সকল লেখা জানতে চাই
Searching…

বাজেট ২০২৬-২৭: সংখ্যার আড়ালে কার স্বার্থ?

গত ১১ জুন অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জাতীয় সংসদে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট পেশ করেছেন, যা বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় বাজেট এবং বিএনপি সরকারের বিগত দুই দশকে প্রথম বাজেট। সংখ্যাটা বিশাল, প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ৬.৫ শতাংশ, মুদ্রাস্ফীতি কমিয়ে ৭.৫ শতাংশে আনার প্রতিশ্রুতি। কিন্তু বাজেটের আকার নিয়ে মুগ্ধ হওয়ার চেয়ে জরুরি প্রশ্ন হলো, এই অর্থ কোথা থেকে আসছে, কাদের ওপর তার চাপ পড়ছে, এবং কাদের কাছে গিয়ে পৌঁছাচ্ছে।

Shams-uddin byapari
পড়তে 6 মিনিট লাগতে পারে
এই লেখাটি 75 বার পড়েছে
বাজেট ২০২৬-২৭: সংখ্যার আড়ালে কার স্বার্থ?

গত ১১ জুন অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জাতীয় সংসদে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট পেশ করেছেন, যা বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় বাজেট এবং বিএনপি সরকারের বিগত দুই দশকে প্রথম বাজেট। সংখ্যাটা বিশাল, প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ৬.৫ শতাংশ, মুদ্রাস্ফীতি কমিয়ে ৭.৫ শতাংশে আনার প্রতিশ্রুতি। কিন্তু বাজেটের আকার নিয়ে মুগ্ধ হওয়ার চেয়ে জরুরি প্রশ্ন হলো, এই অর্থ কোথা থেকে আসছে, কাদের ওপর তার চাপ পড়ছে, এবং কাদের কাছে গিয়ে পৌঁছাচ্ছে।

সামাজিক ব্যয়ে অগ্রগতি, কিন্তু প্রেক্ষাপটটা মনে রাখা জরুরি

সামাজিক সুরক্ষা খাতে বরাদ্দ বেড়ে হয়েছে ১ লাখ ৪৪ হাজার ৩৩৮ কোটি টাকা, যা আগের অর্থবছরের সংশোধিত বরাদ্দের চেয়ে বেশি। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে এডিপি বরাদ্দও আগের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। কাগজে এটা ইতিবাচক, এবং এই দিকনির্দেশনাটা স্বাগত জানানো উচিত। কিন্তু কয়েকটা বাস্তবতা মনে রাখা দরকার।

প্রথমত, চলতি অর্থবছরে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের সম্মিলিত বরাদ্দ মূল লক্ষ্যমাত্রা থেকে সংশোধিত হয়ে প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছিল। তাই এবারের "দ্বিগুণ" আসলে একটা খুব নিচু ভিত্তি থেকে হিসাব করা সংখ্যা, এবং বাস্তবায়নের রেকর্ড দেখলে সংশয় থাকা স্বাভাবিক। দ্বিতীয়ত, মুদ্রাস্ফীতি মে মাসে দাঁড়িয়েছে ৯.৪২ শতাংশে, যা গত ১৬ মাসের সর্বোচ্চ। সরকার নিজেই এবার সেটা ৭.৫ শতাংশে নামানোর কথা বলছে, যার মানে স্বীকার করেই নেওয়া হচ্ছে যে এখনকার হারটা অনেক বেশি। অর্থাৎ সামাজিক সুরক্ষা ভাতা বা শিক্ষা-স্বাস্থ্যের নামমাত্র বরাদ্দ বাড়লেও, প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতার হিসাবে তা কতটা বাড়ছে, সেটাই আসল প্রশ্ন। একজন বয়স্ক ভাতাপ্রাপ্ত মানুষ বা একটা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীর জন্য সংখ্যাটা কাগজে যত বড়ই হোক, বাজারে গিয়ে তার মূল্য কতটা টিকে থাকছে, সেটাই বিচার্য।

