সকল লেখা জানতে চাই
Searching…

ত্রৎস্কিপন্থা: আরামকেদারার বিপ্লববাদ?

ত্রৎস্কিপন্থা বা বলশেভিক-লেনিনবাদকে কেবল স্তালিনবাদ-বিরোধী তাত্ত্বিক চর্চা হিসেবে দেখা একটি ঐতিহাসিক ভুল। বিশ্বজুড়ে শ্রমিক শ্রেণির বাস্তব সংগ্রামে এই ধারাটি বারবার অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে, যা প্রায়শই মূলধারার রাজনৈতিক প্রচারণায় উপেক্ষিত থাকে।

Sankalpa
Sankalpa মজদুরের নিয়মিত লেখক
পড়তে 14 মিনিট লাগতে পারে
এই লেখাটি 167 বার পড়েছে এ মাসে লেখকের লেখা 2 জন পাঠক পড়েছেন
ত্রৎস্কিপন্থা: আরামকেদারার বিপ্লববাদ?

মূলধারার বামপন্থী ছাত্র রাজনীতির কর্মীদের সঙ্গে বিতর্কে আমরা প্রায়ই একটি পরিচিত অভিযোগের মুখোমুখি হই। বলশেভিক-লেনিনবাদকে তারা এমন এক ঐতিহাসিক রাজনৈতিক ধারা হিসেবে উপস্থাপন করে, যা নাকি সারাজীবন স্তালিনবাদ ও মাওবাদের সমালোচনা করেই সীমাবদ্ধ থেকেছে; বাস্তব শ্রেণিসংগ্রামে যার কোনও উল্লেখযোগ্য ভূমিকা নেই, বিশ্বের কোথাও যা কোনও অর্থবহ সংগঠন, আন্দোলন বা বিপ্লবী ঐতিহ্য গড়ে তুলতে পারেনি। এই প্রচার এতটাই পুনরাবৃত্ত যে অনেকের কাছেই তা ঐতিহাসিক সত্য বলে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। কিন্তু বাস্তব ইতিহাস সম্পূর্ণ ভিন্ন কথা বলে। বলশেভিক-লেনিনবাদকে বিচার করতে হলে প্রচলিত রাজনৈতিক প্রচারণার ভিত্তিতে নয়, বরং তার প্রকৃত ঐতিহাসিক উত্তরাধিকার, তাত্ত্বিক অবদান এবং আন্তর্জাতিক শ্রমিক আন্দোলনে তার বাস্তব ভূমিকারের ভিত্তিতেই বিচার করতে হবে।

এমন মন্তব্য এমন একটি রাজনৈতিক ধারার কাছ থেকে আসা সত্যিই কৌতূহলোদ্দীপক, যে ধারা কয়েক দশক ধরে পৃথিবীর প্রায় এক-তৃতীয়াংশ জুড়ে রাষ্ট্রক্ষমতা ধরে রেখেও শেষ পর্যন্ত যেসব দেশে তারা শাসন করেছে, তাদের প্রায় সবকটিতেই পুঁজিবাদের পুনঃপ্রতিষ্ঠির তত্ত্বাবধান করছে। যদি আমরা রাজনৈতিক ধারাগুলিকে তাদের ঐতিহাসিক পরিণতির ভিত্তিতে বিচার করি, তবে সেই অভিজ্ঞতাও তাঁদের অবজ্ঞার পাত্র তুলনামূলকভাবে ছোট বিপ্লবী ধারাগুলির মতোই কঠোর সমালোচনার দাবি রাখে। আবার, যে রাজনৈতিক ধারার এত বিপুল সংখ্যক কর্মী ও নেতা স্তালিনবাদী পার্টিগুলির হাতেই কারাবন্দি, নির্বাসিত, হত্যার শিকার কিংবা পদ্ধতিগতভাবে দমন-পীড়নের মুখোমুখি হয়েছেন, তাদের বিরুদ্ধে "কোনও গুরুতর কাজ করেনি"—এই অভিযোগও বেশ অদ্ভুত শোনায়। সমস্ত প্রতিকূলতা সত্ত্বেও এই ধারাই মার্কসবাদী তত্ত্বের এক বিশাল ভাণ্ডার সৃষ্টি করেছে—The Revolution Betrayed, The Transitional Program থেকে শুরু করে ফ্যাসিবাদ, নিরন্তর বিপ্লব, আমলাতান্ত্রিক অধঃপতন এবং পুঁজিবাদের পুনঃপ্রতিষ্ঠি সম্পর্কিত সেইসব বিশ্লেষণ, যা আজও সমাজতান্ত্রিক বিতর্ককে গভীরভাবে প্রভাবিত করে চলেছে। আর তাদের অবদান কেবল তাত্ত্বিক ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ ছিল না।

