সকল লেখা জানতে চাই
Searching…

বুলডোজারের নিচে ২০২৬: ফ্যাসিস্ট উন্মাদনায় রাষ্ট্রীয় মদত

২০২৬ সালের ভারতবর্ষে যে ঘটনাগুলি একের পর এক সামনে এসেছে, সেগুলিকে বিচ্ছিন্ন “আইনশৃঙ্খলার সমস্যা” বা “স্থানীয় উত্তেজনা” বলে ব্যাখ্যা করা ক্রমশ অসম্ভব হয়ে উঠছে। বৈজ্ঞানিক সমাজতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখলে এগুলি একটি বৃহত্তর ঐতিহাসিক প্রক্রিয়ার লক্ষণ, পুঁজিবাদী সংকট, বেকারত্ব, সামাজিক বৈষম্য ও রাজনৈতিক অস্থিরতার ভিতরে মালিকশ্রেণির ক্রমবর্ধমান হিন্দুত্ববাদী ফ্যাসিবাদের উপর নির্ভরশীলতা। এই প্রক্রিয়ায় মুসলিম, দলিত ও অন্যান্য প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে কাল্পনিক শত্রু হিসেবে দাঁড় করিয়ে রাষ্ট্র, মিডিয়া, আদালত, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও রাস্তার মব, সবকিছুকে এক সুসংহত মতাদর্শিক কাঠামোর প্রভাবাধীন করা হচ্ছে।

Sankalpa
Sankalpa মজদুরের নিয়মিত লেখক
পড়তে 6 মিনিট লাগতে পারে
এই লেখাটি 127 বার পড়েছে এ মাসে লেখকের লেখা 2 জন পাঠক পড়েছেন
বুলডোজারের নিচে ২০২৬: ফ্যাসিস্ট উন্মাদনায় রাষ্ট্রীয় মদত

২০২৬ সালের ভারতবর্ষে যে ঘটনাগুলি একের পর এক সামনে এসেছে, সেগুলিকে বিচ্ছিন্ন “আইনশৃঙ্খলার সমস্যা” বা “স্থানীয় উত্তেজনা” বলে ব্যাখ্যা করা ক্রমশ অসম্ভব হয়ে উঠছে। বৈজ্ঞানিক সমাজতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখলে এগুলি একটি বৃহত্তর ঐতিহাসিক প্রক্রিয়ার লক্ষণ, পুঁজিবাদী সংকট, বেকারত্ব, সামাজিক বৈষম্য ও রাজনৈতিক অস্থিরতার ভিতরে মালিকশ্রেণির ক্রমবর্ধমান হিন্দুত্ববাদী ফ্যাসিবাদের উপর নির্ভরশীলতা। এই প্রক্রিয়ায় মুসলিম, দলিত ও অন্যান্য প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে কাল্পনিক শত্রু হিসেবে দাঁড় করিয়ে রাষ্ট্র, মিডিয়া, আদালত, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও রাস্তার মব, সবকিছুকে এক সুসংহত মতাদর্শিক কাঠামোর প্রভাবাধীন করা হচ্ছে।

মার্চের শুরুতেই দিল্লির সংসদ মার্গে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের হিন্দি উপদেষ্টা কমিটির সদস্য ভান্তে সংঘপ্রিয় রাহুল “লাভ জিহাদ”-এর সাম্প্রদায়িক মিথ ছড়িয়ে মুসলিম পুরুষদের “নেকড়ে” ও “শিয়াল” বলে আক্রমণ করেন। তার পরদিন শিলংয়ে HYC নেতা রয় কুপার সিনরেম বাঙালি মুসলিমদের “বাংলাদেশি” আখ্যা দিয়ে তাড়ানোর ডাক দেন এবং “আল্লাহু আকবর” স্লোগান চলবে না বলে হুমকি দেন। কয়েকদিন পর উত্তরপ্রদেশের মৈনপুরীতে ঈদের নামাজ পড়তে জড়ো হওয়া মুসলিমদের SHO প্রকাশ্যে বলে, “মাটিতে পুঁতে দেব।” লক্ষণীয়, স্থানীয় হিন্দুদের বড় অংশ নামাজের বিরোধিতা না করলেও পুলিশ নিজেই দমনমূলক শক্তির ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়। অর্থাৎ প্রশাসনিক ও রাষ্ট্রীয় মদতেও সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা উসকে দেওয়ার চেষ্টা চলছে।

