সকল লেখা জানতে চাই
Searching…

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তিতে বাংলাদেশের শঙ্কার জায়গা গুলো কোথায়?

গত ৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে, জাতীয় নির্বাচনের মাত্র তিন দিন...

Mahtab Uddin
Mahtab Uddin মজদুরের নিয়মিত লেখক
পড়তে 12 মিনিট লাগতে পারে
এই লেখাটি 94 বার পড়েছে
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তিতে বাংলাদেশের শঙ্কার জায়গা গুলো কোথায়?

গত ৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে, জাতীয় নির্বাচনের মাত্র তিন দিন আগে প্রফেসর ইউনূসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার যুক্তরাষ্ট্রের সাথে 'এগ্রিমেন্ট অন রেসিপ্রোকাল ট্রেড (ART)' বা দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষর করে। এই চুক্তিটি আমাদের অর্থনীতির জন্য একটি টিকিং টাইম বোমায় পরিণত হয়েছে। জনসমক্ষে এটিকে আমাদের তৈরি পোশাক (RMG) খাতের জন্য অগ্রাধিকারমূলক বাজার সুবিধা অর্জনের একটি অতি প্রয়োজনীয় লাইফলাইন হিসেবে প্রচার করা হলেও, চূড়ান্ত ও আইনিভাবে বাধ্যতামূলক চুক্তির বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এর অনেকগুলো ধারা আমাদের অর্থনৈতিক, নিয়ন্ত্রক এবং ভূ-রাজনৈতিক সার্বভৌমত্বের বা স্বার্থের সাথে সাংঘর্ষিক।

 ১) এই চুক্তি অনুসারে বাংলাদেশকে যুক্তরাষ্ট্রকে পর্যায়ক্রমে ৬৭০০+ টি পণ্যে পূর্ণ শুল্ক সুবিধা দিতে হবে। এর মধ্যে ৪৫০০ টি পণ্যে বিনা শুল্কে বাংলাদেশে প্রবেশাধিকার দিতে হবে চুক্তি স্বাক্ষরের পর অনতিবিলম্বে। এর মধ্যে আছে, কৃষি পণ্য, মাংস, পশুখাদ্য, সামুদ্রিক মাছ, রাসায়নিক পণ্য, বিভিন্ন আইসিটি ও ইলেকট্রনিক্স পণ্য, ইত্যাদি। ইত্যাদি। ১৫৩৯ টি পণ্যে অনতিবিলম্বে ৫০ শতাংশ ট্যারিফ ছাড় দিতে হবে, ৫ বছরের মধ্যে দিতে হবে পূর্ণ শুল্ক ছাড়। এর মধ্যে আছে বিভিন্ন ধরনের শিল্পের কাঁচামাল, প্লাস্টিক পণ্য, ইত্যাদি। বাকি ৬৭২টি পণ্যে ৫০ শতাংশ ট্যারিফ ছাড় দিতে হবে এখনই, ১০ বছরের মধ্যে দিতে হবে পূর্ণ শুল্ক ছাড় – যার মধ্যে আছে – কিছু কৃষি পণ্য, খাদ্য প্রক্রিয়াজাত পণ্য, ভোক্তা পণ্য, গাড়ি বা যানবাহন, ইত্যাদি।

