"পৃথিবীটা নাকি ছোট হতে হতে স্যাটেলাইট আর ক্যাবলের হাতে ড্রয়িংরুমে রাখা বোকা বাক্সতে বন্দি!"
মহীনের ঘোড়াগুলির এই তুমুল জনপ্রিয় এবং চিরচেনা সুর যখন আজ থেকে কয়েক দশক আগে হাওয়ায় ভেসেছিল, তখন হয়তো এর ভবিষ্যৎ বাস্তবতা আমরা কেউ খুব একটা গায়ে মাখিনি। কিন্তু আজকের দিনে দাঁড়িয়ে গানটি আর স্রেফ নস্টালজিয়ায় আটকে নেই; এটি পরিণত হয়েছে আমাদের উত্তর-আধুনিক বাস্তবতার এক নির্মম নিখুঁত দলিলে। ফাইবার অপটিক্যাল ক্যাবল, ৫জি আর অ্যালগরিদমের মায়াজালে পৃথিবী আজ হাতের তালুতে বন্দি। আপাতদৃষ্টে আমরা ইতিহাসের সবচেয়ে ‘সংযুক্ত’ বা 'কানেক্টেড' প্রজাকুল। অথচ, উইন্ডোর কাচে জমে থাকা ধূসর কুয়াশার মতো এই আপাত-সংযোগের পেছনের সত্যটি হলো এক ভয়াবহ ও নিরেট একাকিত্ব।
আজকের সমাজ এক নিঃশব্দ, অদৃশ্য মনস্তাত্ত্বিক ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে আছে; যার মূল চালিকাশক্তি ‘নিউলিবারেলিজম’ বা নব্য-উদারবাদ। যেখানে নিঃসঙ্গতা বা এলিয়েনেশন (Alienation) কেবল কোনো মনস্তাত্ত্বিক সমস্যা বা ব্যক্তিগত বিষণ্নতা নয়; এটি আধুনিক পুঁজিবাদী পৃথিবীর এক পরিকল্পিত, লাভজনক এবং সুসংগঠিত ‘political economy’ বা রাজনৈতিক অর্থনীতি।
কাঠামোগত ব্যর্থতা বনাম ব্যক্তিগত দায়
ফ্রানৎস কাফকা তাঁর ডায়েরিতে লিখেছিলেন, “All human errors are impatience, a premature renunciation of method, a delusion of a cause.” নব্য-উদারবাদী ব্যবস্থা ঠিক এই কাজটিই করে। সে মানুষের অন্তরের গভীর শূন্যতাকে তার নিজের ‘ব্যক্তিগত ব্যর্থতা’ হিসেবে চিহ্নিত করে। চাকরি না পাওয়া থেকে শুরু করে বান্ধবহীনতা, সবকিছুর দায় গিয়ে পড়ে ব্যক্তির ওপর। কাঠামোগত বৈষম্য, অনিশ্চিত শ্রমবাজার, সামাজিক নিরাপত্তাহীনতা কিংবা ক্রমবর্ধমান প্রতিযোগিতাকে আড়াল করে সমস্ত দায় চাপিয়ে দেওয়া হয় ব্যক্তির কাঁধে। ফলে মানুষ কেবল একা হয় না; নিজের একাকিত্বের জন্য নিজেকেই অভিযুক্ত করতে শেখে।
নিউলিবারেলিজমের মূল দর্শনই হলোযৌথতাকে চূর্ণবিচূর্ণ করা। মনে পড়ে, ১৯৮৭ সালে মার্গারেট থ্যাচার যখন বলেছিলেন; “There is no such thing as society. There are individual men and women, and there are families” তখন তা কেবলই একটি রাজনৈতিক বক্তব্য ছিল না। তিনি রীতিমতো পরবর্তী চার দশকের অর্থনীতির ব্লু-প্রিন্ট এঁকে দিয়েছিলেন। সমাজকে যখন ছোট ছোট বিচ্ছিন্ন ব্যক্তিসত্তায় (Atomized Individuals) ভাগ করে ফেলা যায়, তখন যৌথ প্রতিবাদের সম্ভাবনা ধ্বংস হয়।
মার্ক ফিশার তাঁর Capitalist Realism গ্রন্থে লিখেছিলেন, ‘আজকের পুঁজিবাদের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো এটি মানুষকে বিশ্বাস করাতে সক্ষম হয়েছে যে মানসিক সংকট আসলে ব্যক্তিগত সমস্যা, সামাজিক নয়।’ ফলে হতাশা কিংবা একাকিত্ব আর রাজনৈতিক প্রশ্ন হিসেবে সামনে আসে না; এটি চিকিৎসা বিজ্ঞানের বিষয় হয়ে ওঠে। আর এই রূপান্তরের ভেতরেই লুকিয়ে থাকে নিঃসঙ্গতার মূল রাজনৈতিক অর্থনীতি। কারণ একজন বিচ্ছিন্ন মানুষকে সংগঠিত করা কঠিন। যে মানুষ নিজের ব্যর্থতা নিয়ে ব্যস্ত, সে প্রশ্ন তোলে না কেন মুদ্রাস্ফীতি এত বেশি, কেন তার কাজ অনিশ্চিত, কেন তার বাসস্থান ব্যয়বহুল, কিংবা কেন তার জীবন ক্রমশ আরও প্রতিযোগিতামূলক হয়ে উঠছে। নিঃসঙ্গতা তাই কেবল মানসিক অবস্থা নয়; এটি রাজনৈতিক সম্ভাবনাকেও ক্ষয় করে।
