সকল লেখা জানতে চাই
Searching…

ফ্যাসিবাদ-বিরোধী ঐক্য: কার সঙ্গে, কীসের ভিত্তিতে?

ফ্যাসিবাদ-বিরোধী লড়াইয়ে বুর্জোয়া শক্তির সঙ্গে রাজনৈতিক জোট গড়া শ্রমিকশ্রেণির স্বাধীন অস্তিত্বকে বিপন্ন করে তোলে। ইতিহাসের শিক্ষা হলো, শ্রমিকশ্রেণির নিজস্ব রাজনৈতিক কর্মসূচি ও নেতৃত্বকে কোনো জাতীয় বা গণতান্ত্রিক শক্তির অধীনস্থ করলে তা সংকটের মুহূর্তে শ্রমিকদের বিরুদ্ধেই ঘুরে দাঁড়ায়।

Sankalpa
Sankalpa মজদুরের নিয়মিত লেখক
পড়তে 12 মিনিট লাগতে পারে
এই লেখাটি 8 বার পড়েছে এ মাসে লেখকের লেখা 2 জন পাঠক পড়েছেন
ফ্যাসিবাদ-বিরোধী ঐক্য: কার সঙ্গে, কীসের ভিত্তিতে?

"এই ছুঁচিবাই ভারতবর্ষের বামপন্থী আন্দোলনকে বার বার ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। লড়াই যখন ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে, তখন কে ডান, কে বাম, কে অতি-বাম, কে কম-বাম, এই বাছাবাছি না করে সবাই মিলে লড়াইটা করতে হবে। ফ্যাসিবাদকে প্রতিহত করার পর বেছে নিতে হবে পরবর্তী কার্যক্রম। এটা ইতিহাসের শিক্ষা।"

এই যুক্তির আসল সমস্যা "ঐক্য" শব্দটিকে বিমূর্ত করে তোলায়। শ্রেণিসমাজে ঐক্যও শ্রেণিগত। শ্রমিকরা যখন মালিকের বিরুদ্ধে ধর্মঘটে নামে, তখন সংস্কারবাদী, বিপ্লবী, নৈরাজ্যবাদী, বিভিন্ন ধারার শ্রমিক একই পিকেট লাইনে দাঁড়াতে পারে, এটাই যুক্তফ্রন্টের ভিত্তি। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে শ্রমিকশ্রেণি তার রাজনৈতিক কর্মসূচি, সংগঠন বা স্বাধীন নেতৃত্ব মালিকশ্রেণির কোনও দলের হাতে তুলে দেবে। এই পার্থক্য মুছে ফেললেই যুক্তফ্রন্ট আর পপুলার ফ্রন্ট এক হয়ে যায়, আর ইতিহাসে এই দুইয়ের পার্থক্য বারবার রক্ত দিয়ে লেখা হয়েছে।

ইতিহাসের শিক্ষা

চীনে ১৯২০-এর দশকে শ্রমিক-কৃষকের বিপুল আন্দোলন গড়ে উঠেছিল, তখন কমিউনিস্ট পার্টি তুলনামূলকভাবে ছোট। কমিন্টার্নের নীতির অধীনে চীনা কমিউনিস্ট পার্টিকে চিয়াং কাই-শেকের কুওমিনতাঙের সঙ্গে এমন সহযোগিতায় বাঁধা হয় যেখানে তাদের স্বাধীন সংগঠন ও রাজনৈতিক উদ্যোগ মারাত্মকভাবে সীমাবদ্ধ হয়। ১৯২৭ সালে সাংহাইয়ে শ্রমিক অভ্যুত্থানের পর ক্ষমতা দখল করেই চিয়াং কাই-শেক সেই আন্দোলনের ওপর রক্তাক্ত আক্রমণ চালান, হাজার হাজার কমিউনিস্ট ও শ্রমিক-কর্মী নিহত বা গ্রেপ্তার হন। শিক্ষা এই নয় যে "সবাই মিলে লড়ো, পরে শত্রু ঠিক করব", বরং এই যে শ্রমিকশ্রেণির স্বাধীন শক্তিকে কোনও 'জাতীয়', 'গণতান্ত্রিক' বা 'প্রগতিশীল' বুর্জোয়া শক্তির অধীনস্থ করলে সেই শক্তিই সংকটের মুহূর্তে শ্রমিকদের বিরুদ্ধে ঘুরে দাঁড়ায়।

