স্কুলজীবনে বাংলা পাঠ্যবইয়ে কত রকমের গল্প পড়েছি। প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে কলেজ পর্যন্ত। পঞ্চম, ষষ্ঠ কিংবা সপ্তম শ্রেণির অনেক কিছুই এখন আর মনে নেই। কিন্তু পরের দিকের মহেশ, হৈমন্তী, বিলাসী, লালসালু, পদ্মা নদীর মাঝি মনে আছে। হুমায়ূন আহমেদের লেখা ছিল, প্রমথ চৌধুরীর লেখা ছিল। স্কুল ও কলেজজীবনের প্রতিটি ধাপে কবিতা ছিল।
আর আমি প্রায়ই ভাবতাম, এগুলো এখানে কেন?
আমার কবিতা পড়ার দরকার কী? মানুষ, আবেগ, দুঃখ-কষ্ট, সমাজ আর নানা গভীর অর্থ নিয়ে লেখা এই গল্পগুলো আমাকে পড়তে হবে কেন?
সাহিত্যকে এভাবে ভাবার সুযোগ আমার কখনো হয়নি, কারণ কেউ আমাকে সেভাবে ভাবতে শেখায়নি।
শিক্ষকেরা গল্পগুলো পড়াতেন পরীক্ষার বিষয় হিসেবে। প্রশ্ন আসত, “গল্পটির গভীর তাৎপর্য কী?” কিন্তু সেই গভীর তাৎপর্যেরও একটি নির্দিষ্ট, সঠিক উত্তর থাকত। আমাদের সেটিই লিখতে হতো।
এখন পেছনে ফিরে তাকালে মনে হয়, সেই তথাকথিত গভীর তাৎপর্যগুলো আসলে খুব গভীর কিছু ছিল না।
বেশিরভাগ সময় আমরা গল্প বা কবিতা পড়তাম, তারপর গাইডবই থেকে প্রশ্নের উত্তর মুখস্থ করতাম। কোনো বাংলা স্যার বা ম্যাডামকে খুব একটা মনে পড়ে না, যিনি আমাদের সঙ্গে বসে জিজ্ঞেস করেছেন:
এই গল্পটি আসলে কী বলতে চাইছে?
চরিত্রটি এমন আচরণ করল কেন?
তুমি কি তার সঙ্গে একমত?
এই গল্প সমাজ সম্পর্কে আমাদের কী বলে?
এটিকে কি অন্যভাবে ব্যাখ্যা করা যায়?
তারপর এলো সৃজনশীল প্রশ্ন।
এই পদ্ধতির উদ্দেশ্য ছিল মুখস্থ করার বদলে বিষয়টি বুঝতে শেখানো।
আমরা কী করলাম?
সৃজনশীল প্রশ্নের উত্তর কীভাবে লিখতে হয়, তা শেখার জন্য গাইডবই কিনলাম।
প্রশ্ন বদলাল, কিন্তু আমাদের শেখার পদ্ধতি বদলাল না। সাহিত্য সম্পর্কে গভীর বোঝাপড়া তৈরি করার বদলে পুরো ব্যবস্থাটি নম্বর পাওয়ার আরেকটি সূত্র তৈরি করল।
আজকের রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবেশের দিকে তাকালে এই ব্যর্থতাটি আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ধর্মীয় উগ্রবাদ, নারীবিদ্বেষ, নারীবাদের প্রতি ঘৃণা, অসহিষ্ণুতা, সামাজিক বিভাজন এবং অনলাইনে মানুষের প্রতি মানুষের চরম সহমর্মিতাহীনতা দেখি।
অথচ এসব মোকাবিলা করার উপকরণ আমাদের হাতে ছিল।
সেগুলো আমাদের পাঠ্যবইয়েই ছিল।
কারও সন্তান অপহৃত হয়, আর মানুষ শুধু সেই শিশুর বাবা বা মাকে অপছন্দ করে বলে ঘটনাটি নিয়েও হাসার উপায় খুঁজে পায়।
তাহলে মহেশ থেকে আমরা কী শিখেছিলাম?