এপ্রিল থেকে মে, এই কয়েক মাসে “বুলডোজার রাজ” আরও স্পষ্ট রূপ নেয়। জম্মু-কাশ্মীরে “নেশা মুক্ত” অভিযানের নামে অন্তত ১০টি বাড়ি ও ব্যবসা ভেঙে ফেলে প্রশাসন। উত্তরপ্রদেশের সন্ত কবীর নগরে “অবৈধ” অভিযোগে একটি মাদ্রাসা গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। দিল্লির মঙ্গোলপুরীতে শতবর্ষ প্রাচীন দরগাহ পঞ্চ পীরান ধ্বংস করা হয়, আবার মহিপালপুরে হজরত খাজা সুলতান ঘোরি দরগার উরসে নামাজ ও জমায়েতে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়। উত্তরাখণ্ডে এক সপ্তাহে একের পর এক মাজার বুলডোজার দিয়ে ভাঙা হয় “অবৈধ দখল” ও “উন্নয়ন”-এর নামে। রাষ্ট্রীয় ভাষ্য সর্বত্র একই, আইন, উন্নয়ন, নিরাপত্তা; কিন্তু বাস্তবে নিশানা বারবার একই জনগোষ্ঠী।

এই দমন কেবল প্রশাসনিক নয়, শারীরিক সহিংসতাতেও রূপ নিচ্ছে। রামবানে ১৮ বছরের তানভির সালাম বৈধ কাগজপত্র থাকা সত্ত্বেও গোরক্ষকদের তাড়া খেয়ে নালায় ঝাঁপ দিতে বাধ্য হয়; পরে তার মৃতদেহ উদ্ধার হয়। বীরভূমের সন্তোষপুরে নির্বাচন-পরবর্তী হিংসায় আবির শেখকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়, তাঁর সহকর্মী আলি হোসেন গুরুতর জখম হন। উড়িষ্যায় বালাসোরে “গরু পাচার” সন্দেহে হিন্দুত্ববাদী জনতা একটি ভ্যানে আগুন ধরিয়ে দেয়। গুজরাতে পুলিশের গাড়ির বনেটে এক মুসলিম যুবককে বেঁধে পেটানোর ভিডিও ভাইরাল হয়, যেখানে দেখা যায় সে চিৎকার করে বলছে, “ইয়া আল্লাহ, বাঁচাও।” বিহারের মোতিহরিতে মসজিদের সামনে ইচ্ছাকৃতভাবে উচ্চস্বরে ডিজে বাজিয়ে সংঘর্ষ উসকে দেওয়া হয়। এই ঘটনাগুলি দেখায়, রাষ্ট্রীয় মদত পেয়ে উন্মত্ত মবের প্রতিক্রিয়াশীল হিংসা এখন এক প্রাতিষ্ঠানিক চরিত্র অর্জন করছে।

অসমে বিজেপি-ঘনিষ্ঠ নির্বাচনী স্কিটে মুসলিম পরিবারের বাড়ি বুলডোজার দিয়ে ভাঙার দৃশ্যকে হাস্যরসে পরিণত করা হয়। খাদ্য বিতরণ কর্মসূচিতে হিন্দু রক্ষা দলের পিঙ্কি চৌধুরী এক দরিদ্র মুসলিমের হাত থেকে খাবারের থালা কেড়ে নিয়ে ঘোষণা করে, “কোনও মুসলিমকে খাবার দেওয়া হবে না।” বরোদার MS বিশ্ববিদ্যালয়ে “মোদি তত্ত্ব”, “হিন্দু সমাজতত্ত্ব” ও RSS ক্ষেত্রসমীক্ষা সমাজবিজ্ঞানের পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত হয়। অর্থাৎ একাডেমিক জ্ঞান, সাংস্কৃতিক বিনোদন ও সামাজিক “স্বাভাবিকতা”-র অংশে কতদূর প্রবেশ করেছে হিন্দুত্ববাদী প্রচার!

