ধর্ম সম্বন্ধে বাঙালি মার্কসবাদী মহলে বহুক্ষেত্রেই বেশ একপেশে ধারণা প্রচলিত আছে। 'ধর্ম হল জনগণের জন্য আফিম' - মার্কসের এই মন্তব্যটিকে বিচ্ছিন্নভাবে, খন্ডিতভাব তুলে নিয়ে তার ভিত্তিতে একটা অসম্পূর্ণ ধারণা গড়ে তোলার চেষ্টা হয়। হেগেলের বিখ্যাত গ্রন্থ 'Philosophy of Right' এর যে সমালোচনা করেছিলেন মার্কস, ১৮৪৩ সালে, তার ভূমিকায় লিখিত মন্তব্য ছিল এটি। সেই একই লেখায় মার্কস ধর্ম সম্বন্ধে আরও অনেক গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য করেছিলেন, যেগুলো সম্বন্ধে আমরা সচেতন থাকি না। বাংলার অসাম্প্রদায়িক লোকায়ত সাধনচর্চা সম্বন্ধে আলোচনা করতে গেলে মার্কসের চিন্তা সম্বন্ধে একটা মোটামুটি ধারণা থাকা দরকার।
মার্কস প্রথমেই বলেছেন, "ভ্রান্তির স্বর্গীয় বেদী খণ্ডিত হয়ে যাওয়ার পরে সেটার অপবিত্র অস্তিত্ব অপদস্থ হয়ে যায়। মানুষ স্বর্গের উদ্ভট বাস্তবতার মধ্যে খুঁজেছিল একটা অতিমানব সত্তা, কিন্তু সেখানে দেখতে পেয়েছিল কেবল নিজেরই প্রতিচ্ছায়া। যেখানে মানুষ যথার্থ বাস্তবতা পেতে চায়, সেখানে কেবল নিজের অনুরূপতা দর্শন, একটা অমানুষ সত্তার সাক্ষাৎ পাওয়ার দিকে ঝুঁকতে দেয় না।" অর্থাৎ মৃত্যু-পরবর্তী জীবন মানুষের বাস্তব জীবনেরই একটা কল্পিত ভিন্নতর রূপ, এবং মার্কস সেটাকে খারিজ করার কথা বলেননি। তার পরের কথাগুলি সবিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। ধর্ম সম্বন্ধে মার্কস বলছেন, "It is a fantastic realisation of human essence since the human essence has not acquired true reality. The struggle against religion is therefore indirectly the struggle against that world whose whose spiritual aroma is religion." অর্থাৎ ধর্ম আমাদের সত্যিকারের রিয়েলিটি বুঝতে বাধা দিচ্ছে। ধর্মের বিরুদ্ধে নয়, বরং সেই জগতের বিধিবিধান ও দর্শনের বিরুদ্ধে লড়তে হবে, যে জগতের 'আধ্যাত্মিক সুরভি' হচ্ছে ধর্ম। "Religious suffering is at one and the same time, the expression of real suffering and the protest against real suffering." কারণ ধর্মচারের আড়ালে একধরণের যন্ত্রণা, অসহায়তা লুক্কায়িত থাকে। মার্কসের এই মন্তব্যটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এবং এরপরেই মার্কসের সেই বিখ্যাত উক্তি, "ধর্ম হল নিপীড়িত জীবের (creature) দীর্ঘশ্বাস, হৃদয়হীন জগতের হৃদয়, আত্মাবিহীন পরিবেশের আত্মা। ধর্ম হল জনগণের জন্য আফিমস্বরূপ।" উল্লেখ্য, আত্মা বলতে মার্কস বরাবর 'human spirit'-কে বুঝিয়েছেন। এইখানে ধর্মকে ঐতিহাসিক পরিপ্রেক্ষিতে স্থাপন করলেন মার্কস। ধর্ম শুধু কিছু অন্ধ আচার বা বিশ্বাস নয়, হৃদয়হীন পৃথিবীতে একটুখানি শুভবোধ, পাশাপাশি কঠিন যাতনাময় পরিস্থিতিতে আফিমের মতন আত্মার সুরভি, যা মানুষকে বুঁদ করে রাখে।
