"পার্টিবাদী" Weekly Worker-এ প্রকাশিত মাইক ম্যাকনেয়ারের “Beware of Sparts Bearing Gifts” (নং ১৫৭৪, ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬) নিবন্ধের জবাবে ত্রৎস্কিপন্থী স্পার্টাসিস্ট লীগের লেখার আংশিক ও সংক্ষিপ্ত তরজমা করলাম—
শ্রমিকশ্রেণি থেকে বিচ্ছিন্নতা
আজকের বিতর্কের আসল প্রশ্ন হলো: ক্ষুদ্র কমিউনিস্ট সংগঠনগুলির, যেগুলি মূলত পাতি-বুর্জোয়া উপাদানে গঠিত, তাদের কি সচেতনভাবে কিছু সদস্যকে শিল্প শ্রমিক হিসেবে কাজ নিতে উৎসাহিত করা উচিত? আমাদের উত্তর হ্যাঁ। ১৯৭০-এর দশকে কিছু সংগঠনের ‘শিল্পমুখী মোড়’-এর ব্যর্থতার উদাহরণ দিয়ে এই নীতিকে খারিজ করা যায় না। মূল প্রশ্ন হলো বর্তমান বাস্তবতা। আজকের সমাজতান্ত্রিক আন্দোলন, বিশেষত পশ্চিমে, শ্রমিকশ্রেণি থেকে গভীরভাবে বিচ্ছিন্ন। কিছু বাম সংগঠনের ট্রেড ইউনিয়নে উপস্থিতি থাকলেও তাদের সদস্যভিত্তি প্রধানত ছাত্র, মধ্যবিত্ত ও অবসরপ্রাপ্তদের নিয়ে গঠিত; আর ইউনিয়নে তাদের প্রভাবও অধিকাংশ ক্ষেত্রে আমলাতান্ত্রিক স্তরে সীমাবদ্ধ, সাধারণ শ্রমিকদের মধ্যে নয়।
আমরা বলছি না যে বামপন্থীদের মধ্যে কোনো শ্রমিক নেই। কিন্তু গত কয়েক দশকে বিপ্লবী বামপন্থা শিল্প শ্রমিকদের মধ্যে প্রায় সমস্ত প্রভাব হারিয়েছে এবং মূলত ক্যাম্পাসভিত্তিক ক্যাডারবৃদ্ধির ওপর নির্ভরশীল হয়েছে। এর রাজনৈতিক ফলও রয়েছে। কারণ সংখ্যাগরিষ্ঠভাবে পাতি-বুর্জোয়া উপাদানে গঠিত কোনো সংগঠন অনিবার্যভাবেই পাতি-বুর্জোয়া রাজনীতির দিকে ঝুঁকবে। সমস্যাটিকে কেবল বামপন্থার সামগ্রিক রাজনৈতিক দুর্বলতার ফল হিসেবে দেখা যথেষ্ট নয়; আজকের বহু বাম সংগঠনের সচেতন সামাজিক অভিমুখই পাতি-বুর্জোয়া স্তরের দিকে। সেই কারণেই শ্রমিকশ্রেণির দিকে সচেতন মোড় নেওয়া প্রয়োজন।
শ্রমিক কে?
মার্কসবাদে শ্রমিকশ্রেণিকে কেবল ‘মজুরিভোগী’ বলে সংজ্ঞায়িত করা একটি সংশোধনবাদী বিকৃতি। এই সংজ্ঞা মেনে নিলে ডকশ্রমিক, গাড়ি কারখানার শ্রমিক, বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এবং কর্পোরেট আইনজীবীর মধ্যে আর কোনো মৌলিক পার্থক্য থাকে না। কিন্তু ইতিহাস দেখায়, মজুরিভোগী মানুষ পুঁজিবাদের আগেও ছিল; সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের সম্ভাবনা জন্ম নেয় শিল্প শ্রমিকশ্রেণির উত্থানের সঙ্গে। কারণ এই শ্রেণি সামাজিকীকৃত উৎপাদনের কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করে এবং বৃহৎ উৎপাদন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে সম্মিলিত সংগ্রামের দিকে ধাবিত হয়। মার্কস ও এঙ্গেলস যখন ‘প্রলেতারিয়েত’-এর কথা বলেন, তখন তারা কেবল মজুরি পাওয়া মানুষদের নয়, আধুনিক শিল্প শ্রমিকশ্রেণির কথাই বলেন।
এই কারণে প্রত্যেক মজুরিভোগী মানুষ প্রলেতারিয়েতের অংশ নয়। শিক্ষাবিদ, আইনজীবী, ছাত্র, এমনকি ছোট দোকানের কর্মচারীরাও বিভিন্ন পাতি-বুর্জোয়া স্তরের অন্তর্গত। তাদের স্বার্থ অনেক ক্ষেত্রে শ্রমিকশ্রেণির স্বার্থের সঙ্গে সংঘাতে আসে এবং তাদের সামাজিক অবস্থানও উৎপাদনের কেন্দ্র থেকে বিচ্ছিন্ন। অবশ্যই কমিউনিস্টদের উচিত এই স্তরগুলির সংগ্রামকে সমর্থন করা এবং তাদের শ্রমিকশ্রেণির পক্ষে টেনে আনার চেষ্টা করা, কিন্তু তারা নিজেরা বিপ্লবী শ্রেণি নয়।
