সকল লেখা জানতে চাই
Searching…

মনস্তাত্ত্বিক রাজনীতি: নব্য-পুঁজিবাদ সুকৌশলে আমাদের 'একা' করে দিচ্ছে!

আমরা ইতিহাসের এমন এক অদ্ভুত সময়ে বাস করছি, যেখানে প্রযুক্তির কল্যাণে আমরা পুরো বিশ্বের সাথে ২৪ ঘণ্টা যুক্ত, অথচ মনস্তাত্ত্বিকভাবে আমরা অতীতের যেকোনো প্রজন্মের চেয়ে সবচেয়ে বেশি একা। বিষণ্ণতা, একাকিত্ব এবং মানসিক অবসাদ আজ যেন প্রতিটি তরুণের দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

আতিকুর রহমান অন্তর
আতিকুর রহমান অন্তর মজদুরের নিয়মিত লেখক
পড়তে 5 মিনিট লাগতে পারে
এই লেখাটি 75 বার পড়েছে এ মাসে লেখকের লেখা 1 জন পাঠক পড়েছেন
মনস্তাত্ত্বিক রাজনীতি: নব্য-পুঁজিবাদ সুকৌশলে আমাদের 'একা' করে দিচ্ছে!

আমরা ইতিহাসের এমন এক অদ্ভুত সময়ে বাস করছি, যেখানে প্রযুক্তির কল্যাণে আমরা পুরো বিশ্বের সাথে ২৪ ঘণ্টা যুক্ত, অথচ মনস্তাত্ত্বিকভাবে আমরা অতীতের যেকোনো প্রজন্মের চেয়ে সবচেয়ে বেশি একা। বিষণ্ণতা, একাকিত্ব এবং মানসিক অবসাদ আজ যেন প্রতিটি তরুণের দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

আমাদের শেখানো হয়, এই একাকিত্ব বা বিষণ্ণতা আমাদের ব্যক্তিগত ব্যর্থতা। কিন্তু রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও সমাজতত্ত্বের ছাত্র হিসেবে একটু গভীরভাবে তাকালেই আমরা বুঝতে পারি আমাদের এই 'একা' হয়ে যাওয়াটা কোনো বিচ্ছিন্ন বা ব্যক্তিগত ঘটনা নয়; এটি মূলত নব্য-উদারনীতিবাদী পুঁজিবাদের (Neo-liberal Capitalism) অত্যন্ত সুকৌশলী এক কাঠামোগত ডিজাইন। যে ব্যবস্থা মানুষকে একা করতে পারে না, সে ব্যবস্থা মানুষকে শোষণও করতে পারে না।

কার্ল মার্ক্সের 'এলিয়েনেশন' (বিচ্ছিন্নতা) এবং তার আধুনিক রূপ

উনিশ শতকে কার্ল মার্ক্স পুঁজিবাদের সমালোচনা করতে গিয়ে 'এলিয়েনেশন' বা বিচ্ছিন্নতার তত্ত্ব দিয়েছিলেন। তিনি দেখিয়েছিলেন, পুঁজিবাদ কীভাবে একজন শ্রমিককে তার উৎপাদিত পণ্য, তার সমাজ এবং শেষ পর্যন্ত তার নিজের সত্তা থেকেই বিচ্ছিন্ন করে দেয়।

আজকের ডিজিটাল যুগে সেই বিচ্ছিন্নতা নতুন রূপ পেয়েছে। আগে মানুষ কারখানায় যন্ত্রের মতো কাজ করে একা হতো, আর আজ 'গিগ ইকোনমি' (Gig Economy) এবং 'ওয়ার্ক ফ্রম হোম'-এর যুগে মানুষ নিজের ঘরে বসেই সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে। একজন উবার চালক বা ফুডপান্ডা রাইডারের কোনো সহকর্মী নেই, কোনো ইউনিয়ন নেই, আড্ডার কোনো জায়গা নেই। তারা প্রত্যেকেই এক একটি বিচ্ছিন্ন দ্বীপ, যাদের কাজ কেবল একটি অ্যালগরিদমকে সন্তুষ্ট করা। সমাজবদ্ধ মানুষকে এভাবে একা করে দেওয়াটা পুঁজিবাদের সবচেয়ে বড় মনস্তাত্ত্বিক বিজয়।

সোশ্যাল মিডিয়া: একাকিত্ব বিক্রির সবচেয়ে বড় বাজার

সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলো আমাদের কাছে 'কানেক্টিভিটি' বা সংযুক্তির কথা বলে। কিন্তু বাস্তবে এরা এমন এক মনস্তাত্ত্বিক ফাঁদ তৈরি করে, যা আমাদের আরও বেশি একা ও হতাশ করে তোলে।

সোশ্যাল মিডিয়ার অ্যালগরিদম এমনভাবে ডিজাইন করা, যাতে তা মানুষের মনে সবসময় একধরনের হীনম্মন্যতা ও প্রতিযোগিতার জন্ম দেয় (Fear of Missing Out বা FOMO)। অন্যের সাজানো ও ফিল্টার করা নিখুঁত জীবন দেখে সাধারণ তরুণেরা প্রতিনিয়ত নিজের জীবন নিয়ে হতাশায় ভোগে। এই প্ল্যাটফর্মগুলো আমাদের বন্ধু বা কমিউনিটি দেয় না, বরং আমাদের এক একটি 'পণ্য' হিসেবে ব্যবহার করে ডেটা বিক্রি করে। আমরা যত বেশি একা ও হতাশ হবো, আমরা তত বেশি স্ক্রল করব, আর পুঁজিপতিদের পকেট তত বেশি ভারী হবে।