"The abolition of religion as the illusionary happiness of the people, it is actually the demand for their real happiness." অর্থাৎ, স্বপ্নাচ্ছন বা কাল্পনিক সুখকে ভাঙতে চাওয়া মানে মানুষের বাস্তব সুখ দাবি করা। তথাকথিত ধর্মের বিরুদ্ধে লড়াই মানে মানুষকে সত্যিকারের রিয়েলিটিতে আজই, এখনই, এখানে (পরপারে অন্য কোনো জগতে নয়) যুক্ত করে একটি বৈষম্যহীন, আনন্দময় সমাজকে সামনে রেখে অগ্রসর হওয়া। "To call on them to give up their illusions about their conditions is, to call on them to give up their condition that requires illusions." মার্কস আহ্বান করেছেন, ওই অবস্থাটা থেকে বেরিয়ে এসো যেখানে ইলিউশন প্রয়োজন হয়। তাই, "The criticism of religion is therefore in a embryo that criticism of that valley of tears of which religion is the hallow." বস্তুত অসাম্যই ধর্মকে টিকিয়ে রাখে। আফিম অর্থে মার্কসের কাছে ব্যথা সইয়ে নেওয়ার মলম। মলমের পেছনে না দৌড়ে ব্যথা যাতে না লাগে, ব্যথার কারণটা যাতে না থাকে, সেইটে নিশ্চিত করার কথা বলেছেন মার্কস।
এইবার মূল প্রসঙ্গে ঢোকা যাক। বাংলার লোকায়ত সমাজে প্রচলিত বহু মত ও পথ প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মীয় সংকীর্ণতা ও ভেদাভেদ অস্বীকার করে মানবতাবাদ ও সহিষ্ণুতার ওপর প্রতিষ্ঠিত। বাউল, কর্তাভজা, বলাহাড়ি, সহজিয়া প্রথার উপাসক সম্প্রদায়গুলি মূলত কোনো কঠোর সাম্প্রদায়িক সীমানায় আবদ্ধ ছিল না; বরং তারা ধর্মনিরপেক্ষ ও উদার মানসিকতার লোকায়ত ধারা বহন করেছিল। অধিকাংশ ক্ষেত্রে মানুষই এখানে শ্রেষ্ঠ উপাস্য, কোনো কাল্পনিক বা প্রাতিষ্ঠানিক ঈশ্বর নয়। জন্মভিত্তিক উচ্চ-নীচ বা ছুঁৎমার্গ সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছিল এই লোকায়ত ধারা। সমন্বয়কামিতা ছিল এই সাধনচর্চার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য। বহু ক্ষেত্রেই এই লোকায়ত সম্প্রদায়গুলি বস্তুবাদের খুব কাছাকাছি পৌঁছেছিল, যা তৎকালীন জাতপাত, অন্ধবিশ্বাস ও ধর্মীয়-জড়তা বিদীর্ণ সমাজে ছিল আক্ষরিক অর্থেই যুগান্তকারী।
সাহেবধনী সম্প্রদায় :- নদীয়া জেলার কৃষ্ণনগরের শালিগ্রামের বনে একদা একজন উদাসীন বাস করতেন। ঈশ্বর সাধনায় ও পরোপকার সাধনে তাঁর বিশেষ অনুরাগ ছিল। এনার নাম ছিল সাহেবধনী এবং তিনি জাতে মুসলমান ছিলেন। রঘুনাথ দাস, দুঃখিরাম পাল এবং জনৈক মুসলমান সর্বপ্রথম তাঁর শিষ্য হয়। তবে এই ধর্মের প্রধান সংগঠক ছিলেন হিন্দু গোয়ালা চরণ পাল। তাঁর সময়েই সাহেবধনী সম্প্রদায়ের বিস্তার ঘটে। 'দীননাথ' এদের উপাস্য। চরণ পালের একটি বিখ্যাত গান --
