কিছু অনুপস্থিতি আছে, যাদের আমরা মানুষের অবয়ব দিয়ে ঢেকে রাখি। তাদের চোখ থাকে, কণ্ঠস্বর থাকে, স্মৃতির মধ্যে কয়েকটি বিকেলও থাকে। অথচ পান্ডুলিপির এই সমস্ত আয়োজনের পরেও কোথাও একটি শূন্যতা অক্ষত থেকে যায়। আমরা তার নাম দিই প্রেম, কখনো নিয়তি, কখনো-বা বনলতা সেন।
‘হাজার বছর ধরে আমি পথ হাঁটিতেছি পৃথিবীর পথে, সিংহল সমুদ্র থেকে নিশীথের অন্ধকারে মালয় সাগরে’; এক জীবনে এত পথ হাঁটার ক্লান্তি জীবনের কোনো এক পর্যায়ে কেবল আমাদের শরীরকে আচ্ছন্ন করে না, গ্রাস করে মগজের সমস্ত বোধকেও। জীবনানন্দ দাশের সেই ক্লান্তিহীন পথিকের মতো আমরাও কি জীবনের কোনো এক পর্যায়ে কোনো এক ‘বনলতা সেন’-এর সন্ধানে ঘুরে বেড়াই না? অথচ যে নাটোরের বনলতা সেনকে নিয়ে গত প্রায় এক শতাব্দী ধরে বাঙালি মধ্যবিত্তের রোমান্টিক হৃদয়ে ঝড় বয়ে চলেছে, তার পরিচয় নিয়ে রূপকথা ও বিতর্কের কি কোনো অন্ত আছে? কেউ বলেন তিনি রক্তমাংসের কোনো সুনির্দিষ্ট নারী, কারো মতে তিনি নিছকই এক কল্পিত রূপক, আবার আকবর আলি খানের মতো কেউ কেউ খুঁজে ফেরেন অন্য কোনো প্রচ্ছন্ন ইশারা। এই পরিচয় বিতর্ক, যুক্তি এবং তার খণ্ডনের গোলকধাঁধায় দাঁড়িয়ে যখনই আমরা এক ফালি আশার আলো খুঁজতে যাই, তখনই এক অমোঘ নির্জনতা এসে আমাদের সমস্ত সাহিত্যিক অহংকারকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দিয়ে যায়। বনলতা সেন তাহলে কে? সে কি নিছক প্রহেলিকা নাকি কোনো চির নির্জন দীর্ঘশ্বাস?
যে মেয়েটির কোঁকড়ানো চুলকে আপনি এক অদ্ভুত আচ্ছন্নতায় ব্রেটন উডসের মুদ্রানীতির সাথে তুলনা করেছিলেন, যে মেয়েটি একসময় নিজের ডায়েরির পাতায় নিঃসঙ্গতা লিখে রাখতে ভালোবাসত, অথবা যার সাথে কোনো এক নির্জন সন্ধ্যায় মুখোমুখি বসে অসংকোচে তার হাতটি চেপে ধরেছিলেন কিংবা কোনো গাঢ় রাত্রির অন্তরঙ্গতায় অমিয় চক্রবর্তীর ‘রাত্রি’ আওড়ে ব্রহ্মার নৈতিক স্খলন নিয়ে তুমুল আলাপ করে গেছিলেন ভোর রাত অব্দি; সে মেয়েটিই যখন কয়েকদিনের ব্যবধানে এক সর্বনাশা রাতে আপনার সমস্ত সংযমকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে সুরঞ্জনার মতো অন্য কোনো যুবকের হাত ধরে হেঁটে যায় তখন হয়তো আমরা আবিষ্কার করি ‘সমস্ত পার্থিব প্রেম আসলে এক সুনির্দিষ্ট প্রহেলিকা’। ‘পৃথিবীতে বিশুদ্ধ কোনো চাকরি না থাকা’র মতোই, নেই কোনো বিশুদ্ধ প্রেম!
