প্রথম আলোতে একটা নিউজ দেখলাম।সেখান ২০ বছর বয়সী গারমেন্টস কর্মী মেয়ে,যার নাম মরিয়ম কোরবানী ঈদের দিন অসুস্থ হয়ে মারা যায়।তার পরিবার তাকে কবর দিলেও তার ভাই আর তার বোনের স্বপ্নে মরিয়ম এসে বলে আমি জীবিত আছি।এর পরিপ্রেক্ষিতে মরিয়মের কবর খোড়া হয় and as expected,they found a discomposed body.বাট এইটা খুব ই প্রোফাউন্ড বিষয় মনে হয় আমার কাছে।লাইক,সে চট্টগ্রামের একটি গার্মেন্টস কারখানায় কাজ করত। প্রায় ছয় বা সাত বছর ধরে। অর্থাৎ, সে খুব অল্প বয়সে,প্রায় শিশু অবস্থাতেই বাড়ি ছেড়েছিল পরিবারের জন্য টাকা পাঠানোর উদ্দেশ্যে।তার বডিকে গ্রাস করেছিল গ্লোবাল সাপ্লাই চেইন সিস্টেম,সেই একই সিস্টেম, যা লন্ডন কিংবা নিউইয়র্কের মানুষের গায়ে সস্তা পোশাক তুলে দেয়।কারখানা, দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, ক্লান্তি, অনিশ্চয়তা এসবই ছিল তার জীবন।
সে ঈদের ছুটিতে বাড়ি ফিরেছিল।কোরবানির ঈদ, যা রিপ্রেজেন্ট করে ত্যাগের উৎসব এবং ওই অবস্থাতেই সে অসুস্থ হয়ে পড়ল।এবং ঈদের দিন ভোরে মারা গেল। যে দিনটি আনন্দের,সম্মিলিত নামাজ ও খাওয়া দাওয়ার দিন সেই দিনই তার মৃত্যু হলো।নামাজের পরপর তাকে দাফন করা হলো। শোকের জন্য আলাদা কোনো সময় সে পেল না। মৃত্যুর আচার আর উৎসবের আমেজ দুটো বিষয় এক হয়ে গেল।এরপর শুরু হয় স্বপ্ন।
সে ভাইয়ের স্বপ্নে আসে। সে ছোট বোনের স্বপ্নে আসে। সে বলে, সে কবরের ভেতরে জীবিত আছে। তাকে জীবিত অবস্থায় দাফন করা হয়েছে।
এটিকে আসলে ডিভাইন কোন ক্লেইম হিসাবে পাঠ করা যাবেনা।Its a mistake।আক্ষরিক অর্থে না কিন্তু মরিয়মকে জীবিত অবস্থাতেই কবর দেওয়া হয়েছিল।
তাকে কবর দিয়েছিল দারিদ্র্য বা দিয়েছিল গার্মেন্টস শিল্প যা কন্সটান্ট এক্সপ্লয়েটেশনের উপরে টিকে আছে।গ্লোবাল সাপ্লাই চেইন তার লেবার পাওয়ারকে শুষে নেওয়ার পরপর তার বডিকে ত্যাগ করছে।এবং সে একটি পরিবারে ছিলো, যারা তাকে ভালোবাসত, কিন্তু রক্ষা করতে পারেনি।
আর অবভিয়াসলি সে প্যাট্রিয়ার্কির আন্ডারে ছিলো,লাইক এটা এমন একটি সংস্কৃতি, যেখানে তার জন্য শ্রমিক, কন্যা, এবং একদিন কারও স্ত্রী হয়ে ওঠার বাইরে অন্য কোনো পরিচয়ের জায়গা খুব কম ছিল।
সে জীবিত ছিল,মানে এই অর্থে যে তারও ইচ্ছা ছিল, স্বপ্ন ছিল, এক আলাদা ইন্টেরিওরিটি ছিল, যা কেউ কখনও পুরোপুরি দেখতে পায়নি।সেই জীবনটাই কবর দেওয়া হয়েছিল।স্বপ্ন হইতেছে return of the repressed এবং মরিয়ম এসে বলে গেলো যে,"আমি শেষ হয়ে যাইনি,তোমরা কেউ কখনো আমারে দেখতেই পারো নাই পুরোপুরি।আমার জীবন অসম্পূর্ণ ছিলো।
কবরের সুগন্ধিকে আমাদের ভালো ভাবে চিনতে হবে।কবর থেকে মিষ্টি গন্ধ বের হচ্ছে।
ইসলামী ঐতিহ্যে শহীদের দেহ থেকে সুগন্ধ বের হওয়া পবিত্রতার নিদর্শন হিসেবে বিবেচিত হয়। শহীদের দেহ নষ্ট হয় না। সুগন্ধে ভরে থাকে। পচন তাকে স্পর্শ করে না।
অজান্তেই পুরো গ্রাম মরিয়মকে এক ধরনের সেইন্টে পরিণত করছে।কিন্তু সে ধর্মীয় অর্থে কোনো আনুষ্ঠানিক সেইন্ট না।সোসাইটির কালেক্টিভ গিল্ট মরিয়মকে সেইন্টে পরিণত করছে।সুগন্ধ আসলে সামষ্টিক অবচেতনের ভাষা, যা বলতেছে,"মেয়েটি নিষ্পাপ ছিল,মেয়েটির সঙ্গে যা ঘটেছে, তা তার প্রাপ্য ছিল না।"
সুগন্ধ হলো সামষ্টিক অপরাধবোধের একটা ডিভাইন কনভারশন।সোসাইটি তাকে বাঁচাতে পারেনি,তার জন্য যথাযথ ভাবে শোক ও পালন করতে পারেনি।তাই তারা মরিয়মের কবরে সুগন্ধ উপহার দেয়।মৃত্যুর পর তাকে এমন এক মর্যাদা দেয়, যা জীবিত অবস্থায় তাকে দেওয়া হয়নি।
এরপরে সেই ক্লাইম্যাক্স।
তিনশো থেকে চারশো মানুষ জড়ো হয়।
কবর খোঁড়া হয় এবং মরদেহে স্বাভাবিক পচন দেখা যায়।
আর ডিভাইনিটি এক্সপোজড হয়ে যায় আর স্বজনেরা বলেন, তাঁদের সন্দেহ দূর হয়েছে।কিন্তু কী সেই সন্দেহ?