একটি অসহায় প্রাণীর ক্ষুধা, তৃষ্ণা ও মৃত্যু দিয়ে শরৎচন্দ্র শুধু একটি গরুর গল্প বলেননি। তিনি দেখিয়েছেন দারিদ্র্য কীভাবে মানুষকে কোণঠাসা করে, ক্ষমতাবান সমাজ কীভাবে দুর্বলের শেষ আশ্রয়টুকুও কেড়ে নেয়, আর দীর্ঘদিনের অপমান ও অসহায়তা কীভাবে একজন মানুষকে নিজের ভালোবাসার জিনিসটির বিরুদ্ধেই সহিংস করে তুলতে পারে। আমরা যদি সেই গল্প পড়েও বিপন্ন মানুষের কষ্টে হাসতে পারি, তাহলে গল্পটির কাহিনি হয়তো মনে রেখেছি, কিন্তু তার ভেতরের মানুষটিকে চিনতে শিখিনি।
আমরা ধর্মীয় উগ্রবাদ দেখি। ধর্মীয় কর্তৃত্ব ব্যবহার করে মানুষকে ভয় দেখানো, প্রতারিত করা এবং নিয়ন্ত্রণ করা দেখি।
তাহলে লালসালু থেকে আমরা কী শিখেছিলাম?
মজিদ শুধু একটি উপন্যাসের চরিত্র নয়। সে জানে মানুষের ভয় কোথায়, বিশ্বাস কোথায়, অজ্ঞতা কোথায়। সে ধর্মকে বিশ্বাসের জায়গায় রাখে না; ক্ষমতার হাতিয়ার বানায়। একটি কবরকে কেন্দ্র করে সে এমন একটি বয়ান তৈরি করে, যার সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার সাহস কারও থাকে না।
আমরা কি আলোচনা করেছিলাম, ধর্মীয় বিশ্বাস আর ধর্মীয় কর্তৃত্ব এক জিনিস নয়? আমরা কি শিখেছিলাম, পবিত্র ভাষা ব্যবহার করলেই কারও উদ্দেশ্য পবিত্র হয়ে যায় না? যারা প্রশ্ন করতে নিষেধ করে, তারা কেন প্রশ্নকে এত ভয় পায়?
নাকি আমরা শুধু মজিদের চরিত্রচিত্রণ মুখস্থ করেছিলাম?
চারদিকে নারীবিদ্বেষ আর নারীবাদের প্রতি ঘৃণা দেখি।
তাহলে হৈমন্তী থেকে আমরা কী শিখেছিলাম?
আমরা জানতাম, গল্পের কথক একজন কাপুরুষ। কিন্তু আমরা কি সত্যিই আলোচনা করেছিলাম, সে কেন কাপুরুষ? সে তার স্ত্রীকে ভালোবাসত, অথচ পরিবার ও সমাজের সামনে তার হয়ে দাঁড়াতে পারেনি। তার ব্যক্তিগত অনুভূতির মূল্য খুব সামান্য ছিল, কারণ সেই অনুভূতিকে কাজে পরিণত করার সাহস তার ছিল না।
হৈমন্তী মারা যায়। জীবন চলতে থাকে। এমনকি যে মানুষটি তাকে ভালোবাসার দাবি করেছিল, সেও সেই সামাজিক ব্যবস্থার ভেতর আটকে থাকে, যে ব্যবস্থা হৈমন্তীকে ধ্বংস করেছিল।
সেখানে পিতৃতন্ত্র, লিঙ্গ, পরিবার, সামাজিক চাপ, কাপুরুষতা ও দায়িত্ব নিয়ে কত কিছু আলোচনা করা যেত। কাউকে ভালোবাসা আর সত্যিকার অর্থে তার পাশে দাঁড়ানোর মধ্যে যে বিশাল পার্থক্য, সেটি নিয়েও কথা বলা যেত।
সেই কথোপকথনগুলোই আমাদের নারীবাদ ও লিঙ্গসমতার প্রথম পাঠ হতে পারত। স্লোগান হিসেবে নয়, মানুষের জীবনের প্রশ্ন হিসেবে।
তারপর ছিল বিলাসী।
এখন গল্পটির যে বিষয়টি আমার সবচেয়ে বেশি মনে পড়ে, তা হলো এর কেন্দ্রে থাকা সম্পর্ক। সব সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটের নিচে সেখানে দুজন মানুষ আছে, যারা সত্যিই একে অপরের যত্ন নেয়। তাদের জীবন জাঁকজমকপূর্ণ নয়। তারা দরিদ্র। তাদের একসঙ্গে কাটানো জীবন খুবই সাধারণ। কিন্তু তাদের মধ্যে ভালোবাসা ও সম্মান আছে।
একজন কিশোর বা কিশোরীকে এটি সম্পর্ক সম্পর্কে কী শেখাতে পারত?
