যুদ্ধের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হলো, এর ভয়াবহতা কখনো কেবল যুদ্ধরত পক্ষগুলোর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। যুদ্ধের আগুন ছড়িয়ে পড়ে নিরীহ মানুষদের জীবনে, বিশেষ করে শিশুদের জীবনে। তারা কোনো রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নেয় না, কোনো অস্ত্র বহন করে না, তারা জানেই না কেন যুদ্ধ হচ্ছে। তবুও যুদ্ধের চরম মূল্য তাদেরই দিতে হয়। আজ গাজা উপত্যকার বাস্তবতা সেই করুণ সত্যকেই আবারও সামনে নিয়ে এসেছে।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের পর থেকে গাজায় শুরু হওয়া সংঘাত বিশ্বের অন্যতম আলোচিত মানবিক সংকটে পরিণত হয়েছে। প্রতিদিন ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে উদ্ধার হওয়া শিশুদের নিথর দেহ, আহত শিশুদের আর্তনাদ এবং পরিবারহীন হয়ে পড়া হাজারো শিশুর ছবি বিশ্ব বিবেককে নাড়া দিয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এত মৃত্যু ও ধ্বংসের মধ্যেও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কার্যকর পদক্ষেপ কোথায়?
সম্প্রতি জাতিসংঘের একটি স্বাধীন তদন্ত প্রতিবেদনে গাজায় শিশুদের ভয়াবহ পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, সংঘাতের ফলে বিপুলসংখ্যক শিশু নিহত ও আহত হয়েছে। শিশুদের এই ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি কেবল একটি পরিসংখ্যান নয়; এটি একটি প্রজন্মের স্বপ্ন, সম্ভাবনা এবং ভবিষ্যতের ধ্বংসের প্রতিচ্ছবি।
যুদ্ধের একটি মৌলিক নীতি হলো বেসামরিক নাগরিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা। আন্তর্জাতিক মানবিক আইন অনুযায়ী শিশু, নারী, হাসপাতাল, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং আশ্রয়কেন্দ্র বিশেষ সুরক্ষার আওতায় থাকার কথা। কিন্তু গাজার বাস্তব চিত্র ভিন্ন বার্তাই দিচ্ছে। বহু স্কুল, হাসপাতাল, ত্রাণকেন্দ্র এবং আশ্রয়স্থল হামলার শিকার হয়েছে। ফলে নিরাপত্তার জন্য যেসব স্থানে মানুষ আশ্রয় নেওয়ার কথা, সেসব স্থানই অনেক ক্ষেত্রে মৃত্যুফাঁদে পরিণত হয়েছে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, যুদ্ধের দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব। একটি শিশু যখন তার বাবা-মাকে হারায়, যখন শিক্ষা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়, যখন প্রতিদিন বোমার শব্দ শুনে বড় হয়, তখন সেই ক্ষতি কেবল বর্তমানের নয়, ভবিষ্যতেরও। যুদ্ধ শেষ হলেও সেই মানসিক ক্ষত বহু বছর ধরে থেকে যায়। ফলে গাজার শিশুরা শুধু বর্তমান সংকটের শিকার নয়; তারা ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তারও বন্দি।
মানবাধিকার সংগঠনগুলো দীর্ঘদিন ধরেই গাজায় শিশুদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ জানিয়ে আসছে। তাদের মতে, সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা শিশুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নৈতিক দায়িত্ব। কারণ কোনো রাষ্ট্র, কোনো সামরিক লক্ষ্য কিংবা কোনো রাজনৈতিক উদ্দেশ্যই শিশুদের জীবন ও অধিকারকে অগ্রাহ্য করার বৈধতা দিতে পারে না।
আজ গাজার দিকে তাকালে আমরা শুধু একটি যুদ্ধক্ষেত্র দেখি না; আমরা দেখি ধ্বংস হয়ে যাওয়া শৈশব, হারিয়ে যাওয়া হাসি এবং অনিশ্চিত ভবিষ্যতের এক করুণ প্রতিচ্ছবি। প্রতিটি নিহত শিশু মানবতার জন্য একটি ব্যর্থতার প্রতীক। প্রতিটি আহত শিশু আমাদের নীরবতার বিরুদ্ধে একটি অভিযোগ।
বিশ্ব যখন কূটনীতি, ভূরাজনীতি এবং ক্ষমতার হিসাব-নিকাশে ব্যস্ত, তখন গাজার শিশুরা বেঁচে থাকার লড়াই করছে। তাদের প্রয়োজন অস্ত্র নয়, নিরাপত্তা; ধ্বংস নয়, শিক্ষা; ভয় নয়, একটি স্বাভাবিক শৈশব।
ইতিহাস একদিন এই সময়কে বিচার করবে। তখন প্রশ্ন উঠবে, যখন হাজারো শিশু যুদ্ধের আগুনে পুড়ছিল, তখন বিশ্ব কী করছিল? মানবতা কি তাদের পাশে দাঁড়িয়েছিল, নাকি নীরব দর্শক হয়ে ছিল?
গাজার শিশুদের আর্তনাদ আজ শুধু ফিলিস্তিনের নয়, সমগ্র মানবজাতির বিবেকের কাছে এক কঠিন প্রশ্ন। সেই প্রশ্নের উত্তর আমাদের সবাইকেই দিতে হবে।
About the Author
RAJIN AHAMMED SAMI
মজদুরের নিয়মিত লেখকপ্রগতিশীল লেখক ও এক্টিভিস্ট
কলম ধরেছি অবহেলিতের পক্ষে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে। নীরব মানুষের কথা বলাই আমার দায়িত্ব।
প্রোফাইল দেখুন
মতামত
1অন্যায় ও শোষণ যেখানেই হোক না কেন, তার প্রতিবাদ করা বামপন্থীদের কর্তব্য।
আলোচনায় অংশ নিতে লগ ইন করুন অথবা এ্যাকাউন্ট খুলুন