ফ্রান্সে ১৯৩৬ সালের নির্বাচনের পর সমাজতন্ত্রী, কমিউনিস্ট ও বুর্জোয়া র‍্যাডিক্যাল পার্টির জোটে পপুলার ফ্রন্ট ক্ষমতায় আসে, একই সময়ে দেশে অভূতপূর্ব ধর্মঘট ও কারখানা দখলের ঢেউ ওঠে যা বাস্তবে রাষ্ট্র ও পুঁজিকে চ্যালেঞ্জ করছিল। পপুলার ফ্রন্টের রাজনৈতিক কাঠামো, এবং কমিউনিস্ট পার্টিও, "জনগণের ঐক্য" ও "শৃঙ্খলা"-র নামে সেই আন্দোলনকে বুর্জোয়া সংসদীয় রাষ্ট্রের সীমার মধ্যে ধরে রাখতে চেয়েছিল, শ্রমিকদের সংগ্রামকে এগিয়ে নিয়ে চলার বদলে বুর্জোয়া জোট রক্ষার স্বার্থে তা থামানো হয়েছিল।

স্পেনে ফ্রাঙ্কোর সামরিক বিদ্রোহের বিরুদ্ধে শ্রমিকরা অস্ত্র তুলে নিয়ে বহু এলাকায় কারখানা, পরিবহন ও কৃষি ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে, অথচ রিপাবলিকান বুর্জোয়া দল, সমাজতন্ত্রী ও কমিউনিস্ট পার্টি পপুলার ফ্রন্টের কাঠামোর মধ্যে এই বিপ্লবী প্রক্রিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করতে থাকে। ১৯৩৭ সালের বার্সেলোনা মে-দিনের সংঘর্ষে POUM-এর বিপ্লবী কর্মীদের ওপর দমন নামে, ফ্রাঙ্কোর বিরুদ্ধে যুদ্ধ আর শ্রমিকশ্রেণির বিপ্লবী সংগ্রামকে পরস্পরবিরোধী করে তোলা হয়। নৈরাজ্যবাদীরাও ক্যাটালনিয়ায় বুর্জোয়া জোট সরকারে ঢুকে পড়েছিল, শেষ পর্যন্ত ফ্রাঙ্কো জয়ী হয়। শিক্ষা তাই "বিপ্লব আগে না ফ্যাসিবাদ-বিরোধিতা আগে" এই সরল প্রশ্নে নেই, বরং এই বাস্তবতায় যে ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ জিততে যে শ্রমিকশক্তি দরকার, তাকেই বুর্জোয়া রাষ্ট্রের স্বার্থে নিরস্ত্র বা বিভক্ত করা হলে ফ্যাসিবাদ পরাজিত করার সম্ভাবনাই দুর্বল হয়।

ভিয়েতনামে ঔপনিবেশিকতার বিরুদ্ধে জাতীয় মুক্তির সংগ্রামে বিস্তৃত ঐক্যের প্রয়োজন ছিল, কিন্তু জাতীয় ঐক্য শ্রেণি-বিরোধকে বাতিল করে না। ১৯৪৫-এর পর দক্ষিণ ভিয়েতনামে ত্রৎস্কিপন্থী ও অন্যান্য স্বাধীন বামপন্থী শক্তির ওপর দমন দেখায় জাতীয়তাবাদী নেতৃত্বের সঙ্গে সাময়িক সংগ্রামী ঐক্য, আর তার রাজনৈতিক কর্মসূচির অধীনস্থ হয়ে যাওয়া, এক জিনিস নয়।