রাজস্ব কাঠামো, যেখানে আসল সমস্যা

বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত নেমে এসেছে প্রায় ৬.৮ থেকে ৭ শতাংশে, যা দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সর্বনিম্ন এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর গড়ের তুলনায় অনেক কম। সরকার এবারের বাজেটে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য ধরেছে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৪২ শতাংশ বেশি। সিপিডির বিশ্লেষকরা এটাকে স্পষ্টভাবেই অতি-উচ্চাভিলাষী বলছেন, কারণ চলতি বছরেও রাজস্ব আদায় লক্ষ্যমাত্রা থেকে অনেক পিছিয়ে আছে।

সমস্যাটা শুধু "রাজস্ব কম" না, সমস্যাটা হলো কার কাছ থেকে কর আদায় হচ্ছে এবং কাদের ছাড় দেওয়া হচ্ছে। গবেষণা বলছে, কর অবকাশ ও ছাড়ের মাধ্যমে সরকার যে পরিমাণ রাজস্ব হারায়, তা প্রায় মোট আদায়ের সমান। অর্থাৎ বড় পুঁজি, কর্পোরেট গোষ্ঠী এবং প্রভাবশালী খাতগুলো নিয়মিতভাবে কর ছাড়ের সুবিধা পেয়ে আসছে, আর রাজস্ব ঘাটতি পোষানোর চাপ গিয়ে পড়ছে সাধারণ ভোক্তার ওপর। এবারের বাজেটে খুচরা পণ্য সরবরাহের ওপর ০.২ শতাংশ অগ্রিম কর বা কৃষিপণ্যে ০.৫ শতাংশ করের মতো প্রস্তাব এই প্যাটার্নের ধারাবাহিকতা, এই করগুলো ধনী-গরিব নির্বিশেষে সবার ওপর সমান হারে বোঝা চাপায়। চাপটা আসা উচিত ছিল আয়করের প্রগতিশীল সম্প্রসারণ, সম্পদ ও সম্পত্তির ওপর কর, এবং বড় কর্পোরেট গোষ্ঠীর কর ছাড় কমানোর দিক থেকে, খুচরা ব্যবসা বা কৃষিপণ্যের ওপর নতুন কর চাপিয়ে নয়।

ঋণনির্ভর ব্যয়, মুদ্রাস্ফীতি এবং শ্রমজীবী মানুষের বাস্তবতা

ঘাটতি পোষাতে সরকার দেশীয় ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে ১ লাখ ১২ হাজার থেকে ১ লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা করেছে। এটা একদিকে প্রাইভেট সেক্টরের জন্য ঋণপ্রাপ্তি কঠিন করে তুলতে পারে, অন্যদিকে এই অর্থ যদি উৎপাদনশীল খাতে না গিয়ে শুধু রাজস্ব ঘাটতি পুরণে ব্যয় হয়, তাহলে মুদ্রাস্ফীতির ওপর আরও চাপ তৈরি করতে পারে। আর মুদ্রাস্ফীতির বোঝা সবচেয়ে বেশি বহন করেন তারাই, যাদের আয় নির্দিষ্ট বা অনিয়মিত, পোশাক শ্রমিক, দিনমজুর, ক্ষুদ্র কৃষক, প্রান্তিক চাকরিজীবী। ৯.৪২ শতাংশ মুদ্রাস্ফীতির মানে হলো এক বছর আগে যে ১০০ টাকার পণ্য কেনা যেত, এখন তার জন্য প্রায় ১০৯ টাকা ৪২ পয়সা লাগছে, কিন্তু গড় শ্রমিকের মজুরি এই হারে বাড়েনি।

"ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতি" বনাম মানুষের রাষ্ট্র

বাজেটের সামগ্রিক বয়ান গড়ে উঠেছে বিনিয়োগ-চালিত প্রবৃদ্ধি, পুঁজিবাজারে টি+০ সেটেলমেন্ট, ডিজিটাল আইপিও, লাইসেন্স প্রক্রিয়া সহজীকরণ, এবং "ব্যবসা-বান্ধব" সংস্কারের ওপর। এই সংস্কারগুলো নিজেরা ভুল না, দক্ষ আমলাতন্ত্র ও সহজ ব্যবসায়িক পরিবেশ দরকার আছে। কিন্তু যখন বাজেটের কেন্দ্রীয় ভাষ্য হয়ে যায় বিনিয়োগকারী ও কর্পোরেট খাতের আস্থা অর্জন, তখন সামাজিক সুরক্ষা ও মানবসম্পদ খাতের বরাদ্দ-বৃদ্ধি অনেকটা পার্শ্ব-প্রকল্প বা নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি পূরণের মতো দাঁড়িয়ে যায়, রাষ্ট্রের ভিত্তি হিসেবে নয়।