'হাসল কালচার' (Hustle Culture) এবং সহমর্মিতার মৃত্যু

আধুনিক নব্য-পুঁজিবাদ আমাদের মস্তিষ্কে 'হাসল কালচার' বা দিনরাত পাগলের মতো ছুটে চলার এক বিষাক্ত দর্শন ঢুকিয়ে দিয়েছে। আমাদের শেখানো হয় ঘুমানো মানেই সময় নষ্ট, বিশ্রাম মানেই পিছিয়ে পড়া।

এই কাঠামোর ভেতরে প্রতিটি মানুষ একে অপরের প্রতিযোগী। সহপাঠী, সহকর্মী বা প্রতিবেশী সবাই এখানে একে অপরকে টপকে যাওয়ার দৌড়ে লিপ্ত। যখন সমাজের প্রতিটি মানুষ আপনার প্রতিযোগী, তখন সেখানে কোনো অকৃত্রিম বন্ধু বা সহমর্মী থাকা অসম্ভব। পুঁজিবাদ খুব সুকৌশলে আমাদের সমাজ থেকে 'কালেক্টিভ' বা সামষ্টিক জীবনের ধারণাকে ধ্বংস করে দিয়ে একটি চরম ব্যক্তিকেন্দ্রিক (Individualistic) সমাজ তৈরি করেছে।

আবেগের পণ্যিকরণ (Commodification of Emotion)

পুঁজিবাদের সবচেয়ে ভয়ংকর দিক হলো, সে যে সমস্যা তৈরি করে, সেই সমস্যার সমাধানকেও সে পণ্য বানিয়ে বিক্রি করে। পুঁজিবাদী কাঠামো আমাদের একা ও বিষণ্ণ করে তুলছে, আর সেই বিষণ্ণতা কাটানোর জন্য কর্পোরেট দুনিয়া আমাদের কাছে বিক্রি করছে দামি থেরাপি অ্যাপ, সেলফ-কেয়ার রুটিন, রিট্রিট ক্যাম্প এবং 'রিটেইল থেরাপি' (মন খারাপ হলে শপিং করার প্রবণতা)। অর্থাৎ, মানসিক স্বাস্থ্যকে একটি কাঠামোগত ও সামাজিক সমস্যা হিসেবে না দেখে, সেটিকে সম্পূর্ণ একটি 'ব্যক্তিগত' পণ্যে পরিণত করা হয়েছে। আপনার মন খারাপ? টাকা খরচ করে সাবস্ক্রিপশন কিনুন!

শেষ কথা

যখন আমরা বুঝতে পারি যে আমাদের এই একাকিত্ব ও বিষণ্ণতা কাঠামোগত শোষণের ফসল, তখন এর সমাধান কেবল স্মার্টফোন বন্ধ রাখা বা 'ডিজিটাল ডিটক্স'-এর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না।

এর সমাধান লুকিয়ে আছে মনস্তাত্ত্বিক রাজনীতির বিরুদ্ধে আমাদের সামষ্টিক প্রতিরোধে। আমাদের আবার সামষ্টিক জীবনে (Collective life) ফিরে যেতে হবে। পাড়ার লাইব্রেরি, চায়ের দোকানের আড্ডা, সাংস্কৃতিক সংগঠন এবং মেহনতি মানুষের অধিকার আদায়ের লড়াইয়ের মতো অফলাইন কমিউনিটিগুলোকে পুনরুজ্জীবিত করতে হবে। পুঁজিবাদের সবচেয়ে বড় ভয় হলো একতাবদ্ধ মানুষকে। তাই নিজেদের মনস্তত্ত্বকে এই বিষাক্ত ব্যক্তিকেন্দ্রিকতার হাত থেকে বাঁচিয়ে একটি সহমর্মী সমাজ গড়ে তোলাই আধুনিক যুগের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক লড়াই।

লেখক: আতিকুর রহমান অন্তর

শিক্ষার্থী, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ,

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।

atiqursmind@gmail.com

আতিকুর রহমান অন্তর

About the Author

আতিকুর রহমান অন্তর

মজদুরের নিয়মিত লেখক

​লেখক এবং ডিজিটাল মার্কেটিং প্রফেশনাল

আমি আতিকুর রহমান অন্তর, রাষ্ট্রবিজ্ঞানের একজন শিক্ষার্থী। রাষ্ট্র, সমাজ, লোকসংস্কৃতি, ধর্ম ও সাহিত্য নিয়ে মুক্তালাপ করতে আমি ভালোবাসি। প্রথাগত চিন্তার বাইরে গিয়ে নিজস্ব রাজনৈতিক ও সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে স্বাধীনভাবে মতপ্রকাশ করাই আমার লেখালেখির মূল উদ্দেশ্য।

প্রোফাইল দেখুন

মতামত

এখনও কোনো মতামত নেই।

প্রথম মতামতটি আপনিই দিন।

আলোচনায় অংশ নিতে লগ ইন করুন অথবা এ্যাকাউন্ট খুলুন

Reading

Font size

Auto scroll
Slow Fast