ভারতে ১৯৪১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নে নাৎসি আক্রমণের পর CPI দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকে "People's War" হিসেবে চিহ্নিত করে ব্রিটিশ যুদ্ধপ্রচেষ্টার প্রতি সহযোগিতামূলক অবস্থান নেয়, এমনকি ভারত ছাড়ো আন্দোলনের ওপর ঔপনিবেশিক দমনপীড়নে সাহায্য করে। যদি যুক্তি হয় "ফ্যাসিবাদকে হারাতে হলে তখনকার প্রধান গণতান্ত্রিক শক্তির সঙ্গে থাকতে হবে", তাহলে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ নিজেই সেই সময় মিত্রশক্তির প্রধান অংশ ছিল, কিন্তু ভারতীয় শ্রমিক-কৃষকের কাছে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ হঠাৎ মিত্রশক্তি হয়ে যায়নি। উলটে যদি সেদিন ভারতে শ্রমিকশ্রেণি ক্ষমতা দখল করত, বিশ্বব্যাপী ফ্যাসিবাদ-বিরোধী সংগ্রাম এক ধাপ এগিয়ে যেত।

চিলিতে সালভাদর আলেন্দের নেতৃত্বে সমাজতন্ত্রী, কমিউনিস্ট ও অন্যান্য বাম শক্তি নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসে এবং শ্রমিকদের মধ্যে ব্যাপক সংগ্রামী উদ্যোগও ছিল, কিন্তু রাষ্ট্রযন্ত্রের মৌলিক কাঠামো অক্ষুণ্ণ থাকে, সামরিক বাহিনীকে নিরপেক্ষ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবেই গণ্য করা হয়, আর cordones industriales-এর মতো শ্রমিকদের স্বতন্ত্র উদ্যোগ রাষ্ট্রের সঙ্গে সংঘাতে পড়ে। ১৯৭৩ সালের ১১ সেপ্টেম্বর সামরিক অভ্যুত্থান আলেন্দে সরকারকে উৎখাত করে দীর্ঘ সামরিক স্বৈরশাসন ও দমন-পীড়ন নামিয়ে আনে। প্রশ্নটি ঐক্য করা উচিত ছিল কি না নয়, বরং প্রতিক্রিয়ার বিরুদ্ধে সংগ্রামের নামে শ্রমিকশ্রেণির নিজস্ব শক্তিকে রাষ্ট্র ও বুর্জোয়া প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরশীল করে তোলা হয়েছিল কি না।

জার্মানি ১৯৩২-৩৩ এবং সংকীর্ণতার বিপদ

ঐতিহাসিক এই সতর্কতার পাশাপাশি স্তালিনবাদী সংকীর্ণতার বিপদও স্বীকার করতে হয়। ১৯২৮ থেকে কমিন্টার্নের "তৃতীয় পর্ব" নীতি সমাজ-গণতন্ত্রীদের "সোশ্যাল ফ্যাসিস্ট" চিহ্নিত করে, ফলে SPD-এর বিরুদ্ধে KPD-এর আক্রমণ ফ্যাসিবাদী বিপদের বিরুদ্ধে বাস্তব শ্রমিক ঐক্যের প্রশ্নকে পিছনে ঠেলে দেয়। অন্যদিকে SPD নেতৃত্ব বিপ্লবী শ্রমিকদের সঙ্গে কার্যকর ঐক্যের বদলে বিদ্যমান রাষ্ট্র ও সাংবিধানিক ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করে। এভাবে শ্রমিকশ্রেণির দুই বৃহৎ অংশ, যাদের সম্মিলিত শক্তি নাৎসিবাদকে প্রতিহত করতে পারত, বাস্তবে বিভক্ত রইল, আর হিটলার ক্ষমতায় আসার পর দ্রুতই কমিউনিস্ট, সমাজতন্ত্রী, ট্রেড ইউনিয়ন ও গণতান্ত্রিক সংগঠনগুলির ওপর আক্রমণ নেমে আসে। অতএব "সংস্কারবাদীরা বিশ্বাসঘাতক, তাই তাদের সঙ্গে কোনও ঐক্য নয়" যেমন বিপজ্জনক সংকীর্ণতা, তেমনই "ফ্যাসিবাদকে হারাতে সংস্কারবাদীদের সঙ্গে রাজনৈতিকভাবে মিশে যেতে হবে" একটি সমান বিপজ্জনক আত্মসমর্পণ।

