সকল লেখা জানতে চাই
Searching…

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা বনাম বাস্তবতা

জুলাই গণ-অভ্যুত্থান একটি ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখালেও বর্তমানে মব সংস্কৃতি ও প্রতিশোধের রাজনীতি সেই আকাঙ্ক্ষাকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। বিচারিক প্রক্রিয়ার বদলে জনতার হাতে বিচার তুলে নেওয়া আইনের শাসনের পরিপন্থী।

Shahriar Khan Nafiz
Shahriar Khan Nafiz মজদুরের নিয়মিত লেখক
পড়তে 5 মিনিট লাগতে পারে
এই লেখাটি 137 বার পড়েছে এ মাসে লেখকের লেখা 1 জন পাঠক পড়েছেন
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা বনাম বাস্তবতা

ইতিহাসের প্রতিটি গণ-অভ্যুত্থান মানুষের মনে এক নতুন ভোরের প্রতিশ্রুতি জাগিয়ে তোলে। মানুষ রাজপথে নামে শুধু একটি সরকারের পতন ঘটানোর জন্য নয়, বরং একটি ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র, জবাবদিহিমূলক শাসনব্যবস্থা, নাগরিক মর্যাদা এবং আইনের শাসনের প্রত্যাশায়। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানও সেই প্রত্যাশারই প্রতীক ছিল। অনেকেই বিশ্বাস করেছিলেন, এই আন্দোলন রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে একটি ইতিবাচক পরিবর্তনের সূচনা করবে এবং বাংলাদেশকে আরও গণতান্ত্রিক ও মানবিক রাষ্ট্রে রূপান্তরের পথ দেখাবে। কিন্তু ইতিহাসের কঠিন সত্য হলো কোনো আন্দোলনের সাফল্য তার স্লোগানে নয়, বরং আন্দোলনের পর সমাজ ও রাষ্ট্রের চরিত্রে প্রতিফলিত হয়। সেই জায়গায় দাঁড়িয়েই আজ আমাদের নিজেদের কিছু অস্বস্তিকর প্রশ্ন করা প্রয়োজন। জুলাইয়ের চেতনা যদি হয় অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায়ের অবস্থান, তাহলে সেই চেতনার প্রথম শর্ত হওয়া উচিত ছিল আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা। কিন্তু পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন স্থানে যে মব সংস্কৃতির বিস্তার নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, তা আমাদের নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে। কোনো অভিযোগের বিচার যদি আদালতের পরিবর্তে উত্তেজিত জনতার হাতে চলে যায়, তবে সেখানে ন্যায়বিচারের নিশ্চয়তা থাকে না। জনতার আবেগ কখনো কখনো সত্যকে আড়াল করে, আর আইনের শাসনের পরিবর্তে প্রতিষ্ঠিত হয় ভয়ের সংস্কৃতি। গণতন্ত্রে বিচার হয় আদালতে, রাস্তায় নয়। একইভাবে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের অপমান করা কিংবা তাঁদের গলায় জুতার মালা পরিয়ে দেওয়ার মতো ঘটনার খবর সমাজে গভীর প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। এমন ঘটনা কেবল একজন ব্যক্তির অপমান নয়, এটি রাষ্ট্রের মুক্তিযুদ্ধ-সংশ্লিষ্ট ঐতিহাসিক স্মৃতির প্রতিও অসম্মান। একজন বীর মুক্তিযোদ্ধার মানবিক মর্যাদা হরণ কোনো সভ্য সমাজের রাজনৈতিক সংস্কৃতি হতে পারে না। মহান মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত ভাস্কর্য ও স্থাপনা ভাঙচুরের ঘটনাগুলোও একইভাবে উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। অবশ্যই যেকোনো ভাস্কর্যের পেছনে ইতিহাস, নান্দনিকতা ও তাৎপর্য রয়েছে। তাই ইতিহাসকে হাতুড়ি দিয়ে মুছে ফেলা যায় না, বরং এতে সমাজ আরও বিভক্ত হয়। কোনো জাতি তার ইতিহাসকে সমালোচনা করতে পারে, পুনর্মূল্যায়ন করতে পারে, কিন্তু ধ্বংসের মাধ্যমে ইতিহাসের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারে না। সাম্প্রতিক সময়ে ওসমান হাদির মৃত্যুকে ঘিরেও তীব্র রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হয়েছে। বিভিন্ন পক্ষ বিভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়েছে, অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগ করেছে। কিন্তু একটি মৌলিক প্রশ্ন আমাদের সামনে থেকেই যায় একজন মানুষের মৃত্যু কি রাজনৈতিক সুবিধা অর্জন ও মবের কারণ হওয়া উচিত? গণতান্ত্রিক সমাজে একজন মানুষের মৃত্যুকে ঘিরে এমন মবের ঘটনার নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ ও বিশ্বাসযোগ্য তদন্তই হওয়া একমাত্র পথ। কারণ সত্য প্রতিষ্ঠিত না হলে মৃত্যু নিয়েও বিভাজনের রাজনীতি চলতেই থাকে। আরও একটি প্রশ্ন ক্রমেই উচ্চারিত হচ্ছে, জুলাইয়ের আদর্শ কি ধীরে ধীরে সুবিধা ও ভোগের রাজনীতির কাছে পরাজিত হচ্ছে? ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, বহু বিপ্লব ও গণ-আন্দোলন আদর্শের শক্তিতে শুরু হলেও পরে ব্যক্তিস্বার্থ, পদ-পদবি, প্রভাব বিস্তার কিংবা অর্থনৈতিক সুবিধা অর্জনের প্রতিযোগিতায় দুর্বল হয়ে পড়েছে। জনগণ যখন দেখে যে ত্যাগের ভাষা ধীরে ধীরে সুবিধাভোগের ভাষায় রূপ নিচ্ছে, তখন তাদের আস্থা ক্ষয়ে যায়। যেকোনো গণ-অভ্যুত্থানের জন্য এটি সবচেয়ে বড় সতর্কবার্তা। তবে একই সঙ্গে একটি বিষয়ও আমাদের মনে রাখতে হবে। কোনো গণ-আন্দোলনের নামে সংঘটিত প্রতিটি কর্মকাণ্ডের দায় পুরো আন্দোলনের ওপর চাপিয়ে দেওয়া যেমন সঠিক নয়, তেমনি আন্দোলনের নামে সংঘটিত অন্যায়কে নীরব সমর্থন দেওয়াও সমানভাবে অগ্রহণযোগ্য। নৈতিকতার প্রকৃত পরীক্ষা তখনই হয়, যখন নিজের পক্ষের অন্যায়ের বিরুদ্ধেও একই দৃঢ়তায় কথা বলা যায়। আমাদের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি প্রবণতা বারবার দেখা গেছে, ক্ষমতায় থাকলে আইনকে নিজের মতো ব্যাখ্যা করা, আর ক্ষমতার বাইরে গেলে ন্যায়বিচারের দাবি তোলা। এই দ্বৈত মানদণ্ড থেকে বেরিয়ে আসতে না পারলে কোনো গণ-অভ্যুত্থানই কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আনতে পারবে না। ব্যক্তি বা দলের পরিবর্তনের চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সবচেয়ে বড় অর্জন হতে পারত এমন একটি বাংলাদেশ, যেখানে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা থাকবে, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে শত্রু নয়; প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখা হবে, রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলো দলীয় প্রভাবের ঊর্ধ্বে থাকবে এবং আইনের শাসন হবে সবার জন্য সমান। কিন্তু যদি সমাজে ভয়, প্রতিশোধ, মব সংস্কৃতি এবং ঐতিহাসিক স্মৃতি নিয়ে সংঘাতই বৃদ্ধি পায়, তাহলে আমাদের স্বীকার করতেই হবে স্বপ্ন ও বাস্তবতার মধ্যে একটি উদ্বেগজনক দূরত্ব তৈরি হয়েছে।ইতিহাস আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়। কোনো গণ-অভ্যুত্থান শেষ পর্যন্ত সফল হয় না কেবল ক্ষমতার পালাবদলে; সফল হয় তখনই, যখন মানুষের জীবনে ন্যায়বিচার, নিরাপত্তা এবং মর্যাদার অনুভূতি বৃদ্ধি পায়। সেই মানদণ্ডেই জুলাইকে মূল্যায়ন করতে হবে। অন্ধ সমর্থন যেমন ইতিহাসের প্রতি অবিচার, তেমনি অন্ধ প্রত্যাখ্যানও সত্যের প্রতি অন্যায়। জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষা ছিল একটি বৈষম্যহীন, মানবিক ও ন্যায়ভিত্তিক বাংলাদেশ। সেই আকাঙ্ক্ষাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে আমাদের আবারও ফিরে যেতে হবে আইনের শাসন, রাজনৈতিক সহনশীলতা, ঐতিহাসিক স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা এবং মানবিক মর্যাদার মৌলিক মূল্যবোধে। তাই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন ক্ষমতায় কে আছে, সেটি নয়। প্রশ্ন হলো, যে বাংলাদেশ গড়ার জন্য মানুষ রাজপথে নেমেছিল, সেই বাংলাদেশ কি সত্যিই গড়ে উঠেছে? যদি এই প্রশ্নের উত্তর আমরা আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে দিতে না পারি, তবে আমাদের আত্মসমালোচনা করতেই হবে। কারণ ইতিহাসে সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা কোনো আন্দোলনের পরাজয় নয়, সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা হলো নিজের ঘোষিত আদর্শ থেকে ধীরে ধীরে সরে যাওয়া।

লেখক: শাহরিয়ার খান নাফিজ, শিক্ষার্থী ও কলাম লেখক।

#জুলাই_গণ_অভ্যুত্থান #আইনের_শাসন #রাজনৈতিক_সংস্কৃতি #বাংলাদেশ #গণ_আন্দোলন #সামাজিক_বিচার #ইতিহাস #মানবাধিকার
Shahriar Khan Nafiz

About the Author

Shahriar Khan Nafiz

মজদুরের নিয়মিত লেখক

Columnist & Activist

Hi, I'm Shahriar Khan Nafiz. I am an activist driven by a deep commitment to social change. Through my writing, I strive to highlight pressing social issues, raise awareness and inspire thoughtful change in society.

প্রোফাইল দেখুন

মতামত

এখনও কোনো মতামত নেই।

প্রথম মতামতটি আপনিই দিন।

আলোচনায় অংশ নিতে লগ ইন করুন অথবা এ্যাকাউন্ট খুলুন

Reading

Font size

Auto scroll
Slow Fast