এই বিতর্কের গুরুত্ব এখানেই যে, ‘সবাই শ্রমিক’ ধারণা শিল্প প্রলেতারিয়েতের কেন্দ্রীয় ভূমিকাকে বিলীন করে দেয়। যদি অ্যামাজন ড্রাইভার, পিএইচডি ছাত্র এবং কারখানার শ্রমিক সবাই একই অর্থে শ্রমিক হন, তাহলে কমিউনিস্টদের শিল্প শ্রমিকদের ওপর বিশেষ জোর দেওয়ার আর প্রয়োজন থাকে না। বৃহৎ শিল্পের সংকোচন সত্ত্বেও সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম একমাত্র শক্তি এখনো শিল্প শ্রমিকশ্রেণিই; ছাত্র, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক বা বারিস্তা নয়। তাই কমিউনিস্ট আন্দোলন যদি শিল্প শ্রমিকশ্রেণির মুক্তির আন্দোলন হয়, তবে বিশেষত পাতি-বুর্জোয়া পটভূমি থেকে আসা তরুণ কমিউনিস্টদের শ্রমিকশ্রেণির সারিতে যোগ দিতে উৎসাহিত করা উচিত।
কমিউনিস্ট পার্টি ও শ্রমিকশ্রেণি
ইতিহাসও একই শিক্ষা দেয়। যে সব কমিউনিস্ট বা সমাজতান্ত্রিক দল ক্ষুদ্র গোষ্ঠী থেকে জাতীয় শক্তিতে পরিণত হয়েছিল, তারা তা করেছিল শ্রমিকদের সংগঠিত করে এবং উৎপাদনের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রগুলিতে সংগ্রামের নেতৃত্ব দিয়ে। জার্মান এসপিডি জার্মান শ্রমিক আন্দোলন গড়ে তুলে শক্তিশালী হয়েছিল; কেপিডি গণভিত্তি পেয়েছিল বিপ্লবী শপ স্টুয়ার্ডদের মধ্যে প্রভাব প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে; ফরাসি কমিউনিস্ট পার্টি লড়াকু শিল্প ইউনিয়নগুলির নেতৃত্ব দিয়ে শক্তি অর্জন করেছিল; বুলগেরীয় ‘ন্যারো’ কমিউনিস্ট পার্টি শিল্প শ্রমিকদের মধ্যে কাজ করে বেড়ে উঠেছিল; ইতালীয় কমিউনিস্ট পার্টি কারখানাভিত্তিক গোপন সংগঠন নির্মাণের ফলে প্রতিরোধ আন্দোলনের নেতৃত্ব দিতে পেরেছিল; এমনকি সিপিজিবিও খনি ও শপ-স্টুয়ার্ড নেটওয়ার্কে প্রভাবের মাধ্যমে একটি শক্তিতে পরিণত হয়েছিল। এসব দলের রাজনীতি নিঃসন্দেহে ত্রুটিমুক্ত ছিল না; ইতালীয় কমিউনিস্ট পার্টি তো শেষ পর্যন্ত একটি বিপ্লবী পরিস্থিতির সঙ্গেই বিশ্বাসঘাতকতা করেছিল। তবু সব উদাহরণই দেখায় যে তারা গুরুত্বপূর্ণ শক্তিতে পরিণত হয়েছিল শিল্প শ্রমিকদের নেতৃত্ব দিয়ে।
ট্রেড ইউনিয়ন, দক্ষিণপন্থার উত্থান ও করণীয়
এই অবস্থান থেকে ট্রেড ইউনিয়ন ভাঙা বা ‘রেড ইউনিয়ন’ গঠনের প্রশ্ন ওঠে না। বিদ্যমান ইউনিয়নের মধ্যেই প্রভাব বিস্তার, ইউনিয়ন আমলাতন্ত্রের সঙ্গে সরাসরি রাজনৈতিক সংগ্রাম এবং শ্রমিকদের মধ্যে কাজ করাই প্রয়োজন। আজকের পরিস্থিতিতে এই প্রশ্ন আরও জরুরি, কারণ পশ্চিমে শুধু ক্ষুদ্র কমিউনিস্ট গোষ্ঠীগুলিই নয়, একসময়ের বৃহৎ কমিউনিস্ট ও সামাজ-গণতান্ত্রিক দলগুলিও শ্রমিকশ্রেণির মধ্যে তাদের ভিত্তি হারিয়েছে। বহু ক্ষেত্রে শ্রমিকদের মধ্যে প্রধান রাজনৈতিক প্রভাব এখন বিদ্রোহী দক্ষিণপন্থার হাতে, কারণ বামপন্থা ক্রমশ উদারপন্থী ও মধ্যবিত্ত রাজনীতির সঙ্গে অভিন্ন হয়ে উঠেছে। এই সংকট অস্বীকার করে নয়, বরং শ্রমিকশ্রেণির দিকে সচেতন মোড় নিয়েই তার মোকাবিলা করতে হবে। তরুণ কমিউনিস্টদের শিল্পক্ষেত্রে পাঠানো একমাত্র সমাধান নয়, কিন্তু ভবিষ্যতের কমিউনিস্ট আন্দোলন গড়ে তোলার জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ।
About the Author
Sankalpa
মজদুরের নিয়মিত লেখকশিক্ষার্থী
বই পড়ি, প্রশ্ন করি, তর্ক করি। সাহিত্য, ইতিহাস আর রাজনীতি নিয়ে ভাবতে ভালোবাসি। বিশেষ করে সমাজকে তার অন্তর্নিহিত দ্বন্দ্ব, পরিবর্তন ও সম্ভাবনার মধ্য দিয়ে বোঝার চেষ্টা করি। জটিল বিষয়কে সহজ করে বোঝার চেয়ে, তাকে গভীরভাবে বোঝার চেষ্টাটাকেই বেশি মূল্য দিই।
প্রোফাইল দেখুন
মতামত
এখনও কোনো মতামত নেই।
প্রথম মতামতটি আপনিই দিন।
আলোচনায় অংশ নিতে লগ ইন করুন অথবা এ্যাকাউন্ট খুলুন