে সীমাবদ্ধ করার চেষ্টা চলছে। অথচ নজরুলের জীবন ছিল দারিদ্র্য, প্রান্তিকতা ও বিবর্তনশীল রাজনৈতিক চেতনার এক জটিল আখ্যান।

Nasim sarker
Nasim sarker মজদুরের নিয়মিত লেখক
পড়তে 11 মিনিট লাগতে পারে
এই লেখাটি 1 বার পড়েছে
নজরুল: শ্রেণী, মতাদর্শ ও আত্তীকরণের রাজনীতি

এক.

কোনো ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বকে নিয়ে আলোচনার আগে একটি পদ্ধতিগত প্রশ্ন অবধারিতভাবে চলে আসে  যে এই আলোচনার রাজনীতিটা কী? লুই আলথুসার দেখিয়েছেন, মতাদর্শ কীভাবে ব্যক্তিকে সাবজেক্ট হিসেবে আহ্বান করে  কীভাবে একটি আদর্শিক কাঠামো কাউকে নিজের ভাষায় চিনতে বাধ্য করে। কাজী নজরুল ইসলামকে নিয়ে আজকের বাংলাদেশে যে রাজনীতি চলছে, তা ঠিক এই প্রক্রিয়ার একটি প্রকৃষ্ট দৃষ্টান্ত। একটি বিশেষ ইসলামপন্থী মহল নজরুলকে একচেটিয়াভাবে মুসলিম পরিচয়ে "ইন্টারপেলেট" করতে চাইছে  তাঁর জীবন ও রচনার একটি অংশকে সমগ্র সত্তা বলে দাবি করে। প্রথমত, নজরুলের শ্রেণী-অবস্থান বিমূর্ত জনদরদ নয়,  একটি সুনির্দিষ্ট বস্তুগত ইতিহাস। দ্বিতীয়ত, তাঁর রাজনৈতিক মতাদর্শ ছিল বিবর্তনশীল ও দ্বান্দ্বিক। তৃতীয়ত, তাঁর অসাম্প্রদায়িকতা রক্তাক্ত দাঙ্গার প্রত্যক্ষদর্শী হয়ে গড়ে তোলা একটি জ্ঞানতাত্ত্বিক অবস্থান। চতুর্থত, এই জটিলতাকে অস্বীকার করেই আজকের আত্তীকরণ সম্ভব হচ্ছে। এবং পঞ্চমত যা এই প্রবন্ধের সবচেয়ে তীক্ষ্ণ বিদ্রূপ নজরুলের নিজস্ব সময়েই রক্ষণশীল মুসলিম সমাজ তাঁকে "ইসলামের শত্রু" বলে ঘোষণা করেছিল।


যে কোনো লেখকের রচনা বিশ্লেষণের পূর্বশর্ত হলো তাঁর বস্তুগত অস্তিত্বের অবস্থা অনুসন্ধান করা। কেননা, শিল্পীর ঐতিহাসিক অবস্থান তাঁর সৃষ্টির অন্তর্গঠনকে নির্মাণ করে। নজরুলের ক্ষেত্রে এই বস্তুগত ভিত্তি ছিল দারিদ্র্য ও প্রান্তিকতা। পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার চুরুলিয়া গ্রামের এক দরিদ্র মুসলিম পরিবারে জন্ম নেওয়া নজরুল পিতৃহীন হওয়ার পর মসজিদে মুয়াজ্জিনের কাজ করেছেন, মক্তবে পড়িয়েছেন। দারিদ্র্যের তাড়নাতেই তিনি ব্রিটিশ পরিচালিত ৪৯ নম্বর বেঙ্গলি রেজিমেন্টে যোগ দিয়ে করাচি সেনানিবাসে চলে যান। সেখানে ফারসি-জানা মৌলভীর কাছে ফারসি সাহিত্যপাঠ এবং সেনাসঙ্গীদের সাথে মিশে উর্দু আয়ত্ত করেন । তাঁর বহুভাষিক, বহুসাংস্কৃতিক গঠন অভিজাত শিক্ষায়তনিক প্রকল্প ছিল না, বরং প্রান্তিক জীবনের বাস্তবতা থেকে গড়ে ওঠেছিল। এই শ্রেণী-অবস্থানই তাঁকে প্রলেতারিয়েতের প্রতি সংবেদনশীল করে

দুই.

