বাংলাদেশের চা শিল্প দেশের অন্যতম প্রাচীন ও গুরুত্বপূর্ণ রপ্তানিমুখী খাত। এই শিল্পের সাফল্যের পেছনে সবচেয়ে বড় অবদান চা শ্রমিকদের। অথচ তাদের জীবনযাত্রার মান এখনও অত্যন্ত নিম্ন। একুশ শতকে এসেও তারা এমন মজুরি ও জীবনব্যবস্থার মধ্যে বসবাস করছেন, যা অনেকের কাছে ঔপনিবেশিক শোষণ ব্যবস্থার ধারাবাহিকতার প্রতিচ্ছবি বলে মনে হয়।
বর্তমানে বাংলাদেশে একজন চা শ্রমিকের দৈনিক মজুরি ১৮৭ টাকা, যা মাসিক হিসেবে প্রায় ৫,৬১০ টাকা। বর্তমান বাজারদর অনুযায়ী এই আয়ে একটি পরিবারের ন্যূনতম খাদ্য, বাসস্থান, চিকিৎসা, শিক্ষা ও অন্যান্য মৌলিক চাহিদা পূরণ করা প্রায় অসম্ভব।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) এবং বিভিন্ন গবেষণায় দেখা যায়, জীবনযাত্রার ব্যয় গত কয়েক বছরে উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু সেই হারে চা শ্রমিকদের মজুরি বাড়েনি। ফলে মূল্যস্ফীতির চাপ তাদের জীবনে আরও গভীর দারিদ্র্য সৃষ্টি করেছে।
একদিকে একজন সরকারি সচিবের মূল মাসিক বেতন প্রায় ৭৮,০০০ টাকা, যার সঙ্গে বাড়িভাড়া, চিকিৎসা, যাতায়াতসহ বিভিন্ন ভাতা যুক্ত হয়। অন্যদিকে একজন চা শ্রমিক মাসে মাত্র প্রায় ৫,৬১০ টাকা উপার্জন করেন। অর্থাৎ একজন সচিবের মূল বেতনই একজন চা শ্রমিকের আয়ের প্রায় ১৪ গুণ।
অবশ্য এই দুই পেশার শিক্ষাগত যোগ্যতা, দায়িত্ব ও প্রশাসনিক ভূমিকা এক নয়। তাই সরাসরি বেতন সমান হওয়ার দাবি বাস্তবসম্মত নয়। তবে প্রশ্ন থেকে যায়, একজন পূর্ণকালীন শ্রমিকের মজুরি কি অন্তত এমন হওয়া উচিত নয়, যাতে তিনি মর্যাদার সঙ্গে জীবনযাপন করতে পারেন?
ব্রিটিশ আমলে চা বাগান প্রতিষ্ঠার সময় শ্রমিকদের দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে এনে বাগানকেন্দ্রিক জীবনে আবদ্ধ করা হয়েছিল। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে অনেক পরিবার এখনও একই বাগানে সীমিত সুযোগ-সুবিধার মধ্যে বসবাস করছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, বিকল্প কর্মসংস্থান ও সামাজিক উন্নয়নের সুযোগ সীমিত হওয়ায় তারা দারিদ্র্যের একটি চক্রে আটকে রয়েছেন।
এ কারণেই অনেক গবেষক ও মানবাধিকারকর্মী বর্তমান ব্যবস্থাকে "ঔপনিবেশিক কাঠামোর উত্তরাধিকার" হিসেবে উল্লেখ করেন।
চা শিল্পকে টেকসই ও মানবিক করতে কয়েকটি পদক্ষেপ জরুরি।
- জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ন্যায্য মজুরি নির্ধারণ।
- শ্রমিকদের জন্য উন্নত স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ও নিরাপদ আবাসনের ব্যবস্থা।
- শ্রম আইন কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন এবং সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
- চা শিল্পের লাভের ন্যায্য অংশ শ্রমিকদের কল্যাণে ব্যয় করা।
- শ্রমিকদের দক্ষতা উন্নয়ন ও বিকল্প আয়ের সুযোগ সৃষ্টি করা।
বাংলাদেশের চা শিল্পের মূল চালিকাশক্তি চা শ্রমিকরা। অথচ তাদের জীবন এখনও দারিদ্র্য, বৈষম্য ও সীমিত সুযোগের মধ্যে আবদ্ধ। একুশ শতকে একটি উন্নয়নশীল দেশের জন্য এমন বাস্তবতা উদ্বেগজনক। ন্যায্য মজুরি ও মানবিক কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা কেবল শ্রমিকদের অধিকার নয়, বরং একটি ন্যায়ভিত্তিক ও টেকসই অর্থনীতি গঠনেরও পূর্বশর্ত।
About the Author
RAJIN AHAMMED SAMI
মজদুরের নিয়মিত লেখকপ্রগতিশীল লেখক ও এক্টিভিস্ট
কলম ধরেছি অবহেলিতের পক্ষে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে। নীরব মানুষের কথা বলাই আমার দায়িত্ব।
প্রোফাইল দেখুন
মতামত
এখনও কোনো মতামত নেই।
প্রথম মতামতটি আপনিই দিন।
আলোচনায় অংশ নিতে লগ ইন করুন অথবা এ্যাকাউন্ট খুলুন