দাম্পত্যে সম্মান বলতে কী বোঝায়?
কোন জিনিস একটি সম্পর্ককে মূল্যবান করে?
কে কাকে ভালোবাসতে পারবে, তা ঠিক করা নিয়ে সমাজের এত মাথাব্যথা কেন?
একটি সম্পর্কের মর্যাদা কি সামাজিক অনুমোদন থেকে আসে, নাকি সেই সম্পর্কের মানুষেরা একে অপরের সঙ্গে কেমন আচরণ করে, সেখান থেকে আসে?
এগুলো ছোট প্রশ্ন নয়।
আমাদের কবিতাও ছিল। কবিতা শেখাতে পারত, ভাষা সরল কোনো যন্ত্র নয়। একটি বাক্যের অর্থ শুধু অভিধানের শব্দার্থে থাকে না। অর্থ নির্ভর করে কে কথাটি বলছে, কখন বলছে, কাকে বলছে, কোন পরিস্থিতিতে বলছে এবং কেন বলছে তার ওপর।
রক্তাক্ত প্রান্তর–এর সেই বিখ্যাত লাইনগুলোর কথাই ধরা যাক:
মানুষ মরে গেলে পঁচে যায়,
বেঁচে থাকলে বদলায়,
কারণে-অকারণে বদলায়,
সকালে-বিকেলে বদলায়!
লাইনগুলো এমনভাবে উদ্ধৃত করা হয়, যেন এগুলোর সহজ অর্থ শুধু এই যে মানুষ বদলায়। কিন্তু প্রেক্ষাপট বাদ দিলে কোনো বাক্যের অর্থই সম্পূর্ণ থাকে না। কে কথাটি বলছে, কোন পরিস্থিতিতে বলছে এবং কেন বলছে, তা জানলে একই বাক্য নতুন অর্থ নিতে পারে।
এটিও মিডিয়া লিটারেসি।
আর এখন আমাদের এই সক্ষমতাটিই ভীষণ দরকার।
আমরা এমন এক সময়ে বাস করছি, যখন বিদ্রূপকে আক্ষরিক অর্থে নেওয়া হয়। ব্যঙ্গ থেকে প্রেক্ষাপট ছেঁটে ফেলা হয়। সম্পাদিত ভিডিও ক্লিপ প্রমাণ হয়ে ওঠে। তথ্যের চেয়ে বয়ান দ্রুত ছড়ায়। আবেগের ওপর ভর করে বলা গল্প হাজার হাজার মানুষকে প্রভাবিত করে ফেলে, কেউ একবার থেমে জিজ্ঞেস করার আগেই যে ঘটনাটি আদৌ সত্য কি না।
সাহিত্য আমাদের শেখাতে পারত বয়ান কীভাবে কাজ করে।
কে গল্পটি বলছে?
কার দৃষ্টিভঙ্গি এখানে অনুপস্থিত?
আমি এই চরিত্রটির প্রতি সহানুভূতিশীল কেন?
ওই চরিত্রটিকে ঘৃণা করছি কেন?
কথক কি বিশ্বাসযোগ্য?