ভারত আজ: কংগ্রেস, তৃণমূল, INDI

স্বাধীনতার পর ভারতীয় সংসদীয় বাম বহুবার কংগ্রেসকে "ধর্মনিরপেক্ষ" বা তুলনামূলক কম প্রতিক্রিয়াশীল শক্তি গণ্য করে তার সঙ্গে নির্বাচনী সমঝোতা করেছে। ১৯৮৯ সালে জনতা দলের নেতৃত্বে জাতীয় ফ্রন্ট সরকার গঠিত হলে কংগ্রেস-বিরোধী সমীকরণের অংশ হিসেবে বাম দলগুলি তাকে বাইরে থেকে সমর্থন করে, একই কারণে বিজেপিও নিজস্ব স্বার্থে সমর্থন দেয়, যা দেখায় কেবল একটি বুর্জোয়া দলকে পরাজিত করার লক্ষ্যে গড়ে ওঠা জোটকে শ্রমিকশ্রেণির নিজস্ব রাজনৈতিক বিকল্প হিসেবে গ্রহণ করা যায় না। পশ্চিমবঙ্গেও সিঙ্গুর, নন্দীগ্রাম ও লালগড়ের পর্বে মাওবাদী নেতৃত্বের একাংশ তৃণমূল বা ঝাড়খণ্ড মুক্তি মোর্চার সঙ্গে "আন্দোলনভিত্তিক ঐক্য", এবং পরে বামফ্রন্টকে হারাতে তৃণমূলকে সমর্থনের দিকে এগোয়। একটি বুর্জোয়া দলকে ক্ষমতায় থাকা দলকে হারানোর জন্য শক্তিশালী করা শ্রমিকশ্রেণির স্বাধীন রাজনীতি গড়ে তোলে না।

"No Vote to BJP"-র প্রশ্নেও একই সমস্যা। বিজেপিকে পরাজিত করার প্রয়োজনীয়তা বাস্তব, কিন্তু তার অর্থ যদি "তাই তৃণমূলকে সমর্থন করো" হয়ে দাঁড়ায়, তাহলে শ্রমিক-কৃষকের সামনে স্বাধীন রাজনৈতিক বিকল্প থাকে না। তৃণমূল সরকারের দুর্নীতি, নিয়োগ-কেলেঙ্কারি, প্রশাসনিক দমন বা আরজি করের ঘটনায় যে গণক্ষোভ তৈরি হয়, তাকে বামপন্থী বিকল্পের দিকে সংগঠিত করার বদলে "বিজেপিকে ঠেকাতে তৃণমূলকে বেছে নাও" বলা হলে মানুষকে শেষ পর্যন্ত দুই বুর্জোয়া দলের মধ্যেই বেছে নিতে হয়, এটি বিজেপিকে হারানোর স্থায়ী কৌশল নয়, বিকল্পের সংকোচন। আজকের INDI-ধরনের জোট রাজনীতিতেও একই প্রশ্ন প্রযোজ্য: কংগ্রেস, তৃণমূল, বিভিন্ন আঞ্চলিক বুর্জোয়া দল ও বাম দল এক মঞ্চে দাঁড়ালেই তাদের শ্রেণিচরিত্র বদলায় না। কর্ণাটকে কংগ্রেস সরকার শ্রমিক-শিক্ষার্থী আন্দোলনে দমন চালালে, তামিলনাড়ুতে DMK সরকার শ্রমিক সংগঠনের আন্দোলনে পুলিশি হস্তক্ষেপ করলে, বুর্জোয়া দলগুলির শ্রেণিচরিত্র তাদের বিজেপি-বিরোধী নির্বাচনী অবস্থান দিয়ে বিলীন হয় না।