নজরুলের রাজনৈতিক চেতনা কখনো স্থির, সরলরৈখিক  ছিল না। এটি ছিল সংকট, হতাশা এবং পুনর্গঠনের  দ্বান্দ্বিক ইতিহাস। ইতিহাস থেকে এই বক্তব্যের সপক্ষে কয়েকটি ঘটনা দেখে নেওয়া যাক,

 ক। ১৯২৫ সালে কংগ্রেসের অধিবেশনে চিত্তরঞ্জন দাশ যে আপোসমূলক অবস্থান গ্রহণ করেন, তাতে নজরুল গভীরভাবে হতাশ হন। বন্ধু কুতুবউদ্দীনের উপনির্বাচনী প্রচারাভিযানে অংশ নিতে গিয়ে তিনি উপলব্ধি করেন যে প্রাতিষ্ঠানিক রাজনীতি মূলত সমাজের উচ্চস্তরের ক্ষমতা-লড়াই, যার বার্তা সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছায় না। এই মোহভঙ্গ থেকেই জন্ম নেয় 'সব্যসাচী' কবিতা  "জাগোরে জোয়ান, ঘুমায়ো না ভুয়ো শান্তির বাণী শুনি।"

খ। ১৯২৫ সালের নভেম্বরে নজরুল ও তাঁর বন্ধুরা  হেমন্তকুমার সরকার, কুতুবউদ্দীন আহমদ, আবদুল হালিম, শামসুদ্দীন হুসেন এবং কারারুদ্ধ মুজফফর আহমদ  মিলে গঠন করেন লেবার স্বরাজ পার্টি, যার মুখপত্র 'লাঙল'-এর প্রধান পরিচালক ছিলেন স্বয়ং নজরুল। তবে লক্ষণীয়, নজরুল অত্যন্ত রাজনীতি-সচেতন হলেও তিনি নিজে কোনো দলের সক্রিয় ক্যাডার ছিলেন না, যেমনটা ছিলেন মুজফফর আহমদ।

গ। ১৯২৫-২৬ সালের 'সাম্যবাদী' কাব্যে নজরুল সর্বহারাদের কথা লিখলেও "তারা" ও "আমরা"র দূরত্ব বজায় রেখেছিলেন । দূর থেকে কুলি-মজুর-চাষীদের প্রতি সহানুভূতি জানিয়েছেন, নিজেকে তাঁদের সাথে সম্পূর্ণ অভিন্ন করতে পারেননি। কিন্তু জীবনের শেষপর্বে, ১৯৪১-৪২ সালে, এই দূরত্ব ঘুচে যায়। 'শ্রমিক মজুর' কবিতায় তিনি লেখেন , "যে হাত হাতুড়ি দিয়া গড়িয়াছি প্রাসাদ হর্ম্যরাজি, সেই হাত দিয়া বিলাস-কুঞ্জ ধ্বংস করিব আজি... গড়ার হাতুড়ি ধরেছি, এবার ভাঙার হাতুড়ি ধর।"  এতদিনে সর্বনাম বদলে যায়  "তারা" থেকে "আমরা"য়।