একই সময়ে বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলির ভূমিকাও গভীরভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। সুপ্রিম কোর্ট “গুলি মারো” স্লোগানকে FIR-যোগ্য অপরাধ বলে মনে করে না। RTI-তে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক স্বীকার করে যে তথাকথিত “অনুপ্রবেশকারী”দের কোনও কেন্দ্রীয় তথ্য তাদের কাছে নেই, অথচ অমিত শাহ মুসলিম জনসংখ্যা বৃদ্ধিকেই “অনুপ্রবেশ”-এর ফল বলে প্রচার করে চলেছেন। অন্যদিকে গবেষণা দেখাচ্ছে, মুসলিম ও দলিত জনগোষ্ঠীদের ক্রমশ বিচ্ছিন্ন মহল্লায় ঠেলে দেওয়া হচ্ছে, যেখানে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও নাগরিক পরিষেবা অত্যন্ত দুর্বল।

ত্রৎস্কি লিখেছিলেন, ফ্যাসিবাদ হলো পুঁজিবাদী সংকটের মুহূর্তে বুর্জোয়াশ্রেণির শেষ প্রতিরক্ষা, যেখানে মধ্যবিত্ত ক্ষোভ সংগঠিত প্রতিক্রিয়াশীল রাজনীতিতে একত্রিত হয়ে বৃহৎ পুঁজির স্বার্থে মেহনতি জনগণের উপর তীব্র হিংস্র আক্রমণ নামিয়ে আনে। আজকের ভারত সেই বিপজ্জনক ভবিষ্যতের সম্মুখীন হতে পারে। ফ্যাসিবাদ এখনও রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখল না করতে পারলেও রাষ্ট্রীয় আমলাতন্ত্রের আনাচে কানাচে প্রবেশ করে এক আধা-বোনাপার্টবাদী (পড়ুন কর্তৃত্ববাদী) শাসন কায়েমের চেষ্টা চালাচ্ছে, যেখানে সংখ্যালঘুদের উপর নির্যাতন শুধু একটি সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে আক্রমণ নয়, বরং সমগ্র শ্রমজীবী সমাজ, গণতান্ত্রিক অধিকার ও ভবিষ্যতের রাজনৈতিক প্রতিরোধকে ধ্বংস করে দিয়ে পুঁজিবাদী সংকট মোকাবিলার মরিয়া চেষ্টা দৃশ্যমান।

এই ঘটনাগুলির তাৎপর্য কেবল সাম্প্রদায়িক ঘৃণার বৃদ্ধি নয়; এগুলি ভারতীয় পুঁজিবাদের গভীর সংকট মোকাবিলায় শাসকশ্রেণির রাজনৈতিক হাতিয়ার। বেকারত্ব, বৈষম্য ও সামাজিক অসন্তোষ শ্রেণিসংগ্রামে রুপান্তরিত না হয়ে মুসলিমবিদ্বেষী গণউন্মাদনায় পরিণত হচ্ছে। সেই কারণেই এই পরিস্থিতির মোকাবিলা কেবল নৈতিক প্রতিবাদে নয়, বরং সাম্প্রদায়িক বিভাজনের বিরুদ্ধে সংগঠিত শ্রেণিভিত্তিক রাজনৈতিক প্রতিরোধেই নিহিত।

তথ্যসূত্র:

