মানুষের ইতিহাসে ধর্ম ও রাজনীতির সম্পর্ক অত্যন্ত জটিল এবং গভীর। কখনও ধর্ম রাজনীতিকে নৈতিক ভিত্তি প্রদান করেছে, কখনও রাজনীতি ধর্মকে ব্যবহার করেছে জনসমর্থন অর্জনের হাতিয়ার হিসেবে।
বাংলাদেশের ইসলামী রাজনৈতিক দলগুলো সাধারণত দাবি করে যে তাদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড কেবল ক্ষমতা অর্জনের জন্য নয়; বরং এটি আল্লাহর বিধান প্রতিষ্ঠার একটি প্রচেষ্টা এবং এটা এক ধরনের ইবাদত। এই ধারণার ভিত্তিতে কর্মীরা রাজনৈতিক সংগ্রামকে আধ্যাত্মিক গুরুত্ব প্রদান করেন এবং বিশ্বাস করেন যে দলীয় কাজের জন্য তারা পরকালে বেহেশত পাবেন।
তাহলে অর্থ কি দাড়াচ্ছে? যদি দলীয় রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডকে ইবাদত হিসেবে উপস্থাপন করা হয় এবং এর বিনিময়ে বেহেশতের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়, তাহলে শেষ পর্যন্ত কি রাজনৈতিক আনুগত্য ও সাংগঠনিক কাজের মূল চালিকাশক্তি বেহেশতের আকাঙ্ক্ষাই হয়ে দাঁড়ায় না?
ইসলামী পরিভাষায় ইবাদত বলতে সাধারণত আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্যে সম্পাদিত কাজকে বোঝায়। নামাজ, রোজা, হজ, যাকাতের মতো আনুষ্ঠানিক উপাসনার পাশাপাশি ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা, মানুষের কল্যাণ সাধন এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণকেও অনেক আলেম ইবাদতের বিস্তৃত পরিসরের অন্তর্ভুক্ত করেছেন, কিন্তু বাংলাদেশের ইসলামী দলগুলো বিশেষত জামাতে ইসলামী তার কর্মীদের এমনভাবে মানসিকভাবে প্রস্তুত করে যে ,দল যা বলে তা পালন করাই ইবাদত তা অনৈতিক বা বেআইনি হোক তাতে কিছু যায় আসে না । দল যদি কাউকে ইসলামের দুশমন ট্যাগ দিয়ে হত্যা করার নির্দেশ দেয় তাহলে কর্মী তাই করবে কারন তার মাথায় আগেই গাঁথা আছে দলীয় কাজ ইবাদতের শামিল।
যদি কোনো রাজনৈতিক দল তার কর্মীদের কাছে এই বার্তা পৌঁছে দেয় যে দলীয় কর্মকাণ্ড, সংগঠন পরিচালনা, মিছিল-মিটিং কিংবা রাজনৈতিক সংগ্রাম আল্লাহর কাছে মহৎ আমল হিসেবে গণ্য হবে এবং এর জন্য পরকালে পুরস্কার লাভ করা যাবে, তাহলে কর্মীদের প্রেরণার প্রকৃতি কী হবে? তারা কি মূলত সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করছে, নাকি বেহেশতের প্রত্যাশায় কাজ করছে?
যখন কোনো রাজনৈতিক দল তার রাজনৈতিক কর্মসূচিকে ধর্মীয় মর্যাদা প্রদান করে, তখন সাধারণ রাজনৈতিক সমালোচনাও ধর্মীয় বিরোধিতার রূপ ধারণ করতে পারে। কারণ দলটির সমর্থকেরা মনে করতে পারেন যে তাদের রাজনৈতিক অবস্থানের বিরোধিতা মানেই ইসলামের বিরোধিতা। এর ফলে রাজনৈতিক বিতর্কের ক্ষেত্র সংকুচিত হয় এবং মতপার্থক্যকে কখনও কখনও ধর্মীয় বিচ্যুতি হিসেবে দেখা হতে পারে যা ধর্মীয় সহিংসতা তৈরি করবে সমাজে এবং সেটা ঘটবেই।
যদি বেহেশতের প্রতিশ্রুতি বা ধর্মীয় পুরস্কারের ধারণা সম্পূর্ণ অনুপস্থিত থাকে, তাহলে কি ইসলামী রাজনৈতিক আন্দোলন একই মাত্রার সমর্থন ধরে রাখতে পারবে? সম্ভবত না।
যখন ধর্মীয় পুরস্কারকে রাজনৈতিক আনুগত্যের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত করা হয়, তখন রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে যুক্তি, তথ্য ও বাস্তবতার চেয়ে আবেগের প্রভাব বৃদ্ধি পেতে পারে। মানুষ তখন কোনো নীতির কার্যকারিতা বিচার না করে সেটিকে ধর্মীয় কর্তব্য হিসেবে গ্রহণ করতে পারে। এর ফলে রাজনৈতিক জবাবদিহিতা দুর্বল হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।
গণতান্ত্রিক রাজনীতির মূল ভিত্তি হলো সমালোচনা, বিতর্ক ও জবাবদিহিতা। কোনো রাজনৈতিক দল যদি নিজেকে সরাসরি ধর্মীয় সত্যের প্রতিনিধিত্বকারী হিসেবে উপস্থাপন করে, তাহলে তার নীতির সমালোচনা করা কঠিন হয়ে পড়ে এবং উক্ত দলের বিরুদ্ধে গেলেই নাস্তিক ও ধর্ম বিদ্বেষী ট্যাগ দিয়ে বিরোধী শক্তিকে দমন করা হবে। সমালোচনাকে তখন সহজেই ধর্মবিরোধিতা হিসেবে প্রচার করা হবে। ইতিহাসে বিভিন্ন ধর্মীয় ও মতাদর্শিক আন্দোলনের ক্ষেত্রে এই প্রবণতা দেখা গেছে।
আসল কথা হলো, যদি কোনো রাজনৈতিক দল বা আন্দোলন তার সাংগঠনিক কাজকে ইবাদত হিসেবে সংজ্ঞায়িত করে এবং কর্মীদের কাছে বেহেশতের আশা একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুপ্রেরণা হয়, তাহলে সেটিকে প্রতিহত করা গনতান্ত্রিক রাষ্ট্রের দায়িত্ব হয়ে যায় ।
#রাফিউল রঞ্জন
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সোশ্যাল এক্টিভিস্ট ।
মতামত
এখনও কোনো মতামত নেই।
প্রথম মতামতটি আপনিই দিন।
আলোচনায় অংশ নিতে লগ ইন করুন অথবা এ্যাকাউন্ট খুলুন