ধর্ম ও শ্রেণী-সংগ্রামের সহাবস্থান, এই তীক্ষ্ণ শ্রেণী-চেতনার সময়েই তাঁর কবিতায় গভীর ধর্মীয় ভাষা মিশে যায়। 'দরিদ্র মোর পরমাত্মীয়' কবিতায় সর্বহারাদের প্রতি সহমর্মিতা প্রকাশ করেও তিনি শ্রেণী-বিজয়ের বদলে আল্লাহর আশ্বাসের কথা বলেন। অথচ একই সময়ে 'শ্রমিক মজুর' কবিতায় স্পষ্ট বলেন  এই লাঞ্ছনা "আল্লার বিচার নয়, মানুষের অবিচার।" এই আপাত-দ্বন্দ্ব আসলে একটি দেশজ সংশ্লেষণ, এবং একান্তই নজরুলের অভিজ্ঞতাআদী দৃষ্টিভঙ্গী।মার্ক্সবাদের অনুকরণ না করে  এমন একটি সাম্যবাদের আদর্শ লালন করেন যেখানে ধর্মীয় ন্যায়বিচার ও পার্থিব শ্রেণী-সংগ্রাম পরস্পরকে শক্তিশালী করবে বলে তিনি মনে করতেন। যদি নজরুল নিজেই ধর্ম ও সাম্যবাদকে বিশুদ্ধতাবাদী দ্বন্দ্ব ছাড়াই একসাথে ধারণ করতে পারেন, তাহলে আজকের আত্তীকরণকারীরা কোন অধিকারে তাঁর সাম্যবাদী সত্তা ছেঁটে ফেলে কেবল ধর্মীয় অংশটুকু নিজেদের সম্পত্তি বানাতে চান?


তিন.

এপ্রিল মাসে কলকাতায় ভয়াবহ হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গা শুরু হয়, তিন দফায় চলে  ২-১৫ এপ্রিল, ২২ এপ্রিল-৮ মে, এবং ১১-২৫ জুলাই। প্রথম দফাতেই নিহত হয় পঞ্চাশেরও বেশি মানুষ, আহত সাতশোরও বেশি। এই ভ্রাতৃহত্যা প্রত্যক্ষ করে লেখা 'মন্দির ও মসজিদ' প্রবন্ধে নজরুল বর্ণনা করেন  আল্লাহ ও কালীর "প্রেস্টিজ রক্ষার নামে চিৎকার করা লোকেরা যখন মার খেয়ে পড়ে যাচ্ছিল, তখন তারা আর আল্লাহ-কালীর নাম নেয়নি, বরং একই ভাষায় আর্তনাদ করেছে "বাবা গো, মা গো।" এই পর্যবেক্ষণ প্রতিষ্ঠা করে: যন্ত্রণা ও মৃত্যুর মুহূর্তে ধর্মীয় পরিচয় ভেঙে পড়ে, অবশিষ্ট থাকে কেবল মানবিক আর্তি। 'হিন্দু-মুসলমান' প্রবন্ধে তিনি লেখেন  "হিন্দুত্ব মুসলমানত্ব দুই সওয়া যায়, কিন্তু তাদের টিকিত্ব দাড়িত্ব অসহ্য... টিকিত্ব হিন্দুত্ব নয়, ওটা হয়তো পণ্ডিতত্ব। তেমনি দাড়িও ইসলামত্ব নয়, ওটা মোল্লাত্ব।" এখানে তিনি ধর্মের সারমর্ম এবং তার প্রাতিষ্ঠানিক-প্রতীকী বহিরাবরণ-এর মধ্যে একটি সুস্পষ্ট বিভাজন টানছেন , Saussure-এর পরিভাষায় বলা যায়, সংঘাত তৈরি হয় যখন মানুষ signifier-কে signified-এর সাথে বিভ্রান্ত করে, প্রতীককে সারবস্তু বলে ভুল করে।'সাম্যবাদী' কাব্যে তিনি লেখেন , "পূজিছে গ্রন্থ ভণ্ডের দল। মূর্খরা সব শোনো, মানুষ এনেছে গ্রন্থ গ্রন্থ আনেনি মানুষ কোনো!" এই পঙক্তি ফয়েরবাখ এর ধর্ম-সমালোচনার সাথে সাযুজ্যপূর্ণ  ধর্মগ্রন্থ মানুষের সৃষ্টি, মানুষ ধর্মগ্রন্থের সৃষ্টি নয়। তিনি কোরান-পুরাণ-বেদ-বেদান্ত-বাইবেল-ত্রিপিটক-জেন্দাবেস্তা  সকল ধর্মগ্রন্থকে একই পঙক্তিতে সাজিয়ে একটি সমতুল্যতার কাব্যিক কাঠামো নির্মাণ করেন।  'বারাঙ্গনা' কবিতায় একজন যৌনকর্মীকে "মা" সম্বোধন করে তিনি প্রশ্ন তোলেন যে তাঁকেও হয়তো সীতার মতো সতী মা স্তন্য দিয়েছেন, এবং পিতৃতান্ত্রিক দ্বৈত-নৈতিকতাকে যুক্তি দিয়ে চ্যালেঞ্জ করেন , "অসতী মাতার পুত্র সে যদি জারজ-পুত্র হয়, অসৎ পিতার সন্তানও তবে জারজ সুনিশ্চয়!" এই অর্থে নজরুলের "সাম্য" একটি বহুমাত্রিক, ন্যায়বিচার-তত্ত্ব  ধর্ম, বর্ণ, লিঙ্গ ও অর্থনীতি একসাথে সমাহিত।