শ্রমের রূপান্তর ও সম্পর্কের এলিয়েনেশন
কার্ল মার্ক্স শিল্পবিপ্লবের যুগে শ্রমিকের যে 'Alienation' বা বিচ্ছিন্নতার ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন, ডিজিটাল পুঁজিবাদ তাকে আরও সূক্ষ্ম করেছে। কারখানার শ্রমিক কেবল তার শ্রমের ফল থেকেই বিচ্ছিন্ন ছিল না, বরং আজকের ডিজিটাল যুগের 'জ্ঞান-শ্রমিক' বা ফ্রিল্যান্সারও তার চারপাশের মানুষ, সমাজ, এমনকি নিজের অস্তিত্ব থেকে বিচ্ছিন্ন।
আজ মানুষ কারখানায় না থেকেও বিচ্ছিন্ন হতে পারে। সে সারাদিন অনলাইনে থেকেও সম্পর্কহীন থাকতে পারে। তার হাজার অনুসারী থাকতে পারে, কিন্তু সংকটের মুহূর্তে পাশে দাঁড়ানোর মতো একজন মানুষও নাও থাকতে পারে। আর এই বিচ্ছিন্নতার সবচেয়ে ভয়াবহ দিক হলো; এটি এখন পুঁজির জন্য মারাত্মক লাভজনক। প্রকৃতপক্ষে নিঃসঙ্গতা কোনো ব্যক্তিগত সীমাবদ্ধতা নয়। এটি একটি নির্দিষ্ট অর্থনৈতিক ব্যবস্থারই যৌক্তিক ফল।
মনোযোগের বাজার ও নিয়ন্ত্রণকারী সমাজ
একসময় পুঁজিবাদের প্রধান সম্পদ ছিল জমি, পরে শিল্প, তারপর কারখানা, তারপর তথ্য। একবিংশ শতাব্দীতে এসে পুঁজিবাদের সবচেয়ে বড় সম্পদ হলো মানুষের মনোযোগ (Attention Economy)। অর্থনীতিবিদ হার্বার্ট সাইমন বহু আগেই সতর্ক করেছিলেন, তথ্যের আধিক্য শেষ পর্যন্ত মনোযোগের ঘাটতি তৈরি করে। আজ সেই ভবিষ্যদ্বাণী বাস্তব। আমাদের সময়ে সবচেয়ে দুষ্প্রাপ্য সম্পদ তেল, স্বর্ণ কিংবা শ্রম নয় বরঞ্চ মানুষের অবিভক্ত মনোযোগ।
সুতরাং বর্তমান পুঁজিবাদের চরিত্রও বদলেছে। এটি কেবল শ্রম কেনে না; এটি আমাদের সময়, আবেগ, উদ্বেগ, আকাঙ্ক্ষা ও বান্ধবহীনতা সবকিছুকেই বাজারে নিয়ে আসে। আমরা আর কেবল ভোক্তা নই, আমরা প্রত্যেকে এক-একটি চলমান পণ্য। আমাদের প্রতিটি ক্লিক, প্রতিটি থেমে থাকা স্ক্রল, প্রতিটি সার্চ, প্রতিটি রাতজাগা মুহূর্ত সবই ডেটায় পরিণত হয়। এই ডেটা শুধু আমাদের আচরণ বোঝে না, আমাদের পরবর্তী আচরণ নির্মাণও করে। ফরাসি দার্শনিক জিল দ্যলোজ একে বলেছেন 'Control Society' বা নিয়ন্ত্রণকারী সমাজ, যেখানে মানুষ আর নাগরিক নয়; সে কেবলই এক নিরবচ্ছিন্ন ডেটা ও ফিডব্যাকের উৎস। মানুষ এখন বাহ্যিক কোনো শোষকের অধীনে নয়, বরং নিজে থেকেই নিজের ওপর কাজের চাপ বাড়িয়ে ক্লান্ত করে তুলছে। এখানে মানুষ নিজেই নিজের শোষক।
যখন প্রত্যেকে প্রত্যেকের প্রতিযোগী, তখন গভীর বন্ধুত্বের আর কোনো অবকাশ থাকে না। সহকর্মী আর বন্ধু থাকে না, হয়ে ওঠে প্রতিদ্বন্দ্বী। ফলে তৈরি হয় বিষণ্নতা ও এক গভীর ক্লান্তি। নব্য-উদারবাদী অর্থনীতিতে মানুষের স্বপ্ন, আকাঙ্ক্ষা আর আবেগগুলো পুঁজিবাদের অতি-উৎপাদনের চাপে এভাবেই ঝরে পড়ে।
নিঃসঙ্গতা থেকে ফ্যাসিবাদের উদ্ভব
