প্রস্তাবিত ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেটটি সামষ্টিক অর্থনীতির (Macroeconomics) দৃষ্টিকোণ থেকে পর্যালোচনা করলে বেশ কিছু আশাব্যঞ্জক দিকের পাশাপাশি গভীর কিছু শঙ্কার জায়গাও উন্মোচিত হয়।
বাজেটের বেশ কিছু ইতিবাচক দিক রয়েছে, বিশেষ করে সাপ্লাই-সাইড বা জোগান ব্যবস্থায়। ব্যবসা সহজীকরণের লক্ষ্যে ৭ দিনের মধ্যে লাইসেন্স এবং ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে কোম্পানি নিবন্ধনের জন্য 'Single Window System' চালু করার উদ্যোগ প্রশংসনীয়। এছাড়া, নিত্যপ্রয়োজনীয় ৬০টি পণ্যের ওপর উৎসে কর ১-৫% থেকে কমিয়ে মাত্র ০.৫% করা হয়েছে, যা বাজারে পণ্যের দাম কমাতে সাহায্য করবে এবং সাধারণ মানুষকে কিছুটা স্বস্তি দেবে। আরও বেশ কিছু জায়গায় কর হার কমানো হয়েছে (সোলার, EV, এক্সপোর্ট ওরিয়েন্টেড কিছু সেক্টর এর কাঁচামাল, ইত্যাদি) যেগুলো ভালো পদক্ষেপ। দীর্ঘমেয়াদে ঋণ-নির্ভরতা থেকে বেড়িয়ে বিদেশি বিনিয়োগ (FDI) আকর্ষণের নীতিগত সিদ্ধান্ত এবং কর ব্যবস্থার অটোমেশন অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত ইতিবাচক একটি বাঁকবদল।
তবে, এই বাজেটের বড় দুর্বলতা হলো এর স্ববিরোধী এবং সাংঘর্ষিক লক্ষ্যমাত্রা। সরকার একদিকে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার একটি বিশাল সম্প্রসারণমূলক ফিসকাল পলিসি নিচ্ছে, আবার একই সাথে আশা করছে মূল্যস্ফীতি ৭.৫%-এ নেমে আসবে এবং প্রবৃদ্ধি ৬.৫% হবে, অর্থনীতির সাধারণ সূত্র মতে এটি প্রায় অসম্ভব। পাশাপাশি, জিডিপির ১০.২% বা ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায়ের যে উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে, তা আদায় না হলে বাজেট ঘাটতি আরও বড় আকার ধারণ করবে।
সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গাটি হলো বিশাল বাজেট ঘাটতি এবং এর অর্থায়ন। বাজেটের এক-চতুর্থাংশ বা ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকাই ঘাটতি, যা জিডিপির ৩.৬%। এই ঘাটতি মেটাতে সরকার দেশের ব্যাংক ব্যবস্থা থেকেই ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা করেছে। ব্যাংকে এমনিতেই খেলাপি ঋণের পাহাড়, যা প্রায় ৩৫.৭৩% বা ৬ লাখ ৪৪ হাজার কোটি টাকা। সরকার যদি ব্যাংক থেকে এত বিপুল পরিমাণ তরল অর্থ তুলে নেয়, তবে বেসরকারি খাত এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা ঋণ পাবে কোথা থেকে? এর ফলে বাজারে 'ক্রাউডিং আউট ইফেক্ট' তৈরি হতে পারে, যা নতুন কর্মসংস্থান এবং উৎপাদনকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করবে।