 এই বিপুল ছাড়ের বিপরীতে বাংলাদেশের একমাত্র যেই পণ্য শুল্ক ছাড় পাবে, সেটা হলো বাংলাদেশের গার্মেন্ট পণ্য। কিন্তু, এটাও আবার শর্তসাপেক্ষ। চুক্তিতে শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়েছে যে, এই শূন্য-শুল্ক সুবিধা কেবল তখনই পাওয়া যাবে, যখন পোশাক তৈরিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে উৎপাদিত তুলা এবং কৃত্রিম সুতা ব্যবহার করা হবে। বাকি সকল পণ্যে বাংলাদেশের উপর ১৯ শতাংশ + পূর্ববর্তী এমএফএন ট্যারিফ বসবে। যেমন, গার্মেন্ট এর ক্ষেত্রে বাংলাদেশের পূর্ববর্তী ট্যারিফ যদি হয় ১৬ শতাংশ – তাহলে যেসকল গার্মেন্ট দেশীয় তুলা বা তৈরি সুতা ব্যবহার করে কাপড় রপ্তানি করবে, তাদের বর্তমান ট্যারিফ হবে ৩৫ শতাংশ। চামড়াজাত পণ্যে আমাদের দিতে হবে প্রায় ২৭-৩০ শতাংশ, জুতো রপ্তানিতে দিতে হবে প্রায় ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ। অপরাপর পণ্যে প্রায় ২৫ থেকে ৩৫ শতাংশ। অর্থাৎ, আমেরিকার হাজার হাজার পণ্যে আমরা দিচ্ছি ০ শতাংশ শুল্ক, বিনিময়ে আমেরিকা আমাদের দিচ্ছে ২০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক।

 ২) আমাদের পোশাক শিল্প বর্তমানে তাদের কাঁচামালের সিংহভাগই নিকটবর্তী প্রতিবেশী দেশগুলো অথবা দেশীয় স্পিনিং মিলগুলো থেকে সংগ্রহ করে থাকে। পুরো বৈশ্বিক সাপ্লাই চেইনকে রাতারাতি মার্কিন তুলার ওপর নির্ভরশীল করতে গেলে লজিস্টিক বা পরিবহন খরচ ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পাবে এবং কাঁচামালের দামও অনেক বেশি পড়বে। যেহেতু আমাদের পোশাক খাতের নিট মূল্য সংযোজন (net value addition) ৪০ শতাংশেরও কম, তাই কাঁচামাল সংগ্রহের এই বর্ধিত খরচ আমাদের যেকোনো প্রান্তিক রপ্তানি আয়কে কমিয়ে দিতে পারে। ফলে আমাদের কারখানা ও শ্রমিকরা চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়তে পারেন।

 ৩) শুধুমাত্র গার্মেন্টস খাতই নয়, চুক্তির শর্ত অনুযায়ী, বাংলাদেশ মার্কিন পণ্যের ওপর শুল্কমুক্ত সুবিধা প্রদান করলে, আমাদের কৃষি ও স্থানীয় শিল্প খাতেও হুমকি ডেকে আনতে পারে । বাংলাদেশে এই মুহূর্তে অতি উচ্চ আমদানি শুল্ক বিদ্যমান। এরকম পরিস্থিতিতে হুট করে একটা দেশের পণ্যকে শূন্য শুল্ক সুবিধা দিলে – সেটা মোটাদাগে দেশীয় কৃষি ও শিল্পখাতকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলতে পারে। আবার, চুক্তিতে বাংলাদেশকে একটি কঠোর ২৪ মাসের সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছে, যার মধ্যে নিজস্ব কোনো বাধ্যতামূলক ল্যাব টেস্ট বা ক্রেতাদের জন্য আলাদা লেবেলিং ছাড়াই মার্কিন বায়োটেক পণ্য বা জেনেটিক্যালি মডিফায়েড (GMO) ফসল ও বীজকে এদেশের বাজারে প্রবেশের অনুমতি দিতে হবে। এছাড়া মার্কিন পোল্ট্রি, মাংস, দুগ্ধজাত পণ্য এবং ডিম আমদানির ক্ষেত্রে আমরা কোনো নন-অটোমেটিক ইম্পোর্ট লাইসেন্সিং ব্যবহার করে বাধা দিতে পারব না। ভর্তুকিপ্রাপ্ত পশ্চিমা পণ্য এবং পরীক্ষাবিহীন জিএমও ফসলের এই অবাধ প্রবেশের ফলে আমাদের ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকরা ক্ষতির স্বীকার হতে পারেন। ইউরোপের যেসব দেশে GMO আমদানি বৈধ – সেই সকল দেশে ব্যাপক পরিমাণ টেস্টিং এর পরই শুধুমাত্র আমদানীর অনুমতি দেয় হয়। GMO খাদ্য পণ্য বিশেষ লেবেলিং করতে হয়, এই ধরনের খাবারের প্রভাব জীব বৈচিত্র্যের উপর, দেহের উপর কেমন প্রভাব পরে – সেটাও যাচাই করা হয়। এই ধরনের খাদ্যের উৎপাদন খরচ অনেক কম। আমাদের চাষিরা কি পারবেন এই প্রতিযোগিতা সামাল দিতে?

