এখন এই সময়ে এসে মনে হয় সবাই এচিভ করতেছে,শাই জীবনে এগিয়ে গিয়েছে আর আমিই পিছিয়ে আছি।সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আসলে এই অনূভুতিটা ইন্টেন্সিফায়েড হয়ে যায়।
ক্যাপিটালিজম মূলত অসন্তুষ্টি উৎপাদনের এক যন্ত্র।একজন সন্তুষ্ট মানুষ কিছু চায় না।সে কম ভোগ করে,কম কাজ করে,কম মুনাফা সৃষ্টি করে।সিস্টেম এইটাকে সহ্য করতে পারেনা।তার এমন সব সাব্জেক্ট দরকার যার অপরিসীম চাহিদা।যারা নিজেদের ফান্ডামেন্টাল অভাব(Lack)মেনে নিতে পারে না।এজন্য তারা বিশ্বাস করে যে নেক্সট জামা,নেক্সট আইফোন,নেক্সট সাকসেস তাদের জীবনে মাইলফলক হিসাবে থাকবে।এভাবেই জীবনের শুন্যতা পূরণ হবে।কিন্তু সেই শুন্যতা পূরণ হয় না কখনো।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এই অসন্তুষ্টি তৈরির সবচেয়ে কার্যকর উপায়।এই মানুষের সমগ্র জীবনের অভিজ্ঞতাকে রিডিউস করে একটি মাত্র পোস্ট এবং রিলসে রুপান্তরিত করতে পারে।পোস্ট বা রিলস সব সময়েই এক ধরণের পারফরম্যান্স।পোস্টকারী মনে করতে থাকে যে আমাকে অন্যের নজরে কেমন লাগবে।সে অনুযায়ী সে পারফর্ম করে যায়।সবই এক ধরনের অভিনয়।এমনকি "অথেনটিক" বা "সত্যিকারের" পোস্টও সত্যিকারের হওয়ার অভিনয়।
আর এই অভিনয় সর্বদা কম্পেয়ার করার জন্য উন্মুক্ত এবং পুঁজিবাদের অধীনে এই অন্যের সাথে তুলনা সবসময়ই এক ধরনের ক্ষত সৃষ্টি করে।
আমি স্ক্রল করি।দেখি, আমার পুরোনো এক সহপাঠী ফ্ল্যাট কিনেছে।দেখি, আমার বয়সী এক লেখকের বই প্রকাশিত হয়েছে।দেখি, এমন এক অপরিচিত মানুষ, যার মুখ প্রচলিত ডিস্কোর্স অনুযায়ী আমার চেয়ে বেশি আকর্ষণীয়, যার পোশাক বেশি মানানসই, যার জীবন বাইরে থেকে দেখলে সুসংগঠিত, অর্থপূর্ণ, আলোকিত বলে মনে হয়।
আমি আমার জীবনের সঙ্গে এসব ছবির তুলনা করি।
কিন্তু আমার জীবন আমি ভেতর থেকে দেখি,বিশৃঙ্খল, অনিশ্চিত, সন্দেহে ভরা।অন্যের পোস্ট করা ছবি,রিলসের সঙ্গে আমার অভিজ্ঞতার এই ব্যবধানই হচ্ছে ক্ষত(wound)
কালচার আমাকে বলে, এইসব কিছুর জন্য আমিই দায়ী।
আমি যথেষ্ট পরিশ্রম করছি না।যথেষ্ট ইতিবাচক নই।
যথেষ্ট আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে নিজের ভাগ্য নির্মাণ করছি না এবং গিল্ট আর শেইম দিয়ে আমাদের শাস্তি দেওয়া হয়।আর ওই অবস্থাতেই আমরা স্ক্রল করতে থাকি এবং এভাবেই পারপেচুয়ালি এই ক্ষত,গিল্ট,শেইম পুনরুৎপাদন হতে থাকে।এটাই ব্যবসায়িক মডেল।প্ল্যাটফর্মের প্রয়োজন আমার মনোযোগ।আমার মনোযোগই বিজ্ঞাপনদাতাদের কাছে বিক্রি করা হয়।
আমার মনোযোগ ধরে রাখতে হলে প্ল্যাটফর্মকে আমাকে এক ধরনের স্থায়ী অসন্তুষ্টি এবং মাঝে মাঝে কিছু ক্ষুদ্র রিকগনিশন যেমন-একটি লাইক, একটি মন্তব্য, একটি নোটিফিকেশন দিতে হবে।ততটাই দিবে যতটাতে আমি আশা হারিয়ে না ফেলি।কিন্তু কখনোই এতটা নয় যে আমি থেমে যাই।
অ্যালগরিদমের সাথে আমার কোনো পারসোনাল শত্রুতা নেই কারণ সে নিজে কনশাস না,তার স্ট্রাকচার ই ওইরকম।