এই ঘাটতি বাজেট পূরণ করার জন্য সরকার যদি দেশীয় ব্যাংক থেকে ধার না করে, তাহলে অপর উপায় হল বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে টাকা ছাপানো। এটার কথা সরকার যদিও বলে নাই, কিন্তু, যদি সত্যি এই শেষ উপায় সরকারকে গ্রহণ করতে হয়, তাহলে এর সরাসরি প্রভাব পড়বে মূল্যস্ফীতিতে। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) আকার বাড়িয়ে ৩ লাখ কোটি টাকা করা এবং ঘাটতি মেটাতে বাজারে যে অতিরিক্ত অর্থের জোগান তৈরি হবে, তা সরাসরি 'চাহিদা-বৃদ্ধিজনিত মূল্যস্ফীতি' (Demand-Pull Inflation) উসকে দেবে।
অনেকে বলতে পারেন মূল্যস্ফীতি কমানোর দায়িত্ব তো কেন্দ্রীয় ব্যাংকের। এইখানে অর্থনীতির একটা গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবন্ধকতা আছে। বাংলাদেশের মতন দেশে (যেখানে এক্সচেঞ্জ রেট কন্ট্রোল করা হয়, অর্থাৎ এক্সচেঞ্জ রেট ফ্রি ফ্লোট না; এবং উন্মুক্ত বাজার - অর্থাৎ এক্সপোর্ট - ইমপোর্ট হয়) মনিটারি পলিসির ইফেক্টিভনেস খুবই কম। এখানে মূল্যস্ফীতি কমানোর মূল উপায় ফিস্কাল রেস্ট্রেইন্ট, এবং ফিস্ক্যাল প্রুডেনসি।
সবশেষে আসে মূল্যস্ফীতি ও দারিদ্র্যের ফাঁদ। আমাদের দেশে আয় বৈষম্য বা জিনি সহগ (Gini Coefficient) ০.৪৯৯-এ পৌঁছেছে, যা বেশ উদ্বেগজনক। কোভিড পরবর্তী সময়ে শুধুমাত্র উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে বাংলাদেশে নতুন করে দারিদ্র্যসীমার নীচে চলে গিয়েছেন প্রায় দেড় কোটি মানুষ। বাজেটে এই বাস্তবতার লক্ষ করা যায় না।
মূল্যস্ফীতি হলো গরিবের ওপর চাপানো সবচেয়ে বড় পরোক্ষ কর। বাজেটে কিছু চমৎকার সংস্কারের প্রস্তাব থাকলেও, সামষ্টিক অর্থনীতির মূল চ্যালেঞ্জ, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে এটি বেশ ঝুঁকিপূর্ণ। সরকার যদি ব্যয়ের গুণগত মান নিশ্চিত করতে না পারে এবং ব্যাংক ঋণের ওপর এই মাত্রাতিরিক্ত নির্ভরতা না কমায়, তবে বাংলাদেশের মূল্যস্ফীতি ডাবল ডিজিটে যাওয়া ঠেকানো সত্যিই কঠিন হবে।
এই বাজেট ধনীর, সমাজে উদ্যোক্তা শ্রেণীর, কিংবা যারা আমদানি রপ্তানির সাথে সংশ্লিষ্ট - তাদের জন্য বেশ ভাল। কিন্তু মূল্যস্ফীতির কারনে দেশের সবচেয়ে গরীব যেই ২৫ শতাংশ মানুষ নিয়মিত হিমশিম খাচ্ছেন, এই বাজেটে শঙ্কার জায়গা সেখানেই। যদি কর আদায় এর লক্ষ মাত্রা পূরণ না হয়, ঘাটতি মেটাতে সরকারকে ব্যাংক থেকে বেশি মাত্রায় ধার করতে হয়, কিংবা টাকা ছাপাতে হয় - এই মূল্যস্ফীতির করাঘাত সবচেয়ে বেশি অনুভব করবেন এই গরীব জনগোষ্ঠী।
গত পাঁচ বছর যাবত উচ্চ মূল্যস্ফীতির মধ্যে আটকে থাকা বাংলাদেশের মতন একটা দেশে ফিস্কাল পলিসির মূল ফোকাস হওয়া উচিত এই মূল্যস্ফীতির রাশ টেনে ধরে রাখা, অন্তত পক্ষে যতটা সম্ভব। সেই প্রেক্ষাপটে এই বাজেট কতটা গরীব বান্ধব এবং সমতা ভিত্তিক, সেই প্রশ্ন তাই থেকেই যায়।
মতামত
এখনও কোনো মতামত নেই।
প্রথম মতামতটি আপনিই দিন।
আলোচনায় অংশ নিতে লগ ইন করুন অথবা এ্যাকাউন্ট খুলুন