দক্ষিণ ভিয়েতনামে বলশেভিক-লেনিনবাদীরা ছিলেন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিপ্লবী কমিউনিস্ট শক্তিগুলির অন্যতম। তারা গণভিত্তিক শ্রমিক সংগঠন গড়ে তুলেছিলেন, La Lutte-এর মতো প্রভাবশালী সংবাদপত্র প্রকাশ করেছিলেন, শ্রমিক, কৃষক এবং শহুরে দরিদ্র জনগণের একাংশের মধ্যে ব্যাপক সমর্থন অর্জন করেছিলেন এবং ফরাসি ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে সংগ্রামের অগ্রভাগে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, যতক্ষণ না স্তালিনবাদীরা তাদের প্রায় সম্পূর্ণরূপে শারীরিকভাবে নির্মূল করে। ১৯৩৯ সালের কোচিনচিনা নির্বাচনে তা থু থাউ-এর সঙ্গে যুক্ত বলশেভিক-লেনিনবাদী ধারা সাইগনে বিপুল জনসমর্থন লাভ করে। তারা শুধু সংবিধানপন্থীদেরই নয়, স্তালিনবাদ-সমর্থিত পপুলার ফ্রন্টের প্রার্থীদেরও পরাজিত করে। এই ফলাফল স্পষ্ট করে দেয় যে, পরবর্তী দমন-পীড়নের আগেই বিপ্লবী মার্কসবাদ দক্ষিণ ভিয়েতনামের শ্রমিক ও নিপীড়িত জনগণের মধ্যে প্রকৃত গণভিত্তি গড়ে তুলেছিল।

স্পেনের গৃহযুদ্ধের সূচনালগ্ন থেকেই বলশেভিক-লেনিনবাদী ধারার কর্মীরা বিভিন্ন শ্রমিক মিলিশিয়ায় অংশ নেন। ১৯৩৭ সালের বার্সেলোনার মে দিবসের লড়াই সেই বিপ্লবের এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে পরিণত হয়, যখন স্তালিনবাদী আমলাতন্ত্র প্রজাতান্ত্রিক রাষ্ট্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার নামে POUM-সহ স্বাধীন শ্রমিক সংগঠন এবং অ্যানার্কিস্ট কর্মীবাহিনীর বিরুদ্ধে আক্রমণ চালায়। সোভিয়েত NKVD-এর হাতে আন্দ্রেস নিনের অপহরণ ও হত্যাকাণ্ড সেই স্তালিনবাদী প্রতিবিপ্লবী সন্ত্রাসের সবচেয়ে স্পষ্ট প্রতীকগুলির একটি। ব্রিটেন ও ফ্রান্সে বলশেভিক-লেনিনবাদীরা প্রভাবশালী মার্কসবাদী সংগঠন গড়ে তুলেছিলেন, গুরুত্বপূর্ণ শিল্পসংগ্রামে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন এবং যুদ্ধবিরোধী আন্দোলন, ছাত্র আন্দোলন ও শ্রমিক আন্দোলনে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেছিলেন।

