মার্কসবাদী সাহিত্য সমালোচনা
মার্কসবাদী সাহিত্য সমালোচনা মূলত কার্ল মার্কসের দার্শনিক চিন্তা—ঐতিহাসিক বস্তুবাদ—কে সাহিত্য বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করে। এই সমালোচনা-পদ্ধতির মূল ভিত্তিটা অনুধাবন করতে হলে প্রথমেই মার্কসের "ভিত্তি" (base) ও "উপরিকাঠামো" (superstructure) ধারণাটি জানা আবশ্যক।
মূল তাত্ত্বিক কাঠামো: ভিত্তি ও উপরিকাঠামো
মার্কসের মৌলিক প্রতিপাদ্য হলো, একটি সমাজে অর্থনৈতিক ভিত্তি—অর্থাৎ উৎপাদন ব্যবস্থা, শ্রমিক-মালিকের সম্পর্ক এবং সম্পদের মালিকানা—সমাজের অবশিষ্ট সমস্ত কিছুকেই নির্ধারণ করে। এই অর্থনৈতিক ভিত্তির ওপরেই গড়ে ওঠে সমাজের উপরিকাঠামো, যার অন্তর্গত রাজনীতি, আইন, ধর্ম এবং সাহিত্য-শিল্পকলাও। যেমন ধরা যাক, সামন্ততান্ত্রিক যুগের বীরত্বগাথা বা রোমান্স সাহিত্য—যেখানে অভিজাত শ্রেণির বীরত্ব, আনুগত্য ও সম্মানের আদর্শ মহিমান্বিত হতো—তা আসলে সেই যুগের ভূমিভিত্তিক উৎপাদন সম্পর্ক ও সামন্তীয় শ্রেণিবিন্যাসের একটি সাংস্কৃতিক প্রতিফলন। ঠিক তেমনই, ঊনবিংশ শতকের ইউরোপীয় উপন্যাসে যে ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য, সম্পত্তি ও বিবাহের প্রশ্ন এত প্রবলভাবে দেখা যায়, তা শিল্পবিপ্লবোত্তর বুর্জোয়া সমাজের অর্থনৈতিক বাস্তবতা থেকেই উদ্ভূত। মার্কসবাদীদের কেন্দ্রীয় দাবি এখানেই—সাহিত্য কখনোই তার সামাজিক-অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটের প্রভাব এড়িয়ে যেতে পারে না, এমনকি যখন তা নিজেকে "নিরপেক্ষ" বা "চিরন্তন" বলে দাবি করে, তখনও।
ইংরেজ মার্কসবাদী সমালোচক টেরি ইগলটনের ভাষায়, মার্কসীয় সমালোচনা নিতান্তই "সাহিত্যের সমাজবিজ্ঞান" নয়। এর অর্থ এই নয় যে এটি কেবল এই প্রশ্নে সীমাবদ্ধ থাকে যে কোনো উপন্যাস কীভাবে প্রকাশিত হলো, বা তাতে শ্রমিকশ্রেণির উপস্থিতি কতটুকু। বরং এর লক্ষ্য অনেক গভীরতর—সাহিত্যকর্মকে তার পূর্ণ পরিসরে অনুধাবন করা, যার জন্য আঙ্গিক, শৈলী এবং অর্থের সূক্ষ্মতার প্রতিও সমান মনোযোগী দৃষ্টি প্রয়োজন।
সাহিত্যকে যেভাবে দেখা হয়