নজরুল বিদ্রোহী কীসে , বিষয়ে নাকি ভাষায়? ঈশ্বরগুপ্ত থেকে বহু কবি শোষণবিরোধী বিষয় নিয়ে লিখেছেন, কিন্তু কেউই এই আখ্যা পাননি। সুতরাং প্রশ্নটি প্রকাশকৌশলের। মালার্মের ভাষায় — "Poetry is not written with ideas, it is written with words।" নজরুলের শব্দ  চিহ্ন থেকে রূপান্তরিত হয় বিস্ফোরিত ধ্বনিতে। ওয়াল্ট হুইটম্যানের Song of Myself-এর সাথে 'বিদ্রোহী'র গঠনগত সাযুজ্য প্রমাণ করে নজরুলের বিদ্রোহ স্থানীয় প্রতিক্রিয়াতেই সীমাবদ্ধ ছিলো না, এটি একটি বৈশ্বিক আধুনিকতাবাদী আন্দোলনের অংশ।


চার.

বিশের দশকে নজরুলের মধ্য দিয়ে হিন্দু-মুসলমান মিলনের বাণী বেজেছিল, তিরিশের দশকে বিষ্ণু দে-সুধীন্দ্রনাথের হিন্দু পুরাণ-নির্ভরতায় এবং চল্লিশের দশকে ফররুখ আহমদের মুসলিম পুরাণ-নির্ভরতায় তা খণ্ডিত হয়ে গেল। নজরুল একাধারে হিন্দু-মুসলমান মিলনের অগ্রদূত এবং বাংলা সাহিত্যে মুসলিম সংস্কৃতির প্রথম নির্মাতা  এই দ্বৈত পরিচয়ই তাঁকে একটি অনন্য কিন্তু অস্থিতিশীল অবস্থানে রাখে।  নজরুলের কাব্যভাষা একাধিক শাস্ত্রীয় স্বরকে একই দেহে ধারণ করার প্রয়াস করে, যেখানে সুধীন্দ্রনাথ বা ফররুখ একক সংহত রেজিস্টারে কাজ করেন। Heteroglossic টেক্সট প্রায়ই কম "মসৃণ" মনে হয়, কিন্তু ঠিক এই কারণেই তা রাজনৈতিকভাবে অধিকতর র‌্যাডিক্যাল। ১৯৪৭-এর দেশভাগ প্রমাণ করে যে বাঙালি হিন্দু-মুসলমানের সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য-সংরক্ষণ একটি ব্যাপক রাষ্ট্রীয় প্রকল্পের ফসল ছিল, কোনো একক কবির পরাজয় নয়।


পাচ.