ফ্রিডরিখ নিটশের মূল্যবোধ-সংকট কিংবা আলবেয়ার কাম্যুর অস্তিত্ববাদী দর্শনের মতোই মানুষ কখনো নিজের অর্থহীনতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বৃথা অর্থ নির্মানের চেষ্টা করে। প্রেমিক পুরুষও তেমনি নিজের আরাধ্যাকে কেন্দ্র করে বুনে নেয় এক মায়াময় উপাখ্যান। প্রিয় মানুষটি সেখানে আর নিছক একজন মানুষ থাকেন না, হয়ে ওঠেন জীবনের সমস্ত অসমাপ্তির সম্ভাব্য উত্তর।
ফরাসি ঔপন্যাসিক মার্সেল প্রুস্তের ‘হারানো স্মৃতির সন্ধানে’র মতো সেই হারিয়ে যাওয়া সময়কে আঁকড়ে ধরার আগেই বাস্তবের এক সামান্য ধাক্কায় তাসের ঘর ভেঙে পড়ে। যে চোখে ইউফ্রেটিসের স্বচ্ছ জলধারা বা শত শতাব্দীর নীল অন্ধকার খুঁজে পেয়েছিলেন, যার আঙুলে আপনি এক রাতে ঈশ্বর দেখার অলীক দাবি করেছিলেন, যাকে কোনো প্রচলিত নামে না ডেকে ভীষণ সংগোপনে ধরে রাখতে চেয়েছিলেন ‘অনামিকা’ নামে—তার সেই হঠাৎ অচেনা হয়ে যাওয়া কোনো ট্র্যাজেডির চেয়ে কম নয়।
ফ্রান্ৎস কাফকার উপন্যাসের চরিত্ররা যেমন কোনো নির্দিষ্ট অপরাধ না করেও হঠাৎ করে অমোঘ বিচারক ও কাঠগড়ার মুখোমুখি হয়, বাস্তব জীবনের বিচ্ছেদগুলোও ঠিক তেমনই কোনো পূর্বঘোষণা ছাড়াই হাজির হয়। সেখানে কোনো সংলাপের অবকাশ থাকে না, কোনো সুনির্মিত পরিণতি থাকে না। গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজের ‘দি স্লিপিং বিউটি অ্যান্ড দি এয়ারপ্লেন’-এর ঘুমন্ত সুন্দরীর মতোই সেই নারী চিরকাল কেবল এক অলীক অধরা ক্যানভাস হয়েই থেকে যায়; যার কোনো নায়ক নেই, কোনো রূপোলি পর্দা নেই, নেই কাহিনির কোনো সুনির্মিত পরিনতি।
সাহিত্যের পাতায় কিংবা পেত্রার্কের সোনালী কবিতার পঙ্ক্তিতে ‘লরা’র প্রতি প্রেম যত সুন্দর ও পবিত্র শোনায়, বাস্তবের মাটিতে তার অভিঘাত ততটাই তীক্ষ্ণ ও রক্তক্ষয়ী। ফ্রাঙ্কো-ইতালীয় সাহিত্যিক আবেশে যে বিরহকে আমরা সৌন্দর্যের চরম শিখর বলে মেনে নিই, দিনশেষে তা তো স্রেফ এক আত্মপ্রতারণামূলক সান্ত্বনা।
বনলতা সেনের সেই ‘পাখির নীড়ের মতো চোখ’ কিংবা ‘চুল তার কবেকার অন্ধকার বিদিশার নিশা’ কি তবে কবির কোনো ব্যক্তিগত প্রতারণা ও দীর্ঘশ্বাসের ওপর রূপকের প্রলেপ? হাজার বছর ধরে হেঁটে চলা পথিক শেষ পর্যন্ত ‘সব পাখি ঘরে আসে’র পর যেমন কেবলই মুখোমুখি অন্ধকার দেখে, তেমনই আমরাও সমস্ত উচ্ছ্বাস আর কাব্যিক মাতলামি শেষে মুখোমুখি হই এক শূন্য মানসিক ভৌগোলিকতার। ভালবাসাও যে কলসির জলের মতো একদিন ফুরিয়ে যেতে পারে তা আমরা মেনে নিতে পারি না। যার ভালবাসা স্বতঃসিদ্ধ ভেবে আমরা নিশ্চিত থাকি, একদিন অতর্কিতে তাকে হারিয়ে আমাদের আর মর্মপীড়ার অবধি থাকে না। হাতির পিঠে বসা রাজা আর সেই মাতালের গল্পের মতো; মাতালের নেশা ছুটিলে সে যেমন হেসে বলে; ‘হাতির খরিদ্দার চলিয়া গিয়াছে’। আমরাও তেমনি মাতাল, তবে হাতির খরিদ্দার কখন চলে যায় তা আর টের পাই না।
মেয়েটি হয়তো কোনোদিন তার সেই ডায়েরিতে পাতায় অন্য কারো নাম লিখবে, আপনমনে ‘অন্য গ্রহের চাঁদ’ গাইবে অন্য কারো জন্য। বিশ্ববিদ্যালয়ের চিরচেনা সেই রাস্তা ধরে কোনো একদিন আবার বৃষ্টি নামবে; কিন্তু যে মানুষটি তার সমস্ত আলো আপনার ভেতর ঢেলে দিয়ে হঠাৎ রাতদুপুরে নিখোঁজ হয়ে গেল, তার জন্য পড়ে থাকবে কেবল এক চির নির্জন দীর্ঘশ্বাস। বনলতা সেন হয়তো সত্যিই কোনো নারী ছিলেন না, তিনি ছিলেন
হাজার বছরের ক্লান্তি শেষে এক সাময়িক আশ্রয়। যেখানে বিষাদকে কিছুক্ষণের জন্য অর্থপূর্ণ মনে হয়। দুদন্ড শান্তি শেষে, সেই আকাঙ্ক্ষিত আশ্রয়টি ভেঙে গেলে আমাদের ভুল ভাঙে। আমরা আবিষ্কার করি, বনলতা সেন আসলে কখনো ছিলেন না।
About the Author
Saker Hossain Efaz (সাকির হোসেন ইফাজ)
মজদুরের নিয়মিত লেখকResearch Assistance, Public Hosting, Public Speaking
সাকির ইফাজ; উপস্থাপক, বাংলাদেশ বেতার। শিক্ষার্থী ও গবেষক, ইতিহাস বিভাগ; ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। Intern, Applied Democracy Lab; Dhaka University
প্রোফাইল দেখুন
মতামত
এখনও কোনো মতামত নেই।
প্রথম মতামতটি আপনিই দিন।
আলোচনায় অংশ নিতে লগ ইন করুন অথবা এ্যাকাউন্ট খুলুন