 দেশীয় কৃষকরা তখন আমেরিকার কৃষকদের সাথে সরাসরি প্রতিযোগিতা করবেন। বেশ কিছু কৃষি পণ্যে এরকম অসম প্রতিযোগিতা কৃষিখাতের শ্রমবাজার থেকে শুরু করে দারিদ্র এবং বৈষম্যের উপর সরাসরি প্রভাব বিস্তার করতে পারে। বাংলাদেশের মোট শ্রমিকের ৪২ শতাংশ, আর নারী শ্রমিকদের ক্ষেত্রে দুই তৃতীয়াংশ কৃষিখাতে কর্মরত। কিছু কিছু গবেষণার মতে, বাংলাদেশের কৃষকদের মধ্যে দারিদ্র্যের হার শতকরা ৬০ থেকে ৮০ শতাংশ। এইরকম অবস্থায়, কৃষিখাতকে এরকমভাবে মুক্ত করা কি সমীচীন? কৃষিখাতে এই প্রতিযোগিতায়ই একমাত্র দুশ্চিন্তার কারণ না। এই চুক্তি অনুসারে বাংলাদেশের কৃষকরা তাদের বীজ সংরক্ষণ করতে পারবেন না। মৎস্য খাতে বাংলাদেশ কোনো ধরনের ভর্তুকি দিতে পারবে না। মৎস্য খাতকে নিয়ন্ত্রণের মধ্যে আনতে হবে।

 ৪) এর ক্ষতিকর ফলাফল অপরাপর ইন্ডাস্ট্রি গুলোর জন্যও প্রযোজ্য। যেমন, এই চুক্তির মাধ্যমে আমরা দেশীয় পণ্য উৎপাদনকারী শিল্পখাতকে কোনো ধরনের প্রণোদনা বা ভর্তুকি দিতে পারবো না। বর্তমানে বাংলাদেশে রপ্তানিমুখি শিল্পখাতকে তিন ধরনের প্রণোদনা দিতে পারে – ১) ডিরেক্ট ক্যাশ বেনিফিট, ২) ডিউটি ড্রব্যাক, এবং ৩) বন্ডেড ওয়্যারহাউস। এই ধরনের সুযোগ সুবিধা বাংলাদেশের পোশাক খাতকে শক্তিশালী করতে সাহায্য করেছিল। বর্তমানে চামড়া, পাদুকা এবং ওষুধ শিল্প এই ধরনের সুবিধা থেকে সাহায্য পাচ্ছিল। এই ধরনের সাহায্য অনির্ধারিত সময় ধরে চলতে পারে না ঠিক, কিন্তু – উদীয়মান শিল্পের ক্ষেত্রে গুরুত্বপুর্ন ভূমিকা রাখতে পারে। মার্কিন চুক্তির কারণে এই ধরনের প্রণোদনা কিংবা সরাসরি সরকারি ভর্তুকি – হুমকির মুখে পরবে।

