সকল লেখা জানতে চাই
Searching…

ফান্দে পড়িয়া বগা কান্দে রে.......

নতুন সরকার ক্ষমতার মসনদে বসার চার মাসের মাথায় এক গভীর অর্থনৈতিক ফাঁদে আটকা পড়েছে। একদিকে আমলাদের ৯ম পে-স্কেলের বিশাল আবদার, অন্যদিকে রাজস্ব আয়ের চরম ঘাটতি সরকারকে উভয় সংকটে ফেলেছে। আইএমএফের ঋণের শর্ত ও ফ্যামিলি কার্ডের মতো প্রকল্পগুলো এখন সরকারের জন্য গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

mustafa kemal atarturk
পড়তে 6 মিনিট লাগতে পারে
এই লেখাটি 57 বার পড়েছে
ফান্দে পড়িয়া বগা কান্দে রে.......

আব্বাসউদ্দীন আহমদের কণ্ঠে ভাওয়াইয়ার সেই কালজয়ী সুরটা আজকাল ঘনঘন খুব মনে পড়ছে-

                                                   "ফান্দে পড়িয়া বগা কান্দে রে

                                                ফান্দ বসাইছে ফান্দি রে ভাই পুঁটি মাছো দিয়া..."

যখনই টিভির পর্দায় বা সোশ্যাল মিডিয়ায় নতুন সরকারের করুণ দশার খবর দেখি, ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক হিসেবে এই গানটাই কানে বাজে। আগের সরকারের পতনের পর  নতুন সরকারকে ঘিরে দেশের মানুষের স্বপ্নের শেষ ছিল না। একটা বড় স্বপ্ন নাকি  পূরণও হয়েছে: দেশবাসী একজন পুরুষ প্রধান মন্ত্রী পেয়েছে। কিন্তু ক্ষমতার মসনদে বসার পর মাত্র ৪-৫ মাসের মাথায় এই সরকার যে  'উভয় সংকটে' পড়েছে, তা নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ার তথাকথিত বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবীদের তেমন কোনো হেলদোল নেই। সরকারের বর্তমান অবস্থাটা ঠিক ওই ফাঁদে পড়া বগার মতোই-টানাটুনি করতে গিয়ে অবস্থা কেরোসিন!

শুরুতেই এলো নানা রকম কার্ড। ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, নানা রকম ভাতা কার্ড। উদ্দেশ্য ভালো, গরিব মানুষ যেন একটু স্বস্তি পায়। কিন্তু এত সব কার্ড চালু করতে গিয়ে সরকারের কোষাগার থেকে টাকা বেরিয়ে যেতে থাকলো হু হু করে, প্রায় এক লাখ চুয়াল্লিশ হাজার কোটি টাকা নতুন করে খরচের খাতায় ঢুকে গেলো। আইডিয়া মন্দ না, কিন্তু বাস্তবায়নের সময়টা একেবারেই ভুল বেছে নেওয়া হলো।

ক্ষমতায় বসার মাত্র বারো দিনের মাথায় শুরু হয়ে গেলো ইরান যুদ্ধ, যা কয়েক বছরের মধ্যে অন্যতম বড় সংকট হিসেবে বিবেচিত হবে। এই সময়ে চড়া দামে এলএনজি, তেল কিনতে হয়েছে সরকারকে। মাত্র চার পাঁচ মাসের মধ্যেই বাড়তি এক বিলিয়ন ডলার হাপিশ হয়ে গেছে। এদিকে ট্রাম্পের রেসিপ্রোকাল ট্যাক্স নীতির কারণে গোটা বিশ্বজুড়ে মন্দার আভাস, নতুন করে নানা জায়গায় যুদ্ধ। ডলার আয়ের পথ দিন দিন কঠিন হচ্ছে, খরচ বাড়ছে। সরকার নানা দাতা সংস্থার কাছে ঋণের জন্য দৌড়াদৌড়ি করছে, আইএমএফের কাছেও নতুন করে ঋণ চাইছে।

এরই মধ্যে আমলারা বুঝলেন: ‘ঝোপ বুঝে কোপ মারার’ এটাই উপযুক্ত সময়। বিগত ১২ বছর স্বৈরাচারী শেখ হাসিনার আমলে নতুন পে-স্কেল  দেওয়া হয়নি; যদিও আমলারা তখন বিভিন্ন প্রজেক্টের আড়ালে বিশাল কমিশন খেয়ে পকেট ভারী করার এবং চুরির প্রকাশ্য সুযোগ পেয়েছিলেন। কিন্তু এবার তারা চুরির পাশাপাশি বৈধ উপায়েও মোটা অঙ্কের বেতন বাড়াতে চান। যুক্তি দিলেন: সরকারি কর্মচারীরা নাকি না খেয়ে মরছেন! নতুন সরকারও আমলাদের মন জুগিয়ে চলতে গিয়ে ৯ম পে-স্কেলের ঘোষণা দিয়ে বসল। কিন্তু এই বাড়তি টাকা আসবে কোথা থেকে, তা নিয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ের কোনো পূর্বপরিকল্পনাই ছিল না। এই আবদার নতুন সরকার পুরোপুরি মানতেও পারছে না, আবার প্রত্যাখ্যানও করতে পারছে না, পাছে পাশার দান উল্টে যায়।