এবার আসি এই প্রবন্ধের সবচেয়ে তীক্ষ্ণ প্রমাণে। গ্রামসি দেখিয়েছেন, কোনো গোষ্ঠী যখন সাংস্কৃতিক আধিপত্য  প্রতিষ্ঠা করতে চায়, তখন সে ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বদের নিজের ব্যাখ্যা-কাঠামোয় বন্দি করে ফেলতে চায়। কিন্তু নজরুলের ক্ষেত্রে ইতিহাস নিজেই এই আত্তীকরণকে মিথ্যা প্রমাণ করে দেয়। ১৯২০-এর দশকের শেষভাগে, যখন নজরুলকে সম্মান জানাতে সওগাত পত্রিকার উদ্যোগে একটি সংবর্ধনা কমিটি গঠিত হয়  যার সভাপতি ছিলেন এস. ওয়াজেদ আলী এবং সদস্যদের মধ্যে ছিলেন শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, এ. কে. ফজলুল হক, আবুল মনসুর আহমদ প্রমুখ  ঠিক সেই সময়েই মোহাম্মদী পত্রিকার নেতৃত্বে রক্ষণশীল মুসলিম সমাজ নজরুলের বিরুদ্ধে নিন্দা-অপবাদে মুখর হয়ে ওঠে। ১৩৩৫ বঙ্গাব্দের কার্তিক সংখ্যা মোহাম্মদীতে নজির আহমদ চৌধুরীর লেখা 'এছলাম ও নজরুল ইসলাম' প্রবন্ধে সরাসরি অভিযোগ করা হয় যে নজরুল "একদিকে আল্লাহকে অমান্য করিয়া, তাঁহার বুকে পদাঘাত করার ও হাতুড়ি ঠোকার চরম ধৃষ্টতা প্রকাশ করিয়া, অন্যদিকে কালী দুর্গা ও সরস্বতী প্রভৃতির পূজা অর্চনাকে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা" করছেন  এবং উপসংহারে ঘোষণা করা হয়, নজরুল "এছলামের সর্বপ্রধান শত্রু।" এটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছিল না। এর প্রায় এক বছর আগে, ১৩৩৪ বঙ্গাব্দের মাঘ সংখ্যা ইসলাম-দর্শন পত্রিকায় হবিবর রহমান সাহিত্যরত্ন লিখেছিলেন 'কাজীর কেরদানী' প্রবন্ধ, যেখানে তিনি লেখেন , "যখন হইতে তিনি বিদ্রোহী সাজিয়া 'বিধাতার বুকে হাতুড়ী' পিটিতে আরম্ভ করিলেন, সেই সময় হইতেই মুসলমান সমাজ তাঁহাকে বর্জন করিয়াছে... তাই তিনি 'আমি কি হনু রে' মনে করিয়া ফুলিতে..." এখানে ইতিহাসের একটি নিষ্ঠুর বিদ্রূপ উন্মোচিত হয়। নজরুলের নিজের সময়ের রক্ষণশীল মুসলিম সমাজপতিরা তাঁকে ধর্মদ্রোহী, ইসলামের শত্রু এবং হিন্দু-পূজারী বলে আখ্যা দিয়েছিলেন  ঠিক সেই কারণগুলোর জন্যই, যেগুলো আজকের ইসলামপন্থীরা সযত্নে আড়াল করে নজরুলকে "খাঁটি মুসলিম কবি" বানাতে চাইছেন। এই ঐতিহাসিক তথ্যটি তাত্ত্বিকভাবে অমূল্য, কারণ এটি প্রমাণ করে যে আজকের আত্তীকরণ প্রকল্প কোনো ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতার অংশ নয়  এটি একটি সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী পুনর্লিখন। যে কবিকে তাঁর নিজের সময়ে "ইসলামের সর্বপ্রধান শত্রু" ঘোষণা করা হয়েছিল, শতাব্দী পরে সেই কবিকেই ইসলামের একচেটিয়া প্রতিনিধি বানানো হচ্ছে  এই বৈপরীত্যই প্রমাণ করে যে বর্তমান আত্তীকরণটি ঐতিহাসিক সত্যের অনুসন্ধান নয়, বরং একটি রাজনৈতিক প্রকল্প। লক্ষণীয় যে, নজরুলকে রক্ষা করতে যারা এগিয়ে এসেছিলেন, তাঁদের মধ্যে হিন্দু ও মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের বিশিষ্টজনরাই ছিলেন  শরৎচন্দ্র থেকে ফজলুল হক পর্যন্ত। অর্থাৎ নজরুলকে ঘিরে সেই সময়ের লড়াইটাও ছিল সাম্প্রদায়িক বিভাজনরেখা বরাবর নয়, বরং প্রগতি বনাম রক্ষণশীলতার লড়াই  যে লড়াইয়ের প্রকৃত চরিত্রকে আজকের আত্তীকরণ-প্রকল্প ইচ্ছাকৃতভাবে সাম্প্রদায়িক ভাষায় অনুবাদ করে ফেলছে।