"মানুষে কোরো না ভেদাভেদ
করো ধর্মযাজন মানুষ ভজন
ছেড়ে দাও রে বেদ
মানুষ সত্য তত্ত্ব জেনে মানুষের উদ্দেশ্যে ফেরো
ঘটে পটে দিও না রে মন
পান করো সদা প্রেমসুধা অমূল্য রতন।"
চরণ পালের শিষ্য ছিলেন কুবির গোঁসাই। তিনি এই সম্প্রদায়ের প্রধান গীতিকার। কুবির কবিদার নামেও পরিচিত ছিলেন। তিনি গাইলেন --
"তলা তল পাতাল খুঁজে পাবি নাকো রতন ধন
মানুষ হয়ে মানুষ মানো
মানুষ হয়ে মানুষ জানো
মানুষ হয়ে মানুষ চেনো
মানুষ রতন ধন।"
কর্তাভজা সম্প্রদায় :- এদের আদিগুরু ছিলেন আউলেচাঁদ নামে এক মুসলমান ফকির। ১৬৯১ শকাব্দে তাঁর মৃত্যুর পরে রামশরণ-সহ আউলের প্রধান বাইশ জন শিষ্য তাঁর ভাবনা ছড়িয়ে দিতে মুখ্য ভূমিকা পালন করেন। সমাজের ইতর লোকেরাই এই ধর্মমত প্রচার করেছিল। রামশরণের স্ত্রী সরস্বতী এদের 'সতী মা'। রামশরণ ও সরস্বতীর সন্তান দুলালচাঁদের সময়ে কর্তাভজারা প্রতিষ্ঠা পায়। দুলালচাঁদই কর্তাভজাদের প্রধান গীতিকার ও অন্যতম গুরু। সম্প্রদায়ের মানুষ দুলালচাঁদকে 'শ্রীযুত' নামে অভিহিত করেন। দুলালচাঁদের বিখ্যাত গান -- "ভেদ নাই মানুষে মানুষে
খেদ কেন করো দেশে দেশে
আছে কর্তাভজা আর এক মজা সত্য উপাসনা
বেদ বিধিতে নাইকো তার ঠিকানা
সে সব চতুরের কারখানা।"
মারফতি সম্প্রদায় :- এই সাধক গোষ্ঠী বাহ্যিক আচার সর্বস্ব ধর্মের বাইরে অন্তরের উপলব্ধির ওপর গুরুত্ব দিয়েছিল। 'মারফত' মানে পরম প্রজ্ঞা। মারফতি ফকিররা সংসার ও প্রচলিত সমাজজীবনের নিয়ম মানেননি। এঁরা সম্পূর্ণত নিরহংকারী ও প্রচারবিমুখ জীবনযাপন করেন। জাতি, ধর্ম, গোত্রভেদের ঊর্দ্ধে মানবপ্রেমের কথা প্রচার করে এই সম্প্রদায়। মারফতি গানই এই দর্শনের মূল মাধ্যম। যেমন --
"বামুন বলে ভিন্ন জাতি
সৃষ্টি কি করেন প্রকৃতি?
তবে কেন জাতের বজ্জাতি কর এখন ভাই?
বল্লাল সেন শয়তানি দাগায়
গোত্র জাত সৃষ্টি করে যায়
বেদান্তে আছে কোথায় আমরা দেখি নাই।"
বলাহাড়ি সম্প্রদায় :- এদের গুরু বলরামের জন্ম নদীয়া জেলার মেহেরপুর গ্রামে, ১৭৮৫ সালে। বলরাম অন্ত্যজ শ্রেণীর হাড়ি, মালো, ডোম, বাগদী, বেদে, নমঃশূদ্র, মাহিষ্য ও মুসলমানদের নিয়ে নিয়ে নিজের ধর্মমত ও সম্প্রদায় গড়ে তোলেন। বলাহাড়ি শিষ্যদের কাছে তিনি 'হাড়িরাম'। যেসকল নিচু জাতির মানুষের ওপর উচ্চবর্ণের অত্যাচার নেমে আসত তাদের আশ্রয় হয়ে উঠেছিল বলাহাড়ি ধর্ম। বলরাম বলতেন, "যা দেখিনি নয়নে, তা ভজিব কেমনে?"