ফ্রান্সে PCI এবং পরে LCR-এর মতো বলশেভিক-লেনিনবাদী সংগঠনগুলি ১৯৬৮ সালের মে-জুনের ঐতিহাসিক গণধর্মঘটে দৃশ্যমান ভূমিকা পালন করে। সেই আন্দোলনে প্রায় এক কোটি শ্রমিক অংশগ্রহণ করেছিলেন, যা এখনও পর্যন্ত ইউরোপের ইতিহাসে বৃহত্তম সাধারণ ধর্মঘট হিসেবে বিবেচিত হয়। ফ্রান্সে নাৎসি দখলদারিত্বের সময় বলশেভিক-লেনিনবাদী কর্মী মার্টিন মোনাথ (ছদ্মনাম ভিক্তর) এক অসাধারণ আন্তর্জাতিকতাবাদী উদ্যোগের নেতৃত্ব দেন। ফরাসি বলশেভিক-লেনিনবাদীরা জার্মান সেনাবাহিনীর সাধারণ সৈন্যদের উদ্দেশ্যে জার্মান ভাষায় Arbeiter und Soldat ("শ্রমিক ও সৈনিক") নামে একটি গোপন পত্রিকা প্রকাশ করতেন। এর লক্ষ্য ছিল জার্মান সৈন্যদের জাতীয়তাবাদী ও নাৎসি প্রচার থেকে বিচ্ছিন্ন করে তাদের বোঝানো যে তাদের প্রকৃত শত্রু ফরাসি শ্রমিক নয়, বরং নাৎসি শাসকশ্রেণি এবং ইউরোপীয় পুঁজিবাদ। মোনাথ ও তাঁর সহযোদ্ধারা শুধু প্রচারপত্র বিলিই করেননি; তাঁরা জার্মান সৈন্যদের সঙ্গে গোপন যোগাযোগ স্থাপন করেছিলেন, সৈনিকদের ক্ষুদ্র আলোচনাচক্র গড়ে তুলেছিলেন এবং ফ্যাসিবাদী যুদ্ধযন্ত্রের ভেতর থেকেই আন্তর্জাতিক শ্রমিক সংহতির বীজ বপনের চেষ্টা করেছিলেন। ১৯৪৪ সালে গেস্টাপোর হাতে গ্রেফতার হওয়ার পর নির্যাতনে নিহত হওয়ার আগে পর্যন্ত মোনাথ এই বিপজ্জনক কাজ চালিয়ে যান।

ব্রিটেনে বলশেভিক-লেনিনবাদীরা লিভারপুল ডক শ্রমিকদের সংগ্রাম, Poll Tax-বিরোধী গণআন্দোলন এবং ট্রেড ইউনিয়নের ভেতরে একাধিক জঙ্গি র‍্যাঙ্ক-অ্যান্ড-ফাইল আন্দোলনে কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করেছিলেন। যুক্তরাষ্ট্রে ১৯৩৪ সালের ঐতিহাসিক মিনিয়াপোলিস টিমস্টার্স ধর্মঘটের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন বলশেভিক-লেনিনবাদীরা। ফারেল ডবস, কার্ল স্কগলুন্ড এবং Communist League of America-এর সদস্যরা সেই সংগ্রামের মাধ্যমে মধ্য-পশ্চিমাঞ্চলের শিল্প শ্রমিক আন্দোলনের চরিত্র বদলে দেন। একই সঙ্গে তাঁরা মার্কিন শ্রমিক আন্দোলনের সবচেয়ে জঙ্গি ধারাগুলির একটি গড়ে তোলেন এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধের বিরোধিতা ও বিপ্লবী সমাজতন্ত্রের পক্ষে অবস্থান নেওয়ার কারণে Smith Act-এর অধীনে কারারুদ্ধও হন।