মার্কসবাদী দৃষ্টিকোণ থেকে সাহিত্য একটি সামাজিক প্রতিষ্ঠান, যার একটি নির্দিষ্ট ভাবাদর্শিক (ideological) কার্যকারিতা রয়েছে। অর্থাৎ, একটি সাহিত্যকর্ম কেবল লেখকের ব্যক্তিগত কল্পনার নিরঙ্কুশ ফসল নয়—এটি সেই সময়ের সামাজিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতার একটি প্রতিফলন, এবং অনেক সময় লেখকের অজান্তেই সেই কালপর্বের প্রভাবশালী শ্রেণির চিন্তাভাবনা বা স্বার্থকেও বহন করে। এই অজান্তে বহন করার বিষয়টিই মার্কসবাদী সমালোচনায় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ একজন লেখক সচেতনভাবে কোনো শ্রেণির পক্ষে কলম ধরছেন কিনা তার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো তাঁর রচনার ভেতরে অবচেতনভাবে প্রবিষ্ট হওয়া ভাবাদর্শগত অনুমানগুলি।
উদাহরণস্বরূপ, জেন অস্টেনের উপন্যাসগুলিতে বিবাহকে যে স্বাভাবিক ও আকাঙ্ক্ষিত পরিণতি হিসেবে দেখানো হয়, তার পেছনে নিহিত আছে উনিশ শতকের ইংল্যান্ডের সম্পত্তি-উত্তরাধিকার ব্যবস্থা, যেখানে নারীর অর্থনৈতিক নিরাপত্তা সরাসরি বিবাহের সঙ্গে সম্পর্কিত ছিল। অস্টেন স্বয়ং সচেতনভাবে এই ব্যবস্থার পক্ষে প্রচারণা চালাচ্ছেন না, কিন্তু তাঁর আখ্যানের অবকাঠামোতেই এই অর্থনৈতিক বাস্তবতা গেঁথে আছে। মার্কসবাদীরা এই প্রশ্ন তোলেন—একটি গল্প বা উপন্যাস কি বিদ্যমান সামাজিক ক্ষমতার বিন্যাস ও অর্থনৈতিক বৈষম্যকে নিশ্চিত করছে, নাকি তার বিরুদ্ধে প্রশ্ন তুলছে? লেখকের নিজের শ্রেণি-পরিচয় ও আদর্শও এখানে বিশেষভাবে বিবেচ্য বিষয়—যদিও এটি লক্ষণীয় যে একজন বুর্জোয়া শ্রেণির লেখকও তাঁর শ্রেণির সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করে বাস্তবতার গভীরতর সত্যকে ধরতে পারেন, যা পরে আলোচিত হবে।
শ্রেণিসংগ্রাম ও বাস্তবতাবাদ
মার্কসবাদী সাহিত্য সমালোচনার একটি প্রধান অভিমুখ শ্রেণিসংগ্রামকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়। চরিত্র, ঘটনা ও আখ্যানের মধ্য দিয়ে শ্রমিকশ্রেণির শোষণ, সম্পদের অসমবণ্টন এবং শ্রম-বিভাজনের রূপটি কীভাবে উপস্থাপিত হচ্ছে—এই সবই বিশ্লেষণের কেন্দ্রবিন্দু। চার্লস ডিকেন্সের "হার্ড টাইমস" বা এমিল জোলার "জার্মিনাল" উপন্যাসে শিল্প-শ্রমিকদের জীবনযাত্রার যে চিত্র পাওয়া যায়, তা শ্রেণিসংগ্রামের সাহিত্যিক প্রতিফলনের একটি প্রত্যক্ষ দৃষ্টান্ত হিসেবে মার্কসবাদী সমালোচকদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলা সাহিত্য আলোচনায় এ প্রসঙ্গে বলা হয়, মার্কসীয় বাস্তববাদ বিচারের তিনটি দিক বিশেষভাবে লক্ষণীয়—প্রথমত, বস্তুজগতের বিশ্বস্ত