সন্দেহটি কি সত্যিই এই ছিল যে মরিয়ম আক্ষরিক অর্থে জীবিত কি না?মনে হয় না।সন্দেহটি ছিল এইরকম যে,
তার মৃত্যু কি সত্যিই মেনে নেওয়ার মত কি না বা?তার জীবনের কোনো অর্থ ছিল কি?পরিবার কি যথেষ্ট করেছে?
or if society and political reality failed? কবর খোঁড়া আসলে একটা কালেক্টিভ কনফেশনের রিচুয়াল।কবর খুড়ে তারা বলতেছে যে,"আমাদের সত্যটা দেখতে হবে।আমরা কী করেছি, কিংবা কী করতে ব্যর্থ হয়েছি, তার মুখোমুখি হতে হবে।"
সত্য হচ্ছে মরিয়ম ইজ ডেড।সে প্রিক্যারিওয়াস জীবন যাপন করছে আর অল্প বয়সে মারা গেছে।সুগন্ধ একটা ইমাজিনেশন ছিলো আর স্বপ্ন তা হচ্ছে শোককে deflect করার একটা ওয়ে মেবি(?)
সত্য যে কঠিন,তবুও সবাই সেটির মুখোমুখি হয়ে যায় এবং কবর আবার বন্ধ করে দেওয়া হয়।
পুলিশ কর্মকর্তা এখানে সিস্টেমের ভয়েস।আইন।রাষ্ট্র।
তিনি বলেন,কবর খোড়ার আগে আদালতের অনুমতি প্রয়োজন ছিল।স্বপ্ন প্রমাণ না এবং কবর থেকে সুগন্ধ আসা কোন তথ্য না।কবর ইচ্ছামতো খোঁড়া যায় না।
তিনি একদম ব্যুরোক্রেটিক বাস্তবতার প্রতিনিধি।
কিন্তু এই বাস্তবতাই আবার সেই বাস্তবতা, যা তেরো-চৌদ্দ বছরের একটি মেয়েকে কারখানায় কাজ করতে দিয়েছে।
যে রিয়ালিটি তাকে ঈদের দিন মারা যেতে দিয়েছে এবং বেচে থাকলে অবভিয়াসলি তার জীবন একটা সাব হিউম্যান হিসাবে কেটে যেতো।আমি আইনকে ভুল বলতেছিনা কিন্তু এইটা ইনোসেন্ট ও না।সে-ও সেই ব্যবস্থার অংশ, যা তার মৃত্যুকে সম্ভব করেছে।
তাই গ্রামবাসীরা আইনকে পাশ কাটিয়ে গেছিলো।তারা প্রতিশোধ নিতে নয়, সত্য খুঁজতে নিজেরাই পদক্ষেপ নেয়।
কিন্তু তাদের সত্য আইনের সত্য নয়।তাদের সত্য হচ্ছে truth of the unconscious. যে সত্যে পৌঁছাতে কখনও কখনও নিয়ম ভাঙতে হয়।
মরিয়ম সেই সব মেয়েদের প্রতীক, যারা গ্লোবাল সাপ্লাই চেইনের কাছে বলি হয়ে গিয়েছে।সে রানা প্লাজার গার্মেন্টস শ্রমিক।সে সেই কন্যা, যাকে শহরে পাঠানো হয় পরিবারের জন্য টাকা পাঠাতে।সে সেই শরীর, যার লেবার পাওয়ার এক্সট্র্যাক্ট করে নিঃশেষ করা হয়,তারপর পরিত্যাগ করা হয়।আর কবর খোড়া হচ্ছে সেই সত্যের মুখোমুখি হওয়ার চেষ্টা যা আমরা এড়িয়ে যাইতেছি।
মতামত
এখনও কোনো মতামত নেই।
প্রথম মতামতটি আপনিই দিন।
আলোচনায় অংশ নিতে লগ ইন করুন অথবা এ্যাকাউন্ট খুলুন