রাষ্ট্রব্যবস্থার একটি মৌলিক ধারণা হলো, রাষ্ট্র জনগণের প্রতিনিধিত্ব করবে এবং সংখ্যাগরিষ্ঠের স্বার্থকে প্রাধান্য দেবে। কিন্তু বাস্তবতা প্রায়ই তত্ত্বের চেয়ে ভিন্ন। রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও রাজনৈতিক সমাজবিজ্ঞানের দীর্ঘ গবেষণা দেখায়, রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণ কেবল জনসংখ্যার আকার দ্বারা নির্ধারিত হয় না; বরং কোন সামাজিক গোষ্ঠী জনমত গঠন করতে পারে, প্রশাসনিক কাঠামোর সঙ্গে সংযুক্ত থাকে এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাকে প্রভাবিত করার সক্ষমতা রাখে, তারাই অনেক সময় রাষ্ট্রের কাছে অধিক গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতা বিশ্লেষণ করলে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে: রাষ্ট্রের ক্ষমতা আসলে কাদের ঘিরে আবর্তিত হয়? সংখ্যাগরিষ্ঠ দরিদ্র জনগোষ্ঠী, নাকি শহুরে মধ্যবিত্ত শ্রেণী?
বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার একটি বড় অংশ এখনও নিম্ন আয় বা নিম্ন-মধ্য আয়ের জীবনযাপন করে। গ্রামীণ জনগোষ্ঠী, শ্রমজীবী মানুষ, ক্ষুদ্র কৃষক, দিনমজুর এবং অনানুষ্ঠানিক খাতের কর্মীরা অর্থনীতির ভিত্তি নির্মাণ করলেও রাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় তাদের উপস্থিতি তুলনামূলকভাবে দুর্বল। তারা ভোট দেয়, উৎপাদন করে, শ্রম সরবরাহ করে, কিন্তু জাতীয় আলোচনার কেন্দ্রে খুব কমই স্থান পায়।
বিদ্যুতের ঘাটতি, দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতি, চিকিৎসাসেবার অপ্রতুলতা, কর্মসংস্থানের সংকট কিংবা জলবায়ুজনিত দুর্ভোগ দীর্ঘদিন ধরে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জীবনের অংশ। এসব সমস্যা তাদের জন্য অস্তিত্বের প্রশ্ন হলেও প্রায়ই তা জাতীয় রাজনৈতিক সংকটে রূপ নেয় না। কারণ দরিদ্র জনগোষ্ঠীর অধিকাংশই সাংগঠনিকভাবে দুর্বল, অর্থনৈতিকভাবে নির্ভরশীল এবং গণমাধ্যমে সীমিত প্রতিনিধিত্বের অধিকারী। তাদের অসন্তোষ অনেক সময় বিচ্ছিন্ন থাকে, সমন্বিত রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হতে পারে না।
অন্যদিকে শহুরে মধ্যবিত্ত শ্রেণীর অবস্থান সম্পূর্ণ ভিন্ন। এই শ্রেণী শুধু অর্থনৈতিক অবস্থানের কারণে নয়, বরং জ্ঞান, যোগাযোগ ও সাংস্কৃতিক পুঁজির কারণে রাষ্ট্রের সঙ্গে একটি বিশেষ সম্পর্ক গড়ে তোলে। বিশ্ববিদ্যালয়, সংবাদমাধ্যম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, করপোরেট খাত, বিচারব্যবস্থা, প্রশাসন এবং নাগরিক সংগঠনের একটি বড় অংশ এই শ্রেণী থেকে আসে।
ফরাসি সমাজবিজ্ঞানী পিয়ের বুর্দিয়োর ভাষায়, সমাজে কেবল অর্থনৈতিক পুঁজি নয়, সাংস্কৃতিক ও প্রতীকী পুঁজিও ক্ষমতার উৎস। বাংলাদেশের শহুরে মধ্যবিত্ত শ্রেণী ঠিক এই ধরনের পুঁজির অধিকারী। ফলে তারা শুধু মতামত প্রকাশ করে না; তারা জনমত নির্মাণ করে। তারা শুধু সমস্যার কথা বলে না; কোন বিষয়কে জাতীয় ইস্যুতে পরিণত করা হবে, সেটিও অনেকাংশে নির্ধারণ করে।
ইতিহাসের দিকে তাকালেও একই চিত্র দেখা যায়। ভাষা আন্দোলন, স্বাধিকার আন্দোলন, স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন, বিভিন্ন ছাত্র আন্দোলন কিংবা সাম্প্রতিক নাগরিক প্রতিবাদে শহুরে শিক্ষিত শ্রেণীর ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এসব আন্দোলনের সাফল্য বা ব্যর্থতা নিয়ে বিতর্ক থাকতে পারে, কিন্তু একটি বিষয় স্পষ্ট: রাষ্ট্র সাধারণত সেই গোষ্ঠীর প্রতি বেশি মনোযোগ দেয়, যারা জনপরিসরে রাজনৈতিক বৈধতার প্রশ্ন তুলতে সক্ষম।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বাস্তবতা রয়েছে। আধুনিক রাষ্ট্রের জন্য কেবল ভোটের সংখ্যা যথেষ্ট নয়; শাসনের বৈধতাও গুরুত্বপূর্ণ। দরিদ্র জনগোষ্ঠীর অসন্তোষ অনেক সময় নীরব থাকে, কিন্তু মধ্যবিত্তের অসন্তোষ দৃশ্যমান হয়। তারা সংবাদপত্রে লেখে, টেলিভিশনের আলোচনায় অংশ নেয়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার চালায় এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে। ফলে তাদের ক্ষোভ রাজনৈতিক অস্থিরতার ঝুঁকি তৈরি করে।
