সকল লেখা জানতে চাই
Searching…

আইএমএফ এবং সার্বভৌমত্বের সীমাবদ্ধতা

সাহেলের সামরিক জান্তা এবং সেনেগালের নতুন নেতৃত্ব সার্বভৌমত্বের নতুন সংজ্ঞা খুঁজলেও আইএমএফ-এর কঠোর অর্থনৈতিক শর্তাবলি তাদের সামনে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সাহেলের শাসকরা খনিজ সম্পদে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করলেও সরকারি ব্যয়ের ক্ষেত্রে আইএমএফ-এর পুরোনো নব্য-উদারবাদী কাঠামোর মধ্যেই আটকে আছেন।

মজদুর অনুবাদ টিম
মজদুর অনুবাদ টিম মজদুরের নিয়মিত লেখক
পড়তে 20 মিনিট লাগতে পারে
এই লেখাটি 54 বার পড়েছে
আইএমএফ এবং সার্বভৌমত্বের সীমাবদ্ধতা

সাহেল অঞ্চলের সামরিক শাসকরা এবং তাদের সমর্থনকারী কোটি কোটি মানুষের কাছে ‘সার্বভৌমত্ব’ অত্যন্ত প্রিয় একটি বিষয়। ২০২০ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে মালি, বুরকিনা ফাসো এবং নাইজারে জান্তারা বেসামরিক সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করে। এরপর এই নতুন সামরিক সরকারগুলো পশ্চিমা বাহিনীকে, বিশেষ করে ফরাসি সেনাদের এবং নাইজারের ক্ষেত্রে আমেরিকান সেনাদেরও বহিষ্কার করে। এছাড়া, যে ইকোনমিক কমিউনিটি অফ ওয়েস্ট আফ্রিকান স্টেটস (ইকোওয়াস) তাদের ওপর বেসামরিক শাসন পুনরুদ্ধারের জন্য চাপ সৃষ্টি করেছিল, সেই আঞ্চলিক জোটের বিরুদ্ধেও সামরিক শাসকরা কঠোর অবস্থান নেয়। শুধু তা-ই নয়, এই সামরিক সরকারগুলো অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও নিজেদের কর্তৃত্ব বজায় রাখতে মরিয়া; তারা স্বর্ণ, ইউরেনিয়াম এবং তেলের ওপর অধিক নিয়ন্ত্রণ ও রয়্যালটির দাবিতে শক্তিশালী বিদেশি কোম্পানিগুলোর মুখোমুখি হয়েছে।

মূল লেখাঃ ফরেইন এক্সচেঞ্জ

সাহেলের এই নতুন ‘সার্বভৌমত্ববাদ’ চাদ, গিনি এমনকি সেনেগালের মতো প্রতিবেশী দেশগুলোর পরিস্থিতির সাথে অনেকটাই সামঞ্জস্যপূর্ণ। সেনেগালে বেসামরিক শাসন থাকলেও, ২০২৪ সালে বিরোধী দলের বিজয়ের ফলে সেখানে সংস্কারপন্থী প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রী ক্ষমতায় এসেছেন। ইউক্রেন থেকে ইরানসহ বিশ্বজুড়ে যখন সার্বভৌমত্বের সংজ্ঞা নিয়ে বিতর্ক ও লড়াই চলছে, তখন সাহেল অঞ্চলটি একটি দেশ প্রকৃত অর্থে নিজে কীভাবে শাসিত হবে, সেই নতুন সংজ্ঞা নির্ধারণের সামনের সারিতে রয়েছে। তবে সাহেলের সামরিক জান্তা এবং সেনেগালের বেসামরিক সরকারের জন্য চূড়ান্ত পরীক্ষাটি হলো—আইএমএফ-এর মতো শক্তিশালী বহুজাতিক ঋণদাতা সংস্থাগুলোর বিরুদ্ধে তারা কতটা স্বাধীনতা বজায় রাখতে পারবে। এখন পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে, সাহেলের সামরিক জান্তা এবং আইএমএফ উভয়ই বিদ্যমান পরিস্থিতি বজায় রাখতেই বেশি আগ্রহী। অন্যদিকে, সেনেগালে আইএমএফ-এর কঠোর নিয়ন্ত্রণবাদী দৃষ্টিভঙ্গি দেশটির নতুন নেতৃত্বের জন্য বড় ধরনের সংকট ও বিভাজনের হুমকি তৈরি করছে।

সার্বভৌমত্ববাদের অর্থনীতি

সাহেল অঞ্চল এবং সেনেগালের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বেশ মিশ্র। একদিকে, সাহেলের সামরিক শাসকরা ক্ষমতায় এসে পেয়েছেন চরম দারিদ্র্য এবং দীর্ঘস্থায়ী সহিংসতা। বছরের পর বছর ধরে এই দেশগুলো মানব উন্নয়ন সূচকে (Human Development Index) তালিকার একেবারে নিচের দিকে অবস্থান করছে—২০২৩ সালের হিসেবে ১৯৩টি দেশের মধ্যে বুরকিনা ফাসোর অবস্থান ১৮৬তম, মালির ১৮৮তম, নাইজারের ১৮৯তম এবং চাদের ১৯০তম। সেনেগালের অবস্থাও খুব একটা ভালো নয়, তারা রয়েছে ১৬৯তম স্থানে। বহুমাত্রিক দারিদ্র্য সূচক (Multidimensional Poverty Index) অনুযায়ী, বুরকিনা ফাসোর ৩৮ শতাংশেরও বেশি মানুষ ‘তীব্র বহুমাত্রিক দারিদ্র্যের’ মধ্যে বসবাস করছে। এই চিত্র মালির ক্ষেত্রে ৪৫ শতাংশ, নাইজারের ক্ষেত্রে ৫৫ শতাংশ এবং চাদের ক্ষেত্রে ৬৪ শতাংশ। সেনেগালের ক্ষেত্রে এই হার কিছুটা কম, ২২ শতাংশ।