যুক্তফ্রন্ট বনাম পপুলার ফ্রন্ট

তবে "ওরা সংশোধনবাদী, তাই ওদের সঙ্গে কোনও আন্দোলনে যাব না" এটিও বিপ্লবী রাজনীতি নয়। কোনও শ্রমিক সংগঠন, ট্রেড ইউনিয়ন বা গণসংগঠনের বৃহৎ অংশ সংশোধনবাদী নেতৃত্বের প্রভাবাধীন থাকলে বিপ্লবীরা সেই শ্রমিকদের থেকে নিজেদের বিচ্ছিন্ন করতে পারেন না। নতুন শ্রম কোডের বিরুদ্ধে ধর্মঘটে কেরলের বাম সরকার বা CPI(M)-এর রাজনৈতিক সীমাবদ্ধতা নিয়ে তীব্র সমালোচনা থাকতে পারে, কিন্তু সেই কারণে শ্রমিকদের সঙ্গে ধর্মঘটে না যাওয়া হাস্যকর, কারণ ঐক্যটা কেরল সরকারের সঙ্গে নয়, শ্রমিকদের সঙ্গে। CPI(M)-এর ইউনিয়নে সংগঠিত শ্রমিকদের কাছে গিয়ে বলতে হয়: তোমাদের সঙ্গে আমরা এই আইনের বিরুদ্ধে লড়ব, কিন্তু তোমাদের নেতৃত্বের ওপর আমাদের কোনও রাজনৈতিক আস্থা নেই, তারা শেষ পর্যন্ত আপস করবে, আর সেই আপসের বিরুদ্ধে সংগ্রামকেই আরও এগিয়ে নিতে হবে। এতে স্ববিরোধ নেই, বরং এখানেই বিপ্লবী কৌশল: কমিউনিস্টরা কোনও বড় ধর্মঘটে যোগ দিলে তার অর্থ সংশোধনবাদী নেতৃত্বের কর্মসূচি মেনে নেওয়া নয়, তারা আন্দোলনের মধ্যে ঢুকে নেতৃত্বের সঙ্গে রাজনৈতিক সংগ্রাম চালায় এবং শ্রমিকদের কাছে নিজেদের কর্মসূচি তুলে ধরে। ১৯২২ সালের কমিন্টার্নের যুক্তফ্রন্ট থিসিসও একই যুক্তি দেয়: কমিউনিস্টদের সংস্কারবাদী নেতৃত্বকে শ্রমিকদের সংগ্রামে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানাতে হবে, তারা অস্বীকার করলে সেই অস্বীকৃতিকে প্রকাশ্যে উন্মোচিত করতে হবে, কিন্তু কোনও অবস্থাতেই কমিউনিস্ট পার্টির রাজনৈতিক স্বাধীনতা বিসর্জন দেওয়া যাবে না। সূত্রটি তাই: সংগ্রামে ঐক্য, কর্মসূচিতে স্বাধীনতা, সুবিধাবাদী শ্রমিক নেতৃত্বের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক সংগ্রাম।