সে ওইটাই করে যা তার প্রফিট বাড়ায় এবং তার প্রফিট
আমার দুর্ভোগের সঙ্গে সম্পর্কিত।কিন্তু আগেই বলেছি,এই অনুভূতির সোর্স প্লাটফর্ম নিজেই না।এটি লেইট ক্যাপিটালিজমের ম্যাটেরিয়াল কন্ডিশন থেকে তৈরি।জবের গ্যারান্টি নেই,ঋণের বোঝা,গিগ ইকোনমি এবং প্রিক্যারিওয়াস কাজ।একটি পুরো প্রজন্মের জন্য বাড়ির মালিক হওয়া স্বপ্নের মত হয়ে দাড়িয়েছে এখন,এবং যে প্রতিশ্রুতি আমাদের পুর্ববর্তী জেনারেশনকে দেওয়া হয়েছিলো লিবারেল ক্যাপিটালিজমের মাধ্যমে,তা যেন আমাদের সময়ে এসে বাতিল হয়ে গিয়েছে।এজন্য আমরা মনে করি আমরা পিছিয়ে পড়ছি।কারণ বাস্তবেই আমরা পিছিয়ে পড়ছি।অর্থনীতি আমাদের সবাইকে ধারণ করার মতো গতিতে বাড়ছে না।ভালো চাকরি নেই।সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা বলেও কিছু নেই এবং জলবায়ু বিপর্যয় এগিয়ে আসছে।
এই অবস্থায় পিছিয়ে পড়ার অনুভূতিকে কোনো মানসিক রোগ হিসাবে ট্রিট করা যাবেনা বরং বিদ্যমান রাজনৈতিক বাস্তবতার নেসেসারি রিয়্যাকশন হিসাবেই দেখতে হবে।
সমস্যা এইটা না যে আমাদের খারাপ লাগে,সমস্যা হলো আমাদের শেখানো হয় যে খারাপ লাগার জন্যও আমাদের অপরাধবোধে ভোগা উচিত।একটি সামাজিক বেদনাকে ব্যক্তিগত ব্যর্থতা হিসেবে দেখতে শেখানো হয়।
একটি কাঠামোগত ক্ষতকে ব্যক্তিগত ত্রুটি হিসেবে বুঝতে বাধ্য করা হয়।
এগুলোকে ট্রিট করার জন্য আবার মাইন্ডফুলনেস,থেরাপি কালচার এগুলো সৃষ্টি।সমাধান সবসময় আরেকটি পণ্য,আরেকটি বই।আরেকটি এ্যাপ্লিকেশন।
এগুলো থেকে বাচার জন্য এইটা বুঝা দরকার উইথ ক্লারিটি যে,আমাদের অসন্তুষ্টি বা পিছিয়ে পড়ার অনুভূতি আসলে আমাদের দোষের জন্য না বরং সিস্টেম্যাটিক ফেইলরের জন্যই সৃষ্টি।কারণ সিস্টেম এতটা এক্সপ্যান্ড করছে না যে সবাইকে জায়গা দিবে এবং এইটা কন্সটান্টলি নতুন নতুন অ্যাবস্ট্র্যাক্ট মেট্রিক্স তৈরি করছে,যাতে অন্যদের এক্সক্লুড করা যায়।সিস্টেমের সুফল আমাদের কাছে আসছে না কারণ এটি কেন্দ্রীভূত হয়ে গুটি কয়েক মানুষের কাছেই চলে গিয়েছে।দুনিয়াতে এনাফ সম্পদ আছে,এনাফ জায়গা আছে, কিন্তু তাও লোকজন হোমলেস থাকে কারণ সম্পদের মালিকানা সাধারণ মানুষের কাছে নেই।
ক্লারিটি আসলেই আসলে অনূভুতি চলে যায় না কিন্তু আমাদের ডিস স্যাটিস্ফেকশনকে এক্সটারনালাইজ করতে হবে।এটা বুঝতে হবে যে আমরা একা নই যে এই অনুভূতির ভেতর দিয়ে যায়।আমি স্ক্রিনে যাকে দেখে "ঈর্ষান্বিত" ফিল করতেছি,সেও একই অনুভূতির ভেতর দিয়ে গিয়েছে।তার "সাকসেস" আসলে নানা ধরণের কন্টিঞ্জেন্ট ইভেন্টের আউটকাম,এবং সেটাই "হাইলাইট" আকারে সোশ্যাল মিডিয়াতে এসেছে।তারাও সেইম মেশিনারি দিয়ে ট্র্যাপড।খেলায় যে জিতে যাচ্ছে আপাতত সে আমাদের শত্রু না,আমাদের শত্রু সেই যে রুলস এবং গেইম ইটসেল্ফ ক্রিয়েট করেছে এবং ফাংশনাল রেখেছে।
মতামত
এখনও কোনো মতামত নেই।
প্রথম মতামতটি আপনিই দিন।
আলোচনায় অংশ নিতে লগ ইন করুন অথবা এ্যাকাউন্ট খুলুন