এবার একটু দেখা যাক পে স্কেল নিয়ে কী কী নাটক হয়েছে আর কী কী চলমান। প্রথমে বলা হলো তিন ধাপে দেওয়া হবে। প্রথম বছর ৫০%, পরের বছর ৫০% বেতন বাড়বে এবং শেষ বছর ভাতা। হঠাৎ শোনা গেল অন্য সুর:অনলাইন সিস্টেম IBASS++-এ নাকি এভাবে হিসাব করতে গেলে গাণিতিক জটিলতা হবে! তাই সিদ্ধান্ত হলো দুই ধাপে দেওয়া হবে: প্রথম বছর ১০০% বেতন, পরের বছর ভাতা। কিন্তু কয়েকদিন পর সেই ওজুহাতও ধোপে টিকল না। বারবার ডাটা এন্ট্রি নাকি করা যাবে না! শেষমেশ সিদ্ধান্ত হলো একবারে পুরো পে-স্কেলই দিয়ে দেওয়া হবে।

প্রথমবার যখন তিন ধাপের কথা বলা হয়েছিল, তখন বাজেটে অতিরিক্ত ৪৪,০০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছিল। কিন্তু একবারে পুরো পে-স্কেল কার্যকর করতে সরকারের লাগবে ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকা! এই অতিরিক্ত ৬২,০০০ কোটি টাকা কোথা থেকে আসবে? কারও কোনো আইডিয়া নেই। ফলশ্রুতিতে দফায় দফায় মিটিং করেও অর্থের সংস্থান করা যাচ্ছে না, আর গ্যাজেটও আলোর মুখ দেখছে না।

এই অবস্থায় সরকার ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার এক বিশাল বাজেট ঘোষণা করেছে ঠিকই, কিন্তু রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হওয়ার কোনো গ্যারান্টি নেই। এনবিআর (NBR) অবশ্য বরাবরের মতোই 'কনফিডেন্ট', যা আগামী ৬ মাস পর কর্পূরের মতো উড়ে যাবে। আয় না থাকায় সরকার ব্যাংক থেকে দেদারসে ঋণ নিচ্ছে, যার ফলে বেসরকারি খাতের ব্যবসায়ীরা ঋণ পাচ্ছেন না।

সবচেয়ে বড় নাটকটা জমেছে আইএমএফ (IMF)-কে নিয়ে। শেখ হাসিনার আমলের লোন বাদ দিয়ে নতুন সরকার  আইএমএফ-এর কাছে নতুন ঋণের তদ্বির করতে গিয়েছিিলো , সেই আইএমএফ এখন নতুন পে-স্কেলের কেচ্ছা শুনে পুরো থ বনে গেছে! তারা ভাবছে, লোন দেব দেশ চালাতে, আর এরা সেই টাকা দিয়ে সরকারি আমলাদের বেতন-ভাতা বাড়াবে? ফ্যামিলি কার্ডের খরচের বহর দেখেও আইএমএফ খুশি নয় । এদিকে আইএমএফ যদি লোন না দেয়, তবে সরকারের আন্তর্জাতিক ইমেজ যে পুরোপুরি ধূলিসাৎ হবে, তা বলাই বাহুল্য। এত সব ঘটনা ঘটছে সরকারের কোনো পরিকল্পনা না থাকার কারণে। আসলে ক্ষমতায় বসা ছাড়া অন্য কোনো পরিকল্পনাই তাদের ছিল না।

ফ্যামিলি কার্ড বা সরকারি কর্মচারীদের হাতে টাকা দিয়ে বাজারে কৃত্রিমভাবে টাকার সাপ্লাই বাড়ানো  রোগীকে 'কৃত্রিম অক্সিজেন' দিয়ে বাঁচিয়ে রাখার মতো। ট্যাক্স-টু-জিডিপি (Tax-to-GDP) অনুপাত না বাড়ালে কোনো কৃত্রিম অক্সিজেনে কাজ হবে না, উল্টো মূল্যস্ফীতি  সাধারণ মানুষের পিঠের চামড়া তুলে নেবে। সরকারের কাছে কর্মসংস্থান বা আয় বাড়ানোর কোনো বাস্তব পরিকল্পনা নেই। যতদিন ক্ষমতায় থাকবে ততদিন কেবল ঋণ করবে আর খরচ করবে, আয় বাড়বে না। কর্মসংস্থানের চেয়ে সরকারের কাছে বেশি প্রিয় সামরিক বাজেট বাড়ানো, নতুন স্কুল কলেজ তৈরি করা, ড্রোন কারখানা করা। মাথামোটা সমর্থক আর তরুণ জনগোষ্ঠী এসব দেখেই খুশি, তাদের কাজকর্মের প্রয়োজন নেই, উন্নত জীবনযাপনেরও দরকার নেই ।

আয় না বাড়িয়ে শুধু লোন করে আর এডিপি (ADP) বাজেট কাটছাঁট করে যদি পে-স্কেল ও ভাতার পেছনে বছরে আড়াই লাখ কোটি টাকা ওড়ানো হয়, তবে এই সরকারের ভিশন খুব দ্রুতই 'পটল তুলবে'। বগা কাঁদছে ঠিকই, ফাঁদটাও নিজেই পেতেছিল, আর মাছ খাওয়ার লোভটাও নিজেরই ছিল। এখন উড়ে যাওয়ার ডানা মেলবে নাকি ধল্লা নদীর পাড়েই বন্দী থাকবে, সেটাই দেখার বাকি ।

#নতুন_সরকার #৯ম_পে_স্কেল #অর্থনৈতিক_সংকট #আইএমএফ #বাংলাদেশ #অর্থনীতি #বাজেট #মূল্যস্ফীতি
mustafa kemal atarturk

About the Author

mustafa kemal atarturk

Financial analyst

মানুষ মরে গেলে পঁচে যায় আর বেঁচে থাকলে বদলায়

প্রোফাইল দেখুন

মতামত

এখনও কোনো মতামত নেই।

প্রথম মতামতটি আপনিই দিন।

আলোচনায় অংশ নিতে লগ ইন করুন অথবা এ্যাকাউন্ট খুলুন

Reading

Font size

Auto scroll
Slow Fast