মালি, নাইজার এবং বুরকিনা ফাসোর বিশাল অংশজুড়ে জিহাদি হামলা গত এক দশক বা তারও বেশি সময় ধরে নিত্যদিনের ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিদ্রোহীরা ছায়া শাসন পরিচালনা করছে, গ্রামবাসী ও পথচারীদের কাছ থেকে চাঁদা আদায় করছে এবং নিয়মিত রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর হামলা চালাচ্ছে। এমনকি অভ্যুত্থানের আগে ও পরে রাজধানী শহরগুলোও হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে নাইজারের রাজধানী নিয়ামির আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ইসলামিক স্টেট নজিরবিহীন হামলা চালায়। এপ্রিলের শেষ দিকে জামায়াত নুসরাত আল-ইসলাম ওয়াল-মুসলিমিন (জেএনআইএম) এবং আজওয়াদ লিবারেশন ফ্রন্ট (এফএলএ) মালির বড় অংশজুড়ে সমন্বিত হামলা চালায়; এতে দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রীসহ অনেকে নিহত হন এবং বিদ্রোহীরা বেশ কিছু শহর ও সামরিক ঘাঁটির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয়। বিদ্রোহীদের কারণে মানবিক বিপর্যয়ের পাশাপাশি অর্থনৈতিক ক্ষতিও হয়েছে অপরিসীম। এই বিদ্রোহ কৃষি থেকে শুরু করে পরিবহন—সবকিছুকেই বিপর্যস্ত করে তুলেছে। উদাহরণস্বরূপ, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর থেকে জেএনআইএম-এর অবরোধের ফলে মালির রাজধানী বামাকোতে জ্বালানি সরবরাহ প্রায় বন্ধ হয়ে গিয়েছিল, যা কয়েক মাস স্থায়ী ছিল। বর্তমানে আরও ভয়াবহ অবরোধের আশঙ্কা করা হচ্ছে।

অন্যদিকে, কিছু সূচকের বিচারে সাহেলের অর্থনীতিতে জোয়ারের আভাসও পাওয়া যাচ্ছে। ২০১০-এর দশকে এখানে প্রবৃদ্ধি ছিল দ্রুত, যদিও তা সব ক্ষেত্রে সমান ছিল না। কোভিড-১৯ মহামারীতে সেনেগাল, মালি, বুরকিনা ফাসো এবং নাইজার—সব দেশই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে; এছাড়া অভ্যুত্থান পরবর্তী বছরগুলোতে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা ও নিষেধাজ্ঞার কারণে অর্থনীতি চাপে পড়েছিল। তবে এরপরই আবার ঘুরে দাঁড়িয়েছে প্রবৃদ্ধি। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপিতে প্রবৃদ্ধির হার বুরকিনা ফাসোতে ৪.৮ শতাংশ, মালিতে ৫ শতাংশ, সেনেগালে ৬.১ শতাংশ এবং নাইজারে ১০.৩ শতাংশে পৌঁছেছে।

এই প্রবৃদ্ধির মূল চালিকাশক্তি হলো খনিজ সম্পদ—স্বর্ণ, ইউরেনিয়াম, তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস, সেইসাথে লিথিয়াম, ম্যাঙ্গানিজ এবং অন্যান্য খনিজ। সাহেল অঞ্চলের দেশগুলোতে কৃষি এবং কিছু ম্যানুফ্যাকচারিং ও সেবা খাত থাকলেও, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের মূল কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে খনিজ আহরণ শিল্প। যেমন, সেনেগালে প্রেসিডেন্ট দিওমায়ে ফায়ে যে পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, তা অনেকটাই নির্ভর করছে ‘গ্রেটার টরটু আহমিম’ লিকুইড ন্যাচারাল গ্যাস প্রকল্পের ওপর। তবে ২০২৪ সালে চালুর পর থেকেই প্রকল্পটি কিছু বাধার মুখে পড়েছে। এছাড়া সেনেগালে স্বর্ণ খাতেরও প্রসার ঘটছে।

সার্বভৌমত্বের দোহাই দিয়ে এবং লভ্যাংশ বণ্টন নিয়ে দীর্ঘদিনের ক্ষোভকে পুঁজি করে সাহেলের সামরিক শাসকরা বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছেন। উদাহরণস্বরূপ, মালি ২০২৩ সালে নতুন খনি আইন কার্যকর করেছে, যার মাধ্যমে খনি প্রকল্পে রাষ্ট্রের মালিকানা ৩০ শতাংশ পর্যন্ত নিশ্চিত করা হয়েছে এবং আরও ৫ শতাংশ স্থানীয় বিনিয়োগকারীদের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে। বিশেষ করে কানাডার কোম্পানি ‘ব্যারিক গোল্ড’-এর ওপর মালির সামরিক কর্তৃপক্ষ কঠোর অবস্থান নেয়; তারা কোম্পানির নির্বাহীদের আটক করে এবং প্রায় ৪০ কোটি ডলার মূল্যের স্বর্ণ জব্দ করে। শেষ পর্যন্ত ব্যারিক গোল্ড ৪৩ কোটি ডলার পরিশোধে সম্মত হয় এবং মালিতে পুনরায় কার্যক্রম শুরু করে। খনি, লভ্যাংশ এবং সম্পদ নিয়ে এমন বিরোধ বুরকিনা ফাসো এবং নাইজারেও দেখা গেছে।

বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর জন্য ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও, সাহেলের দেশগুলো স্বর্ণ এবং অন্যান্য খনিজ সম্পদ আহরণের ক্ষেত্রে নতুন নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণ অব্যাহত রেখেছে। এমনকি ট্রাম্প প্রশাসনও এই সুযোগ কাজে লাগানোর চেষ্টা করছে। আফ্রিকার জন্য সদ্য নিয়োগপ্রাপ্ত ‘সিনিয়র ব্যুরো অফিশিয়াল’ নিক চেকার সাহেল সফর করছেন এবং সেখানকার কর্তৃপক্ষের সাথে সম্পর্ক স্থাপনের চেষ্টা চালাচ্ছেন; তিনি দেশগুলোর ‘সার্বভৌমত্বকে’ শ্রদ্ধা জানানোর প্রতিশ্রুতিও দিয়েছেন। এদিকে, খনিজ সম্পদ থেকে আয় বাড়ার ফলে সামরিক সরকারগুলো কিছু সম্পদ পুনর্বণ্টনের সুযোগ পাচ্ছে, যা চরম নিরাপত্তাহীনতার মধ্যেও তাদের জনপ্রিয়তা ধরে রাখতে সহায়তা করছে।

এসব বিষয় আমাদের আইএমএফ-এর (IMF) ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলার অবকাশ তৈরি করে। ফরাসি বাহিনী এবং বহুজাতিক খনি কোম্পানিগুলোর ক্ষেত্রে সার্বভৌমত্ব প্রয়োগ করাটা যতটা সহজ মনে হয়েছে, আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর (IFIs) ক্ষেত্রে কি তা সম্ভব? অথচ এই প্রতিষ্ঠানগুলোই ১৯৮০-এর দশক থেকে সাহেলের অর্থনৈতিক কাঠামো এবং ভবিষ্যৎ নির্ধারণে গভীর প্রভাব বিস্তার করে আসছে। এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে অঞ্চলের অর্থনৈতিক ইতিহাসের ওপর কিছুটা আলোকপাত করা জরুরি।

আইএফআই এবং সাহেল: একটি সংক্ষিপ্ত ইতিহাস

পশ্চিম আফ্রিকা ও এর বাইরের দেশগুলোতে বিশ্বব্যাংক এবং আইএমএফ মূলত আশির ও নব্বইয়ের দশকের ‘স্ট্রাকচারাল অ্যাডজাস্টমেন্ট’ বা গাঠনিক সমন্বয় কর্মসূচির জন্য পরিচিত। আইএমএফ-এর পত্রিকা ফাইন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট-এর ১৯৮৯ সালের সেপ্টেম্বরের একটি নিবন্ধে এই কর্মসূচির মূল উপাদানগুলো এভাবে তুলে ধরা হয়েছিল:

“অধিকাংশ দেশের কাঠামোগত নীতিতে মুদ্রা বিনিময় হারের সমন্বয়, বিনিময় ও বাণিজ্য ব্যবস্থার সংস্কার, অভ্যন্তরীণ মূল্য নির্ধারণ ও বিপণন নীতির উদারীকরণ, আর্থিক খাতের সংস্কার, সরকারি উদ্যোগগুলোর পুনর্গঠন, শ্রম বাজারের জটিলতা হ্রাস, সরকারি বিনিয়োগ পরিকল্পনা জোরদার, কর ব্যবস্থা ও সরকারি ব্যয় পুনর্গঠন এবং সুদের হার সংক্রান্ত নীতির উন্নয়ন অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। এই কাঠামোগত নীতিগুলোর পরিপূরক হিসেবে ভারসাম্যপূর্ণ রাজস্ব ও মুদ্রানীতি বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন।”

সমালোচকদের মতে, এই স্ট্রাকচারাল অ্যাডজাস্টমেন্ট আফ্রিকার অর্থনীতিকে অস্থিতিশীল করেছে এবং সাধারণ মানুষকে চরম দুর্দশার দিকে ঠেলে দিয়েছে। মুদ্রার ভাসমান মান নির্ধারণ ও অবমূল্যায়ন, উন্নয়নশীল অর্থনীতির দেশগুলোকে বিদেশি পুঁজির বিশৃঙ্খল প্রবাহের মুখোমুখি করা এবং সর্বোপরি—সরকারি সেবা ও কর্মসংস্থান কমিয়ে দেওয়ার মাধ্যমে এই কর্মসূচি পরিস্থিতি আরও জটিল করে তোলে। যথেষ্ট প্রমাণ রয়েছে যে, স্ট্রাকচারাল অ্যাডজাস্টমেন্ট শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতিই করেনি, বরং রাষ্ট্র ও নাগরিকদের মধ্যকার সামাজিক চুক্তিকেও দুর্বল করে দিয়েছে। নব্বইয়ের দশকে যখন বহুদলীয় গণতন্ত্রের আগমনে অধিকতর স্বাধীনতার প্রতিশ্রুতি মিলেছিল, তখন সাধারণ মানুষের জন্য রাষ্ট্রীয় সুরক্ষা ব্যবস্থা ছিল আরও নাজুক।