১. আবির শেখ হত্যাকাণ্ড — মকতুব মিডিয়া (নিকিতা জৈন)

২. গুজরাতে মুসলিম যুবককে পুলিশের গাড়ির বনেটে বেঁধে মারধর — দ্য কুইন্ট / মুসলিম মিরর

৩. “গুলি মারো” মামলা ও সুপ্রিম কোর্টের রায় — লাইভ ল’ (ডেবি জৈন)

৪. বালাসোরে গোরক্ষার নামে ভ্যানে আগুন — সিয়াসত (বীণা নায়ার)

৫. জম্মু-কাশ্মীরে “নেশা মুক্ত” অভিযানে বুলডোজার — ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস (বাশারাত মাসুদ)

৬. শিলংয়ে মুসলিমবিরোধী HYC মিছিল — হিন্দুত্ব ওয়াচ

৭. ভান্তে সংঘপ্রিয় রাহুলের “লাভ জিহাদ” ভাষণ — Ibid.

৮. তানভির সালামের মৃত্যু — ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস (অরুণ শর্মা)

৯. “অনুপ্রবেশকারী” দাবি ও RTI — দ্য ওয়্যার হিন্দি (অঙ্কিত রাজ)

১০. মুসলিম ও দলিত আবাসিক বিচ্ছিন্নতা — দ্য ওয়্যার / NBER গবেষণা

১১. পিঙ্কি চৌধুরীর মুসলিমবিদ্বেষী মন্তব্য — মাধ্যমম অনলাইন

১২. অসমে মুসলিম বাড়ি ভাঙার নির্বাচনী স্কিট — মুসলিম মিরর

১৩. মোতিহারিতে মসজিদের সামনে ডিজে ঘিরে উত্তেজনা — ক্ল্যারিয়ন ইন্ডিয়া

১৪. “মোদি তত্ত্ব” ও RSS-কেন্দ্রিক পাঠ্যক্রম — ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস (অদিতি রাজ)

১৫. মৈনপুরীতে ঈদের নামাজে পুলিশের হুমকি — মুসলিম মিরর

১৬. দরগাহ পঞ্চ পীরান ভাঙা — ক্ল্যারিয়ন ইন্ডিয়া

১৭. খাজা সুলতান ঘোরি দরগার উরসে বিধিনিষেধ — Ibid.

১৮. সন্ত কবীর নগরে মাদ্রাসা বুলডোজার অভিযান — মুসলিম মিরর

১৯. উত্তরাখণ্ডে মাজার ভাঙা — ক্ল্যারিয়ন ইন্ডিয়া

প্রথম প্রকাশিত: নয়া দিশা পত্রিকা'র ফেসবুক পেজে

#বুলডোজার_রাজ #ফ্যাসিবাদ #সাম্প্রদায়িকতা #ভারত #রাজনীতি #সংখ্যালঘু #সামাজিক_বিশ্লেষণ #গণতান্ত্রিক_অধিকার
Sankalpa

About the Author

Sankalpa

মজদুরের নিয়মিত লেখক

শিক্ষার্থী

বই পড়ি, প্রশ্ন করি, তর্ক করি। সাহিত্য, ইতিহাস আর রাজনীতি নিয়ে ভাবতে ভালোবাসি। বিশেষ করে সমাজকে তার অন্তর্নিহিত দ্বন্দ্ব, পরিবর্তন ও সম্ভাবনার মধ্য দিয়ে বোঝার চেষ্টা করি। জটিল বিষয়কে সহজ করে বোঝার চেয়ে, তাকে গভীরভাবে বোঝার চেষ্টাটাকেই বেশি মূল্য দিই।

প্রোফাইল দেখুন

মতামত

এখনও কোনো মতামত নেই।

প্রথম মতামতটি আপনিই দিন।

আলোচনায় অংশ নিতে লগ ইন করুন অথবা এ্যাকাউন্ট খুলুন

Reading

Font size

Auto scroll
Slow Fast