পাগল দ্বিজদাস :- ইহজাগতিকতায় বিশ্বাসী, উনিশ শতকের প্রসিদ্ধ লোককবি ছিলেন পাগল দ্বিজদাস। আসল নাম বৈকুণ্ঠনাথ, নরসিংদীর ব্রাহ্মণ। ব্রাহ্মণ্য উচ্চমন্যতা পরিহার করে, সামাজিক অবস্থান থেকে নেমে এসে কৃষকের দুঃখ মর্মে অনুভব করেই সকল মানুষের জন্য অভিন্ন ধর্মের সন্ধান করেছিলেন। তাঁর বিখ্যাত একটি গানের কিছু অংশ উদার ধর্মনিরপেক্ষতার প্রবাদ-স্বরূপ -
"বেদ কোরান বাইবেল আদি যতই ইতি পুঁথি
মানি বলেই মোদের এত দুর্গতি
মানতে মানতে শাস্ত্র, না পাই অন্নবস্ত্র
ঘটিবাটি লাঠি বেচে কর্মে দিচ্ছে দান
পাগল দ্বিজদাসের গান।"
পাগলপন্থী বিদ্রোহ :- পাগলপন্থী মতবাদের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন করম শাহ। তাঁর বাবা শের আলি গাজি ছিলেন উত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চলের গড়জরিপা আর দশকাহনিয়ার জমিদার। এই শের আলির থেকেই শেরপুর শহরের নামকরণ হয়েছে। অন্য এক জমিদার ষড়যন্ত্র করে তাঁর জমিদারি দখল করে নিয়েছিলেন। সর্বস্বান্ত অবস্থায় মৃত্যু ঘটেছিল তাঁর। শের আলি মারা গেলে তাঁর ছেলে করম শাহ ১৭৭৫ সালে, নিজের মাকে নিয়ে সুসঙ্গ পরগণায় গারো পাহাড়ের পাদদেশের শালকোনা গ্রামে চলে আসেন। সেখানে জীবন কাটাতে থাকেন উদাসীন সাধকের মতো। তাঁর আধ্যাত্মিক সাধনার খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে দূর-দূরান্তে, প্রচুর ভক্ত-অনুগামীও আসতে থাকে। করম শাহ পরিচিত হয়ে ওঠেন করম পাগল নামে, আর তাঁর অনুগামদের সবাই পাগলপন্থী বলে ডাকতে থাকে। করম শাহ হিন্দু, মুসলিম, গারো, হাজংদের সমতাবাদী আদর্শে দীক্ষিত করেন। তিনি সাম্যবাদী আদর্শ প্রচার করে বলেছিলেন - সকল মানুষই ঈশ্বরের সৃষ্টি, কেউ কারও অধীন নয়। সুতরাং উচ্চনীচ ভেদ অসংগত। এই আদর্শ হিন্দুধর্ম, সুফিবাদ এবং অ্যানিমিজমের সমন্বিত সংমিশ্রণ অনুসরণ করে। পাগলপন্থা লোকায়ত সাম্যভাব এবং ভূমিহীন কৃষকদের অধিকারের সপক্ষে জনমত গঠন করেছিল। করম শাহের ছেলে টিপু শাহ বাবার মতোই আধ্যাত্মিক জীবন বেছে নিয়েছিলেন।
১৮২০ সালে শেরপুরের জমিদারির ভাগ বাঁটোয়ারা হয়। শরিকরা নিজেদের মধ্যে জড়িয়ে পড়েন মামলায়। সেই মামলার খরচ তুলতে প্রজাদের ওপর বসানো হয় আবওয়াব, মাথটের মতো সব নতুন ধরণের কর। রাজস্বের পরিমাণও বাড়িয়ে দেওয়া হয়। এর ফলে নাভিশ্বাস উঠতে থাকে কৃষকদের। খাজনা আদায়ের জন্য জমিদারের পাইক-পেয়াদা-বরকন্দাজরা অত্যাচার শুরু করে। খাজনা ঠিক সময়ে দিত না পারলে এরা চাষিদের বন্দি করত, এমনকি পুড়িয়ে দিত তাদের বাড়িঘর। কিছু চাষি পালিয়ে যায়, আর বেশিরভাগ কৃষক অত্যাচার সইতে না পেরে বিদ্রোহী হয়ে ওঠে। এই বিদ্রোহী চাষিদের নেতৃত্ব দিতে এগিয়ে আসেন টিপু শাহ। হিন্দু-মুসলমান সব ধর্মের কৃষকরাই আধ্যাত্মিক সাধক টিপুকে ভক্তিশ্রদ্ধা করত। ১৮১৩ সালে করম শাহের মৃত্যুর পরে টিপু পাগলাই পাগলপন্থীদের প্রধান নেতা হয়ে উঠেছিলেন। চাষিদের একটা বড় অংশ টিপুর কথা মতো খাজনা দেওয়া বন্ধ করে দেয়। টিপু প্রশ্ন তুলেছিলেন - আল্লার দুনিয়ায় সকলেই যেখানে সমান, সেখানে তালুকদারকে কেন জমির খাজনা দিতে হবে? জমিদারের পাইক-পেয়াদা-বরকন্দাজ দের সঙ্গে এদের রক্তক্ষয়ী লড়াই চলতে থাকে। তখন ১৮২৪-২৫ সাল।