সাহেল অঞ্চলজুড়ে এই কাঠামোগত পরিবর্তনের সাথে এক নতুন ‘রাজনৈতিক শ্রেণির’ উত্থানের সম্পর্ক ছিল। আশির দশকে বিভিন্ন পেশায় থাকা একদল টেকনোক্র্যাট বা আমলাতান্ত্রিক এলিট নব্বইয়ের দশকে সরাসরি দলীয় রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। ২০২০-এর দশকে যে নেতাদের অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়, তাদের মধ্যে মালির ইব্রাহিম বুবাকার কেইতা এবং বুরকিনা ফাসোর রশ কাবোরেকে আশির দশকে এই কাঠামোগত পরিবর্তনের অগ্রভাগে দেখা গিয়েছিল। কেইতা তখন ইউরোপীয় ইউনিয়নের উন্নয়ন পরামর্শক ছিলেন এবং কাবোরে বুরকিনা ফাসোর ইন্টারন্যাশনাল ব্যাংকের প্রধান ছিলেন। এমনকি সাহেলের অনেক বামপন্থী চিন্তাবিদও সময়ের স্রোতে গা ভাসিয়েছেন। এমনই একজন ছিলেন মোহাম্মদ বাজুম, যাকে ২০২৩ সালে নাইজারের অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়। নাইজারের প্রাবন্ধিক ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানী রহমান ইদ্রিষা স্মরণ করেন, হাইস্কুলে যখন বাজুম তার দর্শনের শিক্ষক ছিলেন, তখন তিনি ছিলেন একজন মার্ক্সবাদী। কিন্তু ১৯৯১ সালের দিকে বাজুমের মধ্যে আমূল পরিবর্তন দেখা যায়:

“সে সময় তিনি আন্তরিকভাবে গণতান্ত্রিক পরিবর্তন, রাজনৈতিক অধিকার এবং স্বাধীনতার কথা বলছিলেন। ফরাসিদের ভাষায় তিনি একজন ‘রিপাবলিকান’ হয়ে উঠেছিলেন—অর্থাৎ নাগরিক অধিকারের বিষয়ে সচেতন একজন উদারপন্থী। বিষয়টি ছিল সম্পূর্ণ নতুন। তবে সবচেয়ে অবাক করা বিষয় ছিল, তার কথাবার্তায় মার্ক্সবাদের কোনো চিহ্নই ছিল না। আমি দ্রুতই বুঝতে পারি যে, বাজুমের এই রূপান্তর আসলে এক বৃহত্তর ধারার অংশ। মানুষ হঠাৎ করেই এমন সব অবস্থানে চলে আসছিল, যা আগের বছর অস্তিত্বহীন বলে মনে হতো। বাজুমের মতো অনেক প্রতিশ্রুতিশীল বুদ্ধিজীবী ‘কমরেড’ থেকে ‘নাগরিক’-এ রূপান্তরিত হয়েছিলেন।”

বিশ্বজুড়ে ‘ওয়াশিংটন কনসেনসাস’ যখন অর্থনৈতিক দর্শনের মূল ভিত্তি হয়ে ওঠে এবং ‘মুক্ত বাণিজ্য’ ও সরকারি বাজেট কাটছাঁটকে অগ্রাধিকার দেওয়া শুরু হয়, তখন সাহেল অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিকভাবে ‘নব্য-উদারবাদী’ (neoliberalized) হয়ে ওঠে। অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে বেসরকারিকরণ ও ব্যয় সংকোচন নীতির সমান্তরালে রাজনৈতিক ক্ষেত্রেও গড়ে ওঠে এক অস্পষ্ট ও ব্যক্তিকেন্দ্রিক দলীয় ব্যবস্থা।

নব্বইয়ের দশক থেকে আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো (IFIs) তাদের প্রচারণামূলক বা বুলিগত অবস্থানে বেশ কিছু পরিবর্তন এনেছে এবং দারিদ্র্য বিমোচনের মতো নতুন নতুন অগ্রাধিকারের কথা বলছে। কিন্তু তাদের কাজের মূল কাঠামোটি মূলত আগের মতোই রয়ে গেছে। ২০২৮ সালের আফ্রিকায় নাইজেরিয়া বা ইথিওপিয়ার মতো দেশগুলোতে যে ধরনের ‘অর্থনৈতিক সংস্কার’ কর্মসূচি চলছে, তা ৪০ বছর আগের সেই স্ট্রাকচারাল অ্যাডজাস্টমেন্ট কর্মসূচিরই প্রতিচ্ছবি।

আমাদের মূল প্রশ্নে ফিরে আসা যাক: সাহেলের সামরিক জান্তা এবং আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো—বিশেষ করে আইএমএফ—একে অপরের সাথে কীভাবে কাজ করছে? আর সেনেগালের ক্ষেত্রে এই সম্পর্কের সমীকরণটা কেমন, যেখানে নতুন পপুলিস্ট নেতৃত্ব সাধারণ মানুষের উপকারে আসবে এমন বড় ধরনের অর্থনৈতিক পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে?