ভারতে, যখন স্তালিনবাদীরা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পপুলার ফ্রন্ট নীতির কারণে ভারত ছাড়ো আন্দোলনের বিরোধিতা করছিল, তখন বলশেভিক-লেনিনবাদীরা সেই আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। একই সঙ্গে তাঁরা বাংলার পাটকল শ্রমিক, ও অন্যান্য শিল্পাঞ্চলের শ্রমিকদের মধ্যে সংগঠন গড়ে তোলেন এবং শান্তিপুরের মতো অঞ্চলে দীর্ঘ দশক ধরে স্থানীয় সংগ্রামে নেতৃত্ব দেন। বলশেভিক-লেনিনবাদী ধারার সঙ্গে যুক্ত বহু কর্মী ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন এবং স্বাধীনতা-পরবর্তী ভারতীয় রাষ্ট্র উভয়ের হাতেই একাধিকবার কারারুদ্ধ হন। তবুও তাঁরা আত্মগোপনে থেকে বিপ্লবী সমাজতান্ত্রিক কাজ চালিয়ে যান। পাকিস্তানে বলশেভিক-লেনিনবাদীরা দীর্ঘস্থায়ী শ্রমিক সংগঠন ও সমাজতান্ত্রিক রাজনৈতিক ধারা গড়ে তুলেছেন, যা আজও বিভিন্ন শ্রমিক সংগ্রামে সক্রিয়ভাবে হস্তক্ষেপ করে চলেছে। একই সঙ্গে বলশেভিক-লেনিনবাদী ঐতিহ্যের প্রভাবে গড়ে ওঠা বিপ্লবী মার্কসবাদীরা কাশ্মীর এবং গিলগিট-বালতিস্তানে গণতান্ত্রিক দাবি এবং জাতীয় নিপীড়নের বিরুদ্ধে আন্দোলন সংগঠিত করে চলেছেন। শ্রীলঙ্কায় বলশেভিক-লেনিনবাদী আন্দোলন এশিয়ার অন্যতম শক্তিশালী গণভিত্তিসম্পন্ন সমাজতান্ত্রিক দল গড়ে তুলেছিল। লঙ্কা সম সমাজ পার্টি (LSSP) ছিল শ্রীলঙ্কার প্রথম আধুনিক রাজনৈতিক দল। দলটি সংসদে উল্লেখযোগ্য প্রতিনিধিত্ব অর্জন করেছিল, দ্বীপজুড়ে শ্রমিক আন্দোলন ও সাধারণ ধর্মঘটে নেতৃত্ব দিয়েছিল এবং ১৯৩০, ১৯৪০ ও ১৯৫০-এর দশক জুড়ে সাম্রাজ্যবাদবিরোধী রাজনীতিতে নির্ণায়ক ভূমিকা পালন করেছিল। যদিও পরবর্তী সময়ে তা সুযোগসন্ধানী অবক্ষয়ের শিকার হয়।

সমগ্র লাতিন আমেরিকা জুড়ে বলশেভিক-লেনিনবাদীরা ভূমি সংগ্রামেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। বলিভিয়ায় বিপ্লবী শ্রমিক পার্টি (POR) খনি শ্রমিক আন্দোলনের মধ্যে এক গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হয়ে ওঠে। অস্ট্রেলিয়ায়ও দীর্ঘ সময় ধরে বলশেভিক-লেনিনবাদী সংগঠনগুলি দেশের বৃহত্তম সমাজতান্ত্রিক সংগঠনগুলির মধ্যে রয়েছে। তারা ট্রেড ইউনিয়ন, বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস, যুদ্ধবিরোধী আন্দোলন, পূর্ব তিমুর ও প্যালেস্টাইনের সংহতি আন্দোলন এবং পরিবেশ আন্দোলনে ধারাবাহিক ও দৃশ্যমান ভূমিকা পালন করেছে। তাই যদি সত্যিই "গুরুত্বপূর্ণ কাজ" বা "অর্থবহ অবদান"-এর কথা ওঠে, তাহলে ইতিহাসের প্রকৃত রেকর্ড নিয়ে আলোচনা করা উচিত। কেউ যদি মনে করেন বলশেভিক-লেনিনবাদের বিশ্লেষণ বা বাস্তব রাজনৈতিক অবদান ভুল ছিল, তাহলে সেই যুক্তি উপস্থাপন করুন। কিন্তু এমন একটি সমগ্র বিপ্লবী ধারাকে—যার কর্মীদের মেনশেভিক-স্তালিনবাদী রাজনৈতিক ধারা কয়েক দশক ধরে বহিষ্কার করেছে, কারারুদ্ধ করেছে, কুৎসা রটিয়েছে এবং বহু ক্ষেত্রেই হত্যা করেছে—এক কথায় উড়িয়ে দেওয়া কোনও গুরুতর রাজনৈতিক যুক্তি নয়।

