১৯২৯ সালের মহামন্দা জার্মান সমাজকে গভীর সংকটে ঠেলে দেয়। বেকারত্ব কয়েক মিলিয়নে পৌঁছায়, মধ্যবিত্তের বড় অংশ নিঃস্ব হয়ে পড়ে, এবং সমাজে তীব্র রাজনৈতিক মেরুকরণ দেখা দেয়। একদিকে কমিউনিস্ট পার্টির প্রভাব বাড়ে, অন্যদিকে নাৎসিরা দ্রুত শক্তিশালী হয়ে ওঠে।
১৯৩০ সালে সমাজ-গণতান্ত্রিক পার্টি (এসপিডি) নেতৃত্বাধীন সরকার পতনের পর রাষ্ট্রপতি হিন্ডেনবুর্গ হাইনরিখ ব্র্যুনিংকে চ্যান্সেলর নিয়োগ করে। সংসদে স্থিতিশীল সংখ্যাগরিষ্ঠতা না থাকায় সে সংবিধানের ৪৮ নম্বর ধারার অধীনে জরুরি অধ্যাদেশ জারি করে শাসন শুরু করে। সাংবিধানিক কাঠামো বহাল থাকলেও রাষ্ট্র ক্রমশ আরও কর্তৃত্ববাদী পথে এগোতে থাকে। কিন্তু এসপিডি নেতৃত্বের প্রধান উদ্বেগ ছিল সংবিধান ও বিদ্যমান রাষ্ট্রব্যবস্থার প্রতি আনুগত্য বজায় রাখা।
হিটলার ক্ষমতায় আসার ঠিক আগের মুহূর্তেও নাৎসিদের বিরুদ্ধে শ্রমিক দলগুলোর সম্মিলিত ভোট নাৎসিদের চেয়ে বেশি ছিল। অর্থাৎ নাৎসিবাদকে থামানোর সামাজিক শক্তি তখনও অস্তিত্বশীল ছিল। কিন্তু এসপিডি নেতৃত্ব হিটলারের নিয়োগকে "সাংবিধানিক" বলে মেনে নেয় এবং স্বাধীন গণআন্দোলন গড়ে তোলার বদলে শ্রমিকদের ধৈর্য ধরার পরামর্শ দেয়। অন্যদিকে স্তালিনবাদী “কমিউনিস্ট পার্টি” (কেপিডি) নাৎসি বিপদের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক ঐক্য গড়ে তোলার পরিবর্তে এসপিডির বিরুদ্ধেই প্রধান রাজনৈতিক আক্রমণ চালিয়ে যায়। ফলে শ্রমিক আন্দোলন বিভক্ত ও পঙ্গু হয়ে পড়ে।
ক্ষমতায় এসে হিটলার কোনও সময় নষ্ট করেনি। কমিউনিস্ট ও সমাজতান্ত্রিক সংগঠনগুলির ওপর দমন নেমে আসে, সংবাদপত্র বন্ধ হয়, সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধ হয়, হাজার হাজার কর্মী গ্রেপ্তার হন। রাইখস্টাগে অগ্নিকাণ্ডকে অজুহাত করে নাগরিক অধিকার স্থগিত করা হয়। যখন প্রতিরোধের ডাক আসে, তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে। শ্রমিকশ্রেণির মনোবল ভেঙে দেওয়া হয়েছে, তাদের সংগঠনগুলো বিচ্ছিন্ন ও আক্রান্ত।
এই অভিজ্ঞতা আজও প্রাসঙ্গিক। ফ্যাসিবাদী বা কর্তৃত্ববাদী প্রবণতার মোকাবিলার দায়িত্ব যদি সংবিধান, আদালত, নির্বাচন বা বিদ্যমান রাষ্ট্রকাঠামোর ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়, তাহলে তা পরাজয় ডেকে আনতে বাধ্য। জার্মানির সমাজ-গণতন্ত্রীরা বিশ্বাস করেছিল যে সাংবিধানিক কাঠামোই শেষ পর্যন্ত বিপদকে ঠেকাবে; বাস্তব ইতিহাস ভিন্ন ফল দেখিয়েছে। ভারতেও প্রায়শই এমন একটি রাজনৈতিক প্রবণতা দেখা যায়, যেখানে নিজেদের বামপন্থী বা প্রগতিশীল দাবি করা কিছু ধারা ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রামকে মূলত "সংবিধান রক্ষা" এবং "উদার গণতন্ত্র রক্ষা"-র প্রশ্নে সীমাবদ্ধ করে ফেলে। অথচ ইতিহাস দেখায়, গণতান্ত্রিক অধিকার টিকে থাকে সংগঠিত শ্রমিকশ্রেণির আন্দোলনের মাধ্যমে।