আমি নিজের ভেতর থেকে কী ধরনের পূর্বধারণা নিয়ে আসছি?
লেখক আসলে কিসের সমালোচনা করছেন?
একই তথ্য ব্যবহার করে কি সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি বয়ান দাঁড় করানো সম্ভব?
এই প্রশ্নগুলো শুধু সাহিত্যকক্ষের জন্য নয়। আজ ফেসবুক স্ক্রল করার সময়ও আমাদের ঠিক এই প্রশ্নগুলোই করা দরকার।
কিন্তু আমরা সাহিত্যকে প্রায় গণিতের মতো করে ফেলেছিলাম।
প্রশ্ন। সূত্র। উত্তর। নম্বর।
গণিত ও বিজ্ঞানে সঠিক উত্তর নিশ্চিত করতে আমরা কত শিক্ষক আর গৃহশিক্ষকের পেছনে ছুটেছি। তার সামান্য কম সময় যদি সেখানে ব্যয় করতাম, আর সামান্য বেশি সময় যদি সাহিত্যকে সত্যিই বোঝার চেষ্টা করতাম, তাহলে আমরা যে অবশ্যই আরও বুদ্ধিমান মানুষ হতাম, তা নয়।
কিন্তু হয়তো আমরা আরও ভালো মানুষ হতে পারতাম।
হয়তো মহেশ পড়ে আমরা দুর্বল মানুষের যন্ত্রণাকে উপহাস করার আগে থামতাম।
হয়তো লালসালু পড়ে ধর্মের ভাষায় উচ্চারিত প্রতিটি ক্ষমতার দাবিকে অন্ধভাবে মেনে নেওয়ার আগে প্রশ্ন করতাম।
হয়তো হৈমন্তী পড়ে বুঝতাম, মনে মনে কাউকে ভালোবাসা যথেষ্ট নয়; অন্যায়ের মুখে তার পাশে দাঁড়ানোর সাহসও দরকার।
হয়তো বিলাসী পড়ে শিখতাম, মানুষের সম্পর্কের মূল্য সামাজিক পরিচয়, অর্থ বা অনুমোদনে নয়; ভালোবাসা, যত্ন ও সম্মানে।
আর আমি মনে করি না, এই সমস্যা শুধু বাংলাদেশের।
শিক্ষাকে আমরা যেভাবে ভাবি, তার মধ্যে কোথাও একটি মৌলিক সমস্যা আছে। এর জন্য পুঁজিবাদ দায়ী কি না, পরীক্ষা পদ্ধতি দায়ী কি না, আমাদের প্রতিষ্ঠানগুলো দায়ী কি না, নাকি সবকিছুরই কিছুটা ভূমিকা আছে, আমি জানি না।
এর সমাধানে কী আহ্বান জানানো উচিত, তাও জানি না।
আমি শুধু জানি, কোনো এক সময়ে শিক্ষা মূলত শেখার বিষয় থাকা বন্ধ হয়ে গেছে। তা হয়ে উঠেছে অন্য কোথাও পৌঁছানোর একটি হাতিয়ার।
নম্বর পাওয়ার জন্য পড়ো।
ভালো বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার জন্য নম্বর পাও।
ডিগ্রি পাওয়ার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে যাও।
চাকরি পাওয়ার জন্য ডিগ্রি নাও।
টাকা উপার্জনের জন্য চাকরি করো।
সেই বিশাল যন্ত্রের ভেতর কোথাও আমরা খুব সহজ একটি প্রশ্ন করতে ভুলে গেছি:
শিক্ষা আমাদের কেমন মানুষ হয়ে উঠতে সাহায্য করার কথা?
আমি আশা করি, কোনো একদিন এর পরিবর্তন হবে।
আজ সেই দিন নয়।
এ ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই।
মতামত
এখনও কোনো মতামত নেই।
প্রথম মতামতটি আপনিই দিন।
আলোচনায় অংশ নিতে লগ ইন করুন অথবা এ্যাকাউন্ট খুলুন