আসলে প্রশ্নটা উল্টোভাবে সাজানো উচিত। শিক্ষা ও স্বাস্থ্যকে নাগরিকের অধিকার হিসেবে ধরে তার জন্য একটা স্থিতিশীল ও প্রগতিশীল রাজস্ব ভিত্তি আগে তৈরি করতে হবে, তারপর সেই ভিত্তির ওপর বিনিয়োগ ও প্রবৃদ্ধির কাঠামো দাঁড়াবে। এই বাজেটে অগ্রাধিকারের ক্রমটাই উল্টো, প্রথমে বিনিয়োগকারীর আস্থা, তারপর যা বাকি থাকে তা থেকে কল্যাণমূলক খাতে বরাদ্দ।

কী হতে পারতো ভিন্ন

কয়েকটা দিক থেকে এই বাজেটকে অন্যভাবে সাজানো সম্ভব ছিল। রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য পূরণের চাপ খুচরা ব্যবসায়ী বা কৃষিপণ্যের ওপর না চাপিয়ে, কর ছাড়প্রাপ্ত বড় শিল্পগোষ্ঠী ও সম্পদশালী ব্যক্তিদের ওপর প্রগতিশীল করের মাধ্যমে আনা যেত। সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিগুলোকে মুদ্রাস্ফীতির সাথে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সমন্বয়যোগ্য করা যেত, যাতে নামমাত্র বরাদ্দ বৃদ্ধি প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতার ক্ষয় দিয়ে পুরোপুরি গ্রাস হয়ে না যায়। ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়ার বদলে এনবিআরের প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার ও কর-জাল সম্প্রসারণে অগ্রাধিকার দেওয়া যেত, যা দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্রের আর্থিক স্বাধীনতা বাড়ায়। আর ন্যূনতম মজুরি ও সরকারি বেতনস্কেলের সাথে মুদ্রাস্ফীতির একটা স্বয়ংক্রিয় সংযোগ রাখা যেত, যাতে শ্রমজীবী মানুষের আয় প্রতি বাজেটে আলাদা রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের জন্য অপেক্ষা না করে।

উপসংহার

এই বাজেটের আকার ও সামাজিক খাতে বরাদ্দ-বৃদ্ধির দিকনির্দেশনা সম্পূর্ণ উপেক্ষা করার মতো না, একে স্বীকার করাই উচিত। কিন্তু আসল প্রশ্নটা সংখ্যার আকার নিয়ে না, কাঠামো নিয়ে, কর ব্যবস্থা কতটা প্রগতিশীল, ঋণের বোঝা কার ওপর পড়ছে, মুদ্রাস্ফীতি কাদের আয় ক্ষয় করছে, এবং সামাজিক ব্যয় একটা স্থায়ী অধিকার নাকি প্রতি বছরের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল একটা সুবিধা। এই প্রশ্নগুলোর উত্তর ছাড়া, বাজেটের আকার নিয়ে মুগ্ধতা আসলে কাঠামোগত সমস্যাগুলো থেকে দৃষ্টি সরিয়ে দেয়।

#বাজেট২০২৬ #অর্থনীতি #বাংলাদেশ #মুদ্রাস্ফীতি #রাজস্বনীতি #আমিরখসরু #ঢাকা #নাগরিক
Shams-uddin byapari

About the Author

Shams-uddin byapari

আমি চিরদিন কাঁদতে থাকব

প্রোফাইল দেখুন

মতামত

এখনও কোনো মতামত নেই।

প্রথম মতামতটি আপনিই দিন।

আলোচনায় অংশ নিতে লগ ইন করুন অথবা এ্যাকাউন্ট খুলুন

Reading

Font size

Auto scroll
Slow Fast