আর একটি প্রশ্ন—কোন রাজনৈতিক কর্মসূচি বাস্তবে একটি সফল প্রলেতারীয় সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব ঘটাতে পেরেছে? "নিউ ডেমোক্রেসি" নয়। "পিপলস ডেমোক্রেসি" নয়। ইতিহাসে একমাত্র বিজয়ী প্রলেতারীয় সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব ছিল ১৯১৭ সালের অক্টোবর বিপ্লব—যা সংঘটিত হয়েছিল প্রলেতারীয় আন্তর্জাতিকতাবাদ, শ্রমিক গণতন্ত্র এবং নিরন্তর বিপ্লবের কর্মসূচির ভিত্তিতে; সেই কর্মসূচিই পরে আমলাতান্ত্রিক প্রতিবিপ্লবের বিরুদ্ধে বাম বিরোধী পক্ষ (Left Opposition)-এর দ্বারা রক্ষিত হয়েছিল। অক্টোবর বিপ্লব মানব ইতিহাসে নজিরবিহীন শ্রমিক গণতন্ত্রের প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলে। স্বাধীনভাবে নির্বাচিত সোভিয়েত, কারখানা কমিটি, শিল্পে শ্রমিক নিয়ন্ত্রণ, নির্বাচিত সামরিক কমিটি এবং সোভিয়েত কংগ্রেসের কাছে জবাবদিহিমূলক একটি সরকার। এই প্রতিষ্ঠানগুলির ধ্বংস কোনওভাবেই অক্টোবর বিপ্লবের অবশ্যম্ভাবী ফল ছিল না। গৃহযুদ্ধ, অর্থনৈতিক বিপর্যয় এবং পরবর্তীকালে আমলাতান্ত্রিক শক্তির সংহতির মধ্য দিয়ে সেগুলির অবক্ষয় ঘটে। ১৯২৩ সাল থেকে যে স্তালিনবাদী আমলাতন্ত্রের বিরুদ্ধে বাম বিরোধী পক্ষ সংগ্রাম শুরু করেছিল, সেই আমলাতন্ত্রের উত্থানই ছিল এই ধ্বংসের মূল কারণ। অন্যদিকে, স্তালিনবাদী বা মাওবাদী শ্রেণি-সমঝোতার জোট, "নিউ ডেমোক্রেসি" অথবা "পিপলস ডেমোক্রেসি"-র কৌশলের অধীনে সংঘটিত প্রতিটি বিপ্লব শেষ পর্যন্ত শ্রমিক শ্রেণির গণতান্ত্রিক শাসন প্রতিষ্ঠা করেনি; বরং সৃষ্টি করেছে আমলাতান্ত্রিকভাবে বিকৃত শ্রমিক রাষ্ট্র। আজ সেই রাষ্ট্রগুলির প্রায় সবকটিই ধারাবাহিকভাবে পুঁজিবাদের পুনঃপ্রতিষ্ঠির পথে এগোচ্ছে।

যদি সত্যিই "প্রয়োগই সত্যের মানদণ্ড" হয়, তাহলে সেই বিপ্লবগুলির সম্পূর্ণ ঐতিহাসিক গতিপথও সেই প্রয়োগেরই অংশ, যে অংশটিকে সুবিধামতো উপেক্ষা করা যায় না। প্রশ্ন হল মেনশেভিক-স্তালিনবাদী রাজনৈতিক কর্মসূচি শেষ পর্যন্ত কী ধরনের সামাজিক সম্পর্ক সৃষ্টি করেছে, এবং ইতিহাসের গতিপথে সেই সম্পর্ক কোথায় গিয়ে পৌঁছেছে? সেই বিচারে ত্রৎস্কি বহু দশক আগেই সতর্ক করেছিলেন, আমলাতান্ত্রিক অধঃপতনের চূড়ান্ত পরিণতি হবে ঠিক এই পুঁজিবাদী পুনঃপ্রতিষ্ঠিই অথবা রাজনৈতিক বিপ্লবের মাধ্যমে শ্রমিক শ্রেণির গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা। আমাদের স্তালিনবাদী বন্ধুরা বলতে পারেন, "একটি মুক্তাঞ্চল প্রতিষ্ঠা করে দেখানো দশ হাজার পৃষ্ঠার সমালোচনার চেয়েও বেশি অবদান রাখে।"