এরই মধ্যে টিপু একদিন হাজার হাজার দলবল নিয়ে জমিদারবাড়ি আক্রমণ করলেন। চলল ব্যাপক লুঠপাঠ, অগ্নিসংযোগ। জমিদাররা পালিয়ে গিয়ে আশ্রয় নিলেন কালীগঞ্জের জয়েন্ট ম্যাজিস্ট্রেট ড্যাম্পিয়ারের কাছাড়িবাড়িতে। এদিকে টিপু পাগলা গড়জরিপার দুর্গকে নিজের বাসস্থান করে নিলেন। পাগলপন্থীরা শেরপুর দখল করে নিজেদের স্বাধীন রাজ্য স্থাপনের ঘোষণা করে। টিপু হয়ে ওঠেন তাদের রাজা। টিপুর উদ্যোগে তৈরি হয় নিজস্ব শাসন ও বিচারব্যবস্থা। এই স্বাধীন রাজ্যে কৃষকদের খাজনা দিতে হত না, এবং জমির ওপর সকল কৃষকের সমান অধিকার ছিল। লোকায়তিক ভাবনা বাস্তব রূপ নিয়েছিল বাংলার এক ছোট্ট ভূখণ্ডে। কৃষকদের এই স্বাধীন রাষ্ট্র মোটামুটি দু’বছর টিকে ছিল।
ইংরেজ শাসকরা এইরকম স্বাধীন কৃষকরাজ্যেকে কখনও মেনে নিতে চাইনি। কোম্পানির সৈন্যরা শেরপুর পুররুদ্ধার করার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছিল। পাগলপন্থীদের সঙ্গে ভয়ংকর যুদ্ধ হয় তাদের। অবশেষে ১৮২৭ সালে টিপু আর কয়েকজন পাগলপন্থীকে গ্রেপ্তার করে ব্রিটিশ সেনা। ময়মনসিংহ সেশন জজ আদালত তাঁকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের শাস্তি দেয়। কারাগারের মধ্যেই ১৮৫২ সালে মারা যান টিপু শাহ। টিপু পাগল ধরা পড়লে কিন্তু পাগলপন্থীদের বিদ্রোহ থেমে যায়নি। ‘মা সাহেবা’ নামে পরিচিত টিপুর বিধবা মা আন্দোলনের নেতৃত্ব দিতে থাকেন। হঠাৎ করে জমিদারবাড়িতে হামলা, আগুন লাগিয়ে দেওয়া, লুঠপাট চলতে থাকে। ইংরেজ শাসকও পাল্টা নির্যাতন শুরু করে চাষিদের ওপর। এরই মধ্যে ময়মনসিংহের নানা অঞ্চলে কৃষকরা বিচ্ছিন্নভাবে অভ্যূত্থান চালিয়ে যায়। ১৮৫৭ সালে মহাবিদ্রোহ শুরু হলে এই সব আঞ্চলিক কৃষক বিদ্রোহ তার সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়। ১৮৭০ সালের ঐতিহাসিক প্যারি কমিউনের কথা আমরা সবাই জানি। কিন্তু কমিউনের প্রায় ৫০ বছর আগে, ১৮২৫ সালে, এই বাংলারই মাটিতে সাম্যবাদী আদর্শে গড়ে ওঠা স্বাধীন শেরপুর রাজ্যের ইতিহাস সম্বন্ধে কতটুকুই বা চর্চা হয়েছে?
সহায়ক গ্রন্থ:-
∆'ভারতে হিন্দু মুসলমানের যুক্ত সাধনা', ক্ষিতিমোহন সেন।
∆ 'ভারতবর্ষীয় উপাসক সম্প্রদায়', অক্ষয়কুমার দত্ত।
∆ 'ভারতীয় সাধনায় ঐক্য', শশীভূষণ দাশগুপ্ত।
∆ 'বাংলার লৌকিক ধর্মাচারের ঐতিহ্য সন্ধানে', অলোক মৈত্র।
About the Author
অন্বেষ বন্দ্যোপাধ্যায়
মজদুরের নিয়মিত লেখকJob as a content writer in a media house
গবেষক। প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তনী। আগ্রহের বিষয় : বাংলা সাহিত্য আন্দোলন, মার্কসবাদ, চার্বাক ও লোকায়ত দর্শন। ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী)-র দলীয় সদস্য। ভারতীয় গণনাট্য সংঘ এবং পশ্চিমবঙ্গ ইতিহাস সংসদের আজীবন সদস্য।
প্রোফাইল দেখুন
মতামত
এখনও কোনো মতামত নেই।
প্রথম মতামতটি আপনিই দিন।
আলোচনায় অংশ নিতে লগ ইন করুন অথবা এ্যাকাউন্ট খুলুন