তেল নেই, গ্যাস নেই, বিদ্যুৎ নেই। অথচ বিল আছে, খরচ আছে, বাজার আছে। সবজির বাজারে গেলেই মনে হয়, সাধারণ মানুষের রান্নাঘর যেন ধীরে ধীরে বিলাসিতায় পরিণত হচ্ছে। কোনো সবজির দাম ১০০ টাকার নিচে নেই, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়ছে প্রতিদিন। কিন্তু মানুষের আয়? সেটি যেন একই জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে।
এই দেশের মধ্যবিত্ত মানুষটি সবচেয়ে অদ্ভুত এক শ্রেণির প্রতিনিধি। সে দরিদ্রের মতো সাহায্য চাইতে পারে না, আবার ধনীর মতো অর্থের নিশ্চয়তাও তার নেই। সমাজের চোখে সে স্বচ্ছল, কিন্তু মাসের শেষ সপ্তাহে তার হিসাবের খাতা বলে ভিন্ন গল্প।
মাসের শুরুতে বেতন আসে। তারপর শুরু হয় হিসাব। বাসা ভাড়া, বিদ্যুৎ বিল, গ্যাস, পানি, সন্তানের পড়াশোনা, চিকিৎসা, যাতায়াত, বাজার খরচ। একটার পর একটা খরচ মেটাতে মেটাতে মাসের মাঝামাঝিতেই পকেট ফাঁকা হয়ে যায়। আর মাসের শেষটা কাটে ধার, বাকিতে বাজার কিংবা নিজের প্রয়োজনকে বিসর্জন দিয়ে।
সবচেয়ে নির্মম বাস্তবতা হলো, এই মানুষটির কষ্টের কোনো দৃশ্যমান পরিচয় নেই।সে রাস্তায় দাঁড়িয়ে সাহায্য চায় না। সে ত্রাণের লাইনে দাঁড়ায় না। সে ভিক্ষা করে না। বরং নিজের আত্মসম্মানটুকু আঁকড়ে ধরে পরিবারের মৌলিক চাহিদা পূরণের জন্য প্রতিদিন লড়াই করে যায়।অথচ আমরা প্রতিদিন উন্নয়নের গল্প শুনি।
প্রশ্ন হলো, সেই উন্নয়নের সুফল কার ঘরে পৌঁছায়?
যে মানুষটি সারাদিন শ্রম দিয়ে মাস শেষে নিজের পরিবারের জন্য পর্যাপ্ত খাবার কিনতে পারে না, তার কাছে উন্নয়নের সংজ্ঞা কী? যে বাবা সন্তানের স্কুলের বেতন দিতে গিয়ে নিজের চিকিৎসা পিছিয়ে দেন, তার কাছে অর্থনৈতিক অগ্রগতি কোথায়? যে তরুণ শিক্ষিত হয়েও বছরের পর বছর চাকরির অপেক্ষায় থাকে, তার কাছে ভবিষ্যতের স্বপ্নটা কতটা বাস্তব?
একটি রাষ্ট্রের অর্থনীতি তখনই সফল, যখন তার সাধারণ মানুষ নিরাপদে বাঁচতে পারে। শুধু বড় বড় প্রকল্প, উঁচু ভবন কিংবা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পরিসংখ্যান দিয়ে মানুষের ক্ষুধা মেটে না। বাজারে নিত্যপণ্যের দাম যদি মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যায়, তাহলে সেই প্রবৃদ্ধির সঙ্গে সাধারণ মানুষের জীবনের সম্পর্ক কোথায়?
মধ্যবিত্ত আজ ক্রমাগত নিচের দিকে নামছে। কেউ ঋণ করছে, কেউ সঞ্চয় ভাঙছে, কেউ সন্তানের ভবিষ্যৎ থেকে টাকা সরিয়ে বর্তমানের খরচ মেটাচ্ছে। আর অনেকে শুধু চুপ করে সহ্য করছে।
রাষ্ট্রের কাছে মানুষের দাবি খুব বেশি কিছু নয়। নিরাপদ খাদ্য, সহনীয় বাজারদর, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও জ্বালানি, কর্মসংস্থান, মানসম্মত শিক্ষা, চিকিৎসা এবং সম্মানের সঙ্গে বেঁচে থাকার সুযোগ।এগুলো কোনো বিলাসিতা নয়। এগুলো নাগরিকের মৌলিক অধিকার।
একটি দেশ যদি তার মধ্যবিত্ত নাগরিককে প্রতিমাসে টিকে থাকার যুদ্ধে নামিয়ে দেয়, তাহলে প্রশ্ন উঠবেই: এই দেশ কার জন্য?
যদি বাজার কেবল বিত্তবানদের জন্য হয়, চাকরি কেবল ভাগ্যবানদের জন্য হয়, আর রাষ্ট্রের সুযোগ-সুবিধা কেবল ক্ষমতাবানদের নাগালে থাকে, তাহলে সাধারণ মানুষ যাবে কোথায়?
সেদিন হয়তো আর খুব বেশি দূরে নয়, যেদিন ক্ষুব্ধ মানুষকে বলতে হবে—
“বুর্জোয়াদের বাংলায়, মধ্যবিত্তের ঠাঁই নাই।”
এই স্লোগান যেন শুধু প্রতিবাদের ভাষা না হয়। রাষ্ট্র ও সমাজের জন্য এটি হোক একটি সতর্কবার্তা। কারণ মধ্যবিত্ত ভেঙে পড়লে শুধু একটি শ্রেণি ক্ষতিগ্রস্ত হয় না, একটি দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক ভারসাম্যও ভেঙে পড়ে।
মানুষকে বাঁচতে দিন।বাজারকে মানুষের নাগালের মধ্যে আনুন।কর্মসংস্থান তৈরি করুন।মধ্যবিত্তকে টিকে থাকার যুদ্ধ থেকে মুক্তি দিন।
কারণ এই দেশ শুধু বিত্তবানদের নয়।
এই দেশ সেই মানুষেরও, যে সারাদিন পরিশ্রম করে রাতে বাড়ি ফেরে এবং হিসাব করে দেখে, আগামীকাল পরিবারের জন্য খাবার জোগাড় করতে পারবে তো?
About the Author
RAJIN AHAMMED SAMI
মজদুরের নিয়মিত লেখকপ্রগতিশীল লেখক ও এক্টিভিস্ট
কলম ধরেছি অবহেলিতের পক্ষে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে। নীরব মানুষের কথা বলাই আমার দায়িত্ব।
প্রোফাইল দেখুন
মতামত
1প্রিয় লেখক আপনাকে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা। মাহমুদ হাসান জাবের, ৯ম শ্রেণি, মানবিক বিভাগ, আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়, মিরপুর-১০, ঢাকা।
আলোচনায় অংশ নিতে লগ ইন করুন অথবা এ্যাকাউন্ট খুলুন