 আবার, পাদুকা, লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং, প্লাস্টিক ও ইলেকট্রনিক্সের মতো আমাদের বিকাশমান দেশীয় শিল্পগুলোকে সাময়িক শুল্ক সুরক্ষার মাধ্যমে বেড়ে ওঠার সুযোগ এই চুক্তি বন্ধ করে দিবে। আমি কোনো ভাবেই বাংলাদেশের বিদ্যমান উচ্চ শুল্কের পক্ষে না। বহু পণ্যে আমাদের Effective Rate of Protection (ERP) এই মুহূর্তে ১০০ বা ২০০ শতাংশের ঘরে। কিন্তু, এই মুহূর্তে যদি আমরা আমাদের শুল্কহার সেখান থেকে একদম হঠাৎ করে শূন্যে নামিয়ে আনি – তার প্রভাব ভয়াবহ হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। যেখানে আমেরিকা নিজেই তাদের দেশে ট্যারিফ বাড়িয়ে ম্যানুফ্যাকচারিং ইন্ডাস্ট্রি বাড়াতে চাচ্ছে, সেখানে আমরা কীভাবে আশা করতে পারি যে – আমার দেশের শিল্পখাত এই ধরনের ঘাত সহ্য করতে পারবে? কোনো দেশকে শূন্য শুল্ক সুবিধা দিতে হলে – অবশ্যই যাচাই করতে হবে – (১) কোন কোন খাতকে আমরা শূন্য শুল্ক দিবো, (২) বিনিময়ে আমরা কোন কোন খাতে শূন্য শুল্ক বা কম শুল্ক পাবো, এবং (৩) এর সম্ভাব্য নেট প্রভাব দেশের উপর কেমন হবে? বিদ্যমান পরিস্থিতিতে, বাংলাদেশের উচিত (১) আমদানি নির্ভর কাঁচামালের উপর শূন্য শুল্ক দেয়া, (২) বাংলাদেশের রপ্তানি সম্ভাবনা আছে এই ধরনের সকল পণ্য (শুধু গার্মেন্টস না) ঐ দেশে শূন্য শুল্কের প্রবেশ চাওয়া।

 ৫) এই চুক্তির আরও ক্ষতিকর দিক আছে। যেমন, আমরা কাদের সাথে বাণিজ্য চুক্তি করবো, আর কার সাথে করবোনা – এই চুক্তি সেটা নির্ধারণ করে দিচ্ছে। চুক্তি অনুসারে আমরা মার্কিন নীতিবিরুদ্ধ কোনো দেশের সাথে (যেমন, উদাহরন হিসেবে বলা যেতে পারে চায়না, রাশিয়া, ইত্যাদি) বাণিজ্য চুক্তি করতে পারবো না। আবার এই চুক্তি অনুসারে আমাদেরকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে সমরাস্ত্র ক্রয় বাড়াতে হবে। আবার, আমরা কাদের থেকে সমরাস্ত্র কিনবো – এই চুক্তি তাও নির্দেশ করে। যেমন, এই চুক্তি অনুসারে মার্কিন নীতি বিরোধী দেশের থেকে আমরা সমরাস্ত্র কিনতে চাইলে সেটা যুক্তরাষ্ট্র বাঁধা দিতে পারবে। চায়নার একদম আধুনিক যেই যুদ্ধ বিমান আছে – আমরা যদি সেগুলো কিনতে চাই, এই চুক্তি অনুসারে আমরা সেটা পারবো না।

 আবার এই চুক্তি অনুসারে আমরা জোটনিরপেক্ষ অবস্থান এ থাকতে পারব না। মনে করুন, জাতিসংঘে প্যালেস্টাইনের উপর একটা দাবি এসেছে। এ চুক্তি অনুসারে আমরা সেই দাবিতে যুক্তরাষ্ট্রের দাবির বিরুদ্ধে দাঁড়াতে পারবো না। আমরা গাজায় যুক্তরাষ্ট্রে গণহত্যায় জড়িত থাকার ব্যাপারে আন্তর্জাতিক মঞ্চে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে বলতে পারবো না।