লেনিন "বামপন্থী" কমিউনিজম: একটি শিশুসুলভ ব্যাধি-তে একই শিক্ষা দেন, কমিউনিস্টদের এমন সংগঠনেও কাজ করতে হবে যেখানে বাস্তব শ্রমিকসমষ্টি উপস্থিত, এমনকি সেই সংগঠনের নেতৃত্ব প্রতিক্রিয়াশীল হলেও, কারণ বিপ্লবীরা কেবল "বিশুদ্ধ" সংগঠনে নিজেদের সীমাবদ্ধ রাখলে শ্রমিকশ্রেণির বাস্তব জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। এই নীতির অর্থ কখনও সংস্কারবাদী নেতৃত্বের কাছে আত্মসমর্পণ নয়, বরং জনগণের মধ্যে ঢুকে তাদের বাস্তব সংগ্রামে অংশ নিয়ে সেই সংগ্রামের মধ্যেই তাদের বর্তমান নেতৃত্বের সীমাবদ্ধতা দেখানো। কিন্তু এই নীতি ছাত্র পরিষদের মতো ক্ষেত্রেও একইভাবে প্রযোজ্য নয়। শ্রমিকশ্রেণির প্রতিনিধিত্বকারী অথচ সুবিধাবাদী, লেনিনের ভাষায় "মজদুর আন্দোলনের মধ্যেকার বুর্জোয়া দালাল" CPI(M)-এর সঙ্গে শ্রম কোডের বিরুদ্ধে ধর্মঘটে যাওয়া এক জিনিস, একটি দক্ষিণপন্থী বা হিন্দুত্ববাদী শিক্ষার্থী সংগঠনের সঙ্গে রাজনৈতিক ব্যানারে যৌথ মিছিল করা সম্পূর্ণ অন্য জিনিস, কারণ প্রথম ক্ষেত্রে শ্রেণিশত্রুর বিরুদ্ধে শ্রমিকদের বাস্তব সংগ্রামে অংশ নেওয়া হয় এবং একই সঙ্গে সংশোধনবাদী নেতৃত্বের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক সংগ্রাম চলে, দ্বিতীয় ক্ষেত্রে এমন একটি রাজনৈতিক শক্তির সঙ্গে মঞ্চ ভাগ করা হয় যার নিজস্ব সংগঠন, মতাদর্শ ও শ্রেণি-রাজনীতিই শ্রমিকশ্রেণির স্বাধীন আন্দোলনের বিরোধী। "CPI(M)-এর সঙ্গে যুক্তফ্রন্ট হলে ছাত্র পরিষদের সঙ্গেও হাঁটতেই হবে" এই যুক্তি তাই যুক্তফ্রন্টের ধারণাকে এমনভাবে প্রসারিত করে যে তার আর কোনও শ্রেণিগত অর্থ থাকে না।

এই পার্থক্য না করলে গোটা বিতর্কটাই অর্থহীন হয়ে পড়ে। যুক্তফ্রন্ট হল বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠন বা রাজনৈতিক ধারার মধ্যে নির্দিষ্ট, সীমিত, বাস্তব সংগ্রামের জন্য ঐক্য, যেখানে প্রত্যেক পক্ষ নিজস্ব রাজনৈতিক স্বাধীনতা বজায় রাখে। পপুলার ফ্রন্ট হল শ্রমিক সংগঠন ও বুর্জোয়া রাজনৈতিক শক্তির মধ্যে রাজনৈতিক জোট, যেখানে সাধারণত শ্রমিকশ্রেণির কর্মসূচিকে বুর্জোয়া রাজনীতির সীমার মধ্যে আবদ্ধ করা হয়, ফরাসি ও স্প্যানিশ অভিজ্ঞতা থেকে এই পার্থক্য স্পষ্ট। "বিপ্লবীরা যুক্তফ্রন্ট করে" থেকে "বিপ্লবীদের কংগ্রেস, তৃণমূল বা যে কোনও বুর্জোয়া দলের সঙ্গে রাজনৈতিক জোট করতে হবে" এই সিদ্ধান্ত টানা যায় না, যুক্তফ্রন্টের মূল শর্তই শ্রেণি স্বাধীনতা।