বেশ। তাহলে চলুন, যুদ্ধোত্তর ভিয়েতনামের প্রথম প্রকৃত শ্রমিক অভ্যুত্থানগুলির একটির কথা আলোচনা করা যাক। ১৯৪৫ সালে সাইগনের শ্রমিক কমিটি এবং সাইগন কমিউন গড়ে তুলতে কারা অগ্রণী ভূমিকা নিয়েছিল? কারা শ্রমিক শ্রেণির স্বাধীন রাজনৈতিক ক্ষমতা প্রতিষ্ঠার পক্ষে যুক্তি দিয়েছিল, শ্রমিকদের একটি শ্রেণি-সমঝোতাভিত্তিক জাতীয়তাবাদী জোটের অধীনস্থ করার পরিবর্তে? জাপানের আত্মসমর্পণের পরবর্তী অস্থির সপ্তাহগুলিতে কারা গণকমিটি, শ্রমিক মিলিশিয়া, পাড়া-প্রতিরক্ষা কমিটি এবং ধর্মঘট কমিটি সংগঠিত করেছিল? কারা জোর দিয়ে বলেছিল যে জাতীয় মুক্তি কেবলমাত্র শ্রমিক শ্রেণির স্বাধীন রাজনৈতিক ক্ষমতার মাধ্যমেই অর্জিত হতে পারে, জাতীয় বুর্জোয়াদের কোনও অংশের সঙ্গে আপসের মাধ্যমে নয়? আর সেই শ্রমিক কমিটিগুলিকে ধ্বংস করেছিল কারা? তা থু থাউ সহ আরও বহু বলশেভিক-লেনিনবাদী ও অন্যান্য লড়াকু শ্রমিকদের খুঁজে বের করে হত্যা করেছিল কারা? পটসডাম চুক্তির শর্ত মেনে প্রত্যাবর্তনকারী মিত্রশক্তির সঙ্গে সমঝোতার চেষ্টা করতে করতে, এবং ফরাসি প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনায় বসে, সাইগনের স্বাধীন শ্রমিক মিলিশিয়াগুলিকে নিরস্ত্র করেছিল কারা, শ্রমিক ক্ষমতাকে আরও প্রসারিত করার পরিবর্তে? যদি সত্যিই "প্রয়োগই সত্যের মানদণ্ড" হয়, তাহলে একটি স্বাধীন শ্রমিক বিপ্লবকে স্তালিনবাদী নেতৃত্বের দ্বারা দমন করাও সেই "প্রয়োগ"-এরই অংশ।