উপস্থাপনা; দ্বিতীয়ত, জীবনসংগ্রামের মাধ্যমে মানবিক বাস্তবতার প্রতিফলন; এবং তৃতীয়ত, সেই সংগ্রামের মধ্য দিয়ে মানবপ্রকৃতির যে নতুন সত্য উদ্ভাসিত হয়, তার যত্নশীল পরিচর্যা। কেবল দারিদ্র্য বা শোষণের বাহ্যিক বিবরণ দেওয়াই যথেষ্ট নয়—সেই সংগ্রামের ভেতর দিয়ে মানুষের চরিত্রের যে রূপান্তর ঘটে, তার শৈল্পিক উপস্থাপনাই বাস্তববাদকে অর্থবহ করে তোলে। মার্ক্সবাদী তাত্ত্বিক গেয়র্গ লুকাচ্ এই প্রসঙ্গে বলজাকের মতো রক্ষণশীল রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির লেখকের উদাহরণ টেনে দেখিয়েছিলেন—বলজাক ব্যক্তিগতভাবে রাজতন্ত্রের সমর্থক হলেও তাঁর "লা কোমেদি উমেন" উপন্যাসমালায় উদীয়মান বুর্জোয়া শ্রেণির লোভ ও নৈতিক বিপর্যয় এত নিপুণভাবে চিত্রিত হয়েছে যে তা তাঁর ব্যক্তিগত রাজনৈতিক বিশ্বাসকেও ছাপিয়ে গিয়েছে—এই ঘটনাকেই লুকাচ্ "বাস্তববাদের বিজয়" বলে অভিহিত করেছিলেন।
সোভিয়েত ইউনিয়ন প্রতিষ্ঠার পরে এই ধারার লেখকরা একটি নতুন সাহিত্যিক প্রবণতার জন্ম দেন, যাকে নামকরণ করা হয় "সমাজতান্ত্রিক বাস্তববাদ" বা সোশ্যালিস্ট রিয়ালিজম—যেখানে সাহিত্যের কাজ হয়ে দাঁড়ায় কেবল বাস্তবতার প্রতিফলন নয়, বরং সমাজতান্ত্রিক ভবিষ্যতের আদর্শকেও জীবনসংগ্রামের আখ্যানে গেঁথে দেওয়া।
মার্কসবাদী সাহিত্য সমালোচনার ধাপ ও বিভিন্নতা
মার্কসবাদী সমালোচনা কোনো একরঙা বা স্থির পদ্ধতি নয়—সময়ের সাথে সাথে এর অভ্যন্তরে নানা ধারা বিকশিত হয়েছে। টেরি ইগলটনের প্রস্তাবিত একটি বিভাজন অনুযায়ী, মার্কসীয় সমালোচনাকে মূলত চার ভাগে বিন্যস্ত করা যায়—নৃতাত্ত্বিক, রাজনৈতিক, ভাবাদর্শিক এবং অর্থনৈতিক ধারা।
নৃতাত্ত্বিক ধারা, যা দ্বিতীয় আন্তর্জাতিকের সময়কালে (১৮৮৯ থেকে ১৯১৬) প্রাধান্য পেয়েছিল, মূলত এই প্রশ্নগুলি তোলে—সামাজিক বিকাশে শিল্পের কাজ কী, শ্রমের সঙ্গে শিল্পের সম্পর্ক কী, এবং পুরাণের সাথে শিল্পের আদিম সংযোগ কোথায় নিহিত। এই ধারায় কাজ করেছেন রুশ তাত্ত্বিক গেয়র্গি প্লেখানভ এবং ব্রিটিশ মার্কসবাদী ক্রিস্টফার কডওয়েল। প্লেখানভ তাঁর "আর্ট অ্যান্ড সোশ্যাল লাইফ" গ্রন্থে দেখান, কীভাবে আদিম সমাজে শ্রমের ছন্দ থেকেই সংগীত ও নৃত্যের উৎপত্তি, এবং শিল্পের রূপ কীভাবে শ্রম-প্রক্রিয়ার সাথে অভিন্নভাবে জড়িত ছিল।