ফ্যাসিবাদ কেন আলাদা

ফ্যাসিবাদ সাধারণ দক্ষিণপন্থী রাজনীতি নয়, পুঁজিবাদী সংকটের বিশেষ রাজনৈতিক ফল, যা তখন জন্ম নেয় যখন পুঁজিবাদী শাসনব্যবস্থা গভীর শ্রেণিসংঘাতের মুখে পড়ে এবং সাধারণ সংসদীয় পদ্ধতি ও পুলিশি দমন দিয়ে শ্রমিকশ্রেণির প্রতিরোধকে আর নিরাপদে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। তখন বুর্জোয়া শ্রেণি ধ্বংসপ্রাপ্ত বা আতঙ্কগ্রস্ত মধ্যবিত্ত, লুম্পেন ও অন্যান্য স্তরকে সংগঠিত করে প্রতিক্রিয়াশীল গণআন্দোলন গড়ে তোলে, যার লক্ষ্য শ্রমিকশ্রেণির সংগঠন ধ্বংস করা, গণতান্ত্রিক অধিকার গুঁড়িয়ে দেওয়া এবং পুঁজির শাসনকে আরও হিংস্র রূপে পুনর্গঠন করা। সাম্রাজ্যবাদের যুগে বুর্জোয়া শ্রেণির কোনও ধারাবাহিক প্রগতিশীল ঐতিহাসিক মিশন নেই, আজ যে বুর্জোয়া দল নিজেকে ধর্মনিরপেক্ষ বলে, সংকট ঘনীভূত হলে আগামীকাল সে-ই শ্রমিকদের দমন করবে, যে দল আজ বিজেপির বিরুদ্ধে কথা বলে সে-ও মুনাফা, সম্পত্তি ও রাষ্ট্রের স্বার্থে শ্রমিক আন্দোলনের বিরুদ্ধে পুলিশ নামাবে। তাই বিজেপি-বিরোধিতা কোনও বুর্জোয়া দলকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে শ্রমিকশ্রেণির মিত্র বানায় না।

ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে ঐক্য তবু হবে, তবে শ্রমিকশ্রেণি যদি সেই লড়াইয়ে নিজের সংগঠন, ধর্মঘটের অধিকার, সংবাদপত্র, সভা, শিক্ষার্থী-যুব আন্দোলন ও গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষা করার দাবি তোলে, তাহলে যে পুঁজিবাদ ফ্যাসিবাদের জন্ম দেয় তার বিরুদ্ধে কী করা হবে, এই প্রশ্ন অবধারিতভাবেই উঠবে। এই কারণেই ফ্যাসিবাদ-বিরোধী সংগ্রাম ও সমাজতান্ত্রিক সংগ্রামকে পরস্পরের বিপরীতে দাঁড় করানো যায় না। ফ্যাসিবাদকে হারাতে শ্রমিকশ্রেণির ঐক্য দরকার, আর সেই ঐক্যকে বাস্তব রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত করতে দরকার তার স্বাধীন বিপ্লবী নেতৃত্ব।





#ফ্যাসিবাদ_বিরোধী_ঐক্য #শ্রমিকশ্রেণি #শ্রেণি_সংগ্রাম #বামপন্থী_রাজনীতি #ভারত #রাজনৈতিক_বিশ্লেষণ #ইতিহাসের_শিক্ষা #বিপ্লবী_কৌশল
Sankalpa

About the Author

Sankalpa

মজদুরের নিয়মিত লেখক

শিক্ষার্থী

বই পড়ি, প্রশ্ন করি, তর্ক করি। সাহিত্য, ইতিহাস আর রাজনীতি নিয়ে ভাবতে ভালোবাসি। বিশেষ করে সমাজকে তার অন্তর্নিহিত দ্বন্দ্ব, পরিবর্তন ও সম্ভাবনার মধ্য দিয়ে বোঝার চেষ্টা করি। জটিল বিষয়কে সহজ করে বোঝার চেয়ে, তাকে গভীরভাবে বোঝার চেষ্টাটাকেই বেশি মূল্য দিই।

প্রোফাইল দেখুন

মতামত

এখনও কোনো মতামত নেই।

প্রথম মতামতটি আপনিই দিন।

আলোচনায় অংশ নিতে লগ ইন করুন অথবা এ্যাকাউন্ট খুলুন

Reading

Font size

Auto scroll
Slow Fast