সবশেষে,

এডোয়ার্ড সাঈদ  দেখিয়েছেন কীভাবে সাংস্কৃতিক উপাদান আধিপত্যের হাতিয়ার হয়ে ওঠে। নজরুলের ক্ষেত্রে এই বিপদ দ্বিগুণ  কারণ তিনি নিজেই জীবদ্দশায় সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে লড়েছিলেন, রক্তাক্ত দাঙ্গা দেখেছিলেন, এবং নিজের সময়ের ধর্মীয় গোঁড়ামির হাত থেকে "ইসলামের শত্রু" তকমা পেয়েছিলেন। যারা আজ নজরুলকে ইসলামপন্থার পতাকাবাহী বানাতে চান, তাঁদের এই প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হবে। তাঁরই সমসাময়িক মুসলিম সমাজপতিরা যাঁকে "এছলামের সর্বপ্রধান শত্রু" বলে ঘোষণা করেছিলেন, আজ শতাব্দী পরে সেই একই ব্যক্তিকে কোন যুক্তিতে "খাঁটি মুসলিম কবি" বানানো হচ্ছে? এই স্ববিরোধিতাই প্রমাণ করে যে আজকের দাবিটি ঐতিহাসিক সত্যানুসন্ধান নয়  এক ধরনের নির্বাচনী স্মৃতিভ্রংশ , যা রাজনৈতিক প্রয়োজনে ইতিহাসকে নতুন করে লেখে। নজরুল ছিলেন এক দ্বান্দ্বিক সত্তা  সংগঠন গড়েও সাংগঠনিক শৃঙ্খলার বাইরে থেকেছেন, ধর্ম আঁকড়ে থেকেও তার কাঠামোর সমালোচনা করেছেন, দুই পুরাণকে আলিঙ্গন করেও কোনোটির একচেটিয়া হননি, এবং নিজের সময়ে যে সমাজ তাঁকে ধর্মদ্রোহী বলেছিল, শতাব্দী পরে সেই একই সমাজের উত্তরসূরিরা তাঁকে নিজেদের একচেটিয়া সম্পত্তি বানাতে চাইছে। এই বিদ্রূপাত্মক ধারাবাহিকতা নজরুলকে বোঝার একমাত্র সৎ পথ দেখিয়ে দেয়  তাঁকে সরলীকৃত করে কোনো একক সম্প্রদায়ের সম্পত্তি না বানিয়ে, বরং তাঁর সমগ্র দ্বন্দ্ব ও জটিলতাসহ ফিরিয়ে দেওয়া দরকার  যেখানে তিনি সবসময় ছিলেন  ইতিহাসের দ্বন্দ্বের মধ্যে, মানুষের পক্ষে।


#কাজী_নজরুল_ইসলাম #নজরুল #বাংলা_সাহিত্য #রাজনীতি #ইতিহাস #সাম্যবাদ #সংস্কৃতি #সমাজ
Nasim sarker

About the Author

Nasim sarker

মজদুরের নিয়মিত লেখক

Student

শিক্ষার্থী, বাংলা বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়। যোগাযোগঃ email:[email protected] Facebook profile: https://www.facebook.com/share/1QYbj7qtnU/

প্রোফাইল দেখুন

মতামত

এখনও কোনো মতামত নেই।

প্রথম মতামতটি আপনিই দিন।

আলোচনায় অংশ নিতে লগ ইন করুন অথবা এ্যাকাউন্ট খুলুন

Reading

Font size

Auto scroll
Slow Fast