পরবর্তীকালে গেয়র্গ লুকাচ্, ফ্রেডরিক জেমসন, রেমন্ড উইলিয়ামস প্রমুখ তাত্ত্বিকরা মার্কসবাদী সাহিত্য তত্ত্বকে আরও গভীর ও জটিল রূপ প্রদান করেন। জেমসন তাঁর "মার্কসিজম অ্যান্ড ফর্ম" (১৯৭১) গ্রন্থে একটি দ্বান্দ্বিক সমালোচনা পদ্ধতির প্রস্তাব করেন, যেখানে সাহিত্যকে তার বিস্তৃত ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে দেখার পাশাপাশি, পাঠ্যের গভীরতর অভ্যন্তরীণ আঙ্গিক-গঠনকেও অন্বেষণ করা হয়। এর পরবর্তী রচনা "দ্য পলিটিক্যাল আনকনশাস"-এ তিনি ফ্রয়েডীয় মনঃসমীক্ষণ তত্ত্বের ধারণা মিশিয়ে দেখান, কীভাবে সাহিত্যকর্মে কিছু সামাজিক দ্বন্দ্ব বা বাস্তবতা "দাবিয়ে রাখা" বা চাপা দেওয়া হয়—যেমন কোনো উপন্যাসে যে সামাজিক টেনশন প্রত্যক্ষভাবে উপস্থাপিত হয় না, কিন্তু আখ্যানের অসংগতি বা ফাঁকফোকরের মধ্য দিয়ে তার উপস্থিতি অনুমান করা যায়—এই "রাজনৈতিক অবচেতন"-কে উদ্ঘাটন করাই ভাবাদর্শের কাজ বোঝার চাবিকাঠি হতে পারে বলে জেমসন মনে করেন। রেমন্ড উইলিয়ামস আবার "কালচার অ্যান্ড সোসাইটি" গ্রন্থে দেখান, কীভাবে "সংস্কৃতি" শব্দটির অর্থ-পরিবর্তনের ইতিহাসের মধ্য দিয়েই শ্রেণিসমাজের রূপান্তর ধরা পড়ে।
সংক্ষেপে
মার্কসবাদী দৃষ্টিতে সাহিত্য হলো সমাজের অর্থনৈতিক ভিত্তির ওপর নির্মিত একটি প্রতিফলন বা প্রকাশ, যা শ্রেণিসংগ্রাম, ক্ষমতার বিন্যাস ও ভাবাদর্শকে আপন গর্ভে বহন করে। সাহিত্য সমালোচকের কাজ এখানে দ্বিমুখী—একদিকে একটি রচনা নিরেট শৈল্পিক গুণে কেমন তা বিচার করা, অন্যদিকে এটিও অনুসন্ধান করা যে রচনাটি তার সময়ের অর্থনৈতিক-সামাজিক বাস্তবতাকে কীভাবে প্রতিফলিত বা প্রশ্নবিদ্ধ করছে, কোন শ্রেণির স্বার্থ বা দৃষ্টিভঙ্গি এতে প্রকাশ পাচ্ছে, এবং লেখকের সমাজ-সচেতনতা কতটা গভীর। তবে এই দৃষ্টিভঙ্গির প্রয়োগে অতিরিক্ত যান্ত্রিকতা বা সংকীর্ণতা প্রবেশ করলে তা সাহিত্যের শৈল্পিক মূল্যকেই খর্ব করে দিতে পারে—এই বিপদের কথা মার্কসবাদী তাত্ত্বিকরা নিজেরাই বারংবার সতর্ক করে গিয়েছেন।
About the Author
Nasim sarker
মজদুরের নিয়মিত লেখকStudent
শিক্ষার্থী, বাংলা বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়। যোগাযোগঃ email:[email protected] Facebook profile: https://www.facebook.com/share/1QYbj7qtnU/
প্রোফাইল দেখুন
মতামত
এখনও কোনো মতামত নেই।
প্রথম মতামতটি আপনিই দিন।
আলোচনায় অংশ নিতে লগ ইন করুন অথবা এ্যাকাউন্ট খুলুন