সামরিক জান্তা এবং আইএমএফ

২০২০-এর দশকে সাহেলের অভ্যুত্থানগুলোর পর বিভিন্ন দ্বিপাক্ষিক ও বহুজাতিক ঋণদাতা সংস্থা মালি, বুরকিনা ফাসো ও নাইজারের ঋণ ও সহায়তা স্থগিত বা কমিয়ে দিয়েছিল। উদাহরণস্বরূপ, সামরিক জান্তার ক্ষমতা দখল আরও সংহত হওয়ার প্রেক্ষিতে ২০২১ সালে বিশ্বব্যাংক মালিতে অর্থ ছাড় বন্ধ করে দেয়। এই জান্তা সরকারগুলো নানামুখী নিষেধাজ্ঞা ও নিষেধাজ্ঞার কবলে পড়েছিল, যেগুলোর লক্ষ্য ছিল—যদিও তা সফল হয়নি—সামরিক শাসকদের বেসামরিক শাসন ফিরিয়ে দিতে বাধ্য করা। এমনকি ২০২২ সালের শুরুতে মালির ক্ষমতা হস্তান্তরের সময়সূচি নিয়ে বিরোধের জেরে ইকোওয়াস (ECOWAS) যে কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল, সামরিক শাসকরা তাও অবলীলায় উপেক্ষা করে গেছে।

তবে সাহেলের দেশগুলোর সাথে আইএমএফ-এর সম্পর্কের ক্ষেত্রে পরিবর্তনের চেয়ে ধারাবাহিকতাই বেশি লক্ষ্যণীয়। উদাহরণস্বরূপ, ২০২৫ ও ২০২৬ সালে আইএমএফ বেশ কয়েকটি বড় অংকের অর্থ ছাড় অনুমোদন করেছে। এর মধ্যে রয়েছে: ২০২৫ সালের এপ্রিলে মালির জন্য ১২ কোটি ৯০ লাখ ডলারের বেইলআউট, ২০২৬-২০২৭ মেয়াদে বুরকিনা ফাসোর জন্য ১৫ কোটি ৭৫ লাখ ডলার এবং নাইজারের জন্য ৯ কোটি ১০ লাখ ডলারের সম্ভাব্য সহায়তা।

সাহেলের দেশগুলোর কাছে আইএমএফ আসলে কী চায়? এখানে আইএমএফ-এর নিরস, টেকনিক্যাল এবং প্রায়শই অস্পষ্ট বা চাতুর্যপূর্ণ ভাষার গভীরে গিয়ে পড়তে হবে। আইএমএফ-এর নথিপত্রে বারবার ‘বিচক্ষণতা’ (prudence) শব্দটির ব্যবহার এবং ‘বেসরকারি খাতের’ ওপর গুরুত্বারোপ তাদের নব্য-উদারবাদী দৃষ্টিভঙ্গিরই প্রতিফলন। মালির ওপর ২০২৫ সালের একটি প্রতিবেদনের একটি অংশ লক্ষ্য করুন:

“রাজস্ব আয় হ্রাস, সহায়তার প্রবাহ কমে আসা এবং ব্যাপক অনিশ্চয়তার কারণে মালি বর্তমানে ‘কম খরচে বেশি কাজ’ করতে বাধ্য হচ্ছে। এর অর্থ হলো—এমন একটি রাজস্ব সংকোচন নীতি গ্রহণ করা যা প্রবৃদ্ধিকে রক্ষা করবে এবং দরিদ্রদের সুরক্ষা দেবে; সেইসাথে অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি, ব্যয়ের মান উন্নয়ন এবং এমন কোনো নীতিগত ভুল এড়িয়ে চলা যা পরিস্থিতির অবনতি ঘটাতে পারে বা ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধিকে ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে। মধ্যমেয়াদে কর্তৃপক্ষের উচ্চাকাঙ্ক্ষী উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার জন্য প্রয়োজন একটি সাহসী সংস্কার কর্মসূচি। এর মধ্যে রয়েছে সুশাসন ও ব্যবসায়িক পরিবেশের উন্নয়ন, সরকারি বিনিয়োগ ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করা, বেসরকারি খাতের গতিশীলতা বাড়ানো, বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং অর্থনীতিতে বৈচিত্র্য আনা। এই লক্ষ্যগুলো পূরণে কাঠামোগত বাধা দূর করা, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং ছাড়মূলক সহায়তার জন্য উন্নয়ন সহযোগীদের সাথে পুনরায় সম্পৃক্ত হওয়া জরুরি।”

আইএমএফ এখানে দরিদ্রদের কথা মুখে বললেও, তাদের মূল মনোযোগ হলো ‘রাজস্ব সংকোচন’ এবং ‘ব্যবসায়িক পরিবেশ’-এর দিকে। আইএমএফ সাহেলের দেশগুলোকে ঘাটতি কমাতে এবং এমন সব সংস্কারকে অগ্রাধিকার দিতে উৎসাহিত করছে, যা বিদেশি বিনিয়োগকারী ও বহিরাগত তহবিল যোগানদাতাদের কাছে আকর্ষণীয় হয়। তারা সব সরকারি ব্যয় ছেঁটে ফেলার কথা সরাসরি না বললেও, বড় ধরনের ছাঁটাই ও যৌক্তিকীকরণের কথা বলে।