তবে এর অর্থ এই নয় যে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর কোনো গুরুত্ব নেই। বাস্তবে তারা রাষ্ট্রের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ তারাই সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটার। কিন্তু তাদের গুরুত্ব প্রায়শই নির্বাচনী রাজনীতিতে সীমাবদ্ধ থাকে। নির্বাচন এলে তাদের কাছে নানা প্রতিশ্রুতি পৌঁছায়; কিন্তু নির্বাচন শেষ হলে তাদের দৈনন্দিন সংকট আবারও ব্যক্তিগত সংগ্রামে পরিণত হয়। অন্যদিকে মধ্যবিত্ত শ্রেণীর দাবি ও উদ্বেগ রাষ্ট্রের সামনে নিয়মিতভাবে দৃশ্যমান থাকে।
এখানে একটি গভীর বৈপরীত্য লক্ষ করা যায়। যারা সংখ্যায় বেশি, তারা প্রভাবে তুলনামূলকভাবে দুর্বল। আর যারা সংখ্যায় কম, তারা প্রভাব বিস্তারে তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা যায় "Power of Influence versus Power of Numbers" অর্থাৎ সংখ্যার ক্ষমতা ও প্রভাবের ক্ষমতার মধ্যকার পার্থক্য।
বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল রাষ্ট্রে এই বৈপরীত্য আরও স্পষ্ট। কারণ এখানে অর্থনৈতিক বৈষম্য, তথ্যপ্রবাহের অসমতা এবং রাজনৈতিক অংশগ্রহণের সীমাবদ্ধতা একই সঙ্গে কাজ করে। ফলে রাষ্ট্র প্রায়ই সেই গোষ্ঠীর প্রতি বেশি সংবেদনশীল হয়ে ওঠে, যারা রাজনৈতিক ও সামাজিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করে।
কিন্তু একটি রাষ্ট্র দীর্ঘমেয়াদে তখনই স্থিতিশীল হতে পারে, যখন প্রভাবশালী গোষ্ঠীর পাশাপাশি নীরব সংখ্যাগরিষ্ঠের কণ্ঠও সমানভাবে গুরুত্ব পায়। কারণ ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, অবহেলিত মানুষের বঞ্চনা দীর্ঘদিন জমতে জমতে একসময় সামাজিক অস্থিরতা ও রাজনৈতিক সংকটের রূপ নিতে পারে। রাষ্ট্র যদি কেবল দৃশ্যমান অসন্তোষের প্রতি সাড়া দেয় এবং অদৃশ্য কষ্টকে উপেক্ষা করে, তাহলে উন্নয়নের পরিসংখ্যান বাড়লেও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হয় না।
অতএব, প্রশ্নটি কেবল রাষ্ট্র কার কথা বেশি শোনে, তা নয়। আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, রাষ্ট্র কার কথা শোনা উচিত। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তি তখনই প্রতিষ্ঠিত হয়, যখন শহুরে মধ্যবিত্তের উদ্বেগ এবং দরিদ্র সংখ্যাগরিষ্ঠের বেদনা উভয়ই সমান গুরুত্ব পায়। অন্যথায় রাষ্ট্র ক্রমশ প্রতিনিধিত্বের সংকটে পড়ে, যেখানে ক্ষমতার কেন্দ্র জনগণের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ থেকে দূরে সরে যেতে থাকে।
রাষ্ট্রের স্থায়িত্ব শেষ পর্যন্ত নির্ভর করে শুধু ক্ষমতাবানদের সন্তুষ্টির ওপর নয়; বরং সেইসব মানুষের আস্থার ওপর, যাদের কণ্ঠ সবচেয়ে কম শোনা যায়।
About the Author
RAJIN AHAMMED SAMI
মজদুরের নিয়মিত লেখকপ্রগতিশীল লেখক ও এক্টিভিস্ট
কলম ধরেছি অবহেলিতের পক্ষে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে। নীরব মানুষের কথা বলাই আমার দায়িত্ব।
প্রোফাইল দেখুন
মতামত
এখনও কোনো মতামত নেই।
প্রথম মতামতটি আপনিই দিন।
আলোচনায় অংশ নিতে লগ ইন করুন অথবা এ্যাকাউন্ট খুলুন