জার্মানির অভিজ্ঞতা দেখায় যে ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রামকে কেবল "সংবিধান রক্ষা" বা "গণতন্ত্র রক্ষা"-র মধ্যে সীমাবদ্ধ করা যায় না। গণতান্ত্রিক অধিকার, ট্রেড ইউনিয়ন, শ্রমিক সংগঠন, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা— এসব রক্ষার জন্য লড়াই অপরিহার্য। কিন্তু শ্রমিক শ্রেণির কাছে এই সংগ্রাম নিজেই চূড়ান্ত লক্ষ্য নয়। জার্মান সমাজ-গণতন্ত্রের মৌলিক ভ্রান্তি ছিল যে তারা বিদ্যমান সাংবিধানিক রাষ্ট্রকেই রক্ষা করতে চেয়েছিল। আজও বহু মেনশেভিক-স্তালিনবাদী শক্তি ফ্যাসিবাদবিরোধী সংগ্রামকে মূলত বুর্জোয়া গণতন্ত্রের প্রতিরক্ষায় সীমাবদ্ধ রাখে।
গভীর সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংকটের মুহূর্তে পুঁজিবাদী ব্যবস্থার মধ্য থেকেই ফ্যাসিবাদী আন্দোলনের জন্ম হয়। যখন প্রচলিত সংসদীয় ও গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা পুঁজির স্বার্থ রক্ষা করতে ব্যর্থ হতে শুরু করে, তখন মালিকশ্রেণি শ্রমিক আন্দোলন ও গণতান্ত্রিক অধিকারগুলিকে চূর্ণ করার জন্য আরও খোলামেলা দমনমূলক পদ্ধতির দিকে ঝুঁকতে পারে। তাই ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রামকে কেবল বুর্জোয়া গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সীমাবদ্ধ রাখা যায় না। ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের অর্থ হল শ্রমিকশ্রেণির সমস্ত সংগঠন, অধিকার ও সংগ্রামের ক্ষেত্রকে রক্ষা ও সম্প্রসারিত করা, যাতে শ্রমিকশ্রেণি স্বাধীন রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে সংগঠিত হতে পারে এবং ফ্যাসিবাদের জন্ম দেওয়া পুঁজির শাসনের পরিবর্তে উৎপাদক সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের গণতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণের ভিত্তিতে সমাজকে পুনর্গঠনের জন্য লড়াই এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে।
প্রথম প্রকাশিত: নয়া দিশা পত্রিকা'র ফেসবুক পেজে
About the Author
Sankalpa
মজদুরের নিয়মিত লেখকশিক্ষার্থী
বই পড়ি, প্রশ্ন করি, তর্ক করি। সাহিত্য, ইতিহাস আর রাজনীতি নিয়ে ভাবতে ভালোবাসি। বিশেষ করে সমাজকে তার অন্তর্নিহিত দ্বন্দ্ব, পরিবর্তন ও সম্ভাবনার মধ্য দিয়ে বোঝার চেষ্টা করি। জটিল বিষয়কে সহজ করে বোঝার চেয়ে, তাকে গভীরভাবে বোঝার চেষ্টাটাকেই বেশি মূল্য দিই।
প্রোফাইল দেখুন
মতামত
এখনও কোনো মতামত নেই।
প্রথম মতামতটি আপনিই দিন।
আলোচনায় অংশ নিতে লগ ইন করুন অথবা এ্যাকাউন্ট খুলুন