একই প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, “একটি টেকসই ও প্রবৃদ্ধি-বান্ধব সমন্বয়ের জন্য অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আহরণ বাড়ানো প্রয়োজন। ব্যয়ের ক্ষেত্রে অপচয় কমিয়ে, ব্যয়ের দক্ষতা বাড়িয়ে, উচ্চ-প্রভাবশালী সামাজিক কর্মসূচিকে অগ্রাধিকার দিয়ে এবং ব্যয়বহুল ভর্তুকি যুক্তিসঙ্গত করার মাধ্যমে ‘কম খরচে বেশি কাজ’ নিশ্চিত করতে হবে।” শুনতে এটি যৌক্তিক মনে হতে পারে—কারণ অপচয় ও অদক্ষতা কোনো দেশের জন্যই কাম্য নয়। কিন্তু কার্যকর, দক্ষ এবং যৌক্তিক হওয়ার মানদণ্ড কারা নির্ধারণ করবে? ‘অপচয় কমানো’র মানে কি সরকারি চাকরিজীবী ছাঁটাই? আর যদি রাষ্ট্র ভর্তুকিকে ‘ব্যয়বহুল’ মনে করে সেগুলো কেটে নেয়, তবে সেই কাঁচির আঘাত কার ওপর পড়ে?

ওই নথির গভীরে কিছু সুনির্দিষ্ট সুপারিশ লুকিয়ে আছে: রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোতে “লক্ষ্যভিত্তিক নিয়োগ স্থগিত করা, কর্মী সংখ্যা কমিয়ে আনা এবং কর্মক্ষমতা-ভিত্তিক বেতন কাঠামো চালু করা।” এছাড়া “জ্বালানি ও বিদ্যুতের ওপর থেকে সাধারণ ভর্তুকি তুলে নিয়ে তা নির্দিষ্ট সামাজিক সহায়তায় রূপান্তর করা।” আইএমএফ সাহেলের কর্তৃপক্ষকে একটি ছিমছাম এবং বিনিয়োগকারী-বান্ধব ‘সংস্কার’ প্রক্রিয়ার দিকে নিয়ে যেতে চায়; যেখানে পূর্বাভাসযোগ্যতা এবং ‘দক্ষতা’ই মুখ্য। লক্ষণীয় যে, জেএনআইএম-এর জ্বালানি অবরোধের মধ্যেই মালি গত মার্চ মাসে জ্বালানির ওপর থেকে বেশ কিছু ভর্তুকি প্রত্যাহার করে নিয়েছে।

সামরিক শাসন কিংবা মানবাধিকারের মতো বিষয়গুলোতে আইএমএফকে বেশ শীতল বা নির্বিকার মনে হয়। যেখানে অন্য বড় পশ্চিমা প্রতিষ্ঠান ও দাতারা সাহেলের সামরিক জান্তার বিরুদ্ধে নৈতিক অবস্থান নিয়েছিল এবং সহায়তা বন্ধের মাধ্যমে তাদের চাপে ফেলতে চেয়েছিল (যদিও তারা ব্যর্থ হয়েছে), সেখানে আইএমএফ তাদের নিজস্ব অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। প্রকৃতপক্ষে, সামরিক জান্তার প্রতি আইএমএফ-এর মনোভাব সেনেগালের মতো বেসামরিক শাসিত, অপেক্ষাকৃত গণতান্ত্রিক দেশটির চেয়ে অনেক বেশি বন্ধুত্বপূর্ণ বলে মনে হয়।

আইএমএফ এবং সেনেগালের সম্ভাব্য সংস্কারকরা

২০১২ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত সেনেগালের প্রেসিডেন্ট ছিলেন ম্যাকি সাল, যিনি পেশায় ছিলেন পেট্রোলিয়াম প্রকৌশলী। সলের শাসনামলে, বিশেষ করে ২০১২ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত প্রথম মেয়াদে সেনেগালের অর্থনীতি বেশ ভালো প্রবৃদ্ধি দেখিয়েছে। কিন্তু অর্থনীতিবিদ এনদঙ্গো সাম্বা সিলার মতো সমালোচকরা সলের ‘এমারজেন্ট সেনেগাল’ (Emergent Senegal) নীতিকে ফাঁপা বলে মনে করতেন। ২০২২ সালের এক সাক্ষাৎকারে সিলা মন্তব্য করেছিলেন, এই পরিকল্পনাটি ছিল “শুধুমাত্র অবকাঠামো প্রকল্পের একটি তালিকা, যা মূলত ফরাসি কোম্পানিগুলোকেই লাভবান করেছে।” সিলা আরও যোগ করেন, সেনেগালের বিশাল ঋণের ভারের কথা উল্লেখ করে যে, “আমরা নতুন ঋণ নিয়ে পুরনো ঋণ শোধ করছি। স্বাধীনতার পর থেকে এটাই সেনেগালের উন্নয়নের মডেল।” সিলার মতে, “আমাদের সরকারের যুক্তি হলো, যেহেতু তাদের কাছে ‘তহবিলের অভাব’, তাই বিদেশি বিনিয়োগকারী ও পুঁজির জন্য দেশকে আকর্ষণীয় করে তোলা ছাড়া উপায় নেই।”