 ৬) উপরন্তু, এই চুক্তির মাধ্যমে বাংলাদেশ সরকারকে বিপুল অঙ্কের মূলধনী ব্যয় করতে আইনিভাবে বাধ্য করা হয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে ২.৮৬ বিলিয়ন ডলারে ১৪টি বোয়িং (Boeing)। বিমান ক্রয় এবং আগামী ১৫ বছরে আনুমানিক ১৫ বিলিয়ন ডলারের মার্কিন জ্বালানি বা এলএনজি (LNG) ক্রয়, বছরে কয়েক বিলিয়ন ডলারের কৃষিপণ্য আমদানি। এইখানে সবচেয়ে বড় আশঙ্কা হলো, আমরা যুক্তরাষ্ট্র থেকে যতটুকু আয় করি, এর ফলে তার থেকে ব্যয় বেশি করে না ফেলি। বাংলাদেশের RMG value Addition মাত্র চল্লিশ শতাংশ। মানে, আমরা যদি একশ ডলার রপ্তানি করি, সেই একশ ডলার রপ্তানির জন্য আমার আমদানি করতে হয় ৬০ ডলার, বাংলাদেশের পকেটে থাকে ৪০ ডলার। গত বছর আমাদের আমেরিকায় মোট রপ্তানির পরিমাণ ছিল ৮ বিলিয়ন ডলার এর মতন, যার প্রায় পুরোটাই গার্মেন্টস। অর্থাৎ, এই ৮ বিলিয়ন ডলার থেকে বাংলাদেশের পকেটে নেট ঢুকে মাত্র ৩.২ বিলিয়ন ডলার। এই বিবেচনায় আমরা কি সত্যি আমেরিকা থেকে এত এত আমদানি প্রতিশ্রুতি দিতে পারি? কিছু কিছু জায়গায় অবশ্যই আমাদের ছাড় দিতে হবে সত্যি, কিন্তু এই ক্যালকুলেশন কি করা হয়েছে – যে আমেরিকা থেকে এইসব কিনলে আমাদের নেট লসের পরিমাণ কত হবে?

 এই চুক্তির সবচেয়ে বড় প্রহসন এবং চরম ট্র্যাজেডি হলো, যে সুবিধার আশায় আমরা এই আত্মসমর্পণ করেছিলাম, তা ইতোমধ্যেই বিলীন হয়ে গেছে। আইইইপিএ (IEEPA) আইনের অধীনে যুক্তরাষ্ট্রের হুমকি দেওয়া চরম শাস্তিমূলক গ্লোবাল ট্যারিফ বা শুল্ক থেকে রেহাই পেতেই বাংলাদেশ তার এই বিশাল অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রক সার্বভৌমত্ব বিসর্জন দিতে রাজি হয়েছিল। কিন্তু গত ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে, মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট 'লার্নিং রিসোর্সেস, ইনকর্পোরেটেড বনাম ট্রাম্প' (Learning Resources, Inc. v. Trump) মামলায় একটি ঐতিহাসিক রায় দিয়ে এই IEEPA শুল্ক বাতিল করে দেয় এবং মার্কিন প্রেসিডেন্টের এই শুল্ক আরোপের আইনি ক্ষমতাকে অবৈধ ঘোষণা করে।

 আইনি এই পরাজয়ের পর মার্কিন প্রশাসন তাৎক্ষণিকভাবে ১৯৭৪ সালের ট্রেড অ্যাক্টের 'সেকশন ১২২' (Section 122) প্রয়োগ করে বিশ্বব্যাপী ১৫ শতাংশ অস্থায়ী শুল্ক আরোপ করে। যেহেতু সেকশন ১২২ সব দেশের ওপর সমানভাবে প্রযোজ্য এবং এটি পূর্বে আলোচনা করা দেশভিত্তিক শুল্ক ছাড়ের বিষয়টিকে বাতিল করে দেয়, তাই বাংলাদেশ এখন সেই সব দেশের মতোই সমান ১৫% শুল্কের মুখে পড়েছে, যারা যুক্তরাষ্ট্রকে কোনো সুবিধাই দেয়নি। অর্থাৎ, যে পারস্পরিক সুবিধার আশায় আমরা এতবড় চুক্তির আইনি বাধ্যবাধকতা কাঁধে নিয়েছি, সেই সুবিধাই এখন আর অস্তিত্বশীল নেই।