রাজনৈতিক অর্থনীতির দিক থেকে নিঃসঙ্গতার সবচেয়ে বিপজ্জনক দিকটি মনস্তাত্ত্বিক নয়, বরং রাজনৈতিক। ইতিহাস বলে, চরম নিঃসঙ্গ ও বিচ্ছিন্ন মানুষই যেকোনো কর্তৃত্ববাদী রাজনৈতিক আদর্শের সবচেয়ে সহজ শিকার হয়।
হান্নাহ আরেন্ট তাঁর কালজয়ী গ্রন্থ ‘The Origins of Totalitarianism’-এ স্পষ্ট দেখিয়েছিলেন যে, ফ্যাসিবাদের উর্বর জমিন তৈরি করে মানুষের বিচ্ছিন্নতা ও একা হয়ে যাওয়া (Loneliness and Isolation)। সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন, নিরাপত্তাহীনতায় ভোগা একলা মানুষ যখন নিজের জীবনের কোনো অর্থ খুঁজে পায় না, তখন সে অতি-জাতীয়তাবাদ, ধর্মীয় উগ্রবাদ বা কোনো 'মহাজাগতিক' পপুলিস্ট নেতার অন্ধ অনুসারী হয়ে ওঠে। কারণ সেই উগ্র আদর্শ তাকে একটি ‘আভাসি যৌথতার’ মেকি অনুভূতি দেয়। আজকের বিশ্বে নব্য-ডানপন্থী এবং পপুলিস্ট রাজনীতির পুনরুত্থানের পেছনে এই নব্য-উদারবাদী নিঃসঙ্গতার ভূমিকা অনস্বীকার্য।
বিকল্পের সন্ধান
ক্রিস টমাস কিংবা অং কার-ওয়াইয়ের সিনেমাগুলোতে যেভাবে ফ্রেমে ফ্রেমে আলো-ছায়ার মধ্য দিয়ে নিঃসঙ্গ শহরগুলোকে ফুটিয়ে তোলা হয়, আজকের মেট্রোপলিটন শহরগুলো যেন তার চেয়েও নির্জন। উঁচু উঁচু কাঁচের টাওয়ার আর নিয়ন আলোর নিচে হেঁটে বেড়ানো কোটি কোটি 'সোলো' সত্তা আসলে ব্যবস্থার এক-একটি পণ্য মাত্র।
এই কৃত্রিম নিঃসঙ্গতার বেড়াজাল থেকে বের হতে হলে নিঃসঙ্গতাকে ব্যক্তিগত বা চিকিৎসা-সংক্রান্ত সমস্যা হিসেবে দেখা বন্ধ করতে হবে। আমাদের অলাভজনক, অযৌক্তিক ভালোবাসা ও মানবিক সম্পর্কের জায়গাগুলোকে পুনরুদ্ধার করতে হবে। যে সম্পর্কের কোনো বাজারমূল্য নেই; বিশেষত ঘণ্টার পর ঘণ্টা বন্ধুদের সাথে নিঃস্বার্থ আড্ডা, পরিবারের সদস্যদের সাথে বেশি বেশি সময় কাটানো, স্থানীয় খেলাধুলার মাঠ, ক্লাব, পার্কে সময় ব্যয় কিংবা যৌথ রাজনৈতিক আন্দোলন; সেগুলোকে বাঁচিয়ে তোলাই আজকের যুগের সবচেয়ে বড় প্রতিরোধ। আমাদের বুঝতে হবে যে, নিঃসঙ্গতা হলো কাঠামোগত শোষণেরই একটি রূপ।
আমাদেরই ঠিক করতে হবে 'তারারা যত আলোকবর্ষ দূরে, তার ও দূরে আমরা ক্রমে সরে যাব' কি না, নাকি 'ভোরবেলা ভয়ানক সতর্কতায় চৌকাঠ ডিঙিয়ে আবারো কাছে ফিরে আসব', সেই সিদ্ধান্ত আমাদেরই হাতে। নিঃসঙ্গতা যদি পুঁজির হাতিয়ার হয়, তবে আবার একত্র হওয়া, সংহতি প্রকাশ করা এবং একে অপরকে নিঃশর্তভাবে ভালোবাসাই হলো এই যুগের সবচেয়ে বড় বিপ্লব। শেষ করব এই লিখে
“মিছিলেও প্রেম হোক, ভেঙে যাক মোহ,
তুমি সাজো ব্যারিকেড, আমি বিদ্রোহ!”
About the Author
Saker Hossain Efaz (সাকির হোসেন ইফাজ)
মজদুরের নিয়মিত লেখকResearch Assistance, Public Hosting, Public Speaking
সাকির ইফাজ; উপস্থাপক, বাংলাদেশ বেতার। শিক্ষার্থী ও গবেষক, ইতিহাস বিভাগ; ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। Intern, Applied Democracy Lab; Dhaka University
প্রোফাইল দেখুন
মতামত
এখনও কোনো মতামত নেই।
প্রথম মতামতটি আপনিই দিন।
আলোচনায় অংশ নিতে লগ ইন করুন অথবা এ্যাকাউন্ট খুলুন