আর যেহেতু "প্রয়োগ"-এর প্রসঙ্গ উঠল, তাহলে এবার আসি লাতিন আমেরিকায়। সামরিক একনায়কতন্ত্রের অধীনে সংঘটিত মহান কারখানা দখল আন্দোলনগুলির নেতৃত্ব দিয়েছিল কারা? আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল, বলিভিয়া, পেরু এবং অন্যান্য দেশে র‍্যাঙ্ক-অ্যান্ড-ফাইল শ্রমিক আন্দোলন সংগঠিত করেছিল কারা? Palabra Obrera-র ঐতিহ্য গড়ে তুলেছিল কারা, যা পরে Partido Socialista de los Trabajadores (PST) এবং নাহুয়েল মোরিনোর নেতৃত্বে Movimiento al Socialismo (MAS)-এ বিকশিত হয়েছিল, এমন সংগঠন, যাদের শিকড় বিশ্ববিদ্যালয়ের সেমিনার কক্ষে নয়, বরং কারখানা, ট্রেড ইউনিয়ন এবং শ্রমিক মহল্লায় প্রোথিত ছিল? Villa Constitución-এর ইস্পাত কারখানা দখল আন্দোলনের মতো সংগ্রামে নেতৃত্ব দিয়েছিল কারা? জঙ্গি ট্রেড ইউনিয়ন প্ল্যাটফর্ম গড়ে তুলেছিল কারা? তথাকথিত Dirty War-এর সময় কারাবাস, নির্যাতন, গুম এবং একনায়কতন্ত্রের মধ্যেও বারবার বিপ্লবী সংগঠন পুনর্গঠন করেছিল কারা? ব্রাজিলে ABC শিল্পাঞ্চলের নতুন শিল্প শ্রমিক শ্রেণির মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে ধৈর্যের সঙ্গে কর্মক্ষেত্রভিত্তিক সংগঠন গড়ে তুলেছিল কারা? ১৯৭০-এর দশকের শেষের সেই ঐতিহাসিক ধর্মঘটের ঢেউয়ে অংশ নিয়েছিল কারা, যা সামরিক একনায়কতন্ত্রকে কাঁপিয়ে দিয়েছিল? ত্রৎস্কিপন্থী ধারাগুলি র‍্যাঙ্ক-অ্যান্ড-ফাইল গণতন্ত্র, শ্রেণিগত স্বাধীনতা এবং সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে আপসহীন সংগ্রামের পক্ষে ধারাবাহিকভাবে অবস্থান নিয়েছিল।

ত্রৎস্কিবাদী রাজনীতির ইতিহাস কি কেবল তাত্ত্বিক সমালোচনাতেই আবদ্ধ থেকেছে? ইতিহাস কিন্তু সম্পূর্ণ ভিন্ন কথা বলে। পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি মহাদেশেই বলশেভিক-লেনিনবাদীরা শ্রমিক শ্রেণির সংগ্রামের অগ্রভাগে বারবার নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছে। উল্টোদিকে বার্সেলোনা থেকে সাইগন—যখনই শ্রমিক শ্রেণি স্বাধীন শ্রেণিশক্তি হিসেবে নিজেদের ক্ষমতা প্রয়োগ করার চেষ্টা করেছে, তখনই মেনশেভিক-স্তালিনবাদী আমলাতন্ত্র "দ্বিস্তরীয় বিপ্লবের তত্ত্ব", "জাতীয় ঐক্য" কিংবা "জনগণের গণতন্ত্র"-এর নামে সেই উদ্যোগকে মালিক শ্রেণির অধীনস্থ করেছে অথবা দমন করেছে। আর সেই আমলাতান্ত্রিক মডেলের ওপর নির্মিত প্রতিটি শাসনব্যবস্থাই শেষ পর্যন্ত পুঁজিবাদের পুনঃপ্রতিষ্ঠির দিকেই অগ্রসর হচ্ছে।

অবশ্যই, এই সংক্ষিপ্ত পর্যালোচনা বলশেভিক-লেনিনবাদী ইতিহাসের পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস নয়; এটি কেবল একটি নির্দিষ্ট অভিযোগের উত্তর। প্রশ্ন ছিল বলশেভিক-লেনিনবাদ কি শুধুই স্তালিন ও মাওয়ের সমালোচনা করে ডিবেটিং সোসাইটি চালিয়েছে, নাকি বিশ্বের কোথাও কোনও বাস্তব সংগ্রাম, সংগঠন বা ঐতিহাসিক অবদান রেখে গেছে? ইতিহাসের নথিই তার উত্তর দেয়। একই সঙ্গে এটাও অস্বীকার করার উপায় নেই যে বারবার স্তালিনবাদী নিধনযজ্ঞ, ফ্যাসিবাদী সন্ত্রাস, সাম্রাজ্যবাদী দমন-পীড়ন এবং শ্রমিক আন্দোলনের ঐতিহাসিক পরাজয়ের ফলে আন্তর্জাতিক বলশেভিক-লেনিনবাদী আন্দোলন বহুবার তার শ্রেষ্ঠ শ্রমিক ক্যাডারদের হারিয়েছে। বহু দেশে সংগঠনগুলিকে আন্ডারগ্রাউন্ডে যেতে হয়েছে, পুনর্গঠিত হতে হয়েছে, অথবা তুলনামূলকভাবে ছাত্র, বুদ্ধিজীবী ও ক্ষুদ্র-বুর্জোয়া সামাজিক পরিসরে আশ্রয় নিতে বাধ্য হতে হয়েছে। চতুর্থ আন্তর্জাতিকের ধারাবাহিক বিভাজন, ভাঙন এবং তার কিছু অংশের পরবর্তীকালে দক্ষিণমুখী বা সংস্কারবাদী বিচ্যুতির পেছনে এই ঐতিহাসিক বাস্তবতাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। কিন্তু কোনও রাজনৈতিক ধারার কিছু সংগঠনের পরবর্তী বিচ্যুতি সেই ধারার মৌলিক কর্মসূচিকে সংজ্ঞায়িত করে না।