 নির্বাচিত বিএনপি (BNP) সরকার এখন এক চরম নীতিগত সংকটের (trilemma) উত্তরাধিকারী হয়েছে। তবে হুট করে একতরফাভাবে চুক্তিটি বাতিল করে দেওয়া কোনো সমাধান নয়। তড়িঘড়ি করে চুক্তিটি বাতিল করলে 'সেকশন ৩০১' (Section 301)-এর অধীনে চরম প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থা বা শাস্তিমূলক শুল্কের মুখে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে, যা আমাদের পুরো রপ্তানি অর্থনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। এর বদলে সরকারকে অত্যন্ত সুকৌশলে এবং ধৈর্যের সাথে এগোতে হবে। ঢাকাকে আন্তর্জাতিক আইনের সুপ্রতিষ্ঠিত নীতি 'মৌলিক পরিবর্তনের (rebus sic stantibus)'-এর যৌক্তিকতা তুলে ধরতে হবে। কূটনৈতিক বার্তায় স্পষ্ট করে জানাতে হবে যে, মার্কিন সুপ্রিম কোর্টের রায়ে IEEPA শুল্ক বাতিল হয়ে যাওয়ার ফলে চুক্তির মূল ভিত্তি ও প্রতিশ্রুত সুবিধাই নষ্ট হয়ে গেছে। আর তাই বাংলাদেশের বাধ্যবাধকতাগুলোর অবিলম্বে পুনর্মূল্যায়ন ও আনুপাতিক সংশোধন প্রয়োজন।

 একই সাথে, সবচেয়ে ক্ষতিকর শর্তগুলোর বাস্তবায়ন ঠেকাতে সরকারকে এই চুক্তির আনুষ্ঠানিক সংসদীয় অনুমোদন অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত রাখতে হবে। আগামী ৩০ দিনের মধ্যে বিশেষজ্ঞদের দিয়ে একটি স্বাধীন অর্থনৈতিক প্রভাব মূল্যায়ন সম্পন্ন করতে হবে, যেই কমিশন এই চুক্তির ফলে সৃষ্ট রাজস্ব ঘাটতি এবং স্থানীয় শিল্প ও কৃষিখাতের হুমকির প্রভাব পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পরিমাপ করবেন। বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ মাথায় রেখে চুক্তি বাতিল বা সংশোধনের পথ অবলম্বন করতে হবে।

 যে বাণিজ্য চুক্তি আমাদের অর্থনৈতিক স্বার্বভৌমত্ব কেড়ে নিতে পারে, কৌশলগত ও সামরিক ক্ষেত্রে স্বাধীনতা কেড়ে নিতে পারে এবং দেশীয় শিল্পকে হুমকির মুখে ফেলতে পারে সেটা কোনো অংশীদারিত্ব চুক্তি হতে পারে না; এটি অনেকাংশেই আত্মসমর্পণ। ভিয়েতনাম এবং মালয়েশিয়ার চুক্তি বাংলাদেশের তুলনায় অনেক বেশি তাদের দেশীয় স্বার্থের সাথে অনুবেদনশীল।

 এই চুক্তি নিয়ে তাই আওয়াজ তুলুন। এই চুক্তি স্থগিত করুন। পরিপূর্ণ বিশ্লেষণের পর, দেশীয় স্বার্বভৌমত্ব ও স্বার্থ বজায় রেখে চুক্তিতে সম্মানজনক পরিবর্তন আনুন বা বাতিল করুন।

Mahtab Uddin

About the Author

Mahtab Uddin

মজদুরের নিয়মিত লেখক

শিক্ষক ও গবেষক

উন্নয়ন অর্থনীতিবিদ

প্রোফাইল দেখুন

মতামত

এখনও কোনো মতামত নেই।

প্রথম মতামতটি আপনিই দিন।

আলোচনায় অংশ নিতে লগ ইন করুন অথবা এ্যাকাউন্ট খুলুন

Reading

Font size

Auto scroll
Slow Fast