ম্যাকি সলের রাষ্ট্রপতিত্বের পুরো সময়জুড়েই বিরোধী দলের উদীয়মান নেতারা আইনি জটিলতার মুখে পড়েছেন—তিনবার আদালতের রায়ে একজন প্রধান বিরোধী নেতা প্রেসিডেন্ট নির্বাচন থেকে ছিটকে পড়েছেন। ২০১৯ সালে সাল সহজেই পুনর্নির্বাচিত হন। দ্বিতীয় মেয়াদের শেষে তিনি ক্ষমতা ছাড়তে অনিচ্ছুক ছিলেন; তিনি নির্বাচন স্থগিত করেছিলেন, কিন্তু অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক চাপের মুখে শেষ পর্যন্ত পিছিয়ে আসেন। তার পছন্দ করা উত্তরসূরি, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী আমাদু বা, দিওমায়ে ফায়ে-এর কাছে বড় ব্যবধানে হেরে যান। ফায়ে একজন সংস্কারপন্থী এবং সলের সবচেয়ে কঠোর সমালোচক উসমান সোনকোর ঘনিষ্ঠ মিত্র ছিলেন। ধর্ষণ ও জনশৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে আইনি লড়াইয়ের কারণে সোনকো প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে লড়তে পারেননি, তবে তিনি ফায়ে-এর প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

সোনকো, ফায়ে এবং তাদের রাজনৈতিক দল—‘আফ্রিকান প্যাট্রিয়টস অফ সেনেগাল ফর ওয়ার্ক, এথিক্স অ্যান্ড ফ্র্যাটারনিটি’ বা পাস্টেফ (PASTEF)—২০১০-এর দশকে একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়। সিভিল সার্ভিসের ব্যাকগ্রাউন্ড থেকে আসা ফায়ে এবং বিশেষ করে সোনকো দুর্নীতি (পেট্রোলিয়াম ও গ্যাস শিল্পসহ) উন্মোচন করে এবং সেনেগালের জন্য সম্পূর্ণ নতুন এক অর্থনৈতিক মডেলের দাবি তুলে নিজেদের পরিচিতি গড়ে তোলেন।

সোনকো এবং পাস্টেফের কাছে সার্বভৌমত্ব, বিশেষ করে অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্ব—ক্ষমতায় আসার আগে ও পরে সবসময়ই প্রধান উদ্বেগের বিষয় ছিল। ২০২৫ সালে ফ্রাঞ্জ ফ্যাননের জীবন নিয়ে এক বক্তৃতায় সোনকো বলেছিলেন, “ঔপনিবেশিক শক্তি চলে গেছে কিন্তু ঋণ রয়ে গেছে। ঔপনিবেশিক প্রশাসন সরে গেছে কিন্তু অসম চুক্তিগুলো থেকে গেছে। গভর্নররা অদৃশ্য হয়েছেন কিন্তু আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর নির্দেশ জারি রয়েছে।” ক্ষমতায় আসার পর, ফায়ে ও সোনকো রাজনৈতিক সার্বভৌমত্বের ক্ষেত্রে কিছু দ্রুত সাফল্য অর্জন করেন; তারা কিছু ফরাসি সেনাকে বহিষ্কার করেন এবং সেনেগালে ১৯৪৪ সালে ফরাসি বাহিনীর গণহত্যার জন্য ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁর কাছ থেকে অনুশোচনামূলক বক্তব্য আদায় করেন।

তবে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে ফায়ে এবং সোনকোর (যারা বর্তমানে একে অপরের সাথে মতবিরোধে লিপ্ত) রূপান্তরকামী উচ্চাকাঙ্ক্ষা আইএমএফ-এর বাধার মুখে পড়েছে, এমনকি ব্যর্থ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। ক্ষমতায় আসার পর ফায়ে-এর সরকার সরকারি অর্থসহ বিভিন্ন খাতের অডিট করে, যেখানে আগের সরকারের আমলে প্রায় ৭০০ কোটি ডলারের “গোপন ঋণ” বা হিডেন ডেট বেরিয়ে আসে। এর প্রতিক্রিয়ায়, ফায়ে ক্ষমতায় আসার মাত্র ছয় মাস পর ২০২৪ সালের অক্টোবরে আইএমএফ তাদের ১৮০ কোটি ডলারের ঋণ স্থগিত করে দেয়। তখন থেকেই ফায়ে-এর সরকার আইএমএফ-এর সাথে দরকষাকষি করছে, আর সোনকো আইএমএফ-এর চাপিয়ে দেওয়া শর্তগুলোর তীব্র সমালোচনা করছেন। এসব শর্তের মধ্যে রয়েছে আইএমএফ-এর চিরচেনা সেই পুরনো দাওয়াই: বাজেট সংকোচন এবং বিশেষ করে ভর্তুকি কমানো। আইএমএফ যদিও কর বাড়ানোর পক্ষে কথা বলে, তবে প্রতিষ্ঠান হিসেবে তারা ব্যয় সংকোচনের দিকেই বেশি ঝুঁকে থাকে। আইএমএফ সতর্ক করে বলেছে, “উচ্চাভিলাষী রাজস্ব আহরণ” অবশ্যই “সতর্ক প্রাক্কলনের” অধীন হতে হবে। আমার কাছে মনে হয়, তাদের “ভারসাম্যপূর্ণ” এবং “সুনির্দিষ্ট” শব্দগুলো আসলে কৃচ্ছ্রসাধন বা ব্যয় সংকোচনেরই চাতুর্যপূর্ণ রূপক।