তবে সেই বিচ্যুতিগুলি বলশেভিক-লেনিনবাদের কর্মসূচির বাস্তবায়ন নয়; বরং তার থেকেই রাজনৈতিক বিচ্যুতি। বিপরীতে, শ্রেণি-সহযোগিতা, "দ্বিস্তরীয় বিপ্লবের তত্ত্ব", "জাতীয় ঐক্য", "জনগণের গণতন্ত্র" বা তথাকথিত "প্রগতিশীল" জাতীয় বুর্জোয়ার সঙ্গে কৌশলগত জোট কোনও বিচ্যুতি নয়, এসবই মেনশেভিক ও পরবর্তীকালে স্তালিনবাদী রাজনীতির তাত্ত্বিক ভিত্তির অবিচ্ছেদ্য অংশ। বলশেভিক-লেনিনবাদের ভিত্তি হল শ্রমিক শ্রেণির রাজনৈতিক স্বাধীনতা, আন্তর্জাতিকতাবাদ এবং নিরন্তর বিপ্লবের কর্মসূচি। সেই কারণেই কোনও বলশেভিক-লেনিনবাদী সংগঠন যদি শ্রেণি-সহযোগিতার পথে হাঁটে, তবে সেটি বলশেভিক-লেনিনবাদের ধারাবাহিকতা নয়, বরং তাকে পরিত্যাগ করা। আর যেসব রাজনৈতিক ধারা শ্রেণি-সহযোগিতাকেই নীতি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছে, তাদের ক্ষেত্রে সেটি বিচ্যুতি নয়, তাদের নিজস্ব কর্মসূচিরই যৌক্তিক পরিণতি।


#ত্রৎস্কিপন্থা #বলশেভিক_লেনিনবাদ #শ্রমিক_আন্দোলন #মার্কসবাদ #চতুর্থ_আন্তর্জাতিক #বিপ্লবী_রাজনীতি #ইতিহাস #সমাজতন্ত্র
Sankalpa

About the Author

Sankalpa

মজদুরের নিয়মিত লেখক

শিক্ষার্থী

বই পড়ি, প্রশ্ন করি, তর্ক করি। সাহিত্য, ইতিহাস আর রাজনীতি নিয়ে ভাবতে ভালোবাসি। বিশেষ করে সমাজকে তার অন্তর্নিহিত দ্বন্দ্ব, পরিবর্তন ও সম্ভাবনার মধ্য দিয়ে বোঝার চেষ্টা করি। জটিল বিষয়কে সহজ করে বোঝার চেয়ে, তাকে গভীরভাবে বোঝার চেষ্টাটাকেই বেশি মূল্য দিই।

প্রোফাইল দেখুন

মতামত

এখনও কোনো মতামত নেই।

প্রথম মতামতটি আপনিই দিন।

আলোচনায় অংশ নিতে লগ ইন করুন অথবা এ্যাকাউন্ট খুলুন

Reading

Font size

Auto scroll
Slow Fast