অর্থনীতিবিদ আব্দুল্লা এনদিয়ায়ে যেমনটি বর্ণনা করেছেন, সেনেগাল এখন তিনটি বড় পথের মুখোমুখি: যেকোনো মূল্যে ঋণ পরিশোধ করা, ঋণখেলাপি হওয়া, অথবা নতুন কোনো অ-পশ্চিমা ঋণদাতার শরণাপন্ন হওয়া। ‘ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস’-এর সাম্প্রতিক রিপোর্ট অনুযায়ী, সেনেগাল সরকার ওই তৃতীয় পথটি বেছে নিতে শুরু করেছে; তারা “গোপনে এমন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে কোটি কোটি ডলার ঋণ নিচ্ছে যা তারা প্রকাশ্যে প্রকাশ করেনি।” সেনেগাল আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ উভয় ক্ষেত্রেই জটিল পছন্দের মুখোমুখি। সোনকো হুমকি দিয়েছেন যে, সরকার যদি ঋণ পুনর্গঠনের বিষয়ে আইএমএফ-এর কাছে নতি স্বীকার করে, তবে তিনি পদত্যাগ করবেন। এপ্রিল মাসে ওয়াশিংটনে সেনেগালের কর্মকর্তাদের সাথে আইএমএফ-এর বৈঠক থেকে খুব একটা অগ্রগতি হয়নি; অথচ সেনেগালের কর্তৃপক্ষ দাবি করছে যে, তারা দেশের ঋণ সম্পর্কে “সম্পূর্ণ স্বচ্ছতা” বজায় রাখছে। দেশে নিত্যপণ্যের দাম বাড়ায় কিছুটা বিক্ষোভও দেখা দিয়েছে, আর এর মধ্যেই ২০২৭ সালের নির্বাচন সোনকো ও ফায়ের সম্পর্কের চূড়ান্ত বিচ্ছেদের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।

এই চরম অস্থিরতার মাঝে একটি বিষয় অবাক করার মতো—আইএমএফ-এর কাছে সাহেলের সামরিক শাসিত দেশগুলোর প্রতি যে সহমর্মিতা দেখা যায়, সেনেগালের মতো বেসামরিক শাসিত ও গণতান্ত্রিক দেশের প্রতি তাদের মনোভাব ততটাই কঠোর ও নিয়ন্ত্রণবাদী।

সার্বভৌমত্ববাদের সীমাবদ্ধতা

সাহেল এবং পশ্চিম আফ্রিকায় সার্বভৌমত্ববাদের ভবিষ্যৎ এখন কোন দিকে মোড় নিচ্ছে? সরকারগুলোর বাজেট যারা নিয়ন্ত্রণ করে, মূলত তাদের ইচ্ছার কাছেই সার্বভৌমত্ববাদের সীমাবদ্ধতা আটকে আছে। সাহেলের দেশগুলো সামরিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে যে ব্যাপক পরিবর্তন এনেছে—যেমন দীর্ঘদিনের পশ্চিমা নিরাপত্তা মোতায়েন ও প্রশিক্ষণ কর্মসূচি বন্ধ করে দেওয়া—তার বিপরীতে আইএমএফ-এর সাথে তাদের সম্পর্কের ক্ষেত্রে এক ধরণের ধারাবাহিকতাই লক্ষ্য করা যাচ্ছে। সামরিক জান্তারা বিদেশি জ্বালানি ও খনি কোম্পানিগুলোর সামনে নিজেদের কর্তৃত্ব জাহির করলেও, সরকারি ব্যয়ের ক্ষেত্রে তারা মূলত পুরোনো ব্যবস্থাই বজায় রেখেছে।

এখন প্রশ্ন থেকে যায়, স্বর্ণ, ইউরেনিয়াম এবং তেল থেকে প্রাপ্ত নতুন রয়্যালটির সিংহভাগ শেষ পর্যন্ত কোথায় যাবে? এই দশকের শুরুতে সাধারণ সাহেলবাসী যে অবস্থায় ছিল, দশকের শেষে তারা কি তার চেয়ে ভালো কোনো অবস্থায় পৌঁছাতে পারবে? এই তিনটি সামরিক জান্তাই অন্তত ২০৩০ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকার পরিকল্পনা করছে, যাদের আইএমএফ এবং ক্রমশ যুক্তরাষ্ট্রও অনেকটা মেনে নিয়েছে। অন্যদিকে, সেনেগালের সংস্কার কর্মসূচি আইএমএফ-এর চাপে পড়ে ব্যর্থ হওয়ার পথে। এই পুরো পরিস্থিতি আমাদের একটি বড় শিক্ষা দেয়—প্রকৃত ক্ষমতা আসলে কোথায় নিহিত, তা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

#সাহেল_অঞ্চল #সেনেগাল #অর্থনৈতিক_সার্বভৌমত্ব #পশ্চিম_আফ্রিকা #আন্তর্জাতিক_রাজনীতি #সামরিক_জান্তা #অর্থনীতি
মজদুর অনুবাদ টিম

About the Author

মজদুর অনুবাদ টিম

মজদুরের নিয়মিত লেখক

অনুবাদ

প্রোফাইল দেখুন

মতামত

এখনও কোনো মতামত নেই।

প্রথম মতামতটি আপনিই দিন।

আলোচনায় অংশ নিতে লগ ইন করুন অথবা এ্যাকাউন্ট খুলুন